কুমিল্লার দাউদকান্দি থেকে নিখোঁজ হওয়ার এক দিন পর লাকসামে উদ্ধার বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবিরের কেন্দ্রীয় সহকারী আন্তর্জাতিক বিষয়ক সম্পাদক জিসান মিয়া প্রধানের বিরুদ্ধে এক নারীকে ধর্ষণ ও জোর করে ভ্রুণ নষ্ট করার অভিযোগে সংশ্লিষ্ট থানায় মামলা হয়েছে। পুলিশের দাবি, জিসানকে কেউ অপহরণ করেনি; তিনি নিজেই আত্মগোপনে ছিলেন। এ ইস্যুটিকে ঘিরে দেশে বেশ তোলপাড় চলছে।
এরই মধ্যে, এ বিষয়ে বিশ্লেষণ করতে এবং ওই শিবির নেতার কিছুটা পক্ষ টানতে গিয়ে সাবেক ঢাবি শিক্ষার্থী এবং জামায়াত ও শিবিরপন্থি রাজনৈতিক বিশ্লেষক হিসেবে পরিচিত সোলায়মান নামে এক ব্যক্তির একটি ভিডিও ক্লিপ ভাইরাল হয়েছে, যেটিতে তাকে নবী ও সাহাবীদের চরিত্র নিয়ে আপত্তিকর মন্তব্য করতে দেখা যায়। প্রাথমিকভাবে ছড়িয়ে পড়া এ ভিডিওকে কেউ কেউ এডিটেড দাবি করলেও দ্য ঢাকা ডায়েরি নিশ্চিত হয়েছে যে, ভিডিওটি তারই এবং ‘সোলায়মান এ্যানালাইসিস’ নামক তার প্লাটফর্মে তিনি নিজেই এটি প্রকাশ করেছিলেন, যা সমালোচনার মুখে পরে ডিলিট করে ফেলেন।
ভিডিওটিতে দেওয়া বক্তব্যের সত্যতা জানতে বিশ্লেষক সোলায়মানের সঙ্গে আজ রবিবার (১৪ জুন) সকালে যোগাযোগ করা হয়েছে। এসময় তিনি স্বীকার করেছেন যে, নবী ও সাহাবীদের নিয়ে ছড়িয়ে পড়া বক্তব্যটি তারই ছিল। তার এ বক্তব্যের জন্য তিনি ভুল স্বীকার করেছেন এবং নিঃশর্ত ক্ষমা চেয়েছেন।
এ বিষয়ে ক্ষমা প্রার্থণা করে তিনি দ্য ঢাকা ডায়েরিকে বলেন, মানুষ মাত্রই ভুল। সব মানুষই কম বেশি ভুল করে। সেখানে (ভিডিওতে) উদাহরণটা নিঃসন্দেহে ভুল হয়েছে তখন। এজন্য ক্ষমা প্রার্থনা করছি। আসলে বক্তব্যটা ছিল এরকম যে, মানুষ মাত্রই ভুল, অনেকেই ভুল করে। বলতে বলতে এক পর্যায়ে সাহাবী পর্যন্ত চলে গিয়েছিলাম। এটা আমার উচিত হয়নি। একটা লিমিট পর্যন্ত রাখাটা উচিত ছিল।
তাছাড়াও, নিজের ভুল স্বীকার করে সোলায়মান নিজের ফেসবুক পেজে আজ একটি ভিডিও বার্তাও দিয়েছেন। সেটিতে তিনি বলেন, ‘আমার একটা বক্তব্য নিয়ে আপনাদের মধ্যে মিশ্র প্রতিক্রিয়া তৈরি হয়েছে। অনেক সম্মানিত আলেম ওলামারা তীব্র সমালোচনা করছেন। শিবির নেতা জিসানকে নিয়ে যে ঘটনা তার গুমের অভিযোগ এবং নারী ঘটিত কেলেংকারী সামনে আসার ঘটনাকে কেন্দ্র করে শিবির তাকে বহিষ্কার করেছে। তো এই বিষয় নিয়ে আলোচনা করতে যেয়ে আমি একটা কথা বলেছিলাম যে, মানুষ মাত্রই ভুল ভুল হতে পারে। সেখানে আমি সাহাবী এবং নবীদের এক্সাম্পল অযাচিতভাবে টেনে এনেছিলাম। এতে অনেকেই সমালোচনা করছেন। আমি তাদের এই সমালোচনাকে স্বাগত জানাই।’
