ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা চুরি-ছিনতাইয়ে রাজধানী ও এর আশপাশের এলাকায় নারী-পুরুষ মিলিয়ে গড়ে উঠেছে এক ভয়াবহ অপরাধী চক্র। একটি অটোরিকশা ছিনতাইয়ের জন্য নানা ধাপে সিনেমার কায়দায় কাজ করে এই চক্রের সদস্যরা। এক থেকে দেড় লাখ টাকার একেকটি রিকশার জন্য এমনকি সিরিয়াল কিলিংও ঘটিয়েছে চক্রটি। দুই বছরেরও কম সময়ে ভয়ংকর এই চক্রের হাতে প্রাণ গেছে অন্তত সাতজন অটোরিকশা চালকের।
কালবেলার অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, ভয়ংকর এই চক্রের মহাজন রাজধানীর মিরপুরের বাউনিয়া বাঁধ এলাকার পাঁচটি রিকশা গ্যারেজের মালিক। তারা ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা ছিনতাইয়ে দাদন দিয়ে পালন করে অপরাধীদের। টার্গেট করা রিকশা গ্যারেজ পর্যন্ত পৌঁছাতে চালক খুনেও হাত কাঁপে না এই চক্রের। খুনের পর তারা লাশ গুম করতে বেছে নেয় ঢাকার আশপাশের নদী আর ঝোপ-জঙ্গল।
মূলত সাভারের বংশী নদে ভেসে আসা অজ্ঞাতপরিচয় একটি মরদেহের সূত্র ধরে খুনি শনাক্তে তদন্ত শুরু করে নৌ-পুলিশ। লাশের পরিচয় মেলার পর রহস্য উদ্ঘাটনে বেরিয়ে আসে, নিহত ব্যক্তির নাম হুমায়ুন কবির। পেশায় তিনি অটোরিকশার চালক ছিলেন। সেই তথ্যের সূত্র ধরে চুরি-ছিনতাই হওয়া অটোরিকশা কোথায় যায়, নেপথ্যে কারা, তা জানতে কালবেলা নামে অনুসন্ধানে। মাসখানেক ঘুরে অটোরিকশার অন্তত ২০ জন মালিক ও চালকের সঙ্গে কথা বলে ধারণা পাওয়া যায়, এ ধরনের চোরাই রিকশা কেনে মূলত কিছু গ্যারেজ মালিক। পরের অনুসন্ধানে বেরিয়ে আসে রিকশা গ্যারেজ মালিকের চোরাই রিকশার গুপ্ত সাম্রাজ্যের আদ্যোপান্ত।
দাদনে চোর-ছিনতাইকারী লালন করে পল্লবীর পাঁচ গ্যারেজ মালিক: অনুসন্ধানে নেমে সখ্য গড়ে তোলা হয় ব্যাটারিচালিত রিকশার এক পুরোনো চোরের সঙ্গে। কয়েক দিনের আলাপে খুলতে থাকে রহস্যের জট। জানা যায়, ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা এককভাবে কেউ চুরি-ছিনতাই করে না। এজন্য রয়েছে গ্রুপ। প্রতি গ্রুপে একাধিক সদস্য এবং তাদের কাজও ভিন্ন ভিন্ন। তার কথার সূত্র ধরে কালবেলার এই প্রতিবেদক নিজের পরিচয় লুকিয়ে ছদ্মবেশে রাজধানীর পল্লবীর বাউনিয়া বাঁধ এলাকায় কয়েকটি রিকশা গ্যারেজে যাতায়াত শুরু করেন। উদ্দেশ্য, কম দামে ব্যাটারিচালিত রিকশা কেনা। দরদামের এই ফাঁকে তথ্য মেলে বাউনিয়া বাঁধ এলাকায় ছিনতাই ও চোরাই অটোরিকশার একটি সংগঠিত নেটওয়ার্কের। অনুসন্ধানে জানা যায়, অন্তত পাঁচ গ্যারেজ মালিক বছরের পর বছর ধরে ব্যাটারিচালিত অটোরিকশার চোর ও ছিনতাইয়ে জড়িতদের লালন-পালন করে আসছে। রিকশা গ্যারেজের এই মালিকরা মাঠে থাকা চোর ও ছিনতাইকারীদের আগাম টাকা দিয়ে রাখে নিজের গ্যারেজে চোরাই রিকশা পেতে। যদিও বাউনিয়া বাঁধের মতো রাজধানীর অন্যান্য এলাকায়ও রয়েছে এই ধরনের চক্র।
