জুলাই সনদ ও গণভোটে জনগণের দেওয়া রায় বাস্তবায়নের দাবি জানিয়েছেন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির ও বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান। তিনি বলেছেন, সংসদে সমাধান না হলে রাজপথে সমাধান হবে। জনগণের রায়ের পক্ষে তাঁরা লড়াই চালিয়ে যাবেন।
বৃহস্পতিবার (১৬ জুলাই) রাজধানীর কাকরাইলে আইডিইবি মিলনায়তনে জুলাই শহীদ দিবস উপলক্ষে আয়োজিত আলোচনা সভা ও দোয়া অনুষ্ঠানে তিনি এসব কথা বলেন। শহীদ আবু সাঈদসহ সব শহীদের স্মরণে জামায়াতে ইসলামী ঢাকা মহানগরী দক্ষিণ এ অনুষ্ঠানের আয়োজন করে।
ডা. শফিকুর রহমান বলেন, ‘জাতি হিসেবে আমরা গর্বিত এবং লজ্জিত। আমরা গর্বিত, কারণ এই জাতি ইতিহাসের বাঁকে বাঁকে রক্ত দিয়ে, জীবন দিয়ে অন্যায়ের বিরুদ্ধে লড়াই করে কাঙ্ক্ষিত বিজয় ছিনিয়ে এনেছে। ১৯৪৭, ১৯৫২, ১৯৭১, ১৯৯০ ও ২০২৪—এগুলো আমাদের গর্বের ঠিকানা। আমাদের ইতিহাসের সোনালি অধ্যায়।’
তিনি বলেন, ‘আমরা লজ্জিত, কারণ প্রতিবার সাধারণ জনগণ, তরুণ, ছাত্রসমাজ, যুবসমাজ, শ্রমিকসহ বিভিন্ন শ্রেণির মানুষ জীবন দিয়ে অর্জন জাতির হাতে তুলে দিয়েছে। পরে কিছু লুটেরার হাতে তা হারিয়ে গেছে। ২০২৪-এর অর্জনও শেষ পর্যন্ত হারিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে। আল্লাহর কসম, জীবন দেব, কিন্তু ২০২৪ হারিয়ে যেতে দেব না।’
জামায়াতের আমির বলেন, ‘শহীদ পরিবারের সদস্যদের কাছে আমাদের কী জবাব? এখনো ভাঙা পা, হাত, বুক, মাথা ও পিঠে গুলি নিয়ে যারা ঘুমাতে পারেন না, কষ্টে আছেন, কোনো কাজ করতে পারেন না সেই তরুণ-তরুণীদের কাছে আমাদের কী জবাব?’
তিনি বলেন, ‘আজ যে সংসদ ও সরকার গঠিত হয়েছে, সবাই স্বীকার করেন এটি ২০২৪-এর ফসল। কিন্তু কেউ কেউ বলতে চান, ২০২৪ তেমন কিছু নয়। আমরা বলছি না, এর আগের অংশ গুরুত্বপূর্ণ নয়। কারণ সেই সময় আমরা আমাদের মাথার তাজ ১১ জন নেতাকে হারিয়েছি। শত শত সহকর্মীকে হারিয়েছি। আমাদের ভাই-বোনেরা আয়নাঘরের সঙ্গী হয়েছেন। লাখো মানুষ বারবার কারাগারে গেছেন। অনেকে চাকরি হারিয়েছেন। বাড়িঘরে ঘুমাতে পারেননি।’
‘আমরা আগের অংশ অস্বীকার করছি না। কিন্তু এটাও অস্বীকার করার উপায় নেই যে, এত ত্যাগ, আন্দোলন ও প্রতিরোধ তখন কার্যকর হয়নি। ২০২৪-এ এসে তা কার্যকর রূপ পেয়েছে। এই ২০২৪-কে স্বীকার করতে এত হীনম্মন্যতা কেন?’ বলেন তিনি।
ডা. শফিকুর রহমান বলেন, ‘এ ২০২৪ না হলে আজ আমি এখানে বক্তৃতা দিতে পারতাম না। বিরোধী দলের নেতা হতে পারতাম না। এমপি নির্বাচিত হতে পারতাম না। সংসদের মুখ দেখতে পারতাম না। একইভাবে তারেক সাহেব প্রধানমন্ত্রী হতে পারতেন না। যেসব মন্ত্রী দায়িত্বজ্ঞানহীন কথা বলেন, দেশবিরোধী কথা বলেন, আমরা সংসদে বিষয়গুলো তুললে বলা হয়, এগুলো সংসদের বাইরের বিষয়। অথচ আমাদের আঘাত করতে আধা শতাব্দী আগের বিষয় টেনে আনা হয়।’
