Image description

সাতক্ষীরা-৪ আসনের সংসদ সদস্য গাজী নজরুল ইসলামের সঙ্গে এক তরুণীর অন্তরঙ্গ মুহূর্তের ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ায় অস্বস্তিতে পড়েছে জামায়াতে ইসলামী। গতকাল বুধবার তাকে দল থেকে বহিষ্কার করা হয়েছে। এ ছাড়া সম্প্রতি দলের কয়েকজন সংসদ সদস্যের বিরুদ্ধে সরকারি অনুদান ও ত্রাণ বিতরণে স্বজনপ্রীতি, অনিয়ম ও দুর্নীতি নানা বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। এসব ঘটনায় সাংগঠনিক ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হওয়ার আশঙ্কায় নেতাকর্মীদের নৈতিকতা ও দলীয় শৃঙ্খলা রক্ষায় কঠোর অবস্থান নিয়েছে জামায়াতে ইসলামী। দলীয় সূত্রে জানা গেছে, সম্প্রতি জেলা ও মহানগর আমিরদের কাছে পৃথক চিঠি পাঠানো হয়েছে। ওই চিঠিতে নেতাকর্মীদের ব্যক্তিগত ও সাংগঠনিক আচরণে সর্বোচ্চ সতর্কতা অবলম্বনের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। বিশেষ করে স্কুল, কলেজ ও মাদ্রাসায় চাকরি করার ক্ষেত্রে দলীয় মর্যাদা ও সাংগঠনিক শৃঙ্খলা বজায় রাখতে প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দেওয়া হয়। এ ছাড়া দলের সব সংসদ সদস্যের কাছেও পৃথক চিঠি পাঠানো হয়েছে। সেই চিঠিতে নৈতিক স্খলন, ক্ষমতার অপব্যবহার, অনিয়ম কিংবা দলীয় ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করে এমন কোনো কর্মকাণ্ডে জড়িত হওয়ার অভিযোগ প্রমাণিত হলে সাংগঠনিক ব্যবস্থা, এমনকি বহিষ্কারের মতো কঠোর সিদ্ধান্ত নেওয়ার সতর্কবার্তা দেওয়া হয়েছে।

জামায়াতের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের একাধিক নেতার ভাষ্য, সাম্প্রতিক ঘটনাগুলোকে বিচ্ছিন্ন হিসেবে দেখলেও এগুলো যেন ধারাবাহিক রূপ না নেয়, সে বিষয়ে এখন থেকেই কঠোর অবস্থানে কেন্দ্র। দলীয় শৃঙ্খলা ও জনআস্থা অক্ষুণ্ন রাখতে ভবিষ্যতে নৈতিকতা ও জবাবদিহির প্রশ্নে কোনো ছাড় দেওয়া হবে না। এ ছাড়া অভ্যন্তরীণ বৈঠকগুলোতে সংসদ সদস্যদের স্পষ্টভাবে জানিয়ে দেওয়া হয়, সরকারি অনুদান, ঐচ্ছিক তহবিল, ত্রাণ কিংবা অন্য কোনো রাষ্ট্রীয় সুবিধা বণ্টনের ক্ষেত্রে দলকে প্রশ্নবিদ্ধ করে—এমন কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়া যাবে না। জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল ড. এ এইচ এম হামিদুর রহমান আযাদ কালবেলাকে বলেন, ‘গার্লস স্কুল, কলেজ বা মহিলা মাদ্রাসায় পুরুষ সদস্য (রুকন) চাকরি করতে পারবেন না, ছাত্রদের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে মহিলারা চাকরি করতে পারবেন না—এটা অনেক আগের সিদ্ধান্ত। সংগঠনের ভেতরে নারী-পুরুষের চাকরি করার নিয়ম বহু আগে থেকেই চর্চা করা হচ্ছে। এটা চলমান একটা প্রক্রিয়া, দলের নৈতিক সিদ্ধান্ত।’

