বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে ক্ষমতার পালাবদল যতবার ঘটেছে, ততবারই জনমনে একটি মৌলিক প্রশ্ন ঘুরে ফিরে এসেছে- শাসনের ধরন কি বদলাবে, নাকি শুধু মুখ বদলাবে? নবনিযুক্ত প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান-এর দায়িত্ব গ্রহণের প্রারম্ভিক বার্তাগুলো সেই প্রশ্নের কেন্দ্রে ফেলেছে নতুন আলো। তাঁর ব্যক্তিগত ও প্রশাসনিক কিছু প্রতীকী এবং বাস্তব সিদ্ধান্ত ইতোমধ্যে রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে একটি ভিন্ন সুরের ইঙ্গিত দিচ্ছে।
বাংলাদেশের রাজনৈতিক বাস্তবতায় প্রধানমন্ত্রী বা শীর্ষ নেতৃত্বের চলাচল মানেই ছিল দীর্ঘ গাড়িবহর, রাস্তাজুড়ে নিরাপত্তা বলয়, ঘণ্টার পর ঘণ্টা ট্রাফিক স্থবিরতা এবং সাধারণ মানুষের ভোগান্তি। সচরাচর ১৩-১৪টি গাড়ির বহর, জাতীয় পতাকা সংবলিত ভিআইপি গাড়ি, সড়কের দুই পাশে শত শত পুলিশ মোতায়েন- এসব যেন রাষ্ট্র ক্ষমতার দৃশ্যমান প্রতীক হয়ে উঠেছিল। এ সংস্কৃতি কেবল নিরাপত্তার বিষয় ছিল না; এটি ছিল ক্ষমতার এক ধরনের প্রদর্শন। ফলে শাসক ও জনগণের মধ্যে এক অদৃশ্য দূরত্ব তৈরি হয়েছে, যেখানে রাষ্ট্র প্রধানের যাত্রা সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনের ওপর প্রাধান্য পেত।
নতুন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান-এর কয়েকটি সিদ্ধান্ত বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। যেমন-পতাকাবিহীন গাড়ি ব্যবহার (রাষ্ট্রীয় বা কূটনৈতিক অনুষ্ঠানে ব্যতিক্রম), ১৩-১৪ গাড়ির বদলে মাত্র ৪টি গাড়ির বহর, ট্রাফিক সিগন্যালে দাঁড়িয়ে থাকা, সাধারণ যান চলাচল বন্ধ না করা, সরকারি গাড়ি ও জ্বালানি ব্যবহার না করে নিজস্ব গাড়ি, জ্বালানি ও চালক ব্যবহার, সড়কের দুই পাশে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন বন্ধের নির্দেশ, মন্ত্রিসভার বৈঠক সচিবালয়ে আয়োজনের সিদ্ধান্ত, ছুটির দিনেও সচিবালয়ে অফিস করা এবং এমপিদের শুল্কমুক্ত গাড়ি ও সরকারি প্লট সুবিধা গ্রহণ না করার ঘোষণা। এসব পদক্ষেপ দুটি মাত্রায় বিশ্লেষণ করা যায়- প্রতীকী বার্তা (ক্ষমতার সরলীকরণ) এবং কাঠামোগত পরিবর্তন (প্রশাসনিক বাস্তবতা)।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান-এর পতাকাবিহীন গাড়ি ব্যবহার এবং ছোট বহর কেবল প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নয়; এটি এক ধরনের রাজনৈতিক বার্তা। এটি জানান দেয় ক্ষমতা মানে প্রদর্শন নয়, দায়িত্ব। ট্রাফিক সিগন্যালে দাঁড়িয়ে থাকা প্রধানমন্ত্রীর গাড়ি রাষ্ট্রের এক নতুন নৈতিক অবস্থানকে তুলে ধরে- যা বোঝায় আইন সবার জন্য সমান। এই মনোভাব জনগণের মনে আস্থার সঞ্চার করতে পারে। কারণ, দীর্ঘদিন ধরে ভিআইপি সংস্কৃতির কারণে নাগরিকদের মনে এক ধরনের বিচ্ছিন্নতার অনুভূতি জন্মেছে।
মন্ত্রিসভার বৈঠক সচিবালয়ে আয়োজনের সিদ্ধান্ত প্রশাসনিক কার্যকারিতার দিক থেকে গুরুত্বপূর্ণ। অতীতে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে বৈঠক মানে সচিবালয় থেকে মন্ত্রীদের বহর যাতায়াত, সড়ক নিয়ন্ত্রণ এবং বাড়তি নিরাপত্তা বলয়, যা নগরজীবনে চাপ সৃষ্টি করত। সচিবালয়ে বৈঠক আয়োজন সেই চাপ কমাতে সহায়ক হতে পারে। এছাড়া এমপিদের শুল্কমুক্ত গাড়ি ও সরকারি প্লট সুবিধা না নেওয়ার ঘোষণা রাজনৈতিক অর্থনীতির দৃষ্টিকোণ থেকে খুবই তাৎপর্যপূর্ণ। এটি রাজনীতিকে বিশেষ সুবিধাভোগী শ্রেণি থেকে সেবামূলক নেতৃত্বে রূপান্তরের এক প্রচেষ্টা হিসেবে দেখা যেতে পারে।