জামায়াতের আমির বলেন, ‘চিংড়ি মাছ লাফ দিলে পেছনের দিকে যায়, সামনে রাস্তা খুঁজে পায় না। এই জাতি এগোবে কীভাবে? আমরা সব সময় বলি, আসুন সামনের দিকে তাকাই। এগিয়ে যাই। ২০২৪ যে অঙ্গীকার নিয়ে হয়েছে, সেই অঙ্গীকার বাস্তবায়ন করি। যুবকেরা বৈষম্যহীন সমাজ চেয়েছিল। সবার অধিকার নিশ্চিত হোক, তা চেয়েছিল। বাংলাদেশ থেকে দুর্নীতি দূর হোক, তা চেয়েছিল। চাঁদাবাজদের কবল থেকে জাতি মুক্তি পাক, তা চেয়েছিল। মানুষ আদালতে গেলে ন্যায়বিচার পাক, তা চেয়েছিল। তারা কারও কাছে ভিক্ষা চায়নি। তারা বলেছে, যোগ্যতা অনুযায়ী আমাদের হাতে কাজ তুলে দিতে হবে।’
ডা. শফিকুর রহমান বলেন, ‘জুলাইয়ের সবচেয়ে বড় দাবি ছিল, ফ্যাসিবাদ যেন বাংলাদেশে আর ফিরে না আসে। এ জন্য সংস্কার করে নতুন বাংলাদেশ গড়ে তোলা, অতীতের প্রচলিত রাজনীতিকে বিদায় দেওয়া এবং নতুন রাজনীতিকে আলিঙ্গন করাই ছিল লক্ষ্য।
গণভোট নিয়ে সমালোচনার জবাবে তিনি বলেন, ‘গণভোটের চারটি প্রশ্ন নাকি খুব জটিল। বলা হচ্ছে, আমি বুঝতে চার ঘণ্টা লাগবে, জনগণ কীভাবে বুঝল? চারটি প্রশ্ন ১৭ দিন আগে থেকেই প্রচার করা হয়েছে। সব গণমাধ্যমে বিষয়টি পরিষ্কার করা হয়েছে। জনগণকে বোঝানো হচ্ছে, জ্ঞান-বুদ্ধি শুধু আপনাদের আছে, ১৮ কোটি মানুষের নেই। এটা জনগণকে অপমান করা।’
তিনি বলেন, ‘আমি মূর্খ হতে পারি, কিন্তু আমার জাতি মূর্খ এ কথা বলতে পারি না। চারটি প্রশ্ন যদি জাতি না বোঝে, তাহলে ৩১টি প্রশ্ন বুঝবে কীভাবে? এগুলো সব বুঝামিল ও ভাঁওতাবাজি। নির্বাচনের আগে সবাই গণভোটে হাত তুলতে বলেছিল। জনগণ প্রায় ৭০ শতাংশ ভোটে হ্যাঁ বলেছে। এখন বলা হচ্ছে, ৫১ শতাংশ মানুষ রায় দিয়ে পাঠিয়েছে, তাই গণভোটের রায় মানা হবে না। ৫১ বড়, না ৭০ বড়? সাড়ে তিন ঘণ্টা ব্ল্যাকআউট করে কী করা হয়েছে, জনগণ তা বোঝে। এর জন্য রাজসাক্ষীও পাওয়া গেছে। ইতিহাস অবশ্যই বিষয়টি পর্যালোচনা করবে।’
গণভোটের রায় বাস্তবায়নের দাবি জানিয়ে তিনি বলেন, ‘৭০ শতাংশ মানুষের রায়কে অগ্রাহ্য করে এখন আমাদেরও বলা হচ্ছে, আপনারাও আসুন, এই অগ্রাহ্যের মিছিলে শরিক হন। আমরা জনগণের সঙ্গে আছি। জনগণের রায়ের পক্ষে আছি। লড়াই করে যাব। সংবিধান সংশোধন কমিটি নামে কোনো কমিটি কোন বিধিতে, কোন সংবিধানে আছে আমি জানতে চাই। যদি না থাকে, তাহলে এটি কেন হচ্ছে? জুলাইকে ভুলিয়ে দেওয়া এবং গণভোটকে ভুলিয়ে দেওয়ার চেষ্টা হচ্ছে। আমরা পরিষ্কার প্রতিবাদ করে ওয়াকআউট করেছি।’
