Image description

ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার আগামী ডিসেম্বরে দেশে ফেরার যে পরিকল্পনার কথা লন্ডনভিত্তিক সংবাদ সংস্থা রয়টার্সের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, তা মোটেই আমলে নিচ্ছে না ক্ষমতাসীন দল বিএনপি। বিরোধী দল জামায়াত ও তাদের জোট শরিক এনসিপির মনোভাবও একই। দলগুলোর নেতাদের ভাষ্য, ‘এ ধরনের বক্তব্য রাজনৈতিক স্ট্যান্ডবাজি ছাড়া কিছুই নয়। দেশে থাকা পলাতক নেতাকর্মীদের উসকে দিয়ে অস্থিতিশীলতা সৃষ্টি করাই পতিত শেখ হাসিনার লক্ষ্য।’ তারা টিপ্পনী কেটে এ-ও বললেন, ‘ডিসেম্বর কেন, পারলে আজই শেখ হাসিনা দেশে ফিরে আইনগতভাবে মামলা-সাজা মোকাবিলা করুক।’

বিএনপির শীর্ষস্থানীয় নেতাদের কাছে শেখ হাসিনার দেশে ফেরার পরিকল্পনার বিষয় নিয়ে প্রতিক্রিয়া জানতে চাইলে তারা এটা অনেকটাই উড়িয়ে দিয়েছেন। পাশাপাশি তারা এমন বক্তব্যকে শেখ হাসিনার নতুন চক্রান্ত বলে উল্লেখ করেন।

বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু আগামীর সময়কে বললেন, ‘যারা পালিয়ে চলে গেছে, তাদের সম্পর্কে মন্তব্য করতে চাই না। তা ছাড়া হুমকি-ধমকি তো তিনি প্রতিদিনই দিয়ে থাকেন।’

শেখ হাসিনার বক্তব্যে ষড়যন্ত্র খুঁজে পেয়েছেন বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব সৈয়দ এমরান সালেহ প্রিন্স। তার ভাষ্য, ‘প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের মানবিক দৃষ্টিভঙ্গিতে যখন জাতি আবার নতুন করে উন্নত জীবন এবং উন্নত েদশ গড়ার প্রত্যয় নিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে; তখন প্রতিবন্ধকতা তৈরি করতে, দেশকে অস্থিতিশীল করতে বহুপক্ষীয় ষড়যন্ত্র আমরা দেখতে পাচ্ছি। এরই অংশ হিসেবে শেখ হাসিনার দেশে ফেরার এ বক্তব্য।’

তার মতে, ‘মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামি শেখ হাসিনা আসলে বাংলাদেশে ফিরবেন না। বাংলাদেশকে নিয়ে উনি আসলে ষড়যন্ত্রমূলক তৎপরতা চালাচ্ছেন। তার দলের যেসব পলাতক নেতাকর্মী হত্যা, দুর্নীতি ও সন্ত্রাসের সঙ্গে জড়িত— তাদের উসকানি দিয়ে দেশে তিনি নতুন করে একটা অস্থিতিশীল পরিস্থিতি সৃষ্টি করতে চাইছেন।’

‘আমরা তো চাই উনি দেশে আসুক। ডিসেম্বরে কেন, আজকেই আসুক। দেশে এসে উনার বিরুদ্ধে যে সাজা-মামলা— সেটা ফেস (মোকাবিলা) করুক। কিন্তু উনি আসবেন না’, যোগ করলেন প্রিন্স।

বিএনপি চেয়ারম্যানের উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য সৈয়দ মোয়াজ্জেম হোসেন আলাল বললেন, ‘আমরা এটাকে (হাসিনার দেশে ফিরে আত্মসমর্পণের পরিকল্পনা) গুরুত্ব দিচ্ছি না, এটা আইন-আদালতের ব্যাপার।

