গণঅভ্যুত্থানে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগের সরকার পতনের পর একে একে গ্রেপ্তার হতে থাকেন দলটির সাবেক সংসদ সদস্য (এমপি), মন্ত্রী ও প্রতিমন্ত্রীসহ শীর্ষপর্যায়ের নেতাকর্মীরা। শুধু রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বই নন, বিগত ১৬ বছরের তৎকালীন সরকারের নিয়োজিত শীর্ষ পর্যায়ের পুলিশ, আমলা, স্পিকার এবং প্রধান বিচারপতিও গ্রেপ্তারের তালিকায় যুক্ত হন। এরই মধ্যে পূর্ণ হয়েছে জুলাই আন্দোলনের দুই বছর। আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর গত দুই বছরে গ্রেপ্তার হওয়া দলটির এমপি, মন্ত্রী ও প্রতিমন্ত্রীদের বিরুদ্ধে দায়ের করা মামলার জেল, জামিন ও সাজার হালচাল বিশ্লেষণ করে দেখা যাচ্ছে, তাদের কারাজীবন ক্রমেই দীর্ঘ হতে চলেছে।
এরই মধ্যে জুলাই হত্যাকাণ্ডে মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে ৬টি মামলায় রায় ঘোষণা করা হয়েছে। এসব রায়ের ফলে কারাগারে থাকা সাবেক মন্ত্রী হাসানুল হক ইনু এবং পলাতক সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ চারজন মন্ত্রী-এমপি ও তৎকালীন নিয়োজিত পুলিশ কর্মকর্তাদের ঘাড়ে ঝুলছে সাজার বোঝা। তাছাড়া ১৬ বছরের গুম, খুন ও জুলাইয়ের হত্যাকাণ্ডের অভিযোগে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে আরও বহু মামলা বিচারাধীন। ঢাকার নিম্ন আদালতে বিচারাধীন কয়েকশ মামলার মধ্যে ইতিমধ্যে ৪৩টি মামলার চার্জশিট (অভিযোগপত্র) দাখিল করা হয়েছে। চার্জগঠনের মাধ্যমে এই মামলাগুলো এখন আনুষ্ঠানিক বিচার শুরুর অপেক্ষায় রয়েছে।
কারা অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, বিগত দুই বছরে জামিন পেয়ে মুক্ত হতে পেরেছেন মাত্র ১১ জন মন্ত্রী-এমপি। অন্যদিকে, কারাগারে থাকা অবস্থায় মারা গেছেন সাবেক দুই হেভিওয়েট মন্ত্রী। বর্তমানে দেশের বিভিন্ন কারাগারে আওয়ামী লীগের শুধু এমপি, মন্ত্রী ও প্রতিমন্ত্রী মিলেই আটকে রয়েছেন মোট ১০৭ জন। বন্দিদের অনেকেই অর্ধশতাধিক, আবার কেউ কেউ শতকের কাছাকাছি মামলায় গ্রেপ্তার হয়েছেন। সাবেক পরিবেশ ও জলবায়ুমন্ত্রী সাবের হোসেন চৌধুরী, সাবেক স্পিকার শিরীন শারমীন চৌধুরী ও নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের সাবেক মেয়র সেলিনা হায়াৎ আইভীর কারামুক্তির পর অন্য বন্দিদের আইনজীবীরাও আশার আলো দেখেছিলেন। তবে শেষ পর্যন্ত হতাশ হতে হচ্ছে বলে তারা জানিয়েছেন। অন্যদিকে, রাষ্ট্রপক্ষ স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছে, ‘জুলাই হত্যাকাণ্ডে জড়িতদের কোনো ছাড় নয়’ এবং সরকার জুলাইয়ের মামলাগুলোকে অত্যন্ত গুরুত্ব সহকারে দেখছে।
