গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে বাংলাদেশ। অরাজকতা, সহিংসতা ও অস্থিরতা পেরিয়ে দেশ এখন নির্বাচনমুখী। চলতি বছরের ১২ ফেব্রুয়ারি জাতীয় নির্বাচন ও গণভোট আর খুব বেশি দূরে নয়। জনমনে শঙ্কা বা প্রশ্ন থাকলেও নির্বাচন ঘিরে মানুষের প্রত্যাশাও কম নয়।
ধ্বংস হয়ে যাওয়া নির্বাচনী ব্যবস্থার প্রতি জনগণের আস্থা অর্জন একটি বড় চ্যালেঞ্জ। গ্রহণযোগ্য নির্বাচন ব্যবস্থা কার্যকর করাও সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ।
বিভাজন, সন্দেহ-অবিশ্বাসের সব অধ্যায় মুছে অর্থবহ একটি জাতীয় নির্বাচনই পারে গণতন্ত্রের মৌলিক সত্যটিকে পুনঃপ্রতিষ্ঠিত করতে।
সাধারণ মানুষের এই বিশ্বাসকে ধারণ করেই একটি অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন অনুষ্ঠানে সর্বোচ্চ আন্তরিকতার পরিচয় দিচ্ছে অন্তর্বর্তী সরকার।
স্বাধীন ভোটাধিকার প্রয়োগ নিশ্চিতের মাধ্যমে জনগণের আস্থা-বিশ্বাস পুনরুজ্জীবিত করতে চায় এএমএম নাসির উদ্দীনের নেতৃত্বাধীন নির্বাচন কমিশন (ইসি)।
স্বচ্ছ, গ্রহণযোগ্য ও নিরপেক্ষ নির্বাচন উপহারে শুরু থেকেই অন্তর্বর্তী সরকার দেশপ্রেমী সশস্ত্র বাহিনীকে নির্বাচনের মাঠে সক্রিয় রাখার পথ সুগম করে। সব দল ও সাধারণ মানুষের আকাঙ্ক্ষাও ছিল তেমনই। প্রত্যেকেই জানে জয়-পরাজয় যা-ই হোক শান্তিপূর্ণ নির্বাচন আয়োজনে সশস্ত্র বাহিনীর ভূমিকা মুখ্য।
বিগত তিনটি সংসদ নির্বাচনে আইনি কূটকৌশলে বাংলাদেশ সশস্ত্র বাহিনীকে ‘ক্ষমতাহীন’ করে দিয়েছিল ক্ষমতাচ্যুত শেখ হাসিনা সরকার।
ড. ইউনূস সরকার জানে আরপিও সংশোধনের মাধ্যমে আইন প্রয়োগকারী সংস্থার সংজ্ঞায় সশস্ত্র বাহিনীকে অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। তবেই পুরনো আশঙ্কাগুলো আর মাথা তুলতে পারবে না।
কালবিলম্ব না করে ‘গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ (আরপিও) ১৯৭২’ সংশোধন করা হয়েছে। বুঝিয়ে দিয়েছে নির্বাচনে সশস্ত্র বাহিনী মোতায়েন কেবল ঐতিহ্য নয় সময়ের সুতীব্র প্রয়োজন।
নিরপেক্ষতা, সাহসিকতা ও পেশাদারির সঙ্গে দায়িত্ব পালন সশস্ত্র বাহিনীর দৃঢ় অঙ্গীকার।
সরকারের এই আন্তরিক সদিচ্ছাই একটি গ্রহণযোগ্য ও স্বচ্ছ নির্বাচন অনুষ্ঠানে অন্যতম বড় এক উদাহরণ হতে পারে। গুরুত্বপূর্ণ এই সিদ্ধান্ত জনমনে নবতর আশার সঞ্চার করেছে। অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের মাধ্যমে নির্বাচিত সরকার গঠিত হবে। শান্তি ও স্থিতিশীলতা ফিরবে দেশে।
গত বছরের ২০ ডিসেম্বর জারি করা আইনশৃঙ্খলা-সংক্রান্ত বিশেষ পরিপত্রে নির্বাচন কমিশন (ইসি) বলেছে, ‘নির্বাচন সুষ্ঠু, অবাধ ও উৎসবমুখর করার পূর্বশর্ত হচ্ছে আইন-শৃঙ্খলা স্বাভাবিক রাখা। সংশ্লিষ্ট বাহিনীগুলো এ লক্ষ্যে কাজ করে যাচ্ছে। সশস্ত্র বাহিনী ইতিমধ্যে বেসামরিক প্রশাসনকে সহায়তায় মোতায়েন আছে, যা নির্বাচনের সময়ও অব্যাহত থাকবে। সরকার সামরিক বাহিনীকে ম্যাজিস্ট্রেসি ক্ষমতা দিয়েছে, যা আগামী ২৮ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত বলবৎ থাকবে।’ এর আগেই জানানো হয়েছিল, একটি অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের সহায়তায় মাঠে থাকবে সেনা, নৌ ও বিমান বাহিনীর ৯৪ হাজার সদস্য।
তন্মধ্যে ৯০ হাজার সেনাসদস্য, ২ হাজার ৫০০ জন নৌবাহিনীর সদস্য এবং এক হাজার ৫০০ জন বিমানবাহিনীর সদস্য মোতায়েন থাকবে। প্রতিটি উপজেলায় এক কোম্পানি সেনা মোতায়েন থাকবে। মাস দুয়েক আগে ঢাকা সেনানিবাসের অফিসার্স মেসে এক সংবাদ সম্মেলনে সেনা সদর দপ্তরের মিলিটারি অপারেশনস বিভাগের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল দেওয়ান মোহাম্মদ মনজুর হোসেন বলেছিলেন, ‘বাংলাদেশ সেনাবাহিনী আইন-শৃঙ্খলা রক্ষায় অন্য সব আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনীকে সহযোগিতা করে। একটি সুষ্ঠু ও অবাধ নির্বাচনের জন্য সরকারের যে ইচ্ছা ও গাইডলাইন দেওয়া আছে এবং নির্বাচন কমিশন যে পরিপত্র প্রকাশ করবে সে অনুযায়ী সেনাবাহিনী সর্বাত্মক সহযোগিতা করবে।’
গত তিনটি জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সাধারণ মানুষ ভোট দিতে পারেনি। এবার সবার প্রত্যাশা সাধারণ ভোটাররা নিজেদের পছন্দমতো ভোট দিতে পারবেন। ভোটের সময় আনন্দ-উৎসবমুখর পরিবেশ বজায় থাকবে। সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের মাধ্যমে সব অনিশ্চয়তা কেটে যাবে। গণতন্ত্রের নতুন যাত্রায় দেশের স্থিতিশীলতা ও নিরাপত্তা নিশ্চিতে নিয়ামক শক্তি হিসেবে কাজ করবে এই নির্বাচন। ঐক্যবদ্ধ, শৃঙ্খলাবদ্ধ ও ভ্রাতৃত্ববোধে দৃঢ় সশস্ত্র বাহিনীর পক্ষেই কেবলমাত্র অনিয়মমুক্ত ভোট উৎসব নিশ্চিত করা সম্ভব। ইতিবাচক এই আশাবাদের মধ্যেই নির্ধারিত হবে দেশের ভবিষ্যৎ গতিপথ। এবার ১৩ কোটি মানুষ ভোটার হয়েছেন। প্রায় ৪৪ লাখ নতুন ভোটার যুক্ত হয়েছেন। মৃত ভোটার বাদ দিয়ে ভোটার তালিকা হালনাগাদ করা হয়েছে। বেশ প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ এক নির্বাচন দেখার অপেক্ষায় এখন দেশবাসী।
জুলাই গণঅভ্যুত্থানে সশস্ত্র বাহিনীর দায়িত্বশীল এবং নিরপেক্ষ ভূমিকার কারণেই শেষ পর্যন্ত জনগণের বিজয় হয়েছে। দেশের গণ্ডি পেরিয়ে আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলেও সশস্ত্র বাহিনীর সদস্যদের সততা, নিষ্ঠা ও দৃঢ়তার সঙ্গে দায়িত্ব পালনের বহু নজির রয়েছে। জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনেও তাঁরা অক্ষুণ্ন রেখে চলেছেন দেশের সম্মান। মাতৃভূমির প্রতিটি দুর্যোগে-সংকটে বরাভয় নিয়ে সবার আগে সবার পাশে থেকেছে মহান মুক্তিযুদ্ধের সুবর্ণ ফসল বাংলাদেশ সশস্ত্র বাহিনী। অভ্যুত্থানের পর গত দেড় বছরে দুর্যোগ-দুর্ঘটনায় উদ্ধার তৎপরতা ও মানবিক সহায়তাসহ আইন ও জনশৃঙ্খলা রক্ষায় অক্লান্তভাবে এবং পরম সহিষ্ণুতার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করে যাচ্ছেন তাঁরা। আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনেও সুচারুরূপে দায়িত্ব পালনের মাধ্যমে দেশপ্রেমিক সশস্ত্র বাহিনী নিজেদের উজ্জ্বল ভাবমূর্তিকে আরো নতুন উচ্চতায় নিয়ে যেতে সক্ষম হবে বলে মনে করেন বিশ্লেষকরা।
বাংলাদেশ সেনাবাহিনী প্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান, নৌবাহিনী প্রধান এডমিরাল এম নাজমুল হাসান ও বিমানবাহিনী প্রধান এয়ার চিফ মার্শাল হাসান মাহমুদ খাঁন-বরাবরই একটি সুষ্ঠু, শান্তিপূর্ণ ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন অনুষ্ঠানে সরকারকে সব রকমের সহায়তার অঙ্গীকার করেছেন বিভিন্ন সময়ে। গণতন্ত্র, সুশাসন ও সমৃদ্ধি অর্জনের প্রধান হাতিয়ার নির্বাচনকে ঘিরে সশস্ত্র বাহিনীকে নিয়ে তাই জনগণের প্রত্যাশার পারদ আরো ঊর্ধ্বমুখী হয়েছে। তিন বাহিনী প্রধানের এক ও অভিন্ন অভিপ্রায় জনগণের আশাবাদকে আরো উচ্চকিত করেছে। ভোট দিতে ভুলে যাওয়া মানুষও বিশ্বাস করে নির্বাচনে সশস্ত্র বাহিনীর আইন প্রয়োগকারী সংস্থা হিসেবে দায়িত্ব পালন ভালো ফলাফল নিয়ে আসবে।
দেশপ্রেমের প্রকৃত সারথি সেনা, নৌ ও বিমানবাহিনী প্রধানের প্রত্যয়দীপ্ত এমন অঙ্গীকার ভোটারদের সামনে সম্ভাবনার এক নতুন দুয়ার খুলে দিয়েছে। এগিয়ে আসা ত্রয়োদশ ভোট গণতান্ত্রিক উত্তরণে বড় মাইলফলক হিসেবে বিবেচিত হবে। আশান্বিত সাধারণ ভোটাররা মনে করছেন, এবার আর তাদের ভোটাধিকার হরণ হবে না। সঠিক নির্বাচনের মাধ্যমেই দেশের বর্তমান সংকটময় পরিস্থিতির দীর্ঘমেয়াদি সমাধান সম্ভব। প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূস ‘সবার সেরা’ নির্বাচন চাচ্ছেন। তিন বাহিনী প্রধানও কথা দিয়েছেন।
সাধারণ মানুষের তলানিতে গিয়ে ঠেকা আস্থা ফিরিয়ে আনতে এখন প্রয়োজন উৎসবমুখর ভোট। গণতন্ত্রের মূল ভিত্তির এই পূর্ণতায় জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান, এডমিরাল এম নাজমুল হাসান ও এয়ার চিফ মার্শাল হাসান মাহমুদ খাঁনের এই সুদৃঢ় প্রতিশ্রুতি ঘনিয়ে আসা নির্বাচন ও গণভোটকে ঐতিহাসিক, প্রশ্নমুক্ত, অবাধ ও সুষ্ঠু করার পাশাপাশি জনমনে বাড়তি ভরসা জোগাবে। উন্মোচন করবে স্বপ্নের নবদিগন্ত। প্রমাণ করবে শান্তি ও অগ্রগতির পথে কখনো পথ হারাবে না বাংলাদেশ।
এম.আব্দুল্লাহ আল মামুন খান
লেখক: সাংবাদিক ও কলামিস্ট