রমজানের চাঁদ ওঠার আগেই বাংলাদেশের বাজারে উদিত হয় এক অদৃশ্য চাঁদ—তার নাম মূল্যবৃদ্ধি। চাল, ডাল, ভোজ্যতেল, চিনি, খেজুর, ছোলা, পেঁয়াজ, আদা-রসুন থেকে শুরু করে গরু-ছাগলের মাংস—প্রায় সব নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম অস্বাভাবিকভাবে ঊর্ধ্বমুখী হয়। ঈদ পর্যন্ত সেই ঊর্ধ্বগতি বজায় থাকে, এবং ঈদের পর সাময়িক স্বস্তি ফিরলেও প্রশ্ন থেকে যায়—কেন প্রতি বছর এই দৃশ্যপট পুনরাবৃত্তি হয়? কেন আত্মসংযম, সংহতি ও সহমর্মিতার মাস রমজান হয়ে ওঠে অতিমুনাফার মঞ্চ? নতুন বাংলাদেশে এই প্রশ্নের জবাব খুঁজতে দাঁড়িয়েছেন জননেতা তারেক রহমান। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে দুই-তৃতীয়াংশের বেশি আসনে বিজয়ের পর ১৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ নতুন সরকার শপথ গ্রহণ করেছে। এই জয় কেবল রাজনৈতিক সাফল্য নয়; এটি দেশের মানুষের মনে আশার আলোর প্রদীপ জ্বালিয়েছে—জাতীয় ঐক্য, প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার এবং অর্থনৈতিক পুনর্গঠনের অঙ্গীকার নিয়ে। রাজনীতির উচ্চারণের চেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো মানুষের রান্নাঘরের নিরাপত্তা—ভাতের থালায় স্বস্তি ফিরিয়ে আনা। সামনে ১৯/২০ ফেব্রুয়ারি শুরু হচ্ছে পবিত্র রমজান, সম্ভাব্য ঈদুল ফিতর ২১ মার্চ। এই সময়ে তারেক রহমানের নেতৃত্বে নতুন সরকার বাজারে স্বচ্ছতা, ন্যায্যতা ও স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনতে পারলেই এটি হবে এক ঐতিহাসিক সাফল্য—যেখানে ব্যবসা হবে শুধু মুনাফার খেলা নয়, সামাজিক দায়িত্ব ও মানবিকতার প্রতিফলন।
রমজানের দর্শন বনাম বাজারের বাস্তবতা : রমজান আত্মসংযম, দয়া ও ন্যায়ের মাস। ইসলামি শিক্ষায় মজুতদারি ও কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি কঠোরভাবে নিরুৎসাহিত। কিন্তু বাস্তবে দেখা যায়, এই মাসেই অতিরিক্ত মুনাফার প্রবণতা বাড়ে। একদিকে ইফতার মাহফিল, দান-সদকা; অন্যদিকে বাজারে কৃত্রিম মূল্যবৃদ্ধি—এ এক গভীর নৈতিক বৈপরীত্য। একটি ন্যায্য সমাজে ধর্মীয় মূল্যবোধ ও অর্থনৈতিক আচরণ পরস্পরবিরোধী হতে পারে না। রোজাদারের কষ্টকে পুঁজি করে মুনাফা করা শুধু অর্থনৈতিক অন্যায় নয়; এটি সামাজিক চুক্তিরও লঙ্ঘন।
অর্থনীতির চাপ: প্রেক্ষাপট বোঝা জরুরি : নতুন সরকার দায়িত্ব নিচ্ছে এক জটিল অর্থনৈতিক বাস্তবতায়। গত দুই বছরে মূল্যস্ফীতি উচ্চমাত্রায় অবস্থান করেছে; খাদ্য মূল্যস্ফীতি আরও বেশি। নিম্ন ও মধ্যবিত্তের প্রকৃত আয় কমেছে। বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে চাপ, ডলার বাজারে অস্থিরতা, আমদানি ব্যয় বৃদ্ধি—সব মিলিয়ে বাজারে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংক জরুরি পণ্য—শিশুখাদ্য, ওষুধ, জ্বালানি ও শিল্পের কাঁচামাল—অগ্রাধিকার দিলেও অন্যান্য ভোগ্যপণ্যে এলসি খোলা কঠিন হয়ে পড়েছিল ২০২৪-২৫ অর্থবছরে। ফলে অনেক পণ্য বন্দরে এসে খালাসে বিলম্ব হয়েছে; ব্যবসায়ীদের ডেমারেজ গুনতে হয়েছে, যা শেষ পর্যন্ত ভোক্তার ওপর চাপানো হয়েছে। তবে এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন আছে—ডলার সংকট কি একমাত্র কারণ, নাকি এটি বাজার সিন্ডিকেটের জন্য একটি সুযোগ?
রমজান এলেই কেন বাড়ে দাম
বাংলাদেশে রমজান সামনে এলেই নিত্যপণ্যের বাজারে ১৫–৩০ শতাংশ পর্যন্ত মূল্যবৃদ্ধির প্রবণতা দেখা যায়। অথচ আন্তর্জাতিক বাজারে ভোজ্যতেল, গম বা চিনির দাম অনেক সময় স্থিতিশীল থাকে। তাহলে দেশীয় বাজারে এই অস্বাভাবিক উল্লম্ফনের কারণ কী? মূল কারণ তিনটি :
১. তথ্যের অস্বচ্ছতা : আমদানি, মজুত ও সরবরাহের সঠিক তথ্য নিয়মিত প্রকাশ না হওয়ায় বাজারে গুজব দ্রুত ছড়ায়। “ডলার সংকট”, “এলসি জট”, “পণ্য কম আসবে”—এ ধরনের খবর আতঙ্ক তৈরি করে, যা আগাম মূল্যবৃদ্ধির পথ খুলে দেয়। ২. সীমিত প্রতিযোগিতা ও বাজার কেন্দ্রীভূত কাঠামো। বহু পণ্যের আমদানি ও পাইকারি বণ্টন কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের হাতে কেন্দ্রীভূত। সরবরাহ শৃঙ্খল দীর্ঘ এবং মধ্যস্বত্বভোগী বেশি। ফলে একটি স্তরে কৃত্রিম সংকট তৈরি হলে তার প্রভাব দ্রুত পুরো বাজারে ছড়িয়ে পড়ে। এ অবস্থায় বাংলাদেশ প্রতিযোগিতা কমিশন–এর সক্রিয় নজরদারি অত্যন্ত জরুরি। পাশাপাশি জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর–কে আরও তথ্যভিত্তিক ও প্রাতিষ্ঠানিক ভূমিকা নিতে হবে। ৩. মনস্তাত্ত্বিক চাপ ও অতিরিক্ত কেনাকাটা : “পণ্য কমে যাবে” এমন ধারণায় ভোক্তা ও খুচরা বিক্রেতারা প্রয়োজনের চেয়ে বেশি কেনেন। এতে সাময়িক ঘাটতি তৈরি হয়, যা অসাধু ব্যবসায়ীদের সুযোগ দেয়।আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা: শেখার আছে অনেক : রমজান শুধু ধর্মীয় অনুশাসনের মাস নয়; এটি অর্থনৈতিক ন্যায্যতারও একটি পরীক্ষা। বহু মুসলিমপ্রধান দেশে সরকার ও বেসরকারি খাত যৌথভাবে এই সময়টিকে মূল্যস্থিতির মাস হিসেবে বিবেচনা করে। কারণ তারা বোঝে—রমজানে মানুষের ব্যয় স্বাভাবিকভাবেই বাড়ে; তাই বাজারে অতিরিক্ত চাপ সামলাতে সামাজিক দায়িত্বও বাড়ে।
সৌদি আরবে রমজানের অন্তত এক থেকে দুই মাস আগে বাণিজ্য মন্ত্রণালয় বাজার পরিস্থিতি মূল্যায়ন শুরু করে। বড় সুপারমার্কেট চেইনগুলোকে নির্দিষ্ট পণ্যে মূল্যছাড় ঘোষণা করতে উৎসাহ দেওয়া হয়। ভোক্তা সুরক্ষা ইউনিট মাঠপর্যায়ে অভিযান চালায়; মূল্যতালিকা প্রদর্শন বাধ্যতামূলক। সেখানে রমজান-পূর্ব মূল্যবৃদ্ধি প্রমাণিত হলে দ্রুত জরিমানা আরোপ করা হয়। অর্থনীতিবিদদের মতে, আগাম সরবরাহ নিশ্চিত করা এবং খুচরা দামের স্বচ্ছতা—এই দুই উপাদান বাজারকে স্থিতিশীল রাখে।
সংযুক্ত আরব আমিরাতে রমজান উপলক্ষে শতাধিক নিত্যপণ্যে মূল্য-সীমা নির্ধারণ করা হয়। বড় খুচরা বিক্রেতারা সরকার-সমন্বিত “রমজান প্রোমোশন ক্যাম্পেইন”-এ অংশ নেয়। অনেক ক্ষেত্রে পাইকারি পর্যায়ে মুনাফার হার সীমিত করা হয়। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, প্রতিযোগিতামূলক খুচরা বাজার ও শক্তিশালী ভোক্তা অধিকার কাঠামো—এই দুয়ের সমন্বয়েই তারা মূল্যবৃদ্ধি নিয়ন্ত্রণে রাখতে সক্ষম হয়েছে।
তুরস্কে স্থানীয় পৌরসভা ও সমবায় প্রতিষ্ঠানগুলো রমজানে বিশেষ খাদ্যপ্যাকেজ কমদামে সরবরাহ করে। কৃষিপণ্যের সরাসরি বিপণন ব্যবস্থার কারণে মধ্যস্বত্বভোগীর সংখ্যা কম, ফলে মৌসুমি চাহিদা বাড়লেও মূল্যবৃদ্ধি তুলনামূলক সীমিত থাকে। বাজার বিশ্লেষকদের মতে, সরবরাহ শৃঙ্খল ছোট করা ও কৃষকের সঙ্গে খুচরা বাজারের সরাসরি সংযোগ—এটি দীর্ঘমেয়াদি স্থিতির চাবিকাঠি।
কী শেখা যায়? আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা বলছে রমজানকে “ডিসকাউন্ট সিজন” বানানো সম্ভব, যদি সরকার ও ব্যবসায়ী একসঙ্গে কাজ করে। মূল্যতালিকা বাধ্যতামূলক প্রদর্শন ও নিয়মিত মনিটরিং বাজারে শৃঙ্খলা আনে। সরবরাহ শৃঙ্খল সংক্ষিপ্ত করা ও প্রতিযোগিতা বাড়ানো দীর্ঘমেয়াদি সমাধান দেয়। বাংলাদেশেও যদি আগাম পরিকল্পনা, স্বচ্ছ তথ্যপ্রকাশ ও দৃশ্যমান নজরদারি নিশ্চিত করা যায়, তবে রমজান মূল্যবৃদ্ধির প্রতীক না হয়ে হতে পারে সহমর্মিতা ও ন্যায্যতার প্রতীক। রমজান সংযমের মাস। এই মাসে যদি বাজারে নৈতিকতা প্রতিষ্ঠিত হয়, তবে সেটিই হবে একটি উন্নয়নশীল অর্থনীতির পরিপক্বতার
নতুন সরকারের করণীয়: শূন্য সহনশীলতার স্পষ্ট বার্তা
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান–এর নেতৃত্বে গঠিত নতুন সরকারের সামনে রমজান বাজার একটি তাৎক্ষণিক ও রাজনৈতিকভাবে সংবেদনশীল চ্যালেঞ্জ। রমজানে খাদ্যপণ্যের চাহিদা ১৫–২৫ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ে—বিশেষত ভোজ্যতেল, চিনি, ছোলা, খেজুর, ডাল ও মাংসের ক্ষেত্রে। এই সময় বাজারে সামান্য অস্থিরতাও দ্রুত মূল্যবৃদ্ধিতে রূপ নেয়। তাই প্রথম বার্তাই হতে হবে—মজুতদারি, কার্টেল বা কৃত্রিম সংকটের বিরুদ্ধে শূন্য সহনশীলতা।
তাৎক্ষণিক ও দৃশ্যমান পদক্ষেপ : ১. মজুতদারির বিরুদ্ধে দ্রুত শাস্তিমূলক ব্যবস্থা : আইন অনুযায়ী কৃত্রিম সংকট প্রমাণিত হলে শুধু জরিমানা নয়, লাইসেন্স সাময়িক স্থগিত বা বাতিলের বিধান প্রয়োগ করতে হবে। বিশেষজ্ঞদের মতে, কয়েকটি দৃশ্যমান ও দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা বাজারে মনস্তাত্ত্বিক স্থিতি ফিরিয়ে আনে। ২. একচেটিয়া নিয়ন্ত্রণ ভাঙা ও আমদানি উন্মুক্তকরণ : বাংলাদেশে বহু পণ্যের আমদানি ও পাইকারি বণ্টন কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের হাতে কেন্দ্রীভূত। প্রতিযোগিতা বাড়াতে অস্থায়ীভাবে আমদানি শুল্ক সমন্বয়, নতুন আমদানিকারকদের লাইসেন্স দ্রুত অনুমোদন এবং ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের জন্য ব্যাংকিং সহায়তা বাড়ানো প্রয়োজন। এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশ প্রতিযোগিতা কমিশন–এর সক্রিয় ভূমিকা জরুরি। ৩. টিসিবির কার্যক্রম সম্প্রসারণ : ট্রেডিং কর্পোরেশন অব বাংলাদেশ (টিসিবি) রমজানে ন্যায্যমূল্যে পণ্য সরবরাহের একটি কার্যকর হাতিয়ার। বর্তমানে প্রায় এক কোটি নিম্নআয়ের পরিবারকে কার্ডভিত্তিক সহায়তা দেওয়া হয়—এ পরিসর বাড়িয়ে মধ্যবিত্তের ঝুঁকিপূর্ণ অংশকেও অন্তর্ভুক্ত করার প্রস্তাব দিয়েছেন অনেক অর্থনীতিবিদ। সরবরাহের পরিমাণ ও বিতরণ তালিকা নিয়মিত প্রকাশ করলে স্বচ্ছতা বাড়বে। ৪. আমদানি থেকে খুচরা পর্যন্ত ডিজিটাল ট্র্যাকিং
আমদানি এলসি খোলা থেকে শুরু করে বন্দরে খালাস, পাইকারি ও খুচরা পর্যায়—প্রতিটি ধাপ ডিজিটাল ট্র্যাকিংয়ের আওতায় আনলে কৃত্রিম ঘাটতির সুযোগ কমে। বাংলাদেশ ব্যাংক ও বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সমন্বিত ড্যাশবোর্ড চালু করে রিয়েল-টাইম তথ্য প্রকাশ করা যেতে পারে।
৫. স্থায়ী ‘রমজান মার্কেট মনিটরিং সেল’: অস্থায়ী টাস্কফোর্সের পরিবর্তে একটি স্থায়ী সেল গঠন করে বছরে অন্তত তিন মাস আগে প্রস্তুতি নেওয়া দরকার। এতে থাকবে অর্থনীতিবিদ, ভোক্তা অধিকার বিশেষজ্ঞ, সরবরাহ শৃঙ্খল বিশ্লেষক ও প্রশাসনিক কর্মকর্তা।
দীর্ঘমেয়াদি সংস্কার ছাড়া স্থায়ী সমাধান নয় : স্বল্পমেয়াদি অভিযান সাময়িক স্বস্তি দিতে পারে; কিন্তু কাঠামোগত দুর্বলতা অটুট থাকলে সমস্যা ফিরে আসবে।
১. সরবরাহ শৃঙ্খল সংক্ষিপ্ত করা : কৃষক থেকে ভোক্তা পর্যন্ত ৫–৭ স্তরের মধ্যস্বত্বভোগী থাকলে দাম স্বাভাবিকভাবেই বাড়ে। সরাসরি কৃষক বাজার, অনলাইন পাইকারি প্ল্যাটফর্ম ও সমবায়ভিত্তিক বিপণন ব্যবস্থা চালু করলে মূল্যবৃদ্ধির চাপ কমবে। ২. আধুনিক গুদাম ও কোল্ড স্টোরেজ : কৃষিপণ্যের ২০–৩০ শতাংশ পর্যন্ত নষ্ট হয় সংরক্ষণ ঘাটতিতে—এমন তথ্য বিভিন্ন গবেষণায় উঠে এসেছে। সরকারি-বেসরকারি অংশীদারিত্বে আধুনিক সাইলো ও কোল্ড স্টোরেজ বাড়ালে মৌসুমি ঘাটতি কমবে। ৩. কৃষিপণ্যে ন্যায্যমূল্য ও উৎপাদন বৃদ্ধি : কৃষক ন্যায্য দাম না পেলে উৎপাদন কমে যায়, যা পরবর্তীতে বাজারে ঘাটতি তৈরি করে। ন্যূনতম সহায়ক মূল্য (MSP) বা মূল্য-গ্যারান্টি স্কিম চালু করলে উৎপাদন স্থিতিশীল থাকবে। ৪. প্রতিযোগিতা আইন কঠোর প্রয়োগ : কার্টেল প্রমাণে জরিমানার পাশাপাশি বাজার-শেয়ার সীমা নির্ধারণ ও বাধ্যতামূলক তথ্য প্রকাশের বিধান কার্যকর করা প্রয়োজন। এতে সিন্ডিকেটের ঝুঁকি কমবে। ৫. বাজার তথ্য উন্মুক্ত ও ডিজিটালাইজেশন : দৈনিক আমদানি পরিমাণ, মজুত ও পাইকারি মূল্য সরকারি ওয়েব পোর্টালে প্রকাশ করলে গুজবের জায়গা কমবে। তথ্যের স্বচ্ছতা বাজারকে স্থিতিশীল করে—এটি আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতায় প্রমাণিত।
আস্থাই বড় মূলধন : রমজান বাজারে মূল্য স্থিতিশীলতার মূল চাবিকাঠি হলো আস্থা। যদি সরকার সময়মতো পর্যাপ্ত আমদানি নিশ্চিত করে, মজুত পরিস্থিতি প্রকাশ করে এবং দ্রুত শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেয় তাহলে বাজারে আতঙ্ক ছড়ায় না। সরবরাহ শৃঙ্খল বিশ্লেষকদের মতে, বাংলাদেশে সমস্যা শুধু ডলার সংকট নয়; বরং তথ্যের অস্বচ্ছতা ও সীমিত প্রতিযোগিতা। বাজারে যখন প্রকৃত তথ্য অনুপস্থিত থাকে, তখন গুজবই মূল্য নির্ধারণ করে।
স্বচ্ছ তথ্য, স্থিতিশীল বাজার : যখন তথ্য স্বচ্ছ হবে, আমদানি ও মজুত পরিস্থিতি নিয়মিত প্রকাশ পাবে, প্রতিযোগিতা নিশ্চিত হবে—তখন গুজবের জায়গা কমবে। বাজারে স্থিতিশীলতা ফিরবে। নতুন সরকারের জন্য এটি কেবল প্রশাসনিক চ্যালেঞ্জ নয়; এটি নৈতিক ও রাজনৈতিক অঙ্গীকারের প্রশ্ন। রমজান সংযম ও ন্যায়ের মাস। যদি এই সময়েই বাজারে ন্যায্যতা প্রতিষ্ঠা করা যায়, তবে সেটিই হবে একটি কার্যকর ও জনগণমুখী রাষ্ট্র পরিচালনার প্রমাণ।
রাজনৈতিক ও নৈতিক পরীক্ষা : রমজান ও ঈদ কেবল ধর্মীয় উৎসব নয়; এটি সামাজিক ন্যায়বিচারেরও পরীক্ষা। নতুন সরকারের জনপ্রিয়তা ও বিশ্বাসযোগ্যতার প্রথম মাপকাঠি হবে—এই রমজানে মানুষ কতটা স্বস্তিতে বাজার করতে পারে। যদি সরকার সফলভাবে বাজার সিন্ডিকেট ভেঙে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে পারে, তবে তা হবে সত্যিকারের ইতিহাস রচনা। আর যদি ব্যর্থ হয়, তবে তা জনআস্থায় চিড় ধরাতে পারে।
পরিশেষে: ন্যায্য বাজার, ন্যায্য রাষ্ট্রের ভিত্তি : একটি রাষ্ট্রের প্রকৃত শক্তি কেবল ব্যালটের বাক্সে সীমাবদ্ধ নয়; তা প্রতিফলিত হয় মানুষের ভাতের থালায়। নির্বাচন যতই স্বচ্ছ হোক, যদি নিত্যপণ্যের দাম নাগালের বাইরে চলে যায়, যদি বাজার অস্থির হয়, তবে সেই রাষ্ট্রের ন্যায়বোধ অসম্পূর্ণ থেকে যায়। কারণ ন্যায্য রাষ্ট্র মানে এমন এক ব্যবস্থা, যেখানে আইন যেমন সমান, বাজারও তেমনি সুষম।
রমজান সংযম, সহমর্মিতা ও আত্মশুদ্ধির মাস। এই মাসে যদি কৃত্রিম সংকট, মজুতদারি ও অতিমুনাফার সংস্কৃতি ভেঙে দেওয়া যায়, তবে সেটিই হবে নতুন অর্থনৈতিক নৈতিকতার সূচনা। তখন রমজান আর আতঙ্কের নয়; হবে আস্থা ও স্বস্তির প্রতীক। সম্মিলিত প্রত্যাশা—আমিসহ ১৮ কোটি মানুষ বিশ্বাস করি, জননেতা প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বে এই রমজান হতে পারে ইতিহাসের রমজান। আমরা আশা করি, এই পবিত্র মাসে তিনি এমন এক বাজার নিশ্চিত করবেন, যেখানে দাম বাড়ার গুজব নয়, ন্যায্যতার বার্তা ছড়িয়ে পড়বে; যেখানে ব্যবসা মানে শুধু মুনাফা নয়, সামাজিক দায়িত্বও। রমজানকে মুনাফার মৌসুম নয়, সংযম ও সহমর্মিতার মাস হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা গেলে, সেটিই হবে নতুন বাংলাদেশের প্রকৃত যাত্রার সূচনা। কারণ শেষ পর্যন্ত রাষ্ট্রের বড় পরীক্ষা সংসদে নয়—মানুষের রান্নাঘরেই। সেখানেই নির্ধারিত হয় সরকারের সাফল্য, সেখানেই লেখা হয় আস্থার ইতিহাস। রমজান কেবল আত্মসংযম ও সহমর্মিতার মাস নয়; এটি নতুন বাংলাদেশের মানবমুখী, ন্যায্য ও প্রগতিশীল রাষ্ট্রের পরীক্ষার মঞ্চ। এই পরীক্ষায় সফল হতে পারলেই জননেতা তারেক রহমানের নেতৃত্ব সত্যিই ইতিহাসে লেখা হবে—মানুষের রান্নাঘর থেকে শুরু করে দেশের প্রতিটি বাজারে।
লেখক পরিচিতি: জুবাইয়া বিন্তে কবির/ অর্থনীতিবিদ, গবেষক, সাংবাদিক ও কলামিস্ট