Image description
সিন্ডিকেটের কারসাজি

জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব আর অসাধু চক্রের কারসাজিতে বাজার এখন টালমাটাল। চাল থেকে শুরু করে ডাল, ভোজ্যতেল, ডিম, মাছ-মাংস-সবকিছুর দাম ঊর্ধ্বমুখী। চালের মূল্য কেজিতে ৫ টাকা বেড়ে গেছে। ডালের কেজি ১৬০ টাকা ছুঁয়েছে। ডিম ডজনপ্রতি ১০ টাকা বেড়ে ১৩০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। অন্যদিকে সরবরাহ কমিয়ে উধাও করা হয়েছে বোতলজাত সয়াবিন তেল। সবজির বাজারেও আগুন। বেশির ভাগ সবজির কেজি ৮০-১০০ টাকার ওপরে বিক্রি হচ্ছে। মাছ-মাংসের দাম অনেকের নাগালের বাইরে। এতে অস্বস্তিতে পড়েছের নিম্ন ও মধ্যবিত্তরা। দরিদ্ররা নিত্যদিনের খাবার জোগাড়েই হিমশিম খাচ্ছেন। বাজার বিশ্লেষকদের অভিযোগ, আগের মতোই বাজার সিন্ডিকেটের কাছে জিম্মি দেশের সব শ্রেণির ভোক্তা।

তাদের মতে, বিগত শেখ হাসিনা সরকার ও অন্তর্বর্তী সরকারের সময় সিন্ডিকেট ভেঙে ভোক্তাকে স্বস্তি দেওয়া যায়নি। বরং বিভিন্ন সময় শুল্ক ছাড় ও পণ্যের দাম বাড়িয়ে মূল্য ঘোষণা করে চক্রকে সুবিধা করে দেওয়া হয়। বর্তমান সরকার বাজার নিয়ন্ত্রণের আশ্বাস দিলেও তারা কোনো সমাধান দিতে পারছে না। এমন পরিস্থিতিতে আয়ের সঙ্গে ব্যয় সামলাতে পারছেন না সাধারণ মানুষ। তাই বাজার নিয়ন্ত্রণে সরকারের কিছু নীতিগত সিদ্ধান্ত নিতে হবে।

রাজধানীর খুচরা বাজারে গরিবের মোটা চালের মধ্যে স্বর্ণা জাতের চাল বিক্রি হচ্ছে ৫৫-৬০ টাকা; যা ৭ দিন আগেও কেজিতে ৫ টাকা কমে বিক্রি হয়। মাঝারি দানার মধ্যে প্রতি কেজি পাইজাম চাল বিক্রি হচ্ছে ৬০ থেকে ৬৮ টাকা, যা কিছুদিন আগেও কেজিতে ৫-৬ টাকা কমে বিক্রি হয়েছে। আর সরু চালের মধ্যে প্রতি কেজি মিনিকেট ৩ টাকা বেড়ে ৮৮ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।

কাওরান বাজারের আল্লাহর দান রাইস এজেন্সির মালিক পাইকারি ও খুচরা চাল বিক্রেতা মো. সিদ্দিকুর রহমান যুগান্তরকে বলেন, মিল মালিকরা জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির অজুহাতে চালের দাম বাড়িয়ে দিয়েছে। এটা সত্য, জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির কারণে ধান থেকে চাল প্রক্রিয়াতে দাম বাড়বে। এটা কেজিতে ২-৩ টাকা বাড়ার কথা। কিন্তু ৫-৬ টাকা বাড়ানো হয়েছে। যে কারণে পাইকারি পর্যায়ে দাম বাড়ার প্রভাব খুচরা বাজারে গিয়ে পড়েছে। তিনি জানান, সরকার পাইকারি ও খুচরা বাজারে অভিযান পরিচালনা করলেও মিল পর্যায়ে প্রভাবশালীদের কিছু করতে পারছে না। শেখ হাসিনার সরকারের সময় পারেনি, অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ও কিছু হয়নি। এবারও কিছু হচ্ছে না। সব দায় আমাদের মতো ব্যবসায়ীদের ওপর চাপানো হচ্ছে। আমাদের জরিমানা গুনতে হচ্ছে।

এদিকে দেশের বাজারে সয়াবিন তেল নিয়ে এক প্রকার নৈরাজ্য চলছে। সরকারের সঙ্গে বৈঠকের পরও ভোজ্যতেলের প্রভাবশালী ব্যবসায়ীরা বাজারে বোতল তেল সরবরাহ করছেন না।

যে কারণে বাজার থেকে উধাও হয়ে গেছে বোতলজাত সয়াবিন তেল। অন্যদিকে চাহিদা বাড়ায় খোলা সয়াবিন তেলের দাম লিটারে ৩৪ টাকা বাড়িয়ে ২১০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।