‘আমি মনে করি যে, জিসানের এই ঘটনা বা এগুলো নিয়ে আমাদের নানান আঙ্গিকে পর্যালোচনা থাকতে পারে। অবজারভেশন থাকতে পারে বা এখানে সরকার এবং ক্রিটিক আছে এবং থাকবে। বাট আমি কখনোই জিসানের সেই অনৈতিক কাজকে সমর্থন করবো না এবং ডিফেন্ড এক মুহূর্তের জন্য করিনি কিংবা করবো না। তার উপযুক্ত বিচার বা ন্যায়বিচার চাই। সুষ্ঠ তদন্ত চাই। এটা বারবার বলে আসছি। তবে এই বিষয়ে আলোচনা করতে যেয়ে সাহাবী কিংবা নবী রাসূলদের উদাহরণ টেনে আনাটা সম্পূর্ণ অযাচিত ছিল। এর কোন প্রয়োজন ছিল না। আমি এজন্য দুঃখ প্রকাশ করছি এবং সাহাবী নবী রাসূলদের বিষয়ে আমার আকিদা স্পষ্ট করছি।’
‘অনেকেই আমার দৃষ্টি আকর্ষণ করছেন, অনেক লেখা ভিডিও পাঠাচ্ছেন। আমি মনে করি যে, আপনারা আলেম ওলামা হিসেবে এই বিষয়টা উত্থাপন করেছেন বা সমালোচনা করছেন। অতএব, আলেম হিসেবে আমি আপনাদের সমালোচনাকে গ্রহণ করছি এবং আমি মনে করি, এই উদাহরণ দেয়ার কোনো প্রয়োজন ছিল না। এটা ভুল হয়েছে এবং সাহাবী নবী রাসূল বিষয়ে আমার আকিদা স্পষ্ট। আপনারা যারা আমার সমালোচনা করছেন গতকাল বিকেল থেকে। আপনাদের যে আকিদা আমার আকিদা একই। কোন পার্থক্য নেই। আমি আবারও বলছি নবী রাসূলগণ মাসুম। তাদের সমালোচনা করা জায়েজ নেই। সাহাবায়ে কেরামদের সমালোচনা করা জায়েজ নেই। সমস্ত সাহাবীদের আমি জান্নাতি মনে করি। সাহাবীদের সংজ্ঞা হিসেবে তারা সবাই জান্নাতি। আল্লাহ তাদের সবার উপর সন্তুষ্ট।’
‘নবী শব্দটা আমি আমি সেটা রিপিট করতে চাই না। সেখানে দাঊদ আলাইহি ওয়াসাল্লামের সেই উড়িয়া হিত্তার যে ঘটনা ইত্যাদি, এগুলো থেকেই আমি বলেছি। বাট আমি বলব যে, নবীদের সমালোচনা করার জায়গা থাকুক বা না থাকুক বা কোনো ঘটনা থাকুক বা না থাকুক, সাহাবীদের সমালোচনা করার কোনো জায়গা থাকুক বা না থাকুক, আমি আমার নিজের জন্য এটাকে সম্পূর্ণ হারাম বলে মনে করি। কারণ অত জ্ঞান আমার নেই।’
‘আমি মনে করি, ওই উদাহরণ দেয়াটা ভুল হয়েছে। অতএব আমি দুঃখ প্রকাশ করছি। এবং কখনো এধরনের অযাচিতভাবে নবী-রাসূল কিংবা সাহাবীদেরকে টেনে এনে উদাহরণ দিব না। আমি জাস্ট বোঝাতে চেয়েছি মানুষ মাত্র ভুল হতে পারে। আমি তওবা করেছি……।
‘যে বা যারা সমালোচনা করছেন, যারা লেখালেখি করছেন, যারা লেখালেখি করছেন, তারা যে রাজনৈতিক দলের সমর্থন করেন, আমি তাদের দলের তীব্র একজন সমালোচক। আমি আপাদমস্তক একজন সরকার বিরোধী অ্যাক্টিভিস্ট। সমালোচনা আমার কাজই। এটা চালিয়ে যাব। কেউ যেন নতুনভাবে ফ্যাসিস্ট হয়ে উঠতে না পারে, এজন্যে সরকারের সমালোচনা অব্যাহত থাকবে।’
ছড়িয়ে পড়া ভিডিওতে যা বলেছিলেন সোলায়মান:
শিবিরের যারা সদস্য বা কেন্দ্রীয় নেতা এদের মধ্যে হয়তোবা অনেকেই প্রেম করে, কিন্তু কেউ ধরা পড়ে বা জানাজানি হয়, কারোটা হয় না। ভেরি নরমাল, এটা হতেই পারে, হচ্ছে এবং হবে। সাহাবীদের মধ্যেও প্রেমঘটিত ঘটনা ঘটতো একটা সময় এগুলো; যেমন অন্যের স্ত্রীকে ভালো লাগতো; তারপরে তাকে বলতো যে; তোমার স্ত্রী আমাকে দিয়ে দাও। এটা নবীদের মধ্যেও ঘটেছে। যদিও ওটা অন্যায় না। কিন্তু এই শিবির নেতা যে প্রেম করেছেন এটা আইনের দৃষ্টিতে কোনো অন্যায় না।