বাংলাদেশের রাজনীতির কিংবদন্তি সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া আন্তর্জাতিকভাবেও সমাদৃত নেত্রী ছিলেন। সমসাময়িক অনেক বিশ্বনেতা তাকে তৃতীয় বিশ্বের একজন গুরুত্বপূর্ণ দেশপ্রেমিক রাজনৈতিক নেত্রী মনে করতেন। গণতন্ত্রের প্রতি তার অবিচল আস্থা, অতুলনীয় দেশপ্রেম এবং মানুষের প্রতি মমত্ববোধ বিশ্বনেতাদের অনেককে আকৃষ্ট করেছে।
১৯৯১-৯৬ মেয়াদে প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার উপপ্রেস সচিব হিসেবে তার সঙ্গে আন্তর্জাতিক সম্মেলন ও সফরে যাওয়ার সুযোগে অনেক ঘটনা প্রত্যক্ষ করেছি। একজন সাংবাদিক, ব্যক্তিগত কর্মকর্তা এবং তার জীবনীকারক হিসেবে ডায়েরিতে যেসব তথ্য লিখে রেখেছি, তা নিয়েই আজকের এই লেখা।
সৌদি বাদশাহর চোখে
সৌদি বাদশাহ এবং ক্রাউন প্রিন্সরা খালেদা জিয়াকে একজন গুরুত্বপূর্ণ মুসলিম নেতা এবং বন্ধুপ্রতিম রাষ্ট্রের প্রতিনিধি হিসেবে মূল্যায়ন দেখেছি। খালেদা জিয়া সরকারের ১৯৯১-৯৬ এবং ২০০১-২০০৬ মেয়াদে সৌদি আরবের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক এক নতুন উচ্চতায় পৌঁছায়, যা তৎকালীন সৌদি বাদশাহর কাছে প্রশংসিত হয়েছিল। ২০০৩ সালে খালেদা জিয়া সৌদি আরব সফরে গেলে তৎকালীন বাদশাহ ফাহাদ বিন আবদুল আজিজ তাকে রাজকীয় অতিথি হিসেবে সম্মান জানান। বিভিন্ন সময়ে ওমরাহ পালন এবং স্বাস্থ্য পরীক্ষার জন্য তিনি সৌদি আরব সফরকালে রাজকীয় আতিথেয়তা লাভ করেছেন। সৌদি বাদশাহ খালেদা জিয়াকে বাংলাদেশের একজন দেশপ্রেমিক নেতা এবং ইসলামি ভ্রাতৃত্বের একনিষ্ঠ সমর্থক হিসেবে মন্তব্য করেছেন। ২০০৫ সালে মক্কায় অনুষ্ঠিত ওআইসির বিশেষ সম্মেলনে খালেদা জিয়া অংশ নিলে তৎকালীন সৌদি ক্রাউন প্রিন্স এবং পরে বাদশাহ আবদুল্লাহ বিন আবদুল আজিজ তাকে মুসলিম উম্মাহর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ও প্রভাবশালী নারী নেত্রী হিসেবে উল্লেখ করেন। খালেদা জিয়ার সঙ্গে বৈঠকে সৌদি নেতারা তার স্বামী শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের উপহার দেওয়া নিমগাছের প্রসঙ্গ তুলতেন। প্রেসিডেন্ট জিয়া তৎকালীন বাদশাহ খালিদ বিন আবদুল আজিজকে সৌদি আরবের মাটিতে রোপণের জন্য নিমগাছের চারা উপহার দিয়ে বলেছিলেন, ‘দরিদ্র মানুষের পক্ষ থেকে এটি আপনার জন্য একটি বিনীত উপহার।’ সৌদি বাদশাহ অত্যন্ত আপ্লুত হয়ে সানন্দে এই উপহার গ্রহণ করে বলেছিলেন, তিনি আগে কখনো এমন ‘মূল্যবান উপহার’ পাননি। সৌদি আরবের আরাফাত ময়দানসহ বিভিন্ন জায়গায় এখন প্রচুর পরিমাণে নিমগাছ দেখা যায়। সৌদি জনগণের কাছে এই গাছের নাম এখন ‘জিয়া শাজারাহ’ বা ‘জিয়া গাছ’।
খালেদা জিয়াকে সুহার্তো ও ইয়াসির আরাফাতের বিরল সম্মান
