গত ২৩ এপ্রিল ফেসবুকে ছড়ানো একটি ভুয়া স্ক্রিনশটের ভিত্তিতে ছাত্রদল ও ছাত্রশিবিরের মধ্যে তৈরি হওয়া উত্তেজনাকর ঘটনার সংবাদ কাভার করতে গিয়ে ছাত্রদল নেতাকর্মীদের হামলার শিকার হয়েছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে কর্মরত অন্তত ১০ জন সাংবাদিক। এই ঘটনায় ডাকসুর দুই নেতা এবি জুবায়ের এবং মুসাদ্দেক আলী ইবনে মোহাম্মদকেও মারধর করেছেন ক্ষমতাসীন দলের ছাত্র সংগঠনের কর্মীরা।
সাংবাদিকদের ওপর হামলায় জড়িত ছাত্রদল নেতাকর্মীদের স্থায়ী বহিষ্কার ও সনদ বাতিলের দাবিতে প্রশাসন বরাবর স্মারকলিপি দিয়েছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সাংবাদিক সমিতি (ডুজা)। গতকাল শুক্রবার দুপুরে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক এ বি এম ওবায়দুল ইসলামের কাছে ১২ জন ‘হামলাকারীদের’ নাম ও তথ্যসহ তিন দফা সংবলিত একটি স্মারকলিপি জমা দেন সংগঠনটির নেতারা।
এদিকে ঘটনার ভিডিও ফুটেজ দেখে হামলাকারী কয়েকজন ছাত্রদল নেতাকর্মীকে চিহ্নিত করেছে কয়েকটি অনলাইন পোর্টাল এবং ফেসবুক পেইজ। এসব পোর্টালে ও ফেসবুক পেইজে হামলাকারী হিসেবে নিজেদের ছবি, ভিডিও ও নাম দেখে নিজেদের প্রোফাইল থেকে তা রীতিমত উদযাপন করতে দেখা গেছে বেশ কয়েকজন ছাত্রদল নেতা ও কর্মীকে। কেউ কেউ হামলায় নিজেদের ভূমিকার বিষয়ে কৌতুক করছেন, শেয়ার দিচ্ছেন মিম।
ঘটনার ভিডিও বিশ্লেষণ করে ঢাবি সাংবাদিক সমিতির অভিযোগ করেছে, হামলায় বিশ্ববিদ্যালয়ের হাজী মুহম্মদ মুহসীন হল শাখা ছাত্রদলের আহ্বায়ক আবুজার গিফারী ইফাদের নেতৃত্বে অংশ নেন অন্যান্যরা। এর ভিত্তিতে গিফারীসহ কয়েকজনের ছবি দিয়ে একটি ফটোকার্ড প্রকাশ করে অনলাইন সংবাদমাধ্যম দ্য ডেইলি ক্যাম্পাস। হামলাকারী হিসেবে নিজের ছবিসহ সেই ফটোকার্ডটি ফেসবুকে শেয়ার করে গিফারী লিখেছেন, ‘‘সুন্দর একটা ছবি সিলেক্ট করেছে। ধন্যবাদ’’।

আরেক অভিযুক্ত হাজী মুহম্মদ মুহসীন হল ছাত্রদলের সদস্য সচিব মনসুর রাফি তার তার ছবিযুক্ত একটি ফটোকার্ড শেয়ার দিয়ে লিখেন, ‘‘ভাবছিলাম ভুলভাল মিথ্যা অভিযোগ নিয়ে বকাঝকা করব, নিন্দে জানাবো। আমার সুন্দর ছবি দিছে দেখে মনটাই ভালো হয়ে গেল।’’

পরবর্তীতে মারধরের অভিযোগকে ব্যঙ্গ করে তাকে আবার একটি মিমও শেয়ার করতে দেখা যায়, যেখানে লেখা রয়েছে, “ডরে আমার শরীর কাঁপতেছে।”
ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ্ হল ছাত্রদলের সদস্য সচিব জুনায়েদ আবরারের বিরুদ্ধেও সাংবাদিকদের ওপর হামলার অভিযোগ রয়েছে। তিনি ঢাবি সাংবাদিক সমিতিকে শিবির ট্যাগ দিয়ে ফেসবুকে পোস্ট করেন। এবং হামলায় অভিযুক্ত হিসেবে তার ছবিসহ ফটোকার্ড যেটি গিফারী শেয়ার করেছেন তার নিচে জুনায়েদ কমেন্ট করেছেন, “সবচেয়ে ভালো ছবি আমার টা”।

বিজয় একাত্তর হল ছাত্রদলের নেতা ও হল সংসদ সদস্য সুলায়মান হোসেন রবিও সংবাদমাধ্যমে হামলাকারী হিসেবে নিজের ছবি আসা নিয়ে ব্যঙ্গাত্মক পোস্ট দিয়েছেন এভাবে:
“তিনটি প্রশ্ন।
১। ফটোকার্ডে আমার ছবিটি কেমন হয়েছে?
২। আপনারা কেউ কি আমাকে সাংবাদিকদের উপর হামলা করতে দেখেছেন? বিশ্বাসযোগ্য সোর্স থেকে শুনেছেন? অথবা বিশ্বাস করেন যে আমি কোনো সাংবাদিকের উপর হামলা করতে পারি?
৩। অ্যাথলেটিকসে জিতে কিছু প্রাইজমানি পেয়েছি। কাল কি ডেটে যাওয়া উচিত?