বাউনিয়া বাঁধ এলাকায় অনুসন্ধান করা পাঁচ রিকশা গ্যারেজে অল্প সময়ের মধ্যেই চোরাই রিকশার রূপ বদল হয়ে যায়, আগাম ক্রেতা ঠিক থাকায় বিক্রিও হয় দ্রুতই।
এক দশক ধরে চোরাই রিকশার সিন্ডিকেট চালাচ্ছেন আলম চান: বাউনিয়া বাঁধের বাউনিয়া বাজার মসজিদ গলির আলম চানকে সবাই চেনেন রিকশার গ্যারেজের মালিক হিসেবে। তবে কালবেলার অনুসন্ধানে বেরিয়ে আসে, অন্তত ১০ বছর ধরে তিনি বৈধ গ্যারেজের সাইনবোর্ডে চোরাই রিকশা কেনাবেচায় জড়িত। চক্রের সদস্যের সূত্র বলছে, আলম চানের গ্যারেজে প্রতিদিন আট থেকে দশটি চোরাই রিকশা আনা হয়। মাত্র ২০-৩০ মিনিটের মধ্যেই এসব রিকশা খুলে একেবারে চেহারা পাল্টে ফের তা বিক্রি করা হয়। একই এলাকায় তার আরও দুটি গ্যারেজ রয়েছে—একটিতে বৈধ এবং অন্যটিতে অবৈধ রিকশা রাখা হয়। তার দাদনে খাটা চক্রটি সাভার, আশুলিয়া ও কেরানীগঞ্জ এলাকায় সক্রিয়। চোরাই রিকশার প্রতিটি ২৫-৩৫ হাজার টাকায় কিনে ৭০-৯০ হাজার টাকায় বিক্রি করেন তিনি। এই অপরাধে অতীতে একাধিকবার র্যাবের হাতে গ্রেপ্তার হলেও আলম চানের স্বভাব বদলায়নি।
পারিবারিক ব্যবসা হিসেবে চলছে ইমরানের চোরাই গ্যারেজ: আলম চানের গ্যারেজের পাশেই ইমরানের গ্যারেজ। তবে ওই নামে স্থানীয় লোকজন ঠিক চেনে না এটি। ‘চোরা স্বপনের মেয়ের জামাই’র গ্যারেজ বললেই অটোরিকশার চালকরা চেনেন ইমরানের গ্যারেজটি। এই গ্যারেজে দুজন রিকশা মেকানিক কাজ করে। তার দাদনে খাটা চক্রের সদস্যরা গাবতলী, আমিন বাজার, সাভারসহ আশপাশের এলাকা থেকে রিকশা চুরি করে গ্যারেজে পৌঁছে দেয়। স্থানীয় লোকজন ও রিকশা চুরি চক্রের একাধিক সদস্যের ভাষ্য, পারিবারিকভাবে পাওয়া এই বাণিজ্য চালাচ্ছেন ইমরান। যদিও আগে মাদক কারবারে জড়িত ছিলেন তিনি।
গ্যারেজ থেকে ইমরানের ফোন নম্বর সংগ্রহ করে তার বক্তব্য জানতে ফোন দেওয়া হলেও তিনি তা রিসিভ করেননি।
সাভারের রিকশাচালক হুমায়ুনকে হত্যায় জড়িত ছিনতাই চক্রের সদস্যদের সঙ্গে এই আলম চান ও ইমরানের নিয়মিত যোগাযোগের তথ্য-প্রমাণ রয়েছে কালবেলার কাছে। সেখানে দাদনের টাকা দেওয়ার আলাপ; কবে, কখন ও কী ধরনের রিকশা লাগবে—সেসব আলাপও উঠে এসেছে। যদিও এ বিষয়টি অস্বীকার করেছেন আলম চান। তিনি কালবেলাকে বলেন, ‘এসবের কিছুই আমি জানি না। আমি যদি এসব করে থাকি, তাহলে অবশ্যই পুলিশের কাছে প্রমাণ আছে। তারা আমাকে ধরে নিয়ে শাস্তি দিক। এতে আমার কোনো আপত্তি নেই।’