কারা অধিদপ্তরের সহকারী মহাপরিদর্শক (এআইজি উন্নয়ন ও গণমাধ্যম) জান্নাত-উল ফরহাদের কাছে কারাগারে থাকা ও জামিনে মুক্ত হওয়া এমপি, মন্ত্রী ও প্রতিমন্ত্রীদের তথ্য জানতে চেয়েছিল কালবেলা। তিনি জানান, দেশের বিভিন্ন কারাগারে আওয়ামী লীগের এমপি, মন্ত্রী ও প্রতিমন্ত্রী মিলে ১০৭ জন আটক রয়েছেন। তাদের মধ্যে এমপি ৭৩ জন, মন্ত্রী ও প্রতিমন্ত্রী রয়েছেন ৩৪ জন। এই তিন শ্রেণির বন্দির মধ্যে ১১ জন জামিন পেয়ে কারামুক্ত হয়েছেন।
তিনি জানান, কারাগারে থাকা বন্দিদের মধ্যে ৭১ জনকে নিরাপত্তা ও সহজ ব্যবস্থাপনার জন্য কেরানীগঞ্জের বিশেষ কারাগারে রাখা হয়েছে। তাদের মধ্যে ৪১ জন এমপি ও ৩০ মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রী এই বিশেষ কারাগারে আটক আছেন। বাকি আসামিরা গাজীপুরের কাশিমপুর কেন্দ্রীয় কারাগারসহ কয়েকজন দেশের বিভিন্ন জেলায় মামলা থাকায় আটক রয়েছেন।
জামিনপ্রাপ্ত ১১ জনের তথ্য পর্যালোচনা করে দেখা যায়, ২০২৪ সালের ৮ অক্টোবর গ্রেপ্তারের মাত্র দুদিনের মাথায় ঢাকার সিএমএম আদালত থেকে চার মামলায় জামিন পেয়ে কারামুক্ত হন সাবেক পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন বিষয়কমন্ত্রী সাবের হোসেন চৌধুরী। জুলাই আন্দোলনের পর গ্রেপ্তার হওয়া প্রথম কোনো এমপি বা মন্ত্রী হিসেবে তিনি জামিন পান, যা দেশের বিভিন্ন পর্যায়ে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়। কথিত আছে, অন্তর্বর্তী সরকারের সময় বাইরের একটি দেশের প্রেসিডেন্টের ‘সুপারিশে’ তিনি জামিনে কারামুক্ত হন। এরপর থেকে ‘সাবেরের জামিন’-এর উদাহরণ টেনে আওয়ামী লীগের বিভিন্ন এমপি-মন্ত্রীদের আইনজীবীরা আদালতে তাদের মক্কেলদের জামিন চাইতে থাকেন। সাবের হোসেন চৌধুরীর জামিনের পর দুদিনের মাথায় জুলাই আন্দোলনের একটি মামলায় সুনামগঞ্জ আদালত থেকে জামিন পান সাবেক পরিকল্পনামন্ত্রী এম এ মান্নান। ২০ দিন কারাভোগের পর ২০২৪ সালের ১০ অক্টোবর তিনি কারামুক্ত হন।
এর এক মাস পর ২০২৪ সালের ৭ নভেম্বর আওয়ামী লীগের সুনামগঞ্জ-৫ আসনের সাবেক এমপি মুহিবুর রহমান মানিক সুনামগঞ্জ কারাগার থেকে মুক্তি পান। মূলত অসুস্থতা ও বয়স বিবেচনায় তাকে জামিন দেন সুনামগঞ্জের একটি আদালত। এরপর ২০২৪ সালের ২৪ নভেম্বর ঝিনাইদহ-১ আসনের আওয়ামী লীগের সাবেক এমপি নায়েব আলী জোয়ারদার ও ঝিনাইদহ-২ আসনের এমপি তাহজীব আলম সিদ্দিকী সমি অন্তর্বর্তী জামিন পেয়ে জেলা কারামুক্ত হন। ১২টি মামলায় জামিন পেয়ে ২০২৫ সালের ১৪ আগস্ট কারামুক্ত হন সাবেক মন্ত্রী ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেন। তিন মাস কারাগারে থাকার পর ২০২৫ সালের ২৯ সেপ্টেম্বর মুক্ত হন সাবেক পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী শামসুল আলম। অন্যদিকে, ড. মুহাম্মদ ইউনূস সরকারের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করার অভিযোগে সন্ত্রাসবিরোধী আইনের মামলায় আড়াই মাস কারাগারে থাকার পর হাইকোর্ট থেকে জামিন পেয়ে মুক্ত হন আওয়ামী লীগের সাবেক পাটমন্ত্রী আবদুল লতিফ সিদ্দিকী।
চলতি বছরের ৭ এপ্রিল জুলাই গণঅভ্যুত্থানের একটি হত্যাচেষ্টা মামলায় গ্রেপ্তার হন সাবেক স্পিকার শিরীন শারমীন চৌধুরী। হাই প্রটোকলে থাকা একজন স্পিকার কীভাবে আন্দোলনে জনতার ওপর গুলি চালালেন, তা নিয়ে দেশজুড়ে শুরু হয় ব্যাপক সমালোচনা। গ্রেপ্তারের পাঁচ দিন পর ১২ এপ্রিল ‘শারীরিক অসুস্থতা’ বিবেচনায় জামিন পেয়ে কারামুক্ত হন দেশের প্রথম এই নারী স্পিকার। এছাড়া সর্বশেষ গত ১৬ জুন সাবেক মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রী আব্দুল লতিফ বিশ্বাস ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগার থেকে কারামুক্ত হন। তথ্য অনুযায়ী, অন্তর্বর্তী সরকারের সময় জুলাই আন্দোলনের মামলায় জামিন পেয়ে আওয়ামী লীগের অধিকাংশ অর্থাৎ ৮ জন এমপি-মন্ত্রী কারামুক্ত হয়েছেন। তবে অন্তর্বর্তী সরকারের সময় ২০২৫ সালের ৯ মে গ্রেপ্তার নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের সাবেক মেয়র সেলিনা হায়াৎ আইভী বিএনপি সরকারের আমলে গত মাসের ৩ জুন হাইকোর্ট থেকে ১০ মামলায় জামিন পান এবং কারামুক্ত হন। এ ঘটনার পর আওয়ামী লীগের এমপি-মন্ত্রীদের জামিনের বিষয়ে তাদের আইনজীবীরা পুনরায় আশা দেখতে শুরু করলেও নিম্ন আদালত থেকে অধিকাংশ জামিন আবেদনই নামঞ্জুর হচ্ছে। ফলে জামিনের জন্য আইনজীবীরা এখন হাইকোর্টের দ্বারস্থ হচ্ছেন।
জুলাই আন্দোলন ঘিরে হওয়া মামলাগুলো বিশ্লেষণে দেখা গেছে, জুলাই আন্দোলনে সংঘটিত হত্যার অনেক মামলার চার্জশিট প্রস্তুত হয়ে আছে। ঢাকা মহানগরের নিম্ন আদালতে ৪৩টি মামলার চার্জশিট দাখিল হয়েছে, যা এখন শুধু চার্জ গঠন করে আনুষ্ঠানিক বিচার শুরুর অপেক্ষায় রয়েছে। এর মধ্যে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল গণঅভ্যুত্থানের সময় সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধে এখন পর্যন্ত ছয়টি মামলায় রায় ঘোষণা করেছেন, যার প্রথম রায়টি আসে ২০২৫ সালের ১৭ নভেম্বর। ওই