কওমি মাদ্রাসাকেন্দ্রিক অরাজনৈতিক সংগঠন হেফাজতে ইসলামের প্রত্যক্ষ তত্ত্বাবধানে গত ২২ অক্টোবর ৭টি ইসলামি দল একটি নতুন জোট গঠন করেছে। দলগুলো হচ্ছে—বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস, খেলাফত মজলিস, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ, জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম বাংলাদেশ, ইসলামী ঐক্যজোট (রাজী), বাংলাদেশ নেজামে ইসলাম পার্টি এবং বাংলাদেশ খেলাফত আন্দোলন।
বলা হচ্ছে, আসন্ন স্থানীয় সরকার নির্বাচন সামনে রেখে এই জোট। আইন অনুযায়ী স্থানীয় নির্বাচন হবে নির্দলীয়। অর্থাৎ দলগতভাবে কাউকে মনোনয়ন দেওয়া যাবে না। সেক্ষেত্রে নতুন এই জোট নির্বাচনে কী করবে? এটি কি সত্যিই নির্বাচনি জোট নাকি সমমনা কিছু দলের মধ্যে একটা রাজনৈতিক সমঝোতা? সেই সমঝোতার উদ্দেশ্যই-বা কী এবং হেফাজতে ইসলামের মতো একটি অরাজনৈতিক সংগঠনের ছাতার নিচে সাতটি রাজনৈতিক দল যে ঐক্যবদ্ধ হলো, সেটির রাজনৈতিক তাৎপর্য কী? দেশের ধর্মভিত্তিক রাজনীতিতে কি নতুন কোনও মেরুকরণ ঘটতে যাচ্ছে? আবার এই সাতটি দলের মধ্যে কয়েকটি দল জামায়াতে ইসলামীর ১১ দলীয় ঐক্য এবং বিএনপির জোটে আছে। ফলে প্রশ্ন উঠেছে, একই দল দুই জোটে যুক্ত থাকতে পারে কিনা? গুঞ্জন আছে—জামায়াত নেতৃত্বাধীন জোট ভেঙে যাচ্ছে। হেফাজতে ইসলামের ছাতার তলে এই জোটের একাধিক দলের যোগদান কি তারই ইঙ্গিত? কেউ কেউ মনে করেন, জামায়াতের বাইরে অন্য ইসলামি দলগুলো একত্র হয়ে একটা নতুন রাজনৈতিক মেরুকরণ করবে। প্রশ্ন হলো, সেটির উদ্দেশ্য কী? নিয়ম অনুযায়ী জাতীয় সংসদ নির্বাচনের বাকি এখনও চার বছরের বেশি। এখনই কেন জামায়াতের বিপরীতে কিংবা বিএনপির বিপরীতে ইসলামিক দলগুলো ঐক্যবদ্ধ হবে? আবার জামায়াত ছাড়া অন্য সব ইসলামিক দল একত্র হয়েও কি এমন কোনও শক্তিশালী প্ল্যাটফর্ম গড়ে তুলতে পারবে—যারা নির্বাচনে বিএনপি বা জামায়াতের দিকে বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিতে সক্ষম?
বিষয়টা নিয়ে জামায়াত এবং ইসলামি আন্দোলন বাংলাদেশের দুজন নেতার সঙ্গে আলাপ হয়। তারা মনে করেন, হেফাজতের মধ্যস্থতায় সাতটি রাজনৈতিক দলের নতুন এই জোট শুধু আসন্ন স্থানীয় সরকার নির্বাচন সামনে রেখে নয়। বরং এর পেছনে সাম্প্রতিক বাংলাদেশের বিদ্যমান রাজনৈতিক পরিস্থিতির আরও কিছু বাস্তবতা রয়েছে। কী সেই বাস্তবতা, সেটি তারা পরিষ্কার করে বলেননি বা বলতে চাননি। বরং তারা মনে করেন, ইসলাম প্রতিষ্ঠার জন্য যারা কাজ করে, সেই দল ও সংগঠনগুলোর ঐক্যবদ্ধ থাকা জরুরি। বিশেষ করে সাম্প্রতিক সময়ে যেসব সামাজিক সংকট তৈরি হয়েছে বা যেসব বিষয় নিয়ে আলোচনা-সমালোচনা ও বিতর্ক হয়েছে, সেসব সমস্যা সমাধানে ইসলাম যে বড় ভূমিকা রাখতে পারে, সেই বার্তাটি দেওয়ার জন্যই হেফাজতে ইসলামের এই উদ্যোগ।
