Image description

বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর থেকে এ পর্যন্ত রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালন করেছেন মোট ২২ জন। সংবিধান অনুযায়ী রাষ্ট্রপতির মেয়াদ পাঁচ বছর হলেও নানা রাজনৈতিক পালাবদল, সামরিক শাসন, গণঅভ্যুত্থান, অভ্যুত্থান-পরবর্তী পরিবর্তন, মৃত্যু ও পদত্যাগের কারণে তাদের মধ্যে ১৭ জনই পূর্ণ মেয়াদ শেষ হওয়ার আগেই দায়িত্ব ছেড়েছেন। মাত্র চারজন রাষ্ট্রপতি সংবিধান অনুযায়ী নির্ধারিত মেয়াদ সম্পন্ন করতে পেরেছেন।

স্বাধীনতার পর ১৯৭১ সালের ১৭ এপ্রিল মুজিবনগর সরকারের অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি হিসেবে দায়িত্ব নেন সৈয়দ নজরুল ইসলাম। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান তখন পাকিস্তানের কারাগারে বন্দি থাকায় তার অনুপস্থিতিতে তিনি ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালন করেন। মুক্তিযুদ্ধকালীন সরকারের নেতৃত্বে থেকে তিনি স্বাধীনতা সংগ্রাম পরিচালনায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন।

স্বাধীনতার পর ১৯৭২ সালের ১০ জানুয়ারি দেশে ফিরে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব গ্রহণ করেন। একই বছরের ১২ জানুয়ারি সংসদীয় সরকারব্যবস্থা চালু হলে তিনি প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব নেন এবং রাষ্ট্রপতির পদ ছেড়ে দেন।

এরপর আবু সাঈদ চৌধুরী ১৯৭২ সালের ১২ জানুয়ারি রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব গ্রহণ করেন। তিনি ১৯৭৩ সালের ২৪ ডিসেম্বর পর্যন্ত দায়িত্ব পালন করেন। পরে তার স্থলাভিষিক্ত হন মোহাম্মদ মোহাম্মদুল্লাহ, যিনি ১৯৭৩ সালে রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন। ১৯৭৫ সালের জানুয়ারিতে চতুর্থ সংশোধনীর পর তিনি রাষ্ট্রপতির পদ থেকে সরে দাঁড়ান।

১৯৭৫ সালের ২৫ জানুয়ারি রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব নেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। ওই বছরের ১৫ আগস্ট সপরিবারে হত্যাকাণ্ডের মাধ্যমে তার দায়িত্বের অবসান ঘটে। এরপর রাষ্ট্রপতি হন খন্দকার মোশতাক আহমেদ। মাত্র ৮৩ দিনের মাথায় ৬ নভেম্বর তিনি ক্ষমতা হারান।

পরে প্রধান বিচারপতি আবু সাদাত মোহাম্মদ সায়েম রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব নেন। ১৯৭৭ সালে তিনি পদত্যাগ করলে রাষ্ট্রপতি হন জিয়াউর রহমান। তিনি ১৯৭৮ সালে নির্বাচিত হয়ে দায়িত্ব পালন করলেও ১৯৮১ সালের ৩০ মে চট্টগ্রামে এক ব্যর্থ সেনা অভ্যুত্থানে নিহত হন।

জিয়াউর রহমানের মৃত্যুর পর অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি হন আবদুস সাত্তার। পরে নির্বাচিত হলেও ১৯৮২ সালের ২৪ মার্চ সেনাপ্রধান হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের সামরিক অভ্যুত্থানে তিনি ক্ষমতাচ্যুত হন। হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ প্রথমে প্রধান সামরিক আইন প্রশাসক হিসেবে ক্ষমতায় থাকলেও ১৯৮৩ সালে রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব নেন। ১৯৮৬ সালে নির্বাচিত হন, তবে ১৯৯০ সালের গণঅভ্যুত্থানের মুখে পদত্যাগ করেন।