ক্ষুদ্র ঋণে লোকসান গুনে চোরাই রিকশার বাণিজ্যে মোহর আলী : বাউনিয়া বাঁধের মোহর আলী যুক্ত ছিলেন স্থানীয় সমিতির মাধ্যমে ক্ষুদ্র ঋণের ব্যবসায়। কিন্তু বাণিজ্যে লোকসানে পড়েন তিনি। ক্ষুদ্র ঋণ আদান-প্রদানে পরিচয় হয় রিকশা চুরি চক্রের সঙ্গে। এরপর নিজেও নেমে পড়েন সেই অবৈধ বাণিজ্যে। যদিও খোঁজ করে মোহর আলীর কোনো নিজস্ব গ্যারেজের সন্ধান মেলেনি। তিনি অল্প পুঁজি খাটিয়ে অন্য চক্র থেকে কম দামে কেনেন চোরাই রিকশা, পরে তা বিক্রি করেন বেশি দামে।
সরেজমিন মোহরের সঙ্গে কথা বলতে চাইলেও তাকে পাওয়া যায়নি। তবে ওই গ্যারেজের একজন মেকানিক নিজের নাম না জানিয়ে বলছিলেন, তিনি এখানে শুধু কাজ করেন, এর বেশি জানেন না।
ইদ্রিসের গ্যারেজে দাদন খাটে ১০-১২ অপরাধী: সূত্র বলছে, বাউনিয়ার কলার আড়ত এলাকায় ইদ্রিসের গ্যারেজে মাসে ৭০ থেকে ১০০টি চোরাই রিকশা পুনঃপ্রস্তুত করা হয়। ওই তথ্যের সূত্র ধরে গত মঙ্গলবার সরেজমিন ওই গ্যারেজে যাওয়া হয় পরিচয় গোপন করে। দেখা যায়, গ্যারেজটি দুই ভাগে বিভক্ত—সামনে বৈধ রিকশা থাকলেও ভেতরে পার্টিশনের আড়ালে সারিবদ্ধভাবে রাখা কয়েকটি রিকশা। সঙ্গে থাকা ওই চক্র সম্পর্কে জানাশোনা ব্যক্তি বলছিলেন, ভেতরের এই রিকশাগুলোই চুরি ও ছিনতাই করে আনা। এগুলোর চেহারা পাল্টে নেওয়া হবে সামনে, কোনো কোনোটি চলে যাবে ক্রেতার হাতে। ইদ্রিস নিয়ন্ত্রণ করেন চক্রের ১০ থেকে ১২ জন সদস্য।
মা-ছেলের গ্যারেজেও চলে দাদনে চুরি-ছিনতাই: একই এলাকায় মমতাজের গ্যারেজ নামেও রয়েছে একটি রিকশার গ্যারেজ। বাউনিয়া বাঁধের ই ব্লকের এই গ্যারেজ ‘মা-ছেলের গ্যারেজ’ নামে পরিচিত। মা মমতাজ নিয়ন্ত্রক হলেও এটি চালায় ছেলে ইসমাইল। এখানে চোরাই রিকশার চেহারা পাল্টে বিক্রি করা হয়। এ কাজে মমতাজের স্বামীও যুক্ত বলে বলছে সূত্র। অবশ্য গ্যারেজে গিয়ে মমতাজ বা তার ছেলেকে পাওয়া যায়নি।
গত বুধবার বাউনিয়া বাঁধের স্থায়ী বাসিন্দা বা দীর্ঘদিন ধরে সেখানে বসবাস করেন—এমন অন্তত সাতজনের সঙ্গে এই গ্যারেজ মালিকদের বিষয়ে জানতে চাওয়া হয়। তারা কেউই নামগুলো শোনার পরে স্বাভাবিক আচরণ করেননি। পরে যখন সরাসরি চোরাই রিকশা সিন্ডিকেটের সঙ্গে এই ব্যক্তিদের জড়িত থাকার বিষয়টি নিয়ে জানতে চাওয়া হয়, তখন প্রায় সবার অভিন্ন সুর—এসব তারা কিছু জানেন না। দুজন স্থানীয় বাসিন্দা বলেন, ‘যা জিগাইছেন ভালো জিগাইছেন। আর কাউরে না জিগাইয়া এহান থাইকা যানগা। নইলে বড় বিপদে পড়বেন।’