গত ১২ জুলাই সারা দেশে দলের সদস্য (রুকন) পুরুষ ও নারী চাকরিজীবীদের কঠোর নির্দেশনা জারি করেছে জামায়াত। দলটির সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার স্বাক্ষরিত জেলা ও মহানগরের আমিরদের কাছে পাঠানো চিঠিতে বলা হয়, গত ২২ জুন কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদের বৈঠকের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী গার্লস স্কুল, কলেজ,মাদ্রাসাসহ যে কোনো ধরনের গার্লস শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে চাকরি করা অবস্থায় কোনো পুরুষ জামায়াতের সদস্য (রুকন) হতে পারবেন না। একইভাবে বয়েজ স্কুল, কলেজ, মাদ্রাসাসহ যে কোনো ধরনের বয়েজ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে চাকরি করা অবস্থায় কোনো মহিলাও দলের সদস্য (রুকন) হতে পারবেন না। বর্তমানে যেসব সদস্য (রুকন পুরুষ) গার্লস শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে চাকরি করছেন এবং যেসব সদস্য (রুকন মহিলা) বয়েজ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে চাকরি করছেন তাদের সদস্যপদ (রুকনিয়াত) মুলতবি থাকবে। পরে নিজ নিজ কর্মস্থল পরিবর্তন বা অন্য প্রতিষ্ঠানে যোগদান করলে তাদের সদস্যপদের (রুকনিয়াতের) মান বিবেচনা করে মুলতবি প্রত্যাহার করা হবে। তবে যেসব প্রতিষ্ঠানে ছেলে ও মেয়ে উভয়ে অধ্যয়ন করছে, সেসব প্রতিষ্ঠানে চাকরি করার ক্ষেত্রে সদস্যপদ (রুকনিয়াত) লাভ বা বহাল থাকার ব্যাপারে কোনো বাধা নেই। গত ২৬ জুন কেন্দ্রীয় মজলিসে শূরার অধিবেশনে পেশ করা এই সিদ্ধান্ত যথাযথভাবে বাস্তবায়নের লক্ষ্যে স্থানীয় কর্মপরিষদে আলোচনা করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।

 
 
 

দলের কেন্দ্রীয় মজলিসে শূরার অধিবেশন ও নির্বাহী পরিষদের বৈঠকে নেওয়া নতুন এই সাংগঠনিক সিদ্ধান্তকে কেন্দ্র করে দলটির নেতাকর্মীদের মধ্যে অসন্তোষ ও মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে। ওই চিঠি ঘিরেই দলীয় অঙ্গনে নানা আলোচনা ও সমালোচনা শুরু হয়েছে। দলটির মধ্যম সারির একাধিক নেতা বলেন, চিঠিতে এমন কিছু নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে, যা বাস্তবায়ন করা হলে অনেক নেতাকর্মীর চাকরি ও জীবিকা ঝুঁকির মুখে পড়বে। তাদের দাবি, দেশের বিভিন্ন স্থানে জামায়াতের বহু পুরুষ সদস্য গার্লস স্কুল, কলেজ ও মহিলা মাদ্রাসায় শিক্ষকতা করছেন। একইভাবে অনেক নারী সদস্য বয়েজ স্কুল, কলেজ ও মাদ্রাসায় কর্মরত আছেন। নতুন সিদ্ধান্তের কারণে তাদের হয় চাকরি অথবা দলীয় সদস্যপদ— যে কোনো একটিকে বেছে নেওয়ার পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে।

 
 

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, গার্লস স্কুল, কলেজ বা মহিলা মাদ্রাসায় কর্মরত পুরুষ সদস্যদের (রুকন) সদস্যপদ মুলতবি করার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। বিভিন্ন জেলা ও মহানগরে নেতাকর্মীদের পরোক্ষভাবে চাকরি অথবা দল ছাড়ার বার্তা দেওয়া হচ্ছে। একই ধরনের নির্দেশনা বয়েজ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে কর্মরত নারী সদস্যদের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। তবে ছাত্র-ছাত্রী যেসব প্রতিষ্ঠানে একসঙ্গে আছে, তাদের চাকরি করতে বাধা নেই।

 

জামায়াতের মধ্যম সারির একাধিক নেতা অভিযোগ করেন, দীর্ঘদিন ধরে দলীয় কর্মকাণ্ডে সক্রিয় থাকা এবং নানা প্রতিকূলতার মধ্যেও সংগঠনের পাশে থাকা কর্মীদের জন্য এ ধরনের সিদ্ধান্ত হতাশাজনক। এই সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন হলে অনেকের জীবিকা ও পেশাগত ভবিষ্যৎ অনিশ্চয়তার মুখে পড়বে। তাদের দাবি, দলীয় আদর্শ অনুসরণের কারণে কাউকে চাকরি ছাড়তে বাধ্য করা যুক্তিসংগত নয়। তাই তারা সিদ্ধান্তটি পুনর্বিবেচনা ও প্রত্যাহারের আহ্বান জানিয়েছেন কেন্দ্রীয় নেতাদের কাছে। কেউ কেউ অবশ্য এও বলেন, একদিকে নারী শিক্ষার প্রসার ও নারী জাগরণের কথা বলছে জামায়াত; অন্যদিকে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে কর্মরত সদস্যদের বিষয়ে এমন অবস্থান ভিন্ন বার্তার জন্ম দিতে পারে। এতে তৃণমূল পর্যায়ে বিভ্রান্তি তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

