গাজীপুরের ইন্টারন্যাশনাল মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে মায়ের মৃত্যুর ঘটনায় অবহেলার অভিযোগ তোলা রায়হান হোসেন রুদ্রকে প্রতিষ্ঠানটি ভাঙচুরের অভিযোগে গ্রেপ্তার করেছে টঙ্গী পূর্ব থানা পুলিশ। হাসপাতালের দায়ের করা মামলায় গতকাল শুক্রবার (২৫ জুলাই) তাকে গ্রেপ্তার করা হয়। এরপর আদালতে হাজির করা হলে তাকে কারাগারে পাঠানোর আদেশ দেওয়া হয়েছে। তবে এর আগে বিচার চেয়ে আদালতে একটি মামলা এবং স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ে পৃথক আবেদন করা হলেও কোনো প্রতিকার পাননি তিনি। খবর দ্য ডিসেন্টের।
জানা গেছে, চিকিৎসাধীন অবস্থায় মায়ের মৃত্যুতে অবহেলার অভিযোগ তুলে গত ১৬ মার্চ আদালতে মামলা করেছিলেন রায়হান। বিচার চেয়ে গত ২৬ এপ্রিল স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়েও পৃথক একটি আবেদন করেছিলেন তিনি। রায়হানের দায়ের করার মামলার তদন্ত করছে পিবিআই। এদিকে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের গঠিত তদন্ত কমিটিও পৃথক ভাবে করছে অভিযোগের তদন্ত। এরই মাঝে রায়হান হোসেনের বিরুদ্ধে ভাঙচুরের অভিযোগ তুলে ইন্টারন্যাশনাল মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল পাল্টা মামলা দায়ের করে।
রায়হানের বড় বোন হাসনা হেনা বেগম জানান, শুক্রবার সকালে টঙ্গী পূর্ব থানা পুলিশের একটি টিম তার ভাইকে বাসা থেকে আটক করে। হাসনা হেনা বলেন, তারা মামলা করেছে, কিন্তু আমাদের কাছে সেটার কোন নোটিশ পৌঁছানো হয়নি। কখন মামলা দিয়েছে, কখন ওয়ারেন্ট হয়েছে, আমাদেরকে তো হাজিরার জন্য ডাকবে। কিন্তু সেটা করা হয়নি।
এর আগে রায়হান স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ে আবদেন করলে গত ১৪ মে কয়েকটি ভুয়া পোর্টাল থেকে তার বিরুদ্ধে একযোগে প্রচারণা চালানো হয়। রায়হানের অভিযোগের বিভিন্ন দিক ও ভুয়া পোর্টাল থেকে চালানো প্রচারণা নিয়ে গত ১৯ জুলাই একটি অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রকাশ করে দ্য ডিসেন্ট। রায়হান ওই সময় জানিয়েছিলেন, হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ টাকার বিনিময়ে সমঝোতার প্রস্তাব দিয়েছিল। এছাড়া হাসপাতাল কতৃপক্ষের হয়ে হুমকি দেন মোহাম্মদ হোসেন নামে আওয়ামী লীগের রাজনীতির সাথে জড়িত স্থানীয় এক ব্যক্তি। দ্য ডিসেন্টের অনুসন্ধানে টাকার বিনিময়ে সমঝোতার প্রস্তাবের প্রমাণ পাওয়া যায়। এছাড়া হুমকিদাতা মোহাম্মদ হোসেন বলেছিলেন, হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের অনুরোধে তিনি ফোন করেছিলেন এবং রায়হানের সাথে ভুল বোঝাবুঝি হয়েছিল।
রায়হান আরও জানিয়েছিলেন, টঙ্গী পশ্চিম থানার ওসি মোহাম্মদ আরিফুর রহমান তাকে ডেকে নিয়ে সাইবার ট্রাইবুন্যালে মামলা ও গুম হওয়ার ভয়-ভীতি দেখিয়ে হাসপাতাল এমডির কাছে দুঃখ প্রকাশ করতে বলেছেন। তার অভিযোগ, ওসি তাকে সতর্ক করে বলেছেন, হাসপাতাল কতৃপক্ষের অনেক টাকা, তারা সবকিছু কিনে ফেলবে।
তবে ওসি মোহাম্মদ আরিফুর রহমান এসব অভিযোগ অস্বীকার করে দাবি করেন, তিনি রায়হানের ভালোর জন্যই তাকে সতর্ক করেছিলেন।
রায়হানের আবেদনের প্রেক্ষিতে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় গঠিত নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক তদন্ত কমিটির একজন সদস্য জানিয়েছিলেন, চিকিৎসা অবহেলার অভিযোগের বিপরীতে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ যেসব ডকুমেন্ট উপস্থাপন করেছে সেখানে তারা অসঙ্গতি পেয়েছেন।
হাসপাতালটির সহকারী পরিচালক ডা. শেখ মাহমুদ হাসান জানান তিনি বাদী হয়ে রায়হানের বিরুদ্ধে মামলাটি দায়ের করেছেন। কী অভিযোগে মামলা করেছেন জানতে চাইলে তিনি জানান, রায়হান ও সাথের লোকজন হাসপাতালের স্টাফদের মারধর করেছেন এবং আইসিউতে ভাঙচুর চালিয়েছেন।
মারধর বা ভাঙচুর করার কোন প্রমাণ বা সিসিটিভি ফুটেজ আছে কিনা জানতে চাইলে তিনি বলেন, কাঁচ ভাঙার ছবি আছে। ভাঙচুর ও মারধর করার ফুটেজ নাই কারণ ওই এলাকায় সিসিটিভি কাভারেজ নেই।
রায়হানের বোন হাসনা হেনা বেগম কোন ধরণের ভাঙচুর বা স্টাফদের মারধর করার অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। টঙ্গি পূর্ব থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (তদন্ত) জিল্লুর রহমান জানান, আদালত থেকে ওয়ারেন্ট ইস্যু হওয়ায় তাকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। গ্রেপ্তার করে আদালতে তোলা হলে আদালত তাকে কারাগারে প্রেরণ করে।
গাজীপুর ইন্টারন্যাশনাল হাসপাতালের এমডি এম এ মুবিন খান পতিত আওয়ামী সরকারের স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহেদ মালেকের ঘনিষ্ঠ ব্যক্তি ছিলেন। এছাড়াও আওয়ামী লীগের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্দুল মোমেন, দুর্যোগ ও ত্রাণ প্রতিমন্ত্রী ডা. এনামুর রহমান, শেখ হাসিনার বিশেষ সহকারী নীলুফার আহমেদ, প্রতিমন্ত্রী ডা. মুরাদ হাসান, প্রতিমন্ত্রী জুনায়েদ আহমেদ পলক, হাসিনার উপদেষ্টা কুখ্যাত হলমার্ক কেলেঙ্কারির জনক অধ্যাপক ডা. সৈয়দ মোদাচ্ছের আলীর সাথে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছিল মুবিন খানের।
ডা. সৈয়দ মোদাচ্ছের আলী ইন্টারন্যাশনাল মেডিকেয়ার লিমিটিডের প্রতিষ্ঠাতা সদস্যদের একজন। মোদাচ্ছের আলীর দুই কন্যা মোনা আলী ও সাদিয়া আলী রয়েছেন কোম্পানির পরিচালক বোর্ডে। মুবিন খানের ইন্টারন্যাশনাল মেডিকেয়ার লিমিটেডের বোর্ড অব ডিরেক্টরস-এ পরিচালক হিসেবে রয়েছেন যুবলীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য ও সীমান্তিক এনজিও’র প্রতিষ্ঠাতা আহমদ আল কবির। আহমদ আল কবির ২০০৯ সাল থেকে দুই মেয়াদে মোট ৬ বছর রূপালী ব্যাংকের চেয়ারম্যান ছিলেন।
২০২৪ সালের নির্বাচনে সিলেট-৫ আসন থেকে আওয়ামী লীগ থেকে নমিনেশন চেয়ে না পেয়ে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে নির্বাচন করেন তিনি। আহমদ আল কবির সাবেক অর্থমন্ত্রী এম এ মুহিত ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্দুল মোমেনের আত্মীয়। আহমদ আল কবির ইন্টারন্যাশনাল মেডিকেয়ার এর অন্যতম শেয়ারহোল্ডার।
কোম্পানিটির বোর্ড অব ডিরেক্টরস এর আরেক সদস্য জাতীয় অধ্যাপক ড. শাহলা খাতুন আবুল মাল আব্দুল মুহিত ও আব্দুল মোমেনের আপন বোন। তিনি কোম্পানিটির শেয়ারহোল্ডার হিসেবেও রয়েছেন।
হাসিনার পতনের পর মুবিন খান বিএনপির সাথে মিশে যাওয়ার চেষ্টায় আছেন। সম্প্রতি তিনি স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ে স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেনের সাথে একটি বৈঠকে অংশগ্রহণ করেন। সম্প্রতি মুবিন খান সচিবালয়ে গিয়ে বর্তমান মন্ত্রিসভার বেশ কয়েকজন জ্যেষ্ঠ সদস্যের সঙ্গে বৈঠক করেন। তাঁদের মধ্যে ছিলেন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণমন্ত্রী, প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা, বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদমন্ত্রী, কৃষিমন্ত্রী এবং বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটনমন্ত্রীসহ আরও অনেকে।