ডা. শফিকুর রহমান বলেন, ‘আমরা গভীরভাবে বিশ্বাস করি, ৭০ শতাংশ ভোট বৃথা যাবে না। এই গণরায় বাস্তবায়ন হবে। সংসদে সমাধান না হলে সমাধান হবে রাজপথে। বাংলাদেশ কোনো একক দলের দেশ নয়। এই দেশ প্রত্যেক নাগরিকের। প্রতিবেশী দেশ ভারত বাংলাদেশের সব দলকে আমন্ত্রণ জানালেও জামায়াতে ইসলামীকে লাল কার্ড দেখিয়েছে। আমরা এই লাল কার্ডের পরোয়া করি না।’
তিনি বলেন, ‘ভারতের মাটিতে আশ্রয় নেওয়ার কোনো চিন্তা আমাদের নেই। এ দেশ আমাদের। ১৮ কোটি মানুষের হৃদয়ই আমাদের আশ্রয়। আমরা তাদের হৃদয়ে আশ্রয় নিতে চাই। আমাদের হৃদয়ে বাংলাদেশকে ধারণ করতে চাই। আমাদের কোনো পিশি-খালার দেশ নেই। আমাদের দেশ বাংলাদেশ। আমাদের নেতৃবৃন্দ জীবন দিয়ে, ফাঁসির মঞ্চে দাঁড়িয়ে প্রমাণ করেছেন, বাংলাদেশই আমাদের ঠিকানা। আমরা তাদের রেখে যাওয়া আমানতের সম্মান রক্ষা করব।’
তিনি বলেন, ‘ভারত আমাদের প্রতিবেশী। তাদের সঙ্গে আমরা সৎ প্রতিবেশীর আচরণ করতে চাই। তারাও আমাদের সঙ্গে সৎ প্রতিবেশীর আচরণ করছে কি না, তা দেখতে চাই। এর বাইরে কারও সঙ্গে ভিন্ন কোনো সম্পর্ক থাকবে না। আমাদের পররাষ্ট্রনীতি স্বাধীন। এ দেশের পররাষ্ট্রনীতি কারও নির্দেশে চলুক, আমরা তা চাই না।’
শহীদ পরিবারের সদস্যদের উদ্দেশে ডা. শফিকুর রহমান বলেন, ‘আপনাদের হুমকি দেওয়া হলে তা শুধু আপনাদের হুমকি নয়, জাতিকে হুমকি দেওয়া। আপনারা আমাদের আলাদা ভাববেন না। প্রথম দিনই আমরা আপনাদের ঘরে গিয়ে বলেছি, এখন থেকে আপনাদের পরিবারের আরেক সদস্যের নাম বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী। আপনাদের নিরাপত্তা আমাদের নিরাপত্তা। আমরা ভয় পাই শুধু আল্লাহ রাব্বুল আলামিনকে। আর কাউকে পাত্তা দিই না, দেবও না।’
আহত ও পঙ্গুদের বিষয়ে তিনি বলেন, ‘শহীদ হয়ে যারা চলে গেছেন, আমরা বিশ্বাস করি তারা জান্নাতের পাখি হয়ে গেছেন। কিন্তু যারা বেঁচে আছেন, কষ্ট নিয়ে আছেন, তাদের জন্য আমাদের বড় কষ্ট হয়। তাদের জন্য কার্যকর কিছু করতে না পারায় আমরা লজ্জিত। সরকার পারে। এ জন্য বাজেট অধিবেশনে দুইবার দাবি জানিয়েছি, তাদের বিষয়টি সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে দেখতে হবে। রাষ্ট্র যদি তাদের না দেখে, তাহলে এই রাষ্ট্র অকৃতজ্ঞ রাষ্ট্রে পরিণত হবে।’
ডা. শফিকুর রহমান বলেন, ‘আমরা আশা রাখতে চাই, রাষ্ট্র তাদের সঙ্গে অকৃতজ্ঞতা করবে না। কিন্তু যদি করে, অতীতে অকৃতজ্ঞদের ভালো পরিণতি হয়নি। বর্তমানেও হবে না।’
জুলাই সনদে শহীদ ও আহত যোদ্ধাদের নামে দেশের বিভিন্ন সড়ক ও স্থাপনার নামকরণের দাবি জানিয়ে তিনি বলেন, ‘যত দ্রুত এটি করা হবে, আমরা ধরে নেব সরকার তাদের প্রতি তত বেশি শ্রদ্ধাশীল। এই দাবি আমরা আজ জনসমক্ষে রেখে গেলাম। সংসদেও বলেছি, বলতে থাকব। দাবিগুলো ন্যায্য। ন্যায্য দাবিগুলো অর্জন না হওয়া পর্যন্ত সংসদের ভেতরে আমাদের লড়াই চলবে।’