রাজধানীর জিনজিরা কাঁচাবাজারের মুদি ব্যবসায়ী সাগর বলেন, হাতেগোনা কয়েকটি কোম্পানি তেলের ব্যবসা করে। তারা নিজেদের মতো করে দাম বাড়ায়। সরকারকে চাপ দিয়ে নানা সুবিধা নেয়। এবারও তারা আরেক দফা দাম বাড়াতে বাজারে বোতলজাত সয়াবিন সরবরাহ বন্ধ রেখেছে। তেল সরবরাহ করলেও বোতলের গায়ে খুচরা এমআরপিতে আমাদের কাছে বিক্রি করছে। তাহলে আমরা ক্রেতাদের কাছে কোন দামে বিক্রি করব। তিনি জানান, তেলের সমস্যা হলে আমাদের মতো ব্যবসায়ীদের কাছে আসে তদারকি টিম। কিন্তু যারা কারসাজি করে সাধারণ মানুষের ভোগান্তি বাড়িয়েছে, তাদের কাছে যেতে সাহসই করে না। এভাবেই দিনের পর দিন তদারকি ব্যবস্থা চলছে।

অর্থনীতিবিদ এম কে মুজেরী যুগান্তরকে বলেন, ‘সিন্ডিকেটের সক্রিয় সদস্য কারা, তা সরকারকে আগে বের করতে হবে। উৎপাদনকারী ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান কিংবা আমদানিকারক থেকে পণ্য ভোক্তা পর্যন্ত পৌঁছাতে কয়েকবার হাতবদল হয়। এ পর্যায়ে যারা শক্তিশালী এবং যাদের প্রভাব বেশি, তারা নিজ স্বার্থে শক্তি ব্যবহার করে পণ্যের দাম বাড়ায়। তাদের বের করতে হবে। তাই প্রথমে যেসব পণ্যের মূল্য বেশি ওঠানামা করছে, সেসব পণ্য আমদানিকৃত হোক বা উৎপাদিত হোক, তার মূল্য বিচার-বিবেচনা করে দেখা উচিত। সেখানে কারা শক্তিশালী ভূমিকা পালন করছে, পণ্যমূল্য কারা নিয়ন্ত্রণ করছে-তাদের চিহ্নিত করতে হবে। তাদের ক্ষমতা নষ্ট করা এবং আইনগত ব্যবস্থা বা নীতি পরিবর্তন করে ব্যবস্থা নিলে সিন্ডিকেট ভাঙা সহজ হবে।’

তিনি বলেন, ‘খুচরা পর্যায়ে তদারকি জোরদার হয়েছে, ব্যবসায়ীদের জরিমানা করা হচ্ছে। কিন্তু যারা ক্ষমতাশালী, তারা ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে যাচ্ছে। তাই শক্তিশালীরা কী দামে পণ্য আমদানি করছে বা উৎপাদন করছে, প্রক্রিয়ায় কত খরচ হচ্ছে, কত দামে বিক্রি করছে, তা সরকারের বের করা সহজ। সেখানে কোনো অনিয়ম পেলে জড়িতদের কঠোরভাবে আইনের আওতায় আনলে বাজারে স্থিতিশীলতা ফিরে আসবে।’

খুচরা বাজারে বিক্রেতাদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, ‘শুক্রবার প্রতি ডজন ফার্মের ডিম বিক্রি হয় ১৩০ টাকা, যা ৭ দিন আগেও ১২০ টাকা ছিল। প্রতি কেজি ব্রয়লার মুরগি বিক্রি হয় ১৮০ টাকা। প্রতি কেজি সোনালি মুরগি বিক্রি হয় ৩৬০ টাকা। প্রতি কেজি গরুর মাংস ৮০০ টাকা। খাসির মাংস প্রতি কেজি বিক্রি হয় ১২০০ টাকায়। পাশাপাশি সপ্তাহের ব্যবধানে সব ধরনের মাছের দাম কেজিপ্রতি ১০-৩০ টাকা বেড়েছে। খুচরা বাজারে প্রতি কেজি পাঙাশ বিক্রি হয় ২৩০ টাকা; যা এক দিন আগেও ২২০ টাকা ছিল। এক কেজি ২০০ গ্রাম ওজনের রুই প্রতি কেজি বিক্রি হয় ৩৪০-৩৭০ টাকা, যা ৩ দিন আগেও বিক্রি হতো ৩০০ টাকা দরে। আর দুই কেজির চেয়ে বেশি ওজনের রুই কেজিপ্রতি বিক্রি হচ্ছে ৪২০-৪৫০ টাকা, যা ৭ দিন আগেও কেজিপ্রতি ৩০-৫০ টাকা কম দামে বিক্রি হয়েছে।

এ বিষয়ে কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) সহসভাপতি এসএম নাজের হোসাইন যুগান্তরকে বলেন, ‘কিছু অসাধু ব্যবসায়ীর কাছে জিম্মি সাধারণ ভোক্তা। তদারকি সংস্থা জানে কারা কোন পণ্যের দাম বাড়াচ্ছে। কী পন্থায় বাড়াচ্ছে। আর লাগামও দৃশ্যমান। টান দিলেই সব ঠিক হয়ে যাবে। কিন্তু কেন তা করা হচ্ছে না।’

বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির সম্প্রতি এক অনুষ্ঠানে বলেন, বর্তমান সরকারের মেয়াদেই বাজার সিন্ডিকেট মুছে দেওয়া হবে। এজন্য যা যা করণীয়, তাই করবে সরকার।