তবে বিপ্লবের মুখে নেতাকর্মীদের অসহায় অবস্থায় রেখে যে দলের নেত্রী আত্মীয়স্বজন সবাইকে নিয়ে নিরাপদে চলে গেছেন, সেই নেত্রী আবার ফিরে আসবেন এবং আবার তার পরিবারের লোকজনের হাতে নেতৃত্ব যাবে— এ চিন্তা করলে আওয়ামী লীগের (কার্যক্রম নিষিদ্ধ) নেতাকর্মীরাও ভয় পায়, ঘৃণা করে। তারা তাদের নেত্রীর এ কথা বিশ্বাস করে না যে উনি আসবেন, আবার নেতৃত্ব দেবেন।’

ফাঁকা বুলি বলছে জামায়াত-এনসিপি : প্রধান বিরোধী দল জামায়াতে ইসলামী ও জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) শেখ হাসিনার দেশে ফেরার পরিকল্পনাকে ‘ফাঁকা বুলি’ হিসেবে উল্লেখ করেছে। তাদের দাবি, শেখ হাসিনা আদৌ দেশে ফিরবেন না। বরং বিষয়টি কেন্দ্র করে দেশকে অস্থিতিশীল করার একটি পরিকল্পনা বাস্তবায়নের চেষ্টা হতে পারে।

দল দুটির নেতাদের অভিমত, শেখ হাসিনা এর আগেও দেশে ফেরার বিষয়ে নানা ধরনের বক্তব্য দিয়েছেন, কিন্তু শেষ পর্যন্ত তিনি ফেরেননি। জনগণ ও আদালতের কাছে আত্মসমর্পণ না করে তিনি দেশ ছেড়ে আশ্রয় নিয়েছেন ভারতে এবং সেখান থেকে বিভিন্ন ধরনের ষড়যন্ত্র চালিয়ে যাচ্ছেন।

জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার বললেন, ‘শেখ হাসিনা বিদেশে বসে দেশে প্রতিবিপ্লবের মাধ্যমে আবারও ক্ষমতায় ফিরে আসার ষড়যন্ত্র করছেন। তাকে দেশে ফিরিয়ে এনে জুলাই-আগস্টের গণহত্যার জন্য বিচারের মুখোমুখি করতে হবে।’

এনসিপির আহ্বায়ক ও জাতীয় সংসদের বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ নাহিদ ইসলাম বলেছেন, ‘দেশ গত ১৬ বছরে যে ধ্বংসযজ্ঞের শিকার হয়েছে, সেই প্রেক্ষাপটে আমরাও চাই তিনি দেশে ফিরুন, যাতে তার বিরুদ্ধে দেওয়া রায় কার্যকর করা যায়।’

তার ভাষ্য, ‘শেখ হাসিনার সিদ্ধান্ত তার ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত নয়। দিল্লি থেকে যতটুকু অনুমোদন দেওয়া হয়, সে অনুযায়ীই তিনি কথা বলেন। ফলে তিনি আসবেন কি না, বিচার হবে কি না— এসব মূলত দিল্লি এবং ঢাকার কূটনৈতিক ও রাজনৈতিক বোঝাপড়ার ওপর নির্ভর করবে। আওয়ামী লীগ এখন কার্যত কোনো রাজনৈতিক দল নয়।’

এনসিপির সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক আরিফুল ইসলাম আদীব বললেন, ‘আওয়ামী লীগ দল হিসেবে জনগণের দ্বারা প্রত্যাখ্যাত। সন্ত্রাসী দল হিসেবে তারা আন্তর্জাতিকভাবেও পরিচিত। তাদের ফিরে আসার কোনো সুযোগ নেই। শেখ হাসিনার এসব ফাঁকা বুলি আমরা আমলে নিচ্ছি না। তিনি ফিরবেন না। এটি শুধু দেশকে অস্থিতিশীল করার একটি ফাঁদ এবং যারা এ মতাদর্শের অনুসারী, তাদের উসকে দেওয়ার চেষ্টা।’