বাংলাদেশের রাজনীতিতে দীর্ঘদিন ধরে ক্ষমতা-কেন্দ্রিক, ব্যক্তি-নির্ভর এবং নিরাপত্তা-প্রাধান্যশীল শাসন ধারা দেখা গেছে। সেখানে নতুন প্রধানমন্ত্রীর বার্তা এক ধরনের ‘মানবিক প্রশাসন’-এর ইঙ্গিত দেয়। ফলে পুরনো রাজনৈতিক সংস্কৃতি বদলের সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে। তবে এখানে একটি বাস্তব প্রশ্নও রয়েছে- এই পরিবর্তন কতটা স্থায়ী ও প্রাতিষ্ঠানিক হবে? যদি এই পদক্ষেপগুলো কেবল ব্যক্তিগত আচরণে সীমাবদ্ধ থাকে, তবে তা রাজনৈতিক সংস্কৃতিকে বদলাতে পারবে না। কিন্তু যদি এগুলো নীতিমালা ও বিধিমালায় রূপ পায় যেমন- ভিআইপি চলাচল সংক্রান্ত স্থায়ী নীতিমালা, সরকারি সুবিধা সীমিতকরণ আইন, প্রশাসনিক ব্যয় সংকোচন- তাহলে তা দীর্ঘমেয়াদে রাষ্ট্রীয় সংস্কৃতির অংশ হয়ে উঠতে পারে।
এ ধরনের সূচনা সাধারণ মানুষের মধ্যে ইতিবাচক প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করতে পারে। বিশেষ করে তরুণ প্রজন্ম, যারা স্বচ্ছতা, জবাবদিহি ও সমতা প্রত্যাশা করে, তাদের কাছে এটি আশাবাদের বার্তা। রাজনীতিতে ইতিবাচক প্রতীকী পদক্ষেপ বেশ গুরুত্বপূর্ণ। ইতিহাস দেখিয়েছে, ছোট ছোট প্রতীকী পরিবর্তন বড় মানসিক পরিবর্তনের পথ খুলে দেয়। যদি শাসক নিজেকে নাগরিকের কাতারে দাঁড় করান, তবে নাগরিকও রাষ্ট্রের প্রতি আস্থাশীল হয়। নেতৃত্বের প্রতিও একটা বিশ্বাসের জায়গা তৈরি হয়।
তবে বাংলাদেশের মতো ঘনবসতিপূর্ণ, রাজনৈতিকভাবে সংবেদনশীল এবং অতীতে সহিংস ঘটনার অভিজ্ঞতাসম্পন্ন একটি দেশে প্রধানমন্ত্রীর নিরাপত্তা সবসময়ই রাষ্ট্রীয় অগ্রাধিকারের বিষয়। সে প্রেক্ষাপটে বহর কমানো, ট্রাফিক বন্ধ না করা, সড়কের দুই পাশে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন না রাখা- এসব সিদ্ধান্তে কিছু সম্ভাব্য নিরাপত্তা ঝুঁকি থাকতে পারে। তবে ঝুঁকি ও প্রতীকী সরলতার মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করা সম্ভব। যদি এই সরলীকরণের সঙ্গে সমান্তরালে আধুনিক, গোয়েন্দা-নির্ভর ও প্রযুক্তি-সমর্থিত নিরাপত্তা ব্যবস্থা শক্তিশালী করা হয়, তাহলে ঝুঁকি নিয়ন্ত্রণযোগ্য থাকবে।
অতএব, প্রশ্নটি ‘ঝুঁকি আছে কি?’ বা ‘ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা কতটা কার্যকর?’- এই জায়গাতেই মূল চ্যালেঞ্জ। আধুনিক নিরাপত্তা ব্যবস্থায় শুধু দৃশ্যমান পুলিশই ভরসা নয়; বরং গোয়েন্দা নজরদারি, প্রযুক্তিনির্ভর পর্যবেক্ষণ, অদৃশ্য নিরাপত্তা বলয়, রুটের আগাম স্ক্যানিং ও ঝুঁকি বিশ্লেষণ- এসব থাকলে বহর ছোট হলেও নিরাপত্তা বজায় রাখা সম্ভব। অনেক গণতান্ত্রিক দেশে রাষ্ট্রপ্রধান অপেক্ষাকৃত কম প্রদর্শনমূলক নিরাপত্তা নিয়ে চলাচল করেন। কিন্তু তাদের নিরাপত্তা কাঠামো অত্যন্ত পেশাদার ও প্রযুক্তিনির্ভর।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান-এর দায়িত্ব গ্রহণের প্রারম্ভিক বার্তা বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে এক নতুন অধ্যায়ের সম্ভাবনা জাগিয়েছে। এটি ভিআইপি সংস্কৃতি থেকে সেবামূলক নেতৃত্বের দিকে যাত্রার ইঙ্গিত বহন করে। তবে শেষ পর্যন্ত ইতিহাস বিচার করবে এটি কি কেবল একটি ইতিবাচক সূচনা, নাকি সত্যিকারের প্রাতিষ্ঠানিক রূপান্তরের সূচনা? যদি সিদ্ধান্তগুলো ধারাবাহিকতা পায়, প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোয় স্থায়ীভাবে সংযুক্ত হয়, এবং সকল স্তরের নেতৃত্বে একই চর্চা প্রতিষ্ঠিত হয়- তাহলে বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে এটি এক যুগান্তকারী পরিবর্তনের সূচনা হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। কাজেই, বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে নতুন প্রধানমন্ত্রীর এসব পদক্ষেপ রাজনৈতিকভাবে ইতিবাচক ও গণতান্ত্রিক বার্তা বহন করে অবশ্যই।
লেখক : অধ্যাপক, কম্পিউটার সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগ ও রেজিস্ট্রার (ভারপ্রাপ্ত) জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়, ময়মনসিংহ
[email protected]