Image description

অর্থমন্ত্রী ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জাতীয় বাজেট পেশের আগেই ৮ লাখ ৩৯ হাজার ৫০৫ কোটি টাকার একটি ‘ছায়া বাজেট’ ঘোষণা করেছে সংসদের বিরোধী দল জামায়াতে ইসলামী বাংলাদেশ। মঙ্গলবার (৯ জুন) রাজধানীর মগবাজারের আল ফালাহ মিলনায়তনে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে দলটি এই ‘ছায়া বাজেট’ উপস্থাপন করে।

জামায়াতে ইসলামী তাদের এই ছায়া বাজেটে জনপ্রশাসন, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি, দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) পুনর্গঠন, কর আদায় ব্যবস্থা, অভ্যন্তরীণ ও বৈদেশিক ঋণের সুদ পরিশোধ এবং শিক্ষা ও প্রযুক্তি খাতকে বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছে। এছাড়াও এই ছায়া বাজেটে সরকারি কর্মকর্তা কর্মচারীদের বেতন স্কেল বাস্তবায়নে নিজেদের রূপরেখা দিয়েছে। 

ছায়া বাজেটে উল্লেখ করা হয়, সর্বশেষ ২০১৫ সালে সরকারি কর্মচারীদের জন্য বেতনস্কেল বাস্তবায়ন করা হয়েছিল। এরপর দশ বছরেরও বেশি সময় অতিবাহিত হয়েছে। এই সময়ে নিম্ন গ্রেডের সরকারি কর্মচারীদের জন্য নির্ধারিত বেতন-ভাতা জীবনধারণের জন্য অপ্রতুল হয়ে পড়েছে। বিগত কয়েক বছরের অসহনীয় মূল্যস্ফীতি সব গ্রেডের চাকরিজীবীদের জীবনকে অত্যন্ত কষ্টকর করে তুলেছে বলে ছায়া বাজেটে উল্লেখ করা হয়। এ পরিস্থিতিতে অন্তর্বর্তী সরকারের গঠিত জাতীয় বেতন কমিশনের সুপারিশ অবিলম্বে বাস্তবায়নের যথেষ্ট যৌক্তিকতা রয়েছে বলেও দাবি করা হয়।

তবে দলটির ভাষ্য অনুযায়ী, সরকারের সীমিত আর্থিক সক্ষমতার ওপর ইরান যুদ্ধের কারণে সৃষ্ট অভিঘাত অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করেছে, যা বর্তমান সময়ে একটি নতুন বেতনস্কেল পুরোপুরি বাস্তবায়নের পথে বড় অন্তরায়। এ অবস্থায় সরকারি ব্যয়ের ক্ষেত্রে বিদ্যমান অব্যবস্থাপনা, অপচয় ও দুর্নীতি দূর এবং রাজস্ব আয় বৃদ্ধির জন্য প্রস্তাবিত সংস্কারগুলো বাস্তবায়ন করা গেলে ২০২৬-২৭ অর্থবছরে নতুন জাতীয় বেতনস্কেল সম্পূর্ণ না হলেও আংশিকভাবে কার্যকর করা সম্ভব হবে বলে ছায়া বাজেটে উল্লেখ করা হয়।

ছায়া বাজেটে ১০ম গ্রেড থেকে ২০তম গ্রেড পর্যন্ত সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ক্ষেত্রে বেতন কমিশনের প্রস্তাবিত নতুন স্কেল শতভাগ বা ১০০ শতাংশ বাস্তবায়নের কথা বলা হয়েছে। একই সঙ্গে ১ম থেকে ৯ম গ্রেডের ক্ষেত্রে প্রস্তাবিত স্কেলের ন্যূনতম ৮০ শতাংশ বাস্তবায়নকে যৌক্তিক বলে উল্লেখ করা হয়েছে। বিদ্যমান আর্থিক পরিস্থিতিতে কমিশনের সুপারিশ একযোগে বাস্তবায়ন উচ্চাভিলাষী প্রতীয়মান হওয়ায় ধাপে ধাপে তা বাস্তবায়নের পক্ষে মত দিয়েছে দলটি।

এই কাঠামোয় কর্মচারীদের মূলত দুটি ভাগে বিভক্ত করা হয়েছে, যেখানে ১ থেকে ৯ গ্রেড এক ভাগ এবং ১০ থেকে ২০ গ্রেড আরেক ভাগ হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে। প্রস্তাব অনুযায়ী ১ থেকে ৯ গ্রেডের ক্ষেত্রে বর্ধিত মূল বেতন প্রথম বছরে ৫০ শতাংশ এবং দ্বিতীয় বছরে ৫০ শতাংশ করে দেওয়ার কথা বলা হয়েছে। তবে তৃতীয় বছরে এ খাতে কোনো অতিরিক্ত বেতন বৃদ্ধির সুযোগ রাখা হয়নি। একই গ্রেডে বর্ধিত ভাতার ক্ষেত্রে প্রথম ও দ্বিতীয় বছর কোনো বৃদ্ধি না থাকলেও তৃতীয় বছরে একবারে ১০০ শতাংশ ভাতা বৃদ্ধির প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে।