যদিও চিঠির সত্যতা নিশ্চিত করে জামায়াতের কেন্দ্রীয় নেতারা বলছেন, জামায়াতে ইসলামী একটি ইসলামী আদর্শভিত্তিক সংগঠন। তাই সাংগঠনিক শৃঙ্খলা ও নৈতিক মানদণ্ড বজায় রাখতে সদস্যদের কিছু নীতিমালা মেনে চলতে হয়। উদাহরণ হিসেবে তারা জানান, ছাত্রশিবিরের সদস্যরা বাসায় গিয়ে ছাত্রীদের টিউশনি করাতে পারবেন না। নৈতিক নিরাপত্তা (মোরাল সেফটি) নিশ্চিত করতেই এসব নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।

চিঠিটির সত্যতা নিশ্চিত করেন জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল এবং কেন্দ্রীয় প্রচার ও মিডিয়া বিভাগের সেক্রেটারি এহসানুল মাহবুব জুবায়ের। তিনি কালবেলাকে বলেন, ‘ইসলামের আদর্শভিত্তিক রাজনৈতিক দল জামায়াত। তাই নৈতিক বিষয়ে সবাইকে সতর্ক থাকতে আমরা নিয়মিত পরামর্শ দিয়ে থাকি। অতীতেও রুকন ও শূরা সদস্যদের বিভিন্ন বৈঠকে এ ধরনের সতর্কবার্তা দেওয়া হয়েছে। বিশেষ করে যেসব প্রতিষ্ঠানে শুধু ছাত্রী রয়েছে, সেখানে পুরুষ রুকন সদস্যদের এবং যেসব প্রতিষ্ঠানে শুধু ছাত্র রয়েছে, সেখানে নারী রুকন সদস্যদের দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে আবারও সতর্ক থাকার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। ইসলামের দৃষ্টিতে পর্দার নীতি অনুসরণ করার ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়েছে।’

মাহবুব জুবায়ের বলেন, ‘নৈতিক স্খলনের ঘটনা ঘটলে শুধু সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি নন, তার পরিবার, সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান এবং সংগঠনও ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। সে কারণেই আমরা নতুন করে সবাইকে সতর্ক করেছি এবং প্রয়োজনীয় পরামর্শ দিয়েছি।’

জামায়াতের মহিলা বিভাগের সদস্য মারদিয়া মমতাজ এমপি কালবেলাকে বলেন, ‘এটি নতুন কোনো নির্দেশনা নয়; সংগঠনে বহুদিন ধরেই এ ধরনের নীতিমালা অনুসরণ করা হচ্ছে। আলোচিত চিঠিটিও জুনে দেওয়া হয়েছে। আগে যেসব প্রতিষ্ঠানে শুধু নারী বা ছাত্রী ছিলেন, সেখানে পুরুষ রুকন সদস্যরা দায়িত্ব পালন করতে পারতেন না। একইভাবে শুধু পুরুষ বা ছাত্রদের প্রতিষ্ঠানে নারী রুকন সদস্যদেরও দায়িত্ব পালনের সুযোগ ছিল না। তবে নতুন সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, যেসব প্রতিষ্ঠানে নারী ও পুরুষ উভয়েই রয়েছেন, সেখানে নারী সদস্যরা দায়িত্ব পালন করতে পারবেন। এ ক্ষেত্রে তাদের রুকন পদও বহাল থাকবে, আগে তাদের রুকন পদ বহাল থাকত না।’

জানা গেছে, সম্প্রতি নড়াইল-২ আসনের এমপি আতাউর রহমানকে (বাচ্চু), রংপুরের পীরগঞ্জ-৬ আসনের সংসদ সদস্য মো. নুরুল আমীন ও খুলনা-৬ আসনের এমপি আবুল কালামের বিরুদ্ধে সরকারি অনুদান ও ত্রাণ নিয়ে নানা অভিযোগ ওঠে। এ নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সমালোচনা শুরু হলে প্রত্যেককে চিঠি দিয়ে শোকজ করা হয়।

কালবেলা