রায়ে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খানকে মৃত্যুদণ্ড দেন ট্রাইব্যুনাল-১; তবে তারা দুজনই বর্তমানে আইনের দৃষ্টিতে পলাতক। গত ৫ ফেব্রুয়ারি সাভারের আশুলিয়ায় ছয়জনের লাশ পোড়ানোসহ সাতজনকে হত্যার ঘটনায় সাবেক এমপি মুহাম্মদ সাইফুল ইসলামসহ ৬ জনকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়। সর্বশেষ গত ৩০ জুন জুলাই আন্দোলন দমন করতে নির্যাতন, ষড়যন্ত্র ও প্ররোচনার অভিযোগে মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল (জাসদ) সভাপতি ও সাবেক মন্ত্রী হাসানুল হক ইনুকে ১০ বছরের কারাদণ্ড দেন ট্রাইব্যুনাল। এমপি-মন্ত্রী ছাড়াও পলাতক ডিএমপি পুলিশের সাবেক কমিশনার হাবিবুর রহমানসহ অনেকে সাজার আসামি হলেও, সাজার বোঝা মাথায় নিয়ে হাসানুল হক ইনুই একমাত্র সাবেক মন্ত্রী, যিনি বর্তমানে কারাগারে বন্দি আছেন।
কারা অধিদপ্তরের তথ্যমতে, বর্তমানে যেসব হেভিওয়েট মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রী কারাগারে রয়েছেন তাদের মধ্যে অন্যতম হলেন—সাবেক আইনমন্ত্রী আনিসুল হক, সাবেক তথ্যমন্ত্রী হাসানুল হক ইনু, সাবেক মন্ত্রী ও ওয়ার্কার্স পার্টির চেয়ারম্যান রাশেদ খান মেনন, সাবেক আইসিটি প্রতিমন্ত্রী জুনাইদ আহমেদ পলক, সাবেক মন্ত্রী আমির হোসেন আমু, সাবেক খাদ্যমন্ত্রী অ্যাডভোকেট কামরুল ইসলাম, সাবেক কৃষিমন্ত্রী আব্দুর রাজ্জাক, সাবেক জনপ্রশাসন মন্ত্রী ফরহাদ হোসেন, সাবেক গণশিক্ষা প্রতিমন্ত্রী জাকির হোসেন, উপমন্ত্রী আরিফ খান জয়, সাবেক মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী ক্যাপ্টেন (অব.) এ বি তাজুল ইসলাম, সাবেক পাটমন্ত্রী গোলাম দস্তগীর গাজী, সাবেক বাণিজ্যমন্ত্রী টিপু মুনশি, সাবেক খাদ্যমন্ত্রী সাধন চন্দ্র মজুমদার, সাবেক নৌমন্ত্রী শাহজাহান খান, সাবেক দুর্যোগ প্রতিমন্ত্রী ডা. এনামুর রহমান, সাবেক পানিসম্পদ প্রতিমন্ত্রী জাহিদ ফারুক শামীম, সাবেক মন্ত্রী উবায়দুল মোকতাদির চৌধুরী, সাবেক রেলমন্ত্রী নূরুল ইসলাম সুজন, সাবেক বিমান প্রতিমন্ত্রী মাহবুব আলী, সাবেক পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী শহীদুজ্জামান সরকার, সাবেক সমাজকল্যাণমন্ত্রী নুরুজ্জামান আহমেদ, পার্বত্যবিষয়ক সাবেক প্রতিমন্ত্রী দীপংকর তালুকদার এবং সাবেক কৃষিমন্ত্রী আব্দুস শহীদ। তারা সবাই কারাগারে ডিভিশনপ্রাপ্ত (বিশেষ সুবিধা) কয়েদি। তাদের প্রায় সবাইকে নিরাপত্তা ও বিশেষ নজরদারির জন্য কেরানীগঞ্জের কেন্দ্রীয় কারাগারের ভেতর বিশেষ কারাগারে রাখা হয়েছে এবং দেশের সব কারাগার থেকে চৌকস কারারক্ষী বাছাই করে সেখানে মোতায়েন করা হয়েছে।