অন্যদিকে ১০ থেকে ২০ গ্রেডের কর্মচারীদের ক্ষেত্রে ভিন্ন পদ্ধতির কথা বলা হয়েছে। এই গ্রেডে প্রথম বছরেই একবারে ১০০ শতাংশ বর্ধিত মূল বেতন কার্যকর করার প্রস্তাব রয়েছে এবং পরবর্তী দ্বিতীয় ও তৃতীয় বছরে এ খাতে আর কোনো বৃদ্ধি থাকবে না। ভাতার ক্ষেত্রে প্রথম ও তৃতীয় বছরে কোনো বৃদ্ধি না রেখে দ্বিতীয় বছরে একবারে ১০০ শতাংশ বর্ধিত ভাতা প্রদানের প্রস্তাব ছকে উল্লেখ করা হয়েছে।

এ লক্ষ্যে প্রস্তাব করা হয়েছে, ৯ম থেকে ২০তম গ্রেডের কর্মচারীদের আগামী ১ জুলাই থেকে ১০০ শতাংশ মূল বেতন কার্যকর করা হবে এবং ২০২৭ সালের ১ জুলাই থেকে সম্পূর্ণ বর্ধিত ভাতা কার্যকর করা হবে। অপরদিকে ১ম থেকে ৯ম গ্রেডের কর্মকর্তাদের ক্ষেত্রে আগামী ১ জুলাই থেকে মূল বেতনের ৫০ শতাংশ কার্যকর, পরবর্তী অর্থাৎ ২০২৭ সালের ১ জুলাই থেকে বাকি ৫০ শতাংশ কার্যকর এবং তৎপরবর্তী বছর অর্থাৎ ২০২৮ সালের ১ জুলাই থেকে সম্পূর্ণ বর্ধিত ভাতা কার্যকরের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি টিফিন ভাতা, যাতায়াত ভাতা, চিকিৎসা ভাতা ও শিক্ষা ভাতার বিদ্যমান হার অযৌক্তিক উল্লেখ করে তা যৌক্তিকভাবে পুনর্নির্ধারণেরও সুপারিশ করা হয়েছে।

এদিকে আসন্ন ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জাতীয় বাজেটে সরকারি চাকরিজীবীদের জন্য নতুন নবম পে-স্কেল বাস্তবায়নের প্রাথমিক প্রস্তুতি নিয়েছে সরকার। এ লক্ষ্যে বাজেটে ৩০ থেকে ৩৫ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ রাখার পরিকল্পনা করা হচ্ছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে। নীতিগত সিদ্ধান্ত অনুযায়ী আগামী ১ জুলাই থেকেই নতুন বেতন কাঠামো আংশিকভাবে কার্যকর করার সম্ভাবনাও রয়েছে।

সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা, ভর্তুকি ব্যয় বৃদ্ধি, সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির সম্প্রসারণ এবং ঋণের সুদ পরিশোধের চাপ থাকা সত্ত্বেও সরকারি চাকরিজীবীদের বেতন বৃদ্ধির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এ কারণেই আগামী বাজেটের আকারও তুলনামূলকভাবে বড় হচ্ছে।

পরিকল্পনা অনুযায়ী নতুন পে-স্কেল তিন ধাপে বাস্তবায়নের রূপরেখা তৈরি করা হয়েছে। প্রথম ধাপে ২০২৬-২৭ অর্থবছরে মূল বেতনের উল্লেখযোগ্য অংশ, যা সর্বোচ্চ ৫০ শতাংশ পর্যন্ত হতে পারে, বৃদ্ধি করা হবে। দ্বিতীয় ধাপে ২০২৭-২৮ অর্থবছরে অবশিষ্ট বেতন সমন্বয় করা হবে। তৃতীয় ধাপে ২০২৮-২৯ অর্থবছরে বাড়িভাড়া, চিকিৎসা ও যাতায়াত ভাতাসহ অন্যান্য সুবিধা নতুন কাঠামোর আওতায় এনে পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়ন সম্পন্ন করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।

নতুন পে-স্কেলের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো বিদ্যমান ২০টি গ্রেড বহাল রেখে বেতন বৈষম্য কমানো। প্রস্তাব অনুযায়ী সর্বনিম্ন ও সর্বোচ্চ বেতনের অনুপাত বর্তমানে ১:৯.৪ থেকে কমিয়ে ১:৮-এ নামিয়ে আনার সুপারিশ করা হয়েছে।

প্রস্তাবিত কাঠামো অনুযায়ী ২০তম গ্রেডের সর্বনিম্ন মূল বেতন ৮ হাজার ২৫০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ২০ হাজার টাকা এবং ১ম গ্রেডের সর্বোচ্চ মূল বেতন ৭৮ হাজার টাকা থেকে বাড়িয়ে ১ লাখ ৬০ হাজার টাকা নির্ধারণের প্রস্তাব রয়েছে। এছাড়া বিভিন্ন গ্রেডে মূল বেতন ১০০ থেকে ১৪০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়তে পারে বলেও সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।