ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে ভোটের রাজনীতি সরগরম হয়ে উঠছে। নির্বাচন সামনে রেখে কয়েকটি জরিপ প্রকাশের পর ভোটের হিসাব নিয়ে আলোচনা যখন তুঙ্গে, তখন জোট গঠন নিয়ে চলছে নানা নাটকীয়তা। বাংলাদেশে নির্বাচনের আগে রাজনৈতিক দলগুলোর জোট গঠনে দ্বন্দ্ব চরম আকার ধারণ করে। আসন নিয়ে মান-অভিমান এবং জোট থেকে বেরিয়ে যাওয়ার খবর নির্বাচনের আগে এক নতুন উত্তেজনার জন্ম দেয়। অতীতে নির্বাচনি জোট গঠনে কখনো নায়ক ও খলনায়কের ভূমিকায় ছিলেন জাতীয় পার্টি ও হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ। ১৯৯৯ সালে বিএনপির নেতৃত্বাধীন চারদলীয় জোট গঠনের সময় তিনি ছিলেন অন্যতম শীর্ষ নেতা। কিন্তু ২০০১ সালের নির্বাচনের আগে আগে তিনি যোগ দিয়েছিলেন আওয়ামী জোটে।
২০০৭ সালে ওয়ান-ইলেভেনের আগে এরশাদকে ঘিরে নানা নাটকীয়তা ঘটেছিল। নির্বাচনের তারিখ ঘোষণা করা হয়েছিল ২২ জানুয়ারি। এর আগে দরকষাকষিতে নামেন এরশাদ। তিনি বিএনপি-জামায়াতের নেতৃত্বাধীন জোটে থাকবেন, না আওয়ামী লীগের সঙ্গে থাকবেন, তা নিয়ে একেক দিন একেক রকম বক্তব্য দিয়ে অস্থির পরিস্থিতি সৃষ্টি করেছিলেন। শেষ পর্যন্ত লগি-বৈঠার তাণ্ডবের মধ্য দিয়ে সেনানিয়ন্ত্রিত সরকার গঠন করা হয়। ২০১৮ সালের নির্বাচনে এরশাদ আওয়ামী জোটে যোগ দেন।
২০১৪ সালের নির্বাচনের আগেও তিনি নির্বাচনে যোগ না দেওয়ার নাটক করেছিলেন। উদ্দেশ্য হলো আওয়ামী লীগের সঙ্গে দরকষাকষি করে মন্ত্রী ও বিরোধী দল উভয় পদ নেওয়া। কোরবানির গরুর মতো তিনি ও তার দলকে নিলামে উঠাতেন, যদিও তিনি বহু আগেই দিল্লির কাছে বিক্রি হয়েছিলেন। ফলে নানা নাটকীয়তা শেষে তিনি আওয়ামী লীগের গোয়ালে যোগ দিতেন।
এবারের নির্বাচনের আগে জোট নিয়ে নাটকীয় ও অভাবনীয় ঘটনা ঘটেছে। চরমোনাইয়ের পীরের দল ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের আমির ইসলামপন্থিদের ভোট এক বাক্সে আনার ফরমুলা দিয়েছিলেন। তাতে অন্য কয়েকটি ইসলামপন্থি দলের সঙ্গে জামায়াত যোগ দেয়। গঠিত হয় আটদলীয় জোট। জামায়াতের আমির সফর করেন চরমোনাইয়ের দরবারে। বৃহৎ ইসলামপন্থি দল হিসেবে জামায়াত হয়ে ওঠে এই জোটের প্রধান দল। জোটে পরে যোগ দেয় আরো তিনটি দল। জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি), কর্নেল (অব.) অলি আহমেদের লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টি (এলডিপি) ও আমার বাংলাদেশ পার্টি বা এবি পার্টি যোগ দেওয়ার পর ইসলামী আন্দোলনে অস্বস্তি শুরু হয়। এনসিপির জোটে যোগদানকে স্বাভাবিকভাবে নিতে পারেনি ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ।
এনসিপি জোটে যোগ দেওয়ার পর থেকে নতুন কৌশল গ্রহণ করে ইসলামী আন্দোলন। দলটি দাবি করে, ১৪৩টি আসনে তাদের বিজয়ী হওয়ার মতো সমর্থন আছে। এর মধ্যে এনসিপির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলামের আসনটিও ছিল। এছাড়া সাতক্ষীরাসহ জামায়াত-প্রভাবিত এলাকায় আসন দাবি করে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ। জামায়াতের বেশ কয়েকজন কেন্দ্রীয় নেতার আসন দাবি করে দলটি। আসন বণ্টনের শেষ পর্যায়ে এসে এ ধরনের দাবির মধ্য দিয়ে চরমোনাইয়ের পীরের বার্তাটি স্পষ্ট হয়ে যায়। শেষ পর্যায়ে এসে ইসলামী আন্দোলনের পক্ষ থেকে জানানো হয়, তাদের কমপক্ষে ৮০ আসন দিতে হবে।
আসন নিয়ে ইসলামী আন্দোলন শুরু থেকে জামায়াতের ওপর চাপ সৃষ্টি করতে থাকে। প্রথমে দলটির জন্য ৪০ আসন ছাড়া হয়, পরে ৪৫টিতে গিয়ে দাঁড়ায়। এর সঙ্গে ছয় থেকে সাতটি আসন উন্মুক্ত রাখার প্রস্তাব দেওয়া হয়; কিন্তু ইসলামী আন্দোলন ৮০ আসনের জন্য ছিল অনড়। জোটে অন্য শরিকরা চরমোনাইয়ের পীরকে বোঝানোর চেষ্টা করেও ব্যর্থ হন। অপরদিকে ৮০ আসন ছাড়ার কোনো সুযোগ ছিল না জামায়াতের। কারণ এতে সম্ভাবনাময় আসনগুলো শুধু হাতছাড়া হবে না, একটি দলকে বিপুলসংখ্যক আসন ছাড়লে অন্য দলগুলোর পক্ষ থেকে আরো বেশি আসন দাবি করা হতো। এছাড়া সাম্প্রতিক জরিপগুলোয় ইসলামী আন্দোলনের ভোট এসেছে তিন থেকে চার শতাংশ। অপরদিকে এনসিপির এসেছে ছয় থেকে সাত শতাংশ। ফলে তিন শতাংশ ভোট নিয়ে এত বেশিসংখ্যক আসন ছাড় দেওয়ার ব্যাপারে অন্য ইসলামপন্থি দলগুলোর পক্ষ থেকে আপত্তি আসে। জামায়াতের টার্গেট ছিল ২০০ আসনে নির্বাচন করা, কিন্তু তা শেষ পর্যন্ত দাঁড়ায় ১৯০টিতে। এখন জোট থেকে বের হয়ে যাওয়ায় ইসলামী আন্দোলনকে ২৬৬ আসনে আলাদা নির্বাচন করতে হবে। বিএনপির পক্ষেও দলটির সঙ্গে এখন সমঝোতার কোনো সুযোগ নেই। ইসলামী আন্দোলনের তিন থেকে চার শতাংশের কাছাকাছি ভোট আছে বলে মনে করা হলেও অতীতে কখনো দলটি থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়নি। বরং সবচেয়ে বেশিসংখ্যক প্রার্থীর জামানত হারানোর রেকর্ড আছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করেন, জামায়াতের নেতৃত্বাধীন জোটে এনসিপির যোগ দেওয়ার মধ্য দিয়ে রাজনীতিতে নতুন মেরূকরণ শুরু হয়। এনসিপির এই সিদ্ধান্ত অভ্যুত্থান-পরবর্তী রাজনীতির গতিপথ বদলে দেয়। অভ্যুত্থানের প্রধান মুখ হয়ে উঠে এই জোট। অন্যদিকে ইসলামপন্থি দলগুলোর জোট হওয়া কোনো অস্বাভাবিক বিষয় ছিল না। এ নিয়ে অতীতে চেষ্টা হয়েছে। ইসলামপন্থি দলগুলোর সংকীর্ণতা, ধর্মীয় নানা ইস্যুতে বিভাজন, পদ-পদবি ও অর্থের লোভের কারণে এ ধরনের জোট গঠনের উদ্যোগ সফল হয়নি। এবারও এর ব্যতিক্রম হলো না।
অভ্যুত্থান-পরবর্তী নির্বাচনকেন্দ্রিক রাজনীতিতে ধারণা করা হয়েছিল, ইসলামপন্থি জোটের বিপরীতে জাতীয়তাবাদী ধারার বড় আকারের জোট গঠিত হবে। এনসিপি সেই জোটের সঙ্গে সম্পৃক্ত হবে। বিএনপির পক্ষ থেকে প্রথম দিকে এনসিপির সঙ্গে জোটবদ্ধ নির্বাচনের ব্যাপারে আগ্রহ দেখানো হয়েছিল। এনসিপির ভেতরেও বিএনপির সঙ্গে জোটবদ্ধ হওয়ার ব্যাপারে আগ্রহ ছিল। কিন্তু যখন নির্বাচনি জোট গঠন নিয়ে আলোচনা শুরু হয়, তখন বিস্ময়করভাবে এনসিপিকে জোটে নেওয়ার ব্যাপারে বিএনপি তেমন আগ্রহ দেখায়নি। বিএনপির এই অনাগ্রহের পেছনে নানা মহলের ভূমিকা ছিল। শেষ পর্যন্ত এনসিপি জামায়াতের সঙ্গে জোটবদ্ধ হয়। রাজনৈতিক দল হিসেবে এনসিপি যাতে শক্তিশালী হয়ে উঠতে না পারে, সেজন্য দেশি-বিদেশি একটি মহল শুরু থেকেই তৎপর ছিল।
বিশ্লেষকরা মনে করেন, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে দেশের ভোটারদের মধ্যে যে নতুন মেরূকরণ ঘটছে, তার চিত্র ফুটে উঠছে সাম্প্রতিক জরিপগুলোয়। বিপুল পরিমাণ সুইং ভোটার এবার নির্বাচনের ফলাফল বদলে দিতে পারে। নির্বাচনে কোন দল কত আসন পাবে, তার প্রকৃত চিত্র পাওয়া কঠিন হলেও দুই জোটের মধ্যে ভোটের ব্যবধান যে কম হবে, তা নিশ্চিত করে বলা যায়। একই সঙ্গে তরুণ ও নারী ভোটারদের মনোভাবে বড় ধরনের পরিবর্তন আসার ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে।
অভ্যুত্থান-পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন জরিপে ভোটারদের মনোজগতের পরিবর্তন সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যায়। এ পর্যন্ত বড় আকারে যেসব জরিপ পরিচালিত হয়েছে, তাতে দেখা যাচ্ছে, আগামী নির্বাচন হবে তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ। নির্বাচনে পতিত আওয়ামী লীগ ও জাতীয় পার্টি অপ্রাসঙ্গিক হয়ে পড়েছে। সেখানে এনসিপি সাত শতাংশের মতো ভোটারের সমর্থন পাচ্ছে।
ওয়াশিংটনভিত্তিক থিংকট্যাংক ইন্টারন্যাশনাল রিপাবলিকান ইনস্টিটিউট বা আইআরআই বড় আকারের একটি জরিপের ফল প্রকাশ করে গত বছরের ডিসেম্বরে। সেখানে প্রশ্ন করা হয়েছিল, যদি আগামী সপ্তাহে জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়, তাহলে কোন রাজনৈতিক দলকে ভোট দেবেন? জবাবে ৩০ শতাংশ মানুষ বিএনপির কথা বলেছেন।
জামায়াতকে ভোট দিতে চান ২৬ শতাংশ। এর পরই রয়েছে এনসিপি ছয় শতাংশ, জাতীয় পার্টি পাঁচ শতাংশ ও ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ চার শতাংশ। জরিপে অংশ নেওয়া সাত শতাংশ মানুষ বলেছেন, কাকে ভোট দেবেন, সে বিষয়ে তারা এখনো নিশ্চিত নন। আর ১১ শতাংশ বলেছেন, তারা রাজনৈতিক দলগুলোকে ভোট দেবেন না।
