Image description

‘বাংলাদেশ সনদ’ নামে একটি পেজ থেকে নাগরিকদের একটি ‘জাতীয় অঙ্গীকারে’ যুক্ত হওয়ার আহ্বান জানানো হচ্ছে। প্ল্যাটফর্মটি নিজেদের ‘দল মত নির্বিশেষে’ একটি নাগরিক উদ্যোগ হিসেবে উপস্থাপন করছে।

২১ মার্চ ২০২৬ তারিখে ‘bangladeshcharter.org’ ডোমেইনটি নিবন্ধনের ঠিক পরদিনই এর ফেসবুক পেজ খোলা হয়। ডোমেইনটিতে লোকেশন হিসেবে ‘লন্ডন’ উল্লেখ করা হয়েছে।

ওয়েবসাইটের হোম পেইজে ‘কাঙ্ক্ষিত বাংলাদেশের পথে জনতার অঙ্গীকার সনদ’ শিরোনামে আটটি অঙ্গীকার উপস্থাপন করা হয়েছে। এতে গণহত্যার স্মৃতি, বাঙালি জাতীয়তাবাদ, সার্বভৌমত্ব, ধর্মনিরপেক্ষতা, মানবাধিকার, গণতন্ত্র ও সুশাসনের মতো বিষয়গুলো অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।

এর পাশাপাশি একটি অনলাইন ফর্মের মাধ্যমে ‘ডিজিটাল স্বাক্ষর’ সংগ্রহ করা হচ্ছে। প্ল্যাটফর্মটি দাবি করছে, অল্প সময়ের মধ্যে ৫০ হাজারের বেশি ব্যক্তি এতে একাত্মতা প্রকাশ করেছেন। 

‘কেন এই সনদ’ অংশে উদ্যোগটিকে একটি জাতীয় ঐকমত্য গঠনের প্রচেষ্টা হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে।

প্ল্যাটফর্মটির দাবি, এর পেছনে দেশের বরেণ্য আইনজ্ঞ, শিক্ষাবিদ, গবেষক ও শিক্ষার্থীসহ ৬০ জনেরও অধিক ‘অগ্রসেনানী’ যুক্ত রয়েছেন। তবে ‘তাঁদের কর্মকে বড় করে দেখার’ যুক্তিতে নাম বা পরিচয় গোপন রাখার যে অবস্থান তারা নিয়েছে, তা মূলত উদ্যোগটির স্বচ্ছতা, জবাবদিহি এবং স্বাধীন যাচাইযোগ্যতার ক্ষেত্রে বড় ধরনের প্রশ্ন তৈরি করে। 

দ্য ডিসেন্ট যাচাই করে দেখার চেষ্টা করেছে, এই প্রচারণার নেপথ্যে থাকা ব্যক্তিদের আসল পরিচয় এবং তাদের কোনো সুনির্দিষ্ট রাজনৈতিক সম্পৃক্ততা রয়েছে কি না।

সোশ্যাল মিডিয়াতে প্রচারণা: কারা যুক্ত?
২২ মার্চ পেজটি থেকে প্রথম পোস্ট করা হয়। ওই পোস্টটি “যুক্তহোন আমাদের সাথে-” ক্যাপশনে শেয়ার করেন সামি সউদ দীপ নামে একজন ব্যক্তি। 


পরবর্তীতে ২৭ মার্চ “বাংলাদেশ সনদ নিয়ে তারুণ্যের তাৎক্ষণিক ভাবনা। কথা বলছেন সামি সউদ দীপ” শিরোনামে একটি ভিডিও পোস্ট করা হয় বাংলাদেশ সনদ পেজটি থেকে। তার প্রোফাইল বিশ্লেষণে দেখা যায় তিনি বাংলাদেশ ছাত্রলীগের সঙ্গে সরাসরি সম্পৃক্ত। তার প্রোফাইলের তথ্য অনুযায়ী তিনি বাংলাদেশ আওয়ামী নবীনলীগ ময়মনসিংহ জেলা শাখার সভাপতির দায়িত্ব পালন করেছেন।

একই দিনে পেজটি থেকে আরিফ কামাল লালন, আইয়ুব উদ্দিন ইমরান এবং বিদিত দে এর ভিডিও পোস্ট করা হয়। এই ব্যক্তিরাও বর্তমানে কার্যক্রম নিষিদ্ধ থাকা আওয়ামী রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত, যা প্ল্যাটফর্মটির ‘দল-নিরপেক্ষ’ দাবির সম্পূর্ণ বিপরীত।

শুধু ভিডিও কনটেন্ট নয়, পেজটির পোস্ট শেয়ারিং নেটওয়ার্কেও একই ধরনের প্রবণতা লক্ষ্য করা যায়। জাওয়েদ ইকবাল মজুমদার, সুশান্ত দাস গুপ্তসহ একাধিক অ্যাকাউন্ট থেকে এই পেজের পোস্ট শেয়ার করা হয়েছে, যাদের ক্ষেত্রেও আওয়ামী লীগ সম্পৃক্ততার তথ্য পাওয়া যায়। এছাড়াও ‘বাংলাদেশ সনদ’-এর পক্ষে ‘ডিজিটাল স্বাক্ষর’ অভিযান চালানোর প্রচারণা চালানো হচ্ছে আওয়ামী লীগ সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন ফেসবুক পেইজ থেকে।

লাইভ আলোচনা ও সমন্বয়ের ইঙ্গিত
২৬ মার্চ ‘International Crimes Strategy Forum’ পেজের একটি লাইভ শেয়ার করা হয় ‘বাংলাদেশ সনদ পেজটি থেকে। এটি ছিল 'বাংলাদেশ সনদ' আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশের উদ্দেশ্যে আয়োজিত লাইভ অনুষ্ঠান। দেড় ঘন্টার লাইভটি থেকে বাংলাদেশ সনদের নেপথ্যে থাকা ব্যক্তিদের পরিচয়, তাদের রাজনৈতিক উদ্দেশ্য এবং ওয়েবসাইটের প্রচারণাকারীদের সরাসরি সম্পৃক্ততা প্রকাশ্যে আসে। 


‘তরুণ প্রজন্মের প্রতিনিধি’ হিসেবে ছাত্রলীগাররা
‘বাংলাদেশ সনদ’ পেজটিতে সামি সউদ দীপ এবং আরিফ কামাল লালনকে ‘সাধারণ তরুণ বা প্রজন্মের প্রতিনিধি’ হিসেবে সনদ নিয়ে তাদের তাৎক্ষণিক ভাবনা শেয়ার করতে দেখা যায়। কিন্তু এই লাইভ অনুষ্ঠানে দেখা যায়, তারা কোনো সাধারণ মতামত দাতা নন, বরং এই উদ্যোগের আনুষ্ঠানিক বক্তা।

লাইভের ১:৩৪:০৬ মিনিটে সামি সউদ দীপ এবং ১:৩৯:৫৭ মিনিটে আরিফ কামাল লালন বক্তব্য দেন। সামি তার বক্তব্য শেষ করেন, “তার বক্তব্যের শেষে বলেন, "জয় তোদের স্বপ্ন শেখ হাসিনা স্মৃতিতে সর্বদা অপরাজয়” এই বাক্য দিয়ে।

এই ব্যক্তিরা আওয়ামী রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত সেটি আগেই উল্লেখ করা হয়েছে।

ওয়েবসাইট নিয়ন্ত্রণ
লাইভের ২:০১:৪৫ মিনিটে সুশান্ত দাস গুপ্ত সরাসরি স্ক্রিন শেয়ার করে ‘bangladeshcharter.org’ ওয়েবসাইটের কাঠামো এবং ডিজিটাল স্বাক্ষরের প্রক্রিয়া প্রদর্শন করেন।  তিনি নিজেই বলেন, "ওয়েবসাইটটা কিভাবে ফাংশনিং করে আমি একটু স্ক্রিনটা শেয়ার করব যাতে আপনারা দেখতে পারেন... এটা আমাদের বাংলাদেশ সনদের ওয়েবসাইট।" 


উল্লেখ্য, নিকট অতীতে আওয়ামী লীগের অফিসিয়াল পেইজে বিভিন্ন সময়ে সুশান্ত দাস গুপ্তকে ‘যুক্তরাজ্য প্রবাসী আওয়ামী লীগ নেতা’ হিসেবে পরিচয় করিয়ে দেয়া হয়েছে। পাশাপাশি ৫ আগস্টের পর আওয়ামী লীগের প্রোপাগান্ডা উইং হিসেবে কাজ করা এ-টিম এর একজন্য উদ্যেক্তা হলেন সুশান্ত দাশ।

 দল-নিরপেক্ষ’ দাবির বিপরীতে সুস্পষ্ট দলীয় স্লোগান ও অবস্থান
প্ল্যাটফর্মটি নিজেদের ‘দল-মত নির্বিশেষে’ একটি উদ্যোগ বলে দাবি করলেও, প্রায় আড়াই ঘণ্টার এই লাইভ অনুষ্ঠানে সেই দাবির কোনো প্রতিফলন ছিল না। অনুষ্ঠানটির সঞ্চালক থেকে শুরু করে মূল বক্তাদের প্রায় প্রত্যেকেই তাঁদের বক্তব্য শেষ করেছেন রাজনৈতিক স্লোগান "জয় বাংলা, জয় বঙ্গবন্ধু" দিয়ে; ‍যা সাম্প্রতিক বছরগুলোতে আওয়ামী লীগের দলীয় স্লোগান হিসেবেই পরিচিতি পেয়েছে।

‘মেলাঘর’ ও গোপন সাংগঠনিক কার্যক্রম
লাইভে ১৮:৪৭ মিনিটে ‘আইকনাস ক্লাসটাস’ ছদ্মনামের এক বক্তা বলেন, ৫ আগস্টের পর তারা ‘মেলাঘর’ নামে একটি গোপন প্ল্যাটফর্ম গঠন করেন। তিনি বলেন, "সেপ্টেম্বর থেকে সিরিয়াসলি এই একত্র হওয়াটারই একটা নাম দেওয়া হয় মেলাঘর... আমাদের জন্য এই মেলাঘর হয়ে ওঠে চিন্তা সংলাপ আর প্রস্তুতির জায়গা।" 

লাইভের শুরুতে (০১:০৮ মিনিট) সঞ্চালক জাহানারা নূরীও দর্শকদের "বাংলাদেশ সনদ টিম এবং মেলা ঘরের পক্ষ থেকে" স্বাগত জানান। এর মাধ্যমে প্রমাণিত হয় যে, লাইভে অংশগ্রহণকারী নির্দিষ্ট রাজনৈতিক মতাদর্শের ব্যক্তিরাই মূলত মেলাঘরের সদস্য এবং এই সনদের পেছনে কাজ করেছেন।

লাইভে অংশগ্রহণকারী অন্যান্য উল্লেখযোগ্য মুখ
উদ্যোগটিকে দল-নিরপেক্ষ বলা হলেও লাইভে উপস্থিত ব্যক্তিবর্গের রাজনৈতিক পরিচয় ও কার্যক্রম বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, এদের বেশিরভাগই প্রকাশ্যে আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত বা দলটির সক্রিয় অ্যাক্টিভিস্ট। তাদের মধ্যে কয়েকজন হলেন: রায়হান রশিদ, জাহানারা নূরী, রানা মেহের, অভিনেত্রী রোকেয়া প্রাচী, সাংবাদিক সৈয়দ বদরুল আহসান, আওয়ামী লীগের প্রোপাগান্ডা ওয়েবসাইট বিডিডাইজেস্টের এডিটোরিয়াল বোর্ডের সদস্য তন্ময় ইমরোজ আলমসহ আরও অনেকে।  


বিডিডাইজেস্টে “‘বাংলাদেশ সনদ’ উন্মোচিত: ইতিহাস, নাগরিক দায়বোধ ও জাতীয় ঐক্যের নতুন অধ্যায়” শিরোনামে কন্টেন্ট প্রকাশ করেছে।

অর্থাৎ ‘বাংলাদেশ সনদ’ নিজেকে জনতার সনদ হিসেবে উপস্থাপন করলেও এটির প্রচারণার সাথে আওয়ামী লীগের সংশ্লিষ্টতা স্পষ্ট।