পাশাপাশি আরেক পোস্টে ব্যঙ্গ করে নিজের খোলা গায়ের দুটি ছবি শেয়ার করে লিখেন, ‘‘Sharing my semi NUDES for your Attention!! my very last post was supposed to be a fun, not a cry for help. y'all pls remove your care and drop haha instead. manush vabtese ami shibir somitir mamlar voye post disi. y'all are too normie for this level of humor xD’’

মুক্তিযোদ্ধা জিয়াউর রহমান হল ছাত্রদলের সদস্য কারিব চৌধুরী সংবাতের ফটোকার্ড পোস্ট করে লিখেছেন, “আরো সুন্দর ছবি দিতে পারতো! অথচ আমার দোষ কি? আমি নিজেই জানি না।”

বিজয় একাত্তর হল ছাত্রদলের যুগ্ম আহ্বায়ক সায়িদ হাসান সাদ সংবাদ ফটোকার্ডে ছবি প্রকাশের পর ঠাট্টামূলক ক্যাপশন দিয়ে শেয়ার করেন। তিনি লিখেন ‘‘আর সুন্দর ছবি ছিলো না? শালাদের রুচিই খারাপ’’। এছাড়া সাংবাদিক সমিতির পেইজের পোস্ট শেয়ার করে তুচ্ছতাচ্ছিল্য করে তা শেয়ার করেন।

স্যার এ এফ রহমান হল ছাত্রদলের যুগ্ম আহ্বায়ক আরিফ হাসান ঢাবি সাংবাদিক সমিতিকে গুপ্ত শিবির সমিতি আখ্যা দিয়ে পোস্ট দেন। তিনি লিখেন, ‘‘ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সাংবাদিক সমিতি না বলে এটাকে আপনারা গুপ্ত শিবির সাংবাদিক সমিতি বলতে পারেন। সাংবাদিকদের কাজ আসলে কি ? তারা কি কোন নির্দিষ্ট দলের এজেন্ডা বাস্তবায়ন করবে নাকি সত্য তুলে ধরবে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সাংবাদিক সমিতির জন্য লজ্জা । ধিক্কার জানাই এইসব হলুদ সাংবাদিকদের যারা শিবিরের এজেন্ডা বাস্তবায়নে জন্য সাংবাদিক সমিতি কে ব্যবহার করতেছে।’’
শুধু সাংবাদিকদের ওপর হামলা নয় ডাকসু নেতা মুসাদ্দিক আলী ইবনে মোহাম্মদের ওপর হামলাকারী এক ছাত্রদলকর্মী আল শামস হামলার পর ফেসবুকে ব্যঙ্গ করে পোস্ট দিয়েছেন। হামলার ঘটনার ন্যাশনালিস্ট স্কোয়াড নামের এক ফেসবুক পেজ মুসাদ্দিক আলী ইবনে মোহাম্মদসহ ডাকসু নেতাদের ওপর হামলার একটি ভিডিও প্রকাশ করলে তা শেয়ার করে আশ শামস লেখেন, ‘আহারে, বেশি জোরে দিয়ে দিছি।’ পরবর্টিতে ক্যাপশনটি এডিট করে শুধু ‘আহারে’ শব্দটি রেখে বাকি অংশ কেটে দেন।

এদিকে সাংবাদিক সমিতির সদস্যদের ওপর হামলার অভিযোগের প্রেক্ষিতে চার সদস্য বিশিষ্ট একটি তদন্ত কমিটি গঠন করেছে ছাত্রদল। পাশাপাশি সাংবাদিক সমিতির কাছে দুঃখপ্রকাশ করেছেন সাধারণ সম্পাদক নাছির উদ্দীন নাছির।
দুঃখ প্রকাশের পরও এমন ব্যাঙ্গাত্মক উযপানের বিষয়ে জানতে ছাত্রদলের সাধারণ সম্পাদক নাছির উদ্দীন নাছিরের সাথে দ্য ডিসেন্টের পক্ষ থেকে যোগাযোগ করলে তিনি এমন কিছু দেখেননি বলে জানান। এ প্রতিবেদককে এমন কোনো প্রমাণ থাকলে পাঠাতে বলেন এবং জানান এসব দেখে আবার ফোন করে মন্তব্য জানাবেন। তবে পরবর্তীতে তিনি আর কিছু জানাননি।