১৯৯২ সালে উপপ্রেস সচিব হিসেবে প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার সঙ্গে প্রথম বিদেশ সফর করি। ইন্দোনেশিয়ার রাজধানী জাকার্তায় দশম জোটনিরপেক্ষ সম্মেলন (ন্যাম সামিট) উপলক্ষে এ সফরটি ছিল। এ সম্মেলনে ইন্দোনেশিয়ার প্রেসিডেন্ট সুহার্তো প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়াকে বিশেষ সম্মান জানিয়েছিলেন। জাকার্তার আকাশে খালেদা জিয়াকে বহনকারী বিমানটি পৌঁছালে পাইলট ঘোষণা করেন, বিশ্বনেতাদের বিমানের ভিড় বা ‘এয়ারজট’ থাকায় অবতরণে কিছুটা বিলম্ব হবে। বিমানটি এ সময় আকাশে চক্করে থাকবে। কিন্তু এ ঘোষণার দু-এক মিনিট পরই পাইলট আবার ঘোষণা করেন, বাংলাদেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়াকে সম্মান জানিয়ে প্রেসিডেন্ট সুহার্তো তার বিমানটি আগে অবতরণের নির্দেশ দিয়েছেন। খালেদা জিয়ার জন্য এটা ছিল এক বিরল সম্মান। ন্যাম সম্মেলনে শতাধিক রাষ্ট্র ও সরকারপ্রধান অংশ নিয়েছিলেন। অবতরণের পর বিমানবন্দরে বালি দ্বীপের নৃত্যশিল্পীরা ‘স্বাগতম’ নৃত্য পরিবেশন করে এবং নেচে নেচে খালেদা জিয়ার ওপর ফুলের পাপড়ি ছিটিয়ে দেয়। স্থানীয়ভাবে বালির শিল্পীদের ঐতিহ্যবাহী এই নাচকে ‘পেনডেট ড্যান্স’ বলা হয়। এই সম্মেলনে আসা ফিলিস্তিনি নেতা ইয়াসির আরাফাত খালেদা জিয়ার সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে এসে তার কোমরে বাঁধা পিস্তল খুলে আকাশের দিকে উঁচিয়ে সামরিক কায়দায় তোপধ্বনির মাধ্যমে তাকে সম্মান জানান। ইয়াসির আরাফাতের সঙ্গে প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের ঘনিষ্ঠ বন্ধুত্বের সম্পর্ক ছিল। সেই স্মৃতি তিনি উল্লেখ করেছিলেন।
হোয়াইট হাউসে প্রেসিডেন্ট বুশের সঙ্গে এক ঘণ্টার বৈঠক
খালেদা জিয়া তার প্রথম প্রধানমন্ত্রিত্বের মেয়াদে ১৯৯২ সালের ১৯ মার্চ হোয়াইট হাউসে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট জর্জ এইচ ডব্লিউ বুশের (সিনিয়র বুশ) সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। এই সাক্ষাৎ ছিল অত্যন্ত সম্মানজনক এবং কূটনৈতিকভাবে ফলপ্রসূ। প্রেসিডেন্ট বুশ খালেদা জিয়াকে ওভাল অফিসে এবং ক্যাবিনেট কক্ষে এক ঘণ্টা সময় দেন, যা কোনো রাষ্ট্র ও সরকারপ্রধানের জন্য সর্বোচ্চ পর্যায়ের সম্মান হিসেবে বিবেচিত। প্রেসিডেন্ট বুশ বাংলাদেশে গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার এবং অর্থনৈতিক উন্নয়নে তার নেতৃত্বের প্রশংসা করেছিলেন। কুয়েত আক্রমণের সময় বাংলাদেশ সৈন্য পাঠিয়ে সৌদি আরবকে যে সহায়তা করেছিল, সে জন্যও বুশ তাকে বিশেষভাবে ধন্যবাদ জানান। খালেদা জিয়া প্রথম ক্ষমতায় আসার মাত্র দুই মাসের মাথায় ১৯৯১ সালের ২৯ এপ্রিল ভয়াবহ ঘূর্ণিঝড় আঘাত হানে। তিনি তার দপ্তর চট্টগ্রামে স্থানান্তর করেন। সে সময় খালেদা জিয়ার অনুরোধে প্রেসিডেন্ট বুশ বাংলাদেশে ত্রাণ তৎপরতা চালাতে মার্কিন জেনারেল স্ট্যাকফলের নেতৃত্বে ‘অপারেশন সি অ্যাঞ্জেল’ পাঠিয়েছিলেন। এই উদ্ধার অভিযানে ৮ হাজার মার্কিন সেনা ও ১৫টি জাহাজ অংশ নিয়েছিল। পারস্য উপসাগরীয় যুদ্ধ শেষ করে ফেরার পথে মার্কিন এই ত্রাণ দল সরাসরি বঙ্গোপসাগরে ডাইভার্ট হয়। তারা উপকূলীয় এলাকায় হেলিকপ্টার ও নৌযান ব্যবহার করে বিপুলসংখ্যক মানুষের কাছে খাবার এবং পানি পৌঁছে দেয় ও আনুমানিক দুই লাখ মানুষের প্রাণ বাঁচায়। এই মানবিক সাহায্যে বাংলাদেশের মানুষ ত্রাণ দলকে সমুদ্রের ফেরেশতা নাম দিয়েছিল। খালেদা জিয়া তার যুক্তরাষ্ট্র সফরে প্রেসিডেন্ট বুশকে এ জন্য ধন্যবাদ জানিয়ে বলেছিলেন, ‘আপনার এই তাৎক্ষণিক সহযোগিতায় আমরা আমাদের জনগণকে রক্ষা ও পুনর্বাসন করতে পেরেছি।’
ম্যান্ডেলা, মাহাথির ও মনমোহন সিংয়ের অনুভূতি
দক্ষিণ আফ্রিকার বর্ণবাদবিরোধী অবিসংবাদিত নেতা নেলসন ম্যান্ডেলার সঙ্গে খালেদা জিয়ার দুবার সাক্ষাৎ হয়। কোপেনহেগেনে জাতিসংঘের সামাজিক শীর্ষ সম্মেলন এবং ঢাকায়। ম্যান্ডেলা বাংলাদেশের গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার এবং স্বৈরাচারবিরোধী সংগ্রামে আপসহীন ভূমিকার জন্য তার প্রশংসা করেন। বাংলাদেশের স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী উপলক্ষে ঢাকায় এসেছিলেন ম্যান্ডেলা।
মালয়েশিয়ার সাবেক প্রধানমন্ত্রী ডা. মাহাথির মোহাম্মদের সঙ্গে খালেদা জিয়ার একাধিকবার দেখা-সাক্ষাৎ ও বৈঠক হয়েছে। মাহাথিরের অনুরোধে একবার লঙ্কাবিতে খালেদা জিয়া কয়েক দিন অবকাশও যাপন করেন। লঙ্কাবি মালয়েশিয়ার উত্তর-পশ্চিম উপকূলে আন্দামান সাগরে অবস্থিত ৯৯টি দ্বীপের একটি দ্বীপপুঞ্জ। মাহাথির মোহাম্মদ খালেদা জিয়াকে মুসলিম বিশ্বের প্রভাবশালী এবং একজন মার্জিত নেতা হিসেবে উল্লেখ করেন। খালেদা জিয়ার মালয়েশিয়া সফরে বাংলাদেশের জনশক্তি রপ্তানির বড় দুয়ার উন্মোচিত হয়েছিল। প্রথম মেয়াদে মালয়েশিয়া সফরে গেলে তৎকালীন উপপ্রধানমন্ত্রী ও বর্তমানে মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিম খালেদা জিয়ার হোটেল স্যুটে এসে দেখা করেন। আনোয়ার ইব্রাহিমের দৃষ্টিতে খালেদা জিয়া একজন ‘সাহসী নেত্রী’। এরশাদবিরোধী আন্দোলনের সময় খালেদা জিয়াকে ‘বাংলার কোরাজন’ ডাকা হতো। ফিলিপাইনের সাবেক প্রেসিডেন্ট কোরাজন এক সাক্ষাতে খালেদা জিয়াকে কাছে পেয়ে জড়িয়ে ধরেছিলেন।
ভারতের প্রধানমন্ত্রী ড. মনমোহন সিংয়ের সঙ্গে খালেদা জিয়ার একাধিক বৈঠক হয়েছে দিল্লি ও ঢাকায়। সেসব বৈঠকে তিনি বাংলাদেশের জাতীয় স্বার্থ বিশেষ করে গঙ্গার পানি, তিস্তা সমস্যা, সীমান্ত হত্যা, বাণিজ্য ঘাটতি ইত্যাদি বিষয়গুলো তুলে ধরেছেন। মনমোহন সিংয়ের সঙ্গে তার ছিল শ্রদ্ধার সম্পর্ক। এসব বৈঠকে ড. মনমোহন সিং খালেদা জিয়াকে তৃতীয় বিশ্বের একজন গুরুত্বপূর্ণ গণতান্ত্রিক নেত্রী হিসেবে উল্লেখ করেছেন।
নারী শিক্ষা কর্মসূচির প্রশংসায় ক্লিনটন, হিলারি ও বেনজীর ভুট্টো
খালেদা জিয়ার নারী শিক্ষার উদ্যোগ বিশ্বের নারী নেত্রী এবং সরকার ও রাষ্ট্রপ্রধানদের কাছে খুবই প্রশংসা পায়। তার প্রবর্তিত নারী শিক্ষার মডেলটি আন্তর্জাতিক অঙ্গনে একটি অনুকরণীয় উদাহরণ, ‘গ্লোবাল মডেল’ হিসেবে স্বীকৃতি পায়। প্রথম মেয়াদে (১৯৯১-৯৬) খালেদা জিয়া দেশব্যাপী দশম শ্রেণি পর্যন্ত মেয়েদের শিক্ষা অবৈতনিক এবং উপবৃত্তি কর্মসূচি চালু করেন। দ্বিতীয় মেয়াদে এসে তিনি এই কর্মসূচি দ্বাদশ শ্রেণি পর্যন্ত নিয়ে যান। যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক ফার্স্ট লেডি ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিলারি ক্লিনটন একাধিকবার সাক্ষাতে খালেদা জিয়াকে নারী শিক্ষায় অভাবনীয় সাফল্যের জন্য প্রশংসা করেন। ফার্স্ট লেডি হিসেবে ঢাকায় এসে রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন যমুনায় সাংবাদিকদের তিনি বলেছিলেন, আপনারা সৌভাগ্যবান খালেদা জিয়ার মতো একজন নারী নেত্রী পেয়েছেন, যিনি মেয়েদের শিক্ষার জন্য কত সুন্দর কাজ করছেন। যুক্তরাষ্ট্রে আমরা এখনো প্রেসিডেন্ট পদে কোনো নারীকে নির্বাচিত করে সম্মান জানাতে পারিনি। দ্বিতীয়বার পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিসেবে ঢাকায় এসে হিলারি ক্লিনটন শেখ হাসিনার সঙ্গে সাক্ষাৎ করলেও খালেদা জিয়ার গুলশানের বাসভবনে সাক্ষাৎ করে একসঙ্গে খাবার খেয়েছিলেন। গুমের জন্য সেদিন শেখ হাসিনার প্রতি তিনি ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছিলেন।
নারীর ক্ষমতায়নের প্রশ্নে খালেদা জিয়ার অবদানকে অনেক বড় বিষয় বলে উল্লেখ করেছিলেন যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক প্রেসিডেন্ট ক্লিনটন ও হিলারি ক্লিনটন। মেয়েদের শিক্ষাবিস্তারে ‘গার্লস স্টাইপেন্ড’ বা উপবৃত্তি এবং অবৈতনিক শিক্ষা এবং ফুড ফর এডুকেশন কর্মসূচি নারীর ক্ষমতায়নে বড় ভূমিকা রেখেছে। লাখ লাখ মেয়ে এতে উপকৃত হওয়ার পাশাপাশি শিক্ষার দিকে ঝুঁকেছে। বিশ্বব্যাংকসহ আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো খালেদা জিয়ার এই কর্মসূচিকে উদ্ভাবনী সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি হিসেবে উন্নয়ন দেশগুলোয় চালু করতে উৎসাহ জুগিয়েছে। এই কর্মসূচির ফলে কয়েক কোটি নারী পর্যায়ক্রমে উপকৃত হয়েছে। কর্মসূচি চালুর প্রথম ৫ বছরে ৩০ লাখ অতিরিক্ত মেয়ে বিদ্যালয়ে ভর্তি হয়। এই কর্মসূচিতে প্রতিবছর ২০ লাখ মেয়ে উপবৃত্তি পেয়ে আসছে। এটা এখন ‘বৈশ্বিক মডেল’। পাকিস্তান, রুয়ান্ডা ও ঘানাসহ বিভিন্ন দেশ এই মডেল অনুসরণ করেছে। নারী শিক্ষা ও উপবৃত্তি কর্মসূচি বাল্যবিয়ে রোধ এবং পোশাকশিল্পে শিক্ষিত নারী শ্রমশক্তি তৈরিতে ভূমিকা রেখেছে। এটাকে খালেদা জিয়ার নারীর ক্ষমতায়ন ও শিক্ষার প্রসারে যুগান্তকারী এবং বিপ্লবী পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে।
মুসলিম বিশ্বের দুই নারী প্রধানমন্ত্রী বেনজির ভুট্টো ও খালেদা জিয়া ১৯৯৫ সালে জাতিসংঘের চতুর্থ বিশ্বনারী সম্মেলনের সময় চীনের রাজধানী বেইজিংয়ের এক হোটেলে ঐতিহাসিক দ্বিপক্ষীয় বৈঠকে একে অন্যকে জড়িয়ে ধরেছিলেন। বেনজির ছিলেন মুসলিম বিশ্বের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী এবং খালেদা জিয়া দ্বিতীয়। তাদের মধ্যে আলোচনার বড় অংশ ছিল নারী শিক্ষা এবং নারীর ক্ষমতায়ন। খালেদা জিয়ার নারী শিক্ষার কর্মসূচির খুব প্রশংসা করেন বেনজির। সেদিন খালেদা জিয়ার হোটেল স্যুটে এসে দেখা করেন তিনি। বেনজির ভুট্টোকে বাংলাদেশের ঐতিহ্যবাহী সুন্দর কারুকাজের একটি জামদানি শাড়ি উপহার ও বাংলাদেশের শিল্পীদের আঁকা চিত্রকর্ম উপহার দিয়েছিলেন খালেদা জিয়া। বেনজির ঢাকার রসগোল্লার অপূর্ব স্বাদের প্রসঙ্গ তুললে খালেদা জিয়া তাকে বাংলাদেশে আমন্ত্রণ জানিয়ে বলেন, ‘আমাদের পদ্মার ইলিশও আপনার খুব পছন্দ হবে। বাংলাদেশে এলে আপনাকে ‘ঢাকাই বেনারসি’ শাড়িও পরিয়ে দেব।’
বিশ্বের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রীর সান্নিধ্যে
১৯৯৫ সালের জানুয়ারি মাসে খালেদা জিয়া শ্রীলঙ্কায় সরকারি সফরে যান। সেখানে শ্রীলঙ্কার প্রেসিডেন্ট চন্দ্রিকা কুমারাতুঙ্গা এবং তার মা তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী, যিনি বিশ্বের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী হওয়ার গৌরব অর্জন করেছিলেন, সিরিমাভো বন্দরনায়েকের সঙ্গে সাক্ষাৎ হয়। তিনিও তার স্বামীকে হারিয়ে রাজনীতিতে এসেছিলেন। তার স্বামী শ্রীলঙ্কার চতুর্থ প্রধানমন্ত্রী সলোমন বন্দরনায়েক ১৯৫৯ সালের ২৬ সেপ্টেম্বর আঁততায়ীর গুলিতে মারা যান। তাদের আলোচনায় সেই প্রসঙ্গ স্থান পায়। প্রথম দেখাতেই খালেদা জিয়া মায়ের মমতায় বেশ কিছুক্ষণ সিরিমাভো বন্দরনায়েককে জড়িয়ে ধরে রেখেছিলেন। তিনি তাকে বাংলাদেশে বেড়াতে আসারও অনুরোধ জানিয়েছিলেন। শ্রীলঙ্কার প্রেসিডেন্ট প্রেমদাসা ছিলেন খালেদা জিয়ার একজন ভক্ত।
ব্রিটিশ রানি ও মার্গারেট থ্যাচার
প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়াকে ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী মার্গারেট থ্যাচারের সঙ্গে তুলনা করা হতো। বিশেষ করে, থ্যাচারের ‘আয়রন লেডি’র খেতাবটি অনেক সময় খালেদা জিয়ার নামের সঙ্গেও ব্যবহার করা হতো। কারণ গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের লড়াইয়ে খালেদা জিয়া ছিলেন আপসহীন এবং দৃঢ়চেতা। থ্যাচারের রাজনৈতিক দর্শন যেমন রক্ষণশীল এবং জাতীয়তাবাদী ছিল, খালেদা জিয়াও তার শাসনামলে জাতীয় সার্বভৌমত্ব ও উন্নয়নকে অগ্রাধিকার দিয়েছেন। প্রধানমন্ত্রী হিসেবে খালেদা জিয়া ও মার্গারেট থ্যাচারের মধ্যে কোনো সাক্ষাৎ হয়নি। তবে ১৯৮০ সালের জুন মাসে প্রেসিডেন্ট জিয়ার সঙ্গে যুক্তরাজ্য সফরকালে ১০ নম্বর ডাউনিং স্ট্রিটে মার্গারেট থ্যাচারের সঙ্গে খালেদা জিয়ার সাক্ষাৎ হয়। বাংলাদেশের উন্নয়ন প্রচেষ্টা ও কমনওয়েলথ-সংক্রান্ত পারস্পরিক আলোচনা হয়েছিল ওই বৈঠকে।
ব্রিটিশ রানি দ্বিতীয় এলিজাবেথের সঙ্গে খালেদা জিয়ার একাধিক সাক্ষাৎ হয়েছে। কমনওয়েলথ সম্মেলনে যোগ দিতে ১৯৯১ সালে লন্ডনে এবং পরে সাইপ্রাসে তাদের মধ্যে সাক্ষাৎ হয়। কমনওয়েলথ কার্যক্রমে রানির প্রশংসা করেন খালেদা জিয়া। লন্ডনে বাকিংহাম প্যালেসে আয়োজিত সংবর্ধনায় প্রিন্সেস ডায়ানার সঙ্গে সাক্ষাৎ হয়। নেদারল্যান্ডসের রানি জুলিয়ানার সঙ্গেও তার সাক্ষাৎ হয়। প্রিন্সেস অ্যান ঢাকায় এসে খালেদা জিয়ার সঙ্গে সাক্ষাৎ করে তার নারী শিক্ষা কর্মসূচির প্রশংসা করেন।
মাদার তেরেসার ভালোবাসা
শান্তিতে নোবেলজয়ী মাদার তেরেসার মানবিক আদর্শ এবং তার ভালোবাসার কথাগুলো খালেদা জিয়াকে ব্যক্তিগত ও রাজনৈতিক উভয় ক্ষেত্রে অনুপ্রাণিত করেছে। খালেদা জিয়া মাদার তেরেসাকে এতটাই পছন্দ করতেন, তিনি তার এক ভাষণে তাকে একজন ‘মমতাময়ী মা’ হিসেবে সম্বোধন করেন। মাদার তেরেসার সঙ্গে খালেদা জিয়ার বেশ কয়েকবার দেখা-সাক্ষাৎ হয়েছে। মাদার তেরেসা নারী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে খালেদা জিয়াকে বলেছিলেন, রাজনৈতিক ক্ষমতার ঊর্ধ্বে থেকে দেশের দরিদ্র ও অসহায় মানুষের সেবায় তিনি যেন নিজেকে নিয়োজিত রাখেন। দুঃখী মানুষের পাশে দাঁড়ানোকে জীবনের ব্রত হিসেবে নিতেও তাকে উৎসাহিত করেন। কারণ তিনি বিশ্বাস করেন, নারীরা মমত্ববোধের মাধ্যমে সমাজে ইতিবাচক পরিবর্তন আনতে পারে। ১৯৭২ সাল থেকে বাংলাদেশে সেবামূলক কাজ করে যাচ্ছিলেন মাদার তেরেসা।
খালেদা জিয়া শৈশবে মাদার তেরেসার প্রতিষ্ঠিত মিশনারিজ অব চ্যারিটির সিস্টারদের দ্বারা পরিচালিত স্কুলে পড়েছেন। সেই স্কুলটি ছিল দিনাজপুরের সেন্ট জোসেফ স্কুল। ফলে আগে থেকেই মাদারের প্রতি তার শ্রদ্ধাবোধ তৈরি হয়, যা পরে তার রাজনৈতিক ও ব্যক্তিগত জীবনে মানবিক দৃষ্টিভঙ্গি গঠনে অনুপ্রেরণা জুগিয়েছিল।
১৯৯১ সালের ২৯ এপ্রিলের ঘূর্ণিঝড়ের পরই ৪ মে মাদার তেরেসা ত্রাণসামগ্রী নিয়ে ঢাকায় আসেন। ৬ মে তিনি প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। তিনি ঘূর্ণিঝড়ের ভয়াবহতা ও ক্ষয়ক্ষতির অবস্থা দেখে গভীর দুঃখ প্রকাশ করেন। তিনি সেই সাক্ষাতে খালেদা জিয়াকে বলেছিলেন, তার মিশনারিজ অব চ্যারিটি ক্ষতিগ্রস্ত এলাকার শিশু ও বৃদ্ধদের পুনর্বাসন না হওয়া পর্যন্ত দেখাশোনার দায়িত্ব নিতে আগ্রহী। তিনি দুর্গত এলাকায় একটি বিশেষ দল পাঠানোরও প্রস্তাব দেন। তিনি খালেদা জিয়ার মনোবল শক্ত করার জন্য তাকে বলেছিলেন, ‘মানুষের সেবা করা মানে ঈশ্বরের সেবা করা। এই কঠিন সময়ে ধৈর্য ধরুন এবং ভালোবাসার সঙ্গে মানুষের পাশে দাঁড়ান ‘
তিনি আরো বলেছিলেন, ‘আপনি যদি শুধু মানুষকে বিচারই করতে থাকেন, তবে তাদের ভালোবাসার সময় পাবেন না।’ মাদারের এই আধ্যাত্মিক ও মানবিক সমর্থন সে সময় খালেদা জিয়াকে বিশাল জাতীয় সংকট মোকাবিলায় শক্তি জুগিয়েছিল। ১৯৯৫ সালে বেইজিংয়ে জাতিসংঘের চতুর্থ বিশ্ব নারী সম্মেলনে খালেদা জিয়া ও মাদার তেরেসা উভয়ই উপস্থিত ছিলেন। উভয়ই সম্মেলনে নারী ও শিশুর অধিকার নিয়ে কথা বলেছিলেন।
মাদার তেরেসা খালেদা জিয়াকে বলেছিলেন, ‘আমরা সবাই বড় কাজ করতে পারি না, কিন্তু আমরা ছোট ছোট কাজ ভালোবাসা দিয়ে করতে পারি? ২০২৪ সালে জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর জেলমুক্ত হয়ে খালেদা জিয়া বলেছিলেন, ‘ধ্বংস নয়, প্রতিশোধ-প্রতিহিংসা নয়, ভালোবাসা ও শান্তি দিয়ে সমাজ গড়ে তুলতে হবে।’ তার এই বক্তব্য ছিল মাদার তেরেসার সেই ভালোবাসার শিক্ষারই স্পষ্ট ছাপ।
দুবার সার্ক চেয়ারপারসন হওয়ার বিরল সম্মান
বাংলাদেশে এ পর্যন্ত তিনটি সার্ক শীর্ষ সম্মেলন হয়। খালেদা জিয়া ছিলেন বাংলাদেশের প্রথম প্রধানমন্ত্রী, যিনি দুবার সার্ক চেয়ারপারসন হওয়ার গৌরব অর্জন করেছিলেন ১৯৯৩ ও ২০০৫ সালে। সার্কের ইতিহাসে তিনি ছিলেন প্রথম নারী চেয়ারপারসন । ঢাকায় ১৯৯৩ সালে তিনি এ সম্মান লাভ করেন। ২০০৫ সালের ১২ নভেম্বর ঢাকায় বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রে ১৩তম সার্ক সম্মেলনের উদ্বোধন অধিবেশনে খালেদা জিয়া দ্বিতীয়বার সার্ক চেয়ারপারসন হন। এ সম্মেলনে সার্কের স্বপ্নদ্রষ্টা শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানকে (মরণোত্তর) প্রথম সার্ক স্বর্ণপদক দেওয়া হয়। তার পক্ষে বড় ছেলে তারেক রহমান এ পদক গ্রহণ করেছিলেন। এ সম্মেলনের ঐতিহাসিক অর্জন ছিল আফগানিস্তানকে সার্কের সদস্য হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা। চীন ও জাপানকে সম্মেলনে পর্যবেক্ষকের মর্যাদা দেওয়া হয়েছিল। সম্মেলনে ৩০০ মিলিয়ন ডলারের ‘সার্ক দারিদ্র্যবিমোচন তহবিল’ গঠন করা হয়েছিল। খালেদা জিয়া সার্ক চেয়ারপারসন হিসেবে দেওয়া তার ভাষণে সার্ককে ‘ঘোষণার মঞ্চ’ থেকে বের করে ‘বাস্তবায়নের যুগে’ প্রবেশ করানোর ওপর জোর দিয়েছিলেন।
সপ্তম সার্ক শীর্ষ সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রী কার্যালয় চত্বরে চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে সার্কের সাত নেতা ‘বকুল ফুলে’র গাছ এবং ত্রয়োদশ সম্মেলনে ‘হরীতকী গাছ’ লাগিয়েছিলেন। এই গাছ পছন্দ করে দেন খালেদা জিয়া।