যেভাবে সন্ধান মিলল এই পাঁচ চক্রের : গত বছরের ২৮ ডিসেম্বর ধামরাই এলাকার অটোরিকশা চালক হুমায়ুন কবির রিকশা নিয়ে বের হয়ে নিখোঁজ হন। তাকে না পেয়ে থানায় সাধারণ ডায়েরি করেন স্বজনরা। হুমায়ুন নিখোঁজের পাঁচ দিনের মাথায় সাভারের নামাবাজার বাঁশপট্টি এলাকার বংশী নদে মেলে একটি মরদেহ। এই মরদেহ উদ্ধারের পর তদন্তে নামে ঢাকা রেঞ্জের নৌপুলিশ। তদন্তে বেরিয়ে আসে লাশটি সেই নিখোঁজ রিকশাচালক হুমায়ুনের।
তদন্তে আরও বেরিয়ে আসে, অটোরিকশা ছিনতাইয়ের জন্যই খুন হন হুমায়ুন। তার খুনে নারী-পুরুষ মিলিয়ে ছয়জন জড়িত, তাদের মধ্যে ধরা পড়ে পাঁচজন। তাদের জিজ্ঞাসাবাদে সামনে আসে রিকশা চুরি-ছিনতাইয়ের এই চক্র।
যেভাবে ছিনতাই হয় অটোরিকশা : ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা চুরি-ছিনতাইয়ের গল্প যেন সিনেমাকেও হার মানায়। নৌপুলিশ সূত্র জানায়, হুমায়ুন হত্যায় গ্রেপ্তার চক্রটিতে একই পরিবারের তিন সদস্য রয়েছে। যারা বাকিদের নিয়ে মাঠপর্যায়ে ছিনতাইয়ের কাজ করে। গ্রেপ্তার চক্রের সদস্যরা হলেন—নারগিছ, নাঈম, বাবুল, কবির ও সোবহান। চক্রের আরেক সদস্য আজিজ এখনো পলাতক।
চালক হুমায়ুন হত্যার ঘটনা বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, ঘটনার দিন চক্রটি প্রথমে হুমায়ুনকে টার্গেট করে। এরপর চক্রের নারী সদস্য নারগিছ তার কাছে গিয়ে কান্নাজড়িত কণ্ঠে আকুতি জানান, তার মেয়ে হারিয়ে গেছে, তাকে খুঁজতে দ্রুত যেতে হবে। ওই সময় ওই নারগিছের সঙ্গে স্বামী পরিচয়ে ছিলেন পলাতক আজিজ। মানবিকতা বোধ ও বেশি ভাড়ার প্রলোভনে হুমায়ুন তাদের রিকশায় উঠিয়ে রওনা দেন। পথেই আরও দু-তিনজনের একটি দল দাঁড়িয়ে থাকে। তারা রিকশাটি দেখে থামায় এবং নারগিছ ও আজিজের সঙ্গে এমন কথাবার্তা বলেন, যেটাতে মনে হয় তারা একই পরিবারের সদস্য বা স্বজন। এই পর্যায়ে গ্রেপ্তার বাবুল, কবির ও নাঈম নারগিছকে নানাভাবে সান্ত্বনা দিতে থাকেন এবং তাকে জুস বা অন্য কিছু খাইয়ে ধৈর্য ধরার আহ্বান জানান। এ ক্ষেত্রে পানি বা জুসে চেতনানাশক মেশানো থেকে শুরু করে নানা কৌশলে এটা চালক হুমায়ুনকে খাওয়ায় কবির। খাওয়ানোর পরে যখন চালক অচেতন হয়ে পড়েন, তখন নাঈম অটোরিকশাটি চালিয়ে সেখান থেকে চলে যান। রিকশা নিয়ে যাওয়ার আগে সবাই মিলে অচেতন চালকের মৃত্যু নিশ্চিত করার জন্য নদীতে ফেলে দেয় নিথর দেহটি।