এ ছাড়া কারাগারে থাকা অন্য শীর্ষ এমপিদের মধ্যে রয়েছেন—সাবেক এমপি ও প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা সালমান এফ রহমান, সাবেক ডেপুটি স্পিকার শামসুল হক টুকু, সাবেক হুইপ আ স ম ফিরোজ, আওয়ামী লীগের প্রচার ও প্রকাশনা সম্পাদক ও সাবেক এমপি আবদুস সোবহান গোলাপ, সাবেক এমপি সাদেক খান, ব্যারিস্টার সায়েদুল হক সুমন, হাজী সেলিম, সোলাইমান সেলিম, আব্দুর রহমান বদি, ইকরামুল করিম চৌধুরী, মোস্তফা জালাল মহিউদ্দিন, সুলতান মোহাম্মদ মনসুর আহমেদ, আলী আজম মুকুল, কাজী জাফর উল্যাহ, শাহজাহান ওমর, আব্দুস সালাম মুর্শেদী, শাহে আলম তালুকদার, নাসিমুল আলম, শফিউল ইসলাম মহিউদ্দিন, কামরুল আশরাফ খান পোটন, গোলাম কিবরিয়া টিপু, আব্দুল্লাহ আল জ্যাকব, ধীরেন্দ্র দেবনাথ শম্ভু, মোরশেদ আলম ও সিরাজুল ইসলাম মোল্লা। তারা প্রায় সবাই কারাগারে ডিভিশন সুবিধা পেয়েছেন। নারী এমপি ও মন্ত্রীদের ভেতর সাবেক শিক্ষামন্ত্রী ডা. দীপু মনি মুন্সীগঞ্জ কারাগারে এবং সাবেক এমপি মমতাজ বেগম, মাসুদা সিদ্দিক রোজী ও সাফিয়া খাতুন কাশিমপুর মহিলা কারাগারে বন্দি রয়েছেন।
অন্তর্বর্তী সরকারের সময় কারাগারে মারা যান সাবেক দুই হেভিওয়েট মন্ত্রী। গত বছরের ২৯ সেপ্টেম্বর কারা কর্তৃপক্ষের তত্ত্বাবধানে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান সাবেক শিল্পমন্ত্রী নূরুল মজিদ মাহমুদ হুমায়ূন। সর্বশেষ ২০২৬ সালের ৭ ফেব্রুয়ারি সাবেক পানিসম্পদমন্ত্রী রমেশ চন্দ্র সেন দিনাজপুর জেলা কারাগারে অসুস্থ হওয়ার পর দিনাজপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান।
এদিকে, অস্ট্রেলিয়ার ফেডারেল পার্লামেন্টে বাংলাদেশের সাবেক এমপি ব্যারিস্টার সৈয়দ সায়েদুল হক সুমন এবং বাংলাদেশের মানবাধিকার পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে সম্প্রতি বক্তব্য দিয়েছেন সে দেশের এমপি জেমি চ্যাফি। ব্যারিস্টার সুমনের আইনজীবী লিটন আহমেদ জানান, ‘পার্লামেন্টে ব্যারিস্টার সুমনসহ ২০২৪ সালের পর থেকে আটক থাকা কয়েকজন রাজনীতিবিদের কারাবন্দি অবস্থায় খাদ্য, স্বাস্থ্যসেবা ও চিকিৎসা সুবিধা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে। একই সঙ্গে আশা প্রকাশ করা হয়েছে যে, বাংলাদেশ সরকারের সঙ্গে গঠনমূলক আলোচনার মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা দেশের প্রচলিত আইন ও সংবিধান অনুযায়ী ন্যায়বিচার পাবেন।’ আইনজীবী লিটন আরও জানান, ব্যারিস্টার সুমনের বিরুদ্ধে এ পর্যন্ত ৮টি মামলা দায়ের হয়েছে।