সপ্তম সার্ক শীর্ষ সম্মেলনের সময় (১০-১১ এপ্রিল) মূল আলোচনার বাইরে নেতাদের মধ্যে পারস্পরিক সৌহার্দ্য ও ব্যক্তিগত সম্পর্ক উন্নয়নের লক্ষ্যে প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া মেঘনা নদীতে এক বিশেষ নৌবিহারের আয়োজন করেছিলেন। ভারতের প্রধানমন্ত্রী পি ভি নরসীমা রাও, পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী নওয়াজ শরিফ, শ্রীলঙ্কার প্রেসিডেন্ট রণসিংহ প্রেমদাসা, মালদ্বীপের প্রেসিডেন্ট মামুন আবদুল গাইউম, ভুটানের রাজা জিগমে সিংয়ে ওয়াচুংক এবং নেপালের প্রধানমন্ত্রী গিরিজা প্রসাদ কৈরালা অংশ নেন। মেঘনা নদীর প্রাকৃতিক সৌন্দর্য উপভোগের জন্যই নৌবিহারটির আয়োজন ছিল। এই নৌবিহারে প্রধানমন্ত্রীর উপপ্রেস সচিব হিসেবে আমারও অংশ নেওয়ার সুযোগ হয়েছিল। এই ভ্রমণের সময় বাংলাদেশের ঐতিহ্যবাহী খাবার বিশেষ করে পদ্মার ইলিশের স্বাদ অতিথিদের চমকে দিয়েছিল। ঐতিহ্যবাহী মেরি অ্যান্ডারসন নামের স্টিমারে করে মনোরম এই রিট্রিটের সময় সাংস্কৃতিক পরিবেশনার পাশাপাশি নদীতীরে নতুন পোশাকে সজ্জিত মানুষের বর্ণাঢ্য উপস্থিতি এবং নৌকাবাইচ সার্কের সাত নেতার চোখে তাক লাগিয়ে দিয়েছিল।
এই নৌবিহারেই সার্কের সাত নেতা ট্র্যাক-টু ডিপ্লোম্যাসি বা অনানুষ্ঠানিক আলোচনায় ‘সাফটা’ চুক্তির ভিত্তি স্থাপন করেন, যা দক্ষিণ এশীয় দেশগুলোর মধ্যে বাণিজ্যের বাধা দূর করে। এটা প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার একটা বড় কৃতিত্ব ছিল।
গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি
খালেদা জিয়া তার কাজের জন্য গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি পেয়েছেন। ২০১৮ সালে কানাডিয়ান হিউম্যান রাইটস ইন্টারন্যাশনাল অর্গানাইজেশন (সিএইচআরআইও) তাকে গণতন্ত্র রক্ষা ও মানবাধিকার প্রতিষ্ঠায় অসামান্য অবদানের জন্য ‘মাদার অব ডেমোক্রেসি’ সম্মাননা প্রদান করে। ২০১১ সালে যুক্তরাষ্ট্রের নিউজার্সি স্টেট সিনেট তাকে ‘ফাইটার ফর ডেমোক্রেসি’ সম্মাননায় ভূষিত করে। বিশ্বখ্যাত ফোর্বস ম্যাগাজিনে ২০০৫ ও ২০০৬ সালে পরপর দুবার খালেদা জিয়াকে নারী শিক্ষা ও নারীর ক্ষমতায়নে ভূমিকার জন্য বিশ্বের ক্ষমতাধর ১০০ জন নারীর তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করে। ১৯৯৩ সালে নিউ ইয়র্ক টাইমস এক প্রতিবেদনে মুসলিমপ্রধান দেশগুলোতে নারীর ক্ষমতায়নে খালেদা জিয়ার ভূমিকার জন্য তাকে উচ্চ প্রশংসা করে। বিশ্বব্যাংক, ইউএনএফপিএ, ইউনেসকোসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থা মেয়েদের জন্য অবৈতনিক শিক্ষা ও উপবৃত্তির কর্মসূচি এবং নারীর ক্ষমতায়নের জন্য ‘রোল মডেল’ হিসেবে অভিহিত করে।
১৯৯৪ সালের ফেব্রুয়ারিতে রাশিয়ার উচ্চশিক্ষার সর্ববৃহৎ প্রতিষ্ঠান মস্কো এক্সটার্নাল ইউনিভার্সিটি অব হিউম্যানিটিজ খালেদা জিয়াকে শিক্ষায় বিশেষ অবদানের জন্য সর্বোচ্চ সম্মানসূচক ডিগ্রি ও একাডেমিক গাউন প্রদান করে।
লেখক : নির্বাহী সম্পাদক, আমার দেশ