অজ্ঞান পার্টি বা মলম পার্টির কার্যক্রম নিয়ে ব্যক্তিগত আগ্রহের জায়গা থেকে ঘাঁটাঘাঁটি করেছেন চিকিৎসক ও জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ লেলিন চৌধুরী। তিনি বলেন, ‘একজন মানুষকে অচেতন করতে একসঙ্গে অনেক ঘুমের ওষুধ ও মানসিক রোগের ওষুধ গুঁড়া করে খাওয়ানো হয় ভুক্তভোগীকে। এটাকে আকর্ষণীয় ও সুস্বাদু করতে এই গুঁড়ার সঙ্গে কখনো মেশানো হয় জুস। আবার কখনো মেশানো হয় কেক বা পেস্ট্রি জাতীয় খাবারের সঙ্গে। এতে বিনা দ্বিধায় অনেকেই খেয়ে ফেলে। খাওয়ার পর খুব দ্রুত সময়ে ভুক্তভোগী জ্ঞান হারায়। এ ধরনের ওষুধ মেশানো খাবার খাওয়ার পর খুব দ্রুত কিডনি ও লিভার অচল করে দেয়। এতে ভুক্তভোগী মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ে। যারা ভাগ্যক্রমে বেঁচে ফেরে, তারা পাগল বা মানসিক রোগী হয়ে জীবন কাটায় অতিরিক্ত ওষুধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ায়। যদিও অঞ্চলভেদে ওষুধের পার্থক্য থাকে।’
ওই ঘটনায় করা মামলার তদন্ত কর্মকর্তা নৌপুলিশের উপপরিদর্শক হুমায়ুন কবীর কালবেলাকে বলেন, ‘এটি সিনেমার গল্পের মতো একটি ঘটনা। ওই ঘটনাটি ছাড়াও তারা গত দুই বছরে তদন্তে নেমে একই কায়দায় সংঘটিত হুমায়ুনসহ আরও অন্তত ছয় চালক হত্যার রহস্য উদ্ঘাটন করেছেন।’
পুলিশের এ কর্মকর্তা বলেন, ‘গত দুই বছরে এ চক্রটি যে ছয়টি হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছে, সেটা আমরা বের করতে পেরেছি।’
রিকশার সঙ্গে হুমায়ুনকে হারিয়ে এখন বিপাকে পরিবারটি। গত শুক্রবার কথা হয় নিহত হুমায়ুনের ভাই ও হত্যা মামলার বাদী মোশাররফ হোসেনের সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘হুমায়ুন কিস্তির টাকায় অটোরিকশা কিনেছিলেন। এখন সেই টাকাও তারা শোধ করতে পারছেন না।’
অটোরিকশা ছিনতাইয়ে কার কী কাজ: হুমায়ুন হত্যায় গ্রেপ্তার হওয়া পাঁচজনের কাছে পুলিশ পেয়েছে নানা গুরুত্বপূর্ণ তথ্য। তাদের মধ্যে নাঈম সরদারের স্বীকারোক্তিমূলক জবাবন্দিতে উঠে এসেছে ছিনতাইয়ের সময় কে কী দায়িত্ব পালন করে। মাঠ পর্যায়ে কাজ করা এ চক্রটিতে স্বপন ওরফে কবির সব থেকে ধুরন্ধর সদস্য। রিকশাচালক, স্পট নির্বাচন থেকে শুরু করে খাবারে চেতনানাশক মেশানো পর্যন্ত সব কাজ করে সে। নারগিছ আর আজিজকে দিয়ে ছিনতাই অপারেশনের নাটকীয়তা শুরু হয়। দ্বিতীয় ধাপে যুক্ত হওয়াদের মধ্যে নাঈম ও বাবুল মূলত কবিরের ডান ও বাম হাত হিসেবে কাজ করে। চালককে নিরাপদে ফেলে দেওয়া পর্যন্ত কবিরের কাজে সহায়তা করে বাবুল। এরপর যখন রিকশা নিয়ে নাঈম রওনা দেয়, তখন সেটায় যাত্রী হিসেবেও থাকে বাবুল। স্পট থেকে রিকশা নিয়ে গ্যারেজে এসে বিক্রি করা, বিক্রির টাকা কবিরের হাতে পৌঁছে দেওয়া পর্যন্ত বাবুল সক্রিয় ভূমিকায় থাকে। লাশ ফেলা পর্যন্ত পুরো ঘটনাটা দূর থেকে অনুসরণ করে সোবহান। পেশায় প্রাইভেটকারের চালক এ সোবহানের স্ত্রী নারগিছ। তবে স্ত্রীর হাত ধরে সে এ চক্রে যোগ দেয়। চক্রের আরেক সদস্য বাবুল নারগিছের ছোট বোনের স্বামী।
