চারদিকে অনন্ত শুভ্রতার রাজত্ব। জমাট বাঁধা বরফের এক বিস্তীর্ণ প্রান্তর চিরে তীব্র শব্দে এগিয়ে চলেছে একটি বরফভাঙা জাহাজ। মাথার ওপর সূর্য, যে সূর্য এই সময়ে এখানে ডোবে না! মধ্যরাতেও সে আলো ছড়ায়। উত্তাল সাগরের ঢেউয়ের দোলায় জাহাজের ভয়ংকর রোলিং আর পিচিং। তার মাঝেই সবার চোখেমুখে চরম উত্তেজনা, কখন দেখা মিলবে আর্কটিকের একাকী রাজা, মেরুভল্লুকের।
দিন কয়েক আগের কথা। রোমাঞ্চকর এই যাত্রার শুরুটা হয়েছিল পৃথিবীর একেবারে উত্তর দিকের সর্বশেষ জনপদ লংইয়ারবিয়েন থেকে। বাংলাদেশ বার্ড ক্লাবের সভাপতি নিয়াজ আব্দুর রহমান, তাঁর সঙ্গী লিসা, ডা. মোমেনুজ্জামান, ডা. মৃণাল এবং রেজাউল আমিনকে নিয়ে শুরু করেন এই অভিযান। লংইয়ারবিয়েন থেকে একটি বিশেষ জাহাজে চড়ে তাঁরা যাত্রা করেন উত্তর মেরুর দিকে। গন্তব্য—পৃথিবীর ছাদ।

আর্কটিকের বরফরাজ্যে বাংলাদেশের লাল-সবুজ পতাকা হাতে গর্বিত অভিযাত্রী দল। ছবি: নিয়াজ আব্দুর রহমান
রোমাঞ্চকর এই অভিযানের অভিজ্ঞতা বর্ণনা করতে গিয়ে বাংলাদেশ বার্ড ক্লাবের সভাপতি ও আলোকচিত্রী নিয়াজ আব্দুর রহমান জানান, আট দিন ধরে তাঁরা একটি বরফভাঙা জাহাজে করে আর্কটিক সার্কেলে উত্তরের দিকে যাত্রা করেছেন। ইতিমধ্যে তাঁরা ৮২ ডিগ্রি উত্তর অক্ষাংশ অতিক্রম করেছেন। এখানকার অদ্ভুত প্রকৃতির কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘এখন এখানে ২৪ ঘণ্টাই দিনের আলো, সূর্য কখনোই অস্ত যায় না।’

আর্কটিকের পরাবাস্তব সৌন্দর্য—চারদিকে নীল জলরাশি আর বরফঢাকা পাহাড়ের সারি। ছবি: নিয়াজ আব্দুর রহমান
এই অনন্ত বরফের রাজ্যকে নিয়াজ আব্দুর রহমান আখ্যা দিয়েছেন ‘বরফের জঙ্গল’ হিসেবে। তাঁর ভাষায়, ‘এই বরফের জঙ্গলে আমাদের চোখ অনবরত খুঁজে ফিরেছে মেরুভল্লুক।’
মেরুভল্লুকের স্বভাবের কথা উল্লেখ করে তিনি জানান, এরা অত্যন্ত একাকী প্রাণী। মাইলের পর মাইল বরফের রাজ্যে এরা একাই ঘুরে বেড়ায়। কখনো কখনো বছরের পর বছর অন্য কোনো মেরুভল্লুকের সঙ্গে এদের দেখাই হয় না। সাধারণত এই ধরনের অভিযানে তিন থেকে চারটির বেশি মেরুভল্লুকের দেখা পাওয়া যায় না। কিন্তু বাংলাদেশি এই দলটি ছিল দারুণ সৌভাগ্যবান। নিয়াজ আব্দুর রহমান উচ্ছ্বাস নিয়ে বলেন, ‘আমরা এতটাই ভাগ্যবান ছিলাম যে, বরফের এই বিশাল জগতে নয়টি মেরুভল্লুকের দেখা পেয়েছি!’

অন্তহীন বরফের মাঝে আকাশপানে মুখ করে থাকা একাকী মেরুভল্লুক। ছবি: নিয়াজ আব্দুর রহমান
শুধু মেরুভল্লুকই নয়, আর্কটিকের এই সাফারিতে তাঁদের ক্যামেরায় ধরা দিয়েছে সিন্ধুঘোটক , সিল, আর্কটিক শিয়াল ও বল্গা হরিণ। দেখা মিলেছে সামুদ্রিক পাখিদেরও। এর মধ্যে অন্যতম ছিল আটলান্টিক পাফিন। নিয়াজ জানান, এই পাখিদের আদর করে ডাকা হয় ‘সমুদ্রের ক্লাউন’ বা বিদূষক।
তবে এই যাত্রা মোটেও সহজ ছিল না। প্রতিকূল পরিবেশের কথা স্মরণ করে তিনি বলেন, ‘সমুদ্র বেশ উত্তাল ছিল। জাহাজের দুলুনিতে মাঝে মাঝেই আমরা অসুস্থ (সি-সিক) হয়ে পড়েছিলাম।’ কিন্তু এই কষ্ট বৃথা যায়নি। তাঁর মতে, ‘এই পরাবাস্তব দৃশ্য এবং বন্যপ্রাণী দেখার পর মনে হয়েছে, আমাদের সব কষ্টই সার্থক হয়েছে।’

উত্তাল সমুদ্রের ওপর দিয়ে উড়ে যাচ্ছে 'সমুদ্রের বিদূষক' খ্যাত আটলান্টিক পাফিন। ছবি: নিয়াজ আব্দুর রহমান
আট দিনের হাড় কাঁপানো শীত, উত্তাল সমুদ্র আর অনন্ত শুভ্রতার রোমাঞ্চ শেষে বরফভাঙা জাহাজটি এখন ফিরতি পথে। তবে বরফের বুকে লাল-সবুজ পতাকা ওড়ানো এবং বন্যপ্রাণী দর্শনে বাংলাদেশিদের এই আর্কটিক জয় নিঃসন্দেহে এক অনন্য দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে।