ইতিহাসের প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ বাঁকে কিছু মানুষ জন্ম নেন, যারা নিজেদের ব্যক্তিগত জীবনকে সীমাবদ্ধ এক অস্তিত্ব হিসেবে দেখেন না। বরং তারা নিজেদের দেখেন একটি নৈতিক দায়িত্বের অংশ হিসেবে; নিজেকে দেখেন সমাজ, ধর্ম, ন্যায় ও সত্যের ধারক-বাহক হিসেবে। শহীদ শরীফ ওসমান হাদি তাদেরই একজন। তার জীবন, সংগ্রাম ও শাহাদাত কেবল রাজনৈতিক বা সামাজিক প্রেক্ষাপটের গল্প নয়; এটি একই সঙ্গে ইসলামি সংস্কৃতির নৈতিক সৌন্দর্য, ত্যাগের আদর্শ ও ঈমানি পরিচয়ের এক জীবন্ত ব্যাখ্যা।
ইসলামি সংস্কৃতি যখন কেবল সংগীত, সাহিত্য বা আচার-অনুষ্ঠানের পরিসরে সীমাবদ্ধ করে ব্যাখ্যা করা হয়, তখন তার প্রকৃত সত্তা ধরা পড়ে না। কারণ ইসলামি সংস্কৃতির কেন্দ্রে আছে তাওহিদের চেতনা, নৈতিকতা, ন্যায়ের জন্য সংগ্রাম, অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ এবং মানবিক মর্যাদার সুরক্ষা। শরীফ ওসমান হাদির জীবন ও শাহাদাত ঠিক সেই মৌলিক মূল্যবোধগুলোকেই স্মরণ করিয়ে দেয়—দেখিয়ে দেয়, ঈমান যখন হৃদয়ে জীবন্ত হয়ে ওঠে, তখন তা কেবল বিশ্বাস হিসেবেই থাকে না; বরং রূপ নেয় দায়িত্ব, সাহস ও কর্মের শক্তিতে।
ইসলামি সংস্কৃতি বলতে আমরা যদি কেবল ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান বুঝি, তবে তা হবে অসম্পূর্ণ একটি জ্ঞানের বোঝাপড়া। ইসলামি সংস্কৃতি মূলত একটি সমগ্র জীবনব্যবস্থা, যেখানে চিন্তা, নৈতিকতা, শিল্প, সমাজ, রাজনীতি, অর্থনীতি, ভাষা, সাহিত্য সবই আল্লাহ তথা তাকওয়াকেন্দ্রিক দৃষ্টিভঙ্গির আলোকে পরিমিত, সুষম ও ন্যায়ভিত্তিক হবে। কোরআন বারবার মানুষকে স্মরণ করিয়ে দেয়—‘তোমরা ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করো এবং আল্লাহর উদ্দেশে সাক্ষ্য দাও, যদিও তা তোমাদের নিজেদের বা আপনজনদের বিরুদ্ধে হয়।’ (সুরা নিসা: ১৩৫)
ইসলামি সংস্কৃতির মেরুদণ্ড এই ন্যায়বোধ। আর এটাই মানুষকে অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়াতে শেখায়। শরীফ ওসমান হাদির সংগ্রামও ছিল সেই ন্যায় ও সত্যের পক্ষে, অন্যায়ের বিরুদ্ধে; একদম ইস্পাতকঠিন প্রাচীরের মতো।
শহীদ শরীফ ওসমান হাদির জীবনকাল খুবই সংক্ষিপ্ত। তবে তার ব্যক্তিজীবনের দিকে তাকালে আমরা পাই এক মানবিক ও প্রজ্ঞাবান সত্তা। তিনি ইসলামি শিক্ষায় অনুপ্রাণিত ছিলেন; জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রেই নৈতিকতা, শালীনতা ও দায়িত্ববোধকে অগ্রাধিকার দিয়েছেন। তার কাছে ইসলাম কেবল ব্যক্তিগত একটি ধর্মপালনের মাধ্যম ছিল না; বরং শরীফ ওসমান হাদি ইসলামকে সামাজিক ন্যায় প্রতিষ্ঠার শক্তিমান দর্শন মনে করতেন।
সমাজ যখন অন্যায়, বৈষম্য ও কর্তৃত্ববাদী সংস্কৃতির চাপে অসহায় হয়ে পড়ে, তখন কিছু মানুষ নীরবে মানিয়ে নেয়, আর কিছু মানুষ আত্মসমর্পণ না করে সামনে এগিয়ে আসে। হাদি ছিলেন দ্বিতীয় ধারার মানুষ, যারা আত্মসমর্পণের বদলে প্রতিরোধকে বেছে নেন।
ইসলামি সংস্কৃতিতে একজন মুমিন কেবল নিজের জন্য বাঁচেন না; বরং তিনি বাঁচেন সত্যকে টিকিয়ে রাখার ও মানুষের মর্যাদা রক্ষার জন্য। শহীদ হাদির পথচলা ছিল সেই নৈতিক সাহসেরই বহিঃপ্রকাশ।
শাহাদাত ইসলামি ঐতিহ্যে কেবল একটি মৃত্যুর ঘটনা নয়; এটি সত্য, ন্যায় ও আল্লাহর সন্তুষ্টির পথে জীবন উৎসর্গের নাম। রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি আল্লাহর পথের জন্য নিজের প্রাণ উৎসর্গ করে, সে শহীদ।’ এখানে ‘আল্লাহর পথ’ বলতে ন্যায়, নৈতিকতা, মানবিকতা ও সামাজিক ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার সংগ্রামকেই বোঝায়। শরীফ ওসমান হাদি সেই ঐতিহাসিক ধারাবাহিকতারই এক উত্তরাধিকারী। তার শাহাদাত আমাদের মনে করিয়ে দেয়, ন্যায়বিচারের জন্য লড়াই কখনো নিছক রাজনৈতিক ঘটনা নয়; বরং এটি আধ্যাত্মিক ও নৈতিক দায়বদ্ধতার অংশ। ইসলামি সংস্কৃতিতে একজন শহীদ বেঁচে থাকেন মানুষের স্মৃতি, অনুপ্রেরণা ও ইতিহাসে। শাহাদাত এক অর্থে ইসলামি সংস্কৃতির পুনর্জাগরণ ঘটায়; মানুষের বিবেক জাগ্রত করে; অন্যায়ের বিরুদ্ধে সামাজিক প্রতিরোধ গড়ে তোলে। শরীফ ওসমান হাদির শাহাদাতের মধ্যে দিয়ে আমরা বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটটা এমনই লক্ষ করছি। তার জানাজায় মানুষের ব্যাপক উপস্থিতি, সাধারণ মানুষের ভালোবাসা, আবেগাপ্লুত বিদায়—সবই একটি ইনসাফভিত্তিক রাষ্ট্র ও সমাজ কায়েমের সম্মিলিত প্রতিজ্ঞার বহিঃপ্রকাশ।
বর্তমান পৃথিবীতে ইসলামি সংস্কৃতির বড় চ্যালেঞ্জ হচ্ছে মানসিক ও সাংস্কৃতিক উপনিবেশবাদ। গণমাধ্যম, বৈশ্বিক অর্থনীতি ও ভোক্তাবাদী মূল্যবোধ মানুষের চিন্তা-চেতনাকে এমনভাবে প্রভাবিত করছে, যেন ইসলামি নৈতিকতা ও ত্যাগের সংস্কৃতি ধীরে ধীরে প্রান্তিক হয়ে পড়ে। শরীফ ওসমান হাদির জীবন আমাদের এটাই শেখায় যে, আত্মপরিচয়হীনতা কোনো সমাজকে এগিয়ে নিতে পারে না। ঈমানভিত্তিক সংস্কৃতি মানুষকে স্বাধীন, মর্যাদাবান ও সংগ্রামী করে। সংস্কৃতি তখনই শক্তিশালী হয়, যখন তা নৈতিকতা ও সত্যের সঙ্গে সংযুক্ত থাকে। সুতরাং ইসলামি সংস্কৃতি কোনো বিচ্ছিন্ন ঐতিহ্য নয়; এটি আমাদের ভাষা, ইতিহাস, শিল্প, সাহিত্য এবং সংগ্রাম—সবকিছুর সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে যুক্ত, যা মুসলমানদের সোনালি ঐতিহ্যের অনিবার্য অংশ।
শরীফ ওসমান হাদির মতো মানুষদের আমাদের যুগ যুগ বাঁচিয়ে রাখতে হবে, তার চিন্তা-চেতনাকে মন-মগজে লালন এবং তা বাস্তবে রূপ দেওয়ার চেষ্টা করতে হবে। এই মানুষদের স্মৃতি কেবল ইতিহাসের পাতায় সংরক্ষণ করার বিষয় নয়; বরং তাদের জীবনবোধকে সংস্কৃতি, সাহিত্য, চিন্তা ও সামাজিক চর্চার অংশে রূপান্তর করা জরুরি। আমরা যদি শহীদের কথা শুধু স্মরণেই সীমাবদ্ধ রাখি, তবে তা হবে অপূর্ণ সম্মান। প্রকৃত সম্মান হলো নৈতিক সাহসের সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠা করা; সত্য ও ন্যায়ের পক্ষের অবস্থানকে সামাজিক রাষ্ট্রীয় কালচারে পরিণত করা। এমনকি ৯০ শতাংশ মুসলিম অধ্যুষিত বাংলাদেশ হিসেবে এই রাষ্ট্রের উচিত ইসলামি মূল্যবোধকে একটি জীবন্ত সংস্কৃতিতে রূপ দেওয়া।
শেষকথা
শহীদ শরীফ ওসমান হাদি আমাদের সামনে একটি প্রশ্ন রেখে গেছেন—‘আমরা কি ইসলামি সংস্কৃতিকে কেবল ইতিহাসের পাঠ্যবই হিসেবে রেখে দেব, নাকি একে জীবন্ত নৈতিক শক্তি হিসেবে সমাজে প্রতিষ্ঠা করব?’ তার শাহাদাত আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয়, সত্য কখনো একা হয় না; ন্যায়ের জন্য জীবন উৎসর্গ করা মানুষরাই ইতিহাস লেখেন। ইসলামি সংস্কৃতি কেবল পরিচয়ের নাম নয়; এটি দায়িত্ব, ত্যাগ ও মানবমর্যাদার পথ। শরীফ ওসমান হাদি সেই পথের পথিক, যার রক্ত আমাদের সাংস্কৃতিক চেতনায় আলো জ্বালাবে কাল থেকে কালান্তরে, যে আলো আমাদের মনে করিয়ে দেবে—‘ন্যায় প্রতিষ্ঠার সংগ্রামই ইসলামি সংস্কৃতির প্রকৃত প্রাণ।’
জাকারিয়া আল হোসাইন
লেখক : কবি, গীতিকার ও কলামিস্ট