কেউ কেউ মনে করেন, রাজনৈতিক মত ও পথ ভিন্ন হলেও কিছু বিষয়ে ইসলামি দলগুলোর ঐক্যবদ্ধ থাকা প্রয়োজন এবং সেজন্য একটি অভিন্ন প্ল্যাটফর্ম থাকা দরকার। কিন্তু সেই প্ল্যাটফর্ম গঠনের উদ্যোগ কে নেবেন? সেই প্রশ্নের আলোকেই হেফাজতে ইসলাম এই প্রক্রিয়ায় ‘মুরুব্বির’ ভূমিকা পালন করছে। অবশ্য এই জোটে দেশের সবচেয়ে বড় ইসলামি দল জামায়াতে ইসলামী যদি যোগ না দেয়, তাহলে সেটি বৃহত্তর ইসলামি জোট হবে না। বরং তখন অনেকের মধ্যে এই ধারণা তৈরি হবে যে এটি মূলত জামায়াতবিরোধী ইসলামি জোট। তাছাড়া অতীতে বিভিন্ন সময়ে ইসলামিক দলগুলোর ঐক্যবদ্ধ হয়েছিল। কিন্তু সেগুলো দীর্ঘস্থায়ী হয়নি। বরং দলগুলোর পরস্পরের বিরুদ্ধে কাদা ছোড়াছুড়িতে লিপ্ত হয়েছে। এক দল আরেক দলকে ‘মুনাফেক’ বলেও গালি দিয়েছে। ফলে হেফাজতে ইসলামের ছায়াতলে সম্প্রতি যে সাতটি ইসলামিক দল ঐক্যবদ্ধ হলো, তার উদ্দেশ্য যাই হোক না কেন, এই জোট বা এই বাঁধন কতদিন স্থায়ী হবে, তা এখনই বলা কঠিন।
সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত খবরে বলা হচ্ছে, নতুন এই ইসলামিক জোটের একটি লক্ষ্য আসন্ন স্থানীয় সরকার নির্বাচন। স্থানীয় নির্বাচনে দলীয়ভাবে প্রার্থী মনোনয়ন দেওয়ার সুযোগ না থাকলেও সমর্থনের সুযোগ রয়েছে। বাস্তবতা হলো—স্থানীয় সরকার নির্বাচনে সরকারি দল সমর্থিত প্রার্থীরা নানা কারণে এগিয়ে থাকেন। বিরোধীদলীয় প্রার্থীরাও অনেক জায়গায় জয়ী জন। কিন্তু সাতটি ইসলামি দল মিলে যে জোট হলো, তারা যদি কাউকে সমর্থন দেয়, তারা না হবে সরকারি দল সমর্থিত, না বিরোধী দলের। অর্থাৎ সরকারি ও বিরোধী দলের বাইরে গিয়ে একটি তৃতীয় শক্তি হিসেবে তারা যদি কাউকে সমর্থন দেয়, তাদের জয়ের সম্ভাবনা কতটুকু? তারা কি জনগণকে এই বার্তা দেবে যে, সরকার এক বছরে রাষ্ট্র পরিচালনায় জনগণের প্রত্যাশা পূরণে যেমন ব্যর্থ হয়েছে, তেমনি বিরোধী দলও দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে পারেনি, অতএব নতুন এই ইসলামি জোট সমর্থিত প্রার্থীকে ভোট দিন? এরকম একটি কৌশল শেষ পর্যন্ত কতটা কাজ দেবে?
গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে ক্ষমতায় যাওয়ার জন্য বা সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতার প্রয়োজনে জোট গঠন দোষের কিছু নয়। অনেক সময় এটি অপরিহার্যও হয়ে পড়ে। তবে অগণতান্ত্রিকভাবে কোনও দল ক্ষমতায় থাকতে বিভিন্ন দলকে প্রলোভন দেখিয়ে বা চাপ সৃষ্টি করে জোট গঠন করে—এমন উদাহরণও আছে। এসব জোট করতে গিয়ে দলগুলোর মধ্যে একধরনের আদর্শিক ঐক্য থাকতে হয়। যেমন জামায়াতের সাথে সিপিবি বা এরকম বামপন্থি দলগুলোর জোট হওয়ার সম্ভাবনা নেই। আবার ইসলামি আদর্শ মানলেও সব দলের মধ্যে রাজনৈতিক ঐক্য নাও হতে পারে। যেমন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে দেশের সবচেয়ে বড় দুটি ইসলামিক দল জামায়াতে ইসলামী এবং ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ জোটবদ্ধ হয়েছিল। কিন্তু ভোটের আগে সেই জোট ভেঙে