এই চক্রের ফাঁদে গেছে আরও ছয় চালকের প্রাণ: সাভারের চালক হুমায়ুনের পরিণতি বরণ করতে হয়েছে অন্তত ৬ জনকে। তাদের মধ্যে গত ১৫ ফেব্রুয়ারি জিরাব এলাকার বাসা থেকে অটোরিকশা নিয়ে বের হয়ে নিখোঁজ হন সাইফুল ইসলাম। এর তিন দিন পরে তুরাগ থানা এলাকার ১৭ নম্বর সেক্টরের একটি লেকে মেলে তার মরদেহ। হুমায়ুন হত্যায় গ্রেপ্তার ৫ জন স্বীকার করেছে তাদের হাতেই সাইফুল খুন হয়েছেন।
গত বছরে ১৮ ডিসেম্বর গাজীপুর পুবাইলের খোরাইদ এলাকার অটোরিকশা চালক আব্দুর রহিম ভূঁইয়া এবং এই বছরের মার্চে গাছা এলাকার শাহাবুল ইসলামও রিকশা নিয়ে বের হয়ে একই পরিণতি ভোগ করেন। এ ছাড়া এই চক্রের হাতে প্রাণ হারিয়েছেন আশরাফুল ইসলামসহ আরও দুজন অটোরিকশা চালক। গাজীপুর মহানগরের পুবাইল থানায় দায়ের করা তিনটি মামলা, ডিএমপি তুরাগ থানার দুটি মামলা ও ঢাকা মহানগর পুলিশের পল্লবী থানার একটি মামলার তথ্য ঘেঁটে এসব তথ্য পাওয়া গেছে।
নদীতে লাশ পাওয়ার বিষয়ে নৌপুলিশের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ঢাকা অঞ্চল) মাহফুজুর রহমান কালবেলাকে বলেন, ‘জিজ্ঞাসাবাদে গ্রেপ্তারদের কাছে নিহত চালকদের নাম ধরে জানতে চাইলে তারা জানায়—প্রায় প্রতিদিনই এমন ঘটনা ঘটায়, সব মনে রাখা সম্ভব নয়। পরে নাঈমসহ সবাই একে একে হত্যার কথা স্বীকার করে; তথ্য-প্রযুক্তি ও সিসিটিভি ফুটেজে বিষয়গুলো নিশ্চিত করা হয়।’
এ ধরনের অপরাধকে শক্তিশালী সংঘবদ্ধ অপরাধ হিসেবে আখ্যা দিয়ে গোয়েন্দা নজরদারি বাড়ানোর পরামর্শ দিয়েছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক ও অপরাধ বিশেষজ্ঞ ড. তৌহিদুল হক। তিনি বলেন, ‘এ চক্রকে ধংস করতে হলে পুলিশের নিয়মিত অভিযান ও গোয়েন্দা তৎপরতা বাড়াতে হবে। এ ছাড়াও যারা ছিনতাইয়ের সঙ্গে জড়িত এবং এসব ছিনতাইয়ের বাহন কেনাবেচায় জড়িত তাদের সবাইকে শনাক্ত করা উচিত। তাহলে নিম্ন আয়ের এসব সাধারণ মানুষ তাদের জীবনের নিরাপত্তা পাবেন।’
সার্বিক বিষয়ে জানতে চাইলে ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) অতিরিক্ত কমিশনার (ক্রাইম অ্যান্ড অপারেশনস) এস এন মো. নজরুল ইসলাম কালবেলাকে বলেন, ‘টঙ্গী ও কেরানীগঞ্জকেন্দ্রিক এ ধরনের বেশ কিছু চক্রকে আমরা চিহ্নিত করেছি। বেশ কয়েকজনকে কয়েক দফায় ধরাও হয়েছে। তারা মূলত যাত্রীবেশে উঠে চালককে নির্জন জায়গায় নিয়ে গিয়ে মারধর করে রিকশা নিয়ে পালায়। তারপর রিকশার ব্যাটারি বিক্রি করে। আমরা আরও কিছু চক্রকে নজরদারিতে রেখেছি।’