এরপর প্রধান বিচারপতি শাহাবুদ্দীন আহমদ অস্থায়ী রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৯১ সালে সংসদীয় সরকারব্যবস্থা পুনঃপ্রবর্তনের পর তিনি প্রধান বিচারপতির পদে ফিরে যান। ১৯৯১ সালে রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন আবদুর রহমান বিশ্বাস। তিনি পূর্ণ পাঁচ বছরের মেয়াদ সম্পন্ন করেন। এরপর শাহাবুদ্দীন আহমদ দ্বিতীয়বার রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হয়ে ১৯৯৬ থেকে ২০০১ সাল পর্যন্ত পূর্ণ মেয়াদ পালন করেন।

২০০১ সালে রাষ্ট্রপতি হন এ কিউ এম বদরুদ্দোজা চৌধুরী। তবে রাজনৈতিক বিরোধের মধ্যে ২০০২ সালে তিনি পদত্যাগ করেন। তার স্থলাভিষিক্ত হন ইয়াজউদ্দিন আহম্মেদ, যিনি ২০০৯ সাল পর্যন্ত দায়িত্ব পালন করেন।

২০০৯ সালে রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন মো. জিল্লুর রহমান। দায়িত্বে থাকাকালীন ২০১৩ সালে তিনি মৃত্যুবরণ করেন। এরপর রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব নেন মো. আবদুল হামিদ। তিনি ২০১৩ সালে প্রথমবার এবং ২০১৮ সালে দ্বিতীয়বার নির্বাচিত হয়ে টানা দুই মেয়াদে প্রায় এক দশক দায়িত্ব পালন করেন। তিনিই বাংলাদেশের ইতিহাসে সবচেয়ে দীর্ঘ সময় রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালনকারী ব্যক্তি।

২০২৩ সালে রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন মো. সাহাবুদ্দিন। তিনি অসুস্থার কারণ দেখিয়ে শুক্রবার (২৪ জুলাই) পদত্যাগ করেন। এরপর ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন বাংলাদেশের ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের স্পিকার মেজর (অব.) হাফিজ উদ্দিন আহমদ, বীর বিক্রম। 

রাষ্ট্রপতিদের মধ্যে পূর্ণ মেয়াদ সম্পন্ন করতে পেরেছেন আবদুর রহমান বিশ্বাস (৯ অক্টোবর ১৯৯১ থেকে ৮ অক্টোবর ১৯৯৬), শাহাবুদ্দীন আহমদ (৯ অক্টোবর ১৯৯৬ থেকে ৮ অক্টোবর ২০০১), ইয়াজউদ্দিন আহম্মেদ ( ৬ সেপ্টেম্বর ২০০২ থেকে ১২ ফেব্রুয়ারি ২০০৯) নির্ধারিত পাঁচ বছরের মেয়াদ শেষ করে উত্তরসূরি শপথ নেওয়া পর্যন্ত দায়িত্ব পালন করেন, মো. আবদুল হামিদ দুই মেয়াদে দায়িত্ব পালন করেন  প্রথম মেয়াদ (২৪ এপ্রিল ২০১৩ থেকে ২৩ এপ্রিল ২০১৮) দ্বিতীয় মেয়াদ (২৪ এপ্রিল ২০১৮ থেকে ২৩ এপ্রিল ২০২৩)। 

অন্যদিকে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, জিয়াউর রহমান, হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ, এ কিউ এম বদরুদ্দোজা চৌধুরী, মো. জিল্লুর রহমানসহ মোট ১৭ জন রাষ্ট্রপতি বিভিন্ন কারণে নির্ধারিত মেয়াদ শেষ হওয়ার আগেই দায়িত্ব ছাড়েন।

বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতির পদটি সাংবিধানিকভাবে সর্বোচ্চ হলেও দেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে বারবার ক্ষমতার পালাবদল, সামরিক হস্তক্ষেপ, সংবিধান সংশোধন ও রাজনৈতিক সংকটের প্রভাব এই পদেও স্পষ্টভাবে প্রতিফলিত হয়েছে। ফলে স্বাধীনতার পাঁচ দশকের বেশি সময়ে রাষ্ট্রপতির পদে স্থিতিশীলতার চেয়ে অস্থিরতার ইতিহাসই বেশি দৃশ্যমান।