সাবেক শিক্ষামন্ত্রী ডা. দীপু মনির বিরুদ্ধে ৬০টিরও বেশি মামলা রয়েছে। গত বছরের ৬ অক্টোবর ঢাকার সিএমএম আদালতে মামলায় হাজিরা দিতে এসে তিনি কারাগারে চিকিৎসা না পাওয়ার অভিযোগ তুলে ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেছিলেন, ‘আমার বিরুদ্ধে ৬০টির বেশি মামলা। সাবেক শিল্পমন্ত্রী নূরুল মজিদ মাহমুদ হুমায়ূন চিকিৎসার অভাবে মারা গেছেন। এখন আমাদের কী মরিয়া প্রমাণ করতে হবে আমরা অসুস্থ ছিলাম?’ দীপু মনির মামলার সার্বিক বিষয়ে জানতে চাইলে তার আইনজীবী গাজী ফয়সাল ইসলাম জানান, ‘তার বিরুদ্ধে ৭০টির মতো মামলা দায়ের হয়েছে, যার মধ্যে ৩৮টি মামলায় তাকে গ্রেপ্তার দেখানো হয়েছে। নিম্ন আদালত থেকে জামিন মিলছে না। ২০টি মামলায় জামিন চেয়ে আমরা হাইকোর্টে গেছি, যার মধ্যে তিনটিতে জামিন দিলেও পরে দুটি স্থগিত হয়েছে এবং বাকি ১৭টি রুল পর্যায়ে আছে।’ এই আইনজীবী দাবি করেন, ‘মামলার বিচারের আগে (চার্জ গঠন) এত দীর্ঘ কারাবাস কোনো নারী মন্ত্রীর নেই। তিনি গুরুতর অসুস্থ এবং কারান্তরীণ থেকে হাসপাতালেও চিকিৎসা নিয়েছেন। কিন্তু এত মামলার জামিন হবে কবে? সরকারের সদিচ্ছা থাকলে তিনি দ্রুত মুক্ত হবেন।’
কারাগারের ভেতরে সাবেক আইসিটি প্রতিমন্ত্রী জুনাইদ আহমেদ পলকের অবস্থা বেশ নাজুক। ৮০টিরও বেশি মামলার আসামি পলককে কারাগারে অঝোরে কাঁদতে দেখা গেছে এবং তিনি সবার কাছে হাত তুলে দোয়াও চেয়েছেন। পলকসহ সাবেক মন্ত্রী সাধন চন্দ্র মজুমদার ও টিপু মুনশির আইনজীবী ফারজানা ইয়াসমিন রাখী বলেন, ‘প্রায় দুই বছর ধরে তিনিসহ আওয়ামী লীগের এমপি-মন্ত্রীরা কারাগারে মানবেতর জীবনযাপন করছেন। পলকের বিরুদ্ধে ৮৬/৮৭টি মামলা দেওয়া হয়েছে, যা সম্পূর্ণ রাজনৈতিকভাবে হেনস্তা করার জন্য। ঘটনার সঙ্গে তারা কেউ সম্পৃক্ত নন। আমরা আসামিদের জামিন চাইলেও তা মিলছে না। আশা করছি দ্রুতই সব মামলায় জামিন পাবেন ও ন্যায়বিচার পাবেন।’ আওয়ামী লীগের বিভিন্ন মন্ত্রী ও এমপির পক্ষে আইনি লড়াই চালানো আইনজীবী মোরশেদ হোসেন শাহীন বলেন, ‘সাবের হোসেন চৌধুরী, শিরীন শারমীন চৌধুরী ও মেয়র আইভীর কারামুক্তির মতো আমরা আশা করেছিলাম বাকি বন্দিরাও জামিন পাবেন। কিন্তু কয়েকজন জামিন পেলেও একই ধরনের মামলায় বাকি সবাই এখনো কারাগারে আছেন। সহসা তারা জামিন পাবেন বলেও মনে হচ্ছে না। এতে তারা ন্যায়বিচার থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন এবং মানবাধিকার লঙ্ঘিত হচ্ছে।’
তবে এই বক্তব্যের বিরোধিতা করে ঢাকা মহানগর পাবলিক প্রসিকিউটর (পিপি) ওমর ফারুক ফারুকী জানিয়েছেন, জুলাই আন্দোলনের হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত কাউকে কোনো ধরনের ছাড় দেওয়া হবে না। তিনি বলেন, ‘জুলাই আন্দোলনের মামলাগুলো সরকার অত্যন্ত গুরুত্ব সহকারে দেখছে। তদন্ত কর্মকর্তারা সবগুলো মামলার সুষ্ঠু তদন্ত করে সাক্ষ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে আদালতে চার্জশিট জমা দিচ্ছেন। জুলাই আন্দোলনের এই হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় জড়িত আসামিদের কোনো ছাড় নেই।’
জুলাই মামলাগুলোর বর্তমান বিচার প্রক্রিয়ার অগ্রগতি নিয়ে তিনি বলেন, ‘আদালতে ৪২টির মতো মামলার চার্জশিট জমা হয়েছে বলে জেনেছি। মামলাগুলোর সবগুলোই এখন চার্জ গঠন শুনানি বা আনুষ্ঠানিক বিচারের জন্য অপেক্ষায় রয়েছে। আর একটি মামলার চার্জ গঠন শুনানি বর্তমানে চলছে।’ একই মামলায় ‘কোনো এমপি-মন্ত্রী জামিনে মুক্ত, আবার বাকিরা কারাগারে’—আইনজীবীদের এমন বৈষম্যের অভিযোগের জবাবে রাষ্ট্রপক্ষের এই শীর্ষ আইনজীবী বলেন, ‘জামিন পাওয়ার বিষয়টি সম্পূর্ণ আদালতের ওপর নির্ভর করে। বিচারক যাদের মনে করছেন জামিন দেওয়া উচিত, তাদের জামিন দিচ্ছেন। আর যাদের মনে করছেন জামিন দেওয়া উচিত নয়, তাদের জামিন দিচ্ছেন না। এই বিচারিক প্রক্রিয়ায় সরকারের কোনো ধরনের হস্তক্ষেপ নেই।’
একই ধরনের মামলায় কেউ জামিন পাচ্ছে, আবার কেউ থাকছে কারাগারে। এ বিষয়ে আইনে কী আছে—জানতে চাইলে সাবেক জেলা জজ ও জুডিসিয়াল সার্ভিস অ্যাসোসিয়েশনের সাবেক মহাসচিব মো. শাহজাহান সাজু কালবেলাকে বলেন, ‘১৮৬০ সালের পেনাল কোড ও ১৮৯৮ সালের ফৌজদারি কার্যবিধিসহ অন্যান্য আইনানুসারে, একটি হত্যা বা হত্যাচেষ্টা মামলার সব আসামির সমান অংশগ্রহণ থাকে না। কারও বেশি অংশগ্রহণ থাকে, কারও কম অংশগ্রহণ থাকে। জামিনের ক্ষেত্রে এসব বিষয় বিবেচনা করে দেখেন আদালত। এ ছাড়া জামিন দেওয়ার আগে মামলার অন্য আসামিদের ১৬৪ ধারায় জবানবন্দিতে সংশ্লিষ্টতা, তদন্ত কর্মকর্তার প্রাথমিক সাক্ষ্য-প্রমাণ, ঘটনার তথ্য-প্রমাণ বিবেচনা করে আদালত কাউকে জামিন দেন, আবার একই মামলায় কারও জামিন নামঞ্জুর করেন। অন্যদিকে সাক্ষীদের সাক্ষ্য, আইনজীবীদের যুক্তি-তর্ক, পোস্টমর্টেম রিপোর্ট এবং সব তথ্য-প্রমাণের ওপর ভিত্তি করে মামলার রায় দেওয়া হয়। এতে কারাগারে থাকা কেউ নির্দোষ প্রমাণিত হন, আবার কেউ সাজাপ্রাপ্ত হন। অনেকে রায়ের আগে জামিন পেয়ে গেলে তদন্ত কাজে বিঘ্ন ঘটার সম্ভাবনা থাকে। তাই জামিন দেওয়া হয় না। এগুলো সবই বিচারের প্রক্রিয়া। আদালত এগুলো দেখে বিচার করে থাকেন।’