অনেক বিশ্লেষক মনে করেন, বাংলাদেশের মানুষের রাজনৈতিক দলের প্রতি জনসমর্থন স্থির থাকে না। নির্বাচনের আগে প্রার্থী দেখে জনগণের চাওয়া-পাওয়ার ভিত্তিতে এবং স্থানীয় সমস্যাকে কেন্দ্র করে মনোভাবের পরিবর্তন হয়। কিন্তু এসব জরিপে একটি বিষয় স্পষ্ট, দেশের মানুষের রাজনৈতিক আকাঙ্ক্ষায় পরিবর্তন এসেছে। তারা রাজনীতিতে পরিবর্তন চায়। এছাড়া ইসলামপন্থি রাজনৈতিক দলকে আওয়ামী শাসনামলে যেভাবে মূলধারা থেকে বিচ্ছিন্ন করার চেষ্টা করা হয়েছিল, তা সফল হয়নি। বাংলাদেশের মানুষের কাছে এখন ভোট দেওয়ার ক্ষেত্রে দুর্নীতি ও প্রার্থীর সততা গুরুত্বপূর্ণ ফ্যাক্টর।
আগামী নির্বাচনে তরুণ ভোটাররা প্রধান নিয়ামক শক্তি হিসেবে কাজ করবে। তরুণ ভোটার থাকবে প্রায় চার কোটি। এ পর্যন্ত চালানো সব জরিপে দেখা গেছে, তরুণ ভোটাররা জামায়াতে ইসলামী ও এনসিপিকে ভোট দিতে আগ্রহী। বিএনপির প্রতি তাদের জনসমর্থন কম। অবশ্য এ চিত্রের ফলাফল পাওয়া গেছে দেশের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর ছাত্র সংসদ নির্বাচনে এর প্রতিফলন ঘটেছে। প্রায় ৯০ হাজার ছাত্র-ছাত্রী এসব নির্বাচনে অংশ নিয়েছে।
বিভিন্ন সময়ে করা জরিপগুলোর মতামত থেকে একটি বিষয় উঠে এসেছে, গণঅভ্যুত্থানের আকাঙ্ক্ষা সাধারণ মানুষের মধ্যে এখন প্রবলভাবে কাজ করছে। ভোটাররা মূলত প্রধান দুই ভাগে বিভক্ত হয়েছে—একটি অংশ চায় বহু মানুষের রক্তের বিনিময়ে এই অভ্যুত্থানের পর দেশে পরিবর্তন আসুক; আবার কিছু মানুষ চায় দেশে দ্রুত স্থিতিশীলতা দরকার। বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামীকে ভোট দেওয়ার ক্ষেত্রে এই দুটো ফ্যাক্টর বড় ধরনের ভূমিকা রাখবে বলে মনে করা হয়।
সাম্প্রতিক জরিপে ভোটাররা কোন দলকে কেন পছন্দ করেন, তার কিছু চিত্র পাওয়া গেছে। দলের সমর্থনের ভিত্তি হিসেবে বিএনপির ক্ষেত্রে অভিজ্ঞতা ও রাষ্ট্র পরিচালনার সক্ষমতা গুরুত্ব পাচ্ছে। অন্যদিকে জামায়াতের ক্ষেত্রে ভোটাররা সততা ও পরিবর্তনের রাজনীতিতে আকৃষ্ট হচ্ছেন। তবে একটি বিষয় মনে রাখতে হবে, বেশি ভোট পেলে বেশি আসন পাওয়া যাবে এমন নয়। অতীতে আওয়ামী লীগ ও বিএনপির ভোট প্রায় সমান থাকলেও আসনপ্রাপ্তিতে বিরাট পার্থক্য ছিল; কিন্তু বিভিন্ন জরিপ থেকে একটি বিষয় স্পষ্ট—মানুষ প্রধান দুই দল বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামীর প্রতি প্রায় কাছাকাছি সমর্থন দিচ্ছে।
আলফাজ আনাম
লেখক: সহযোগী সম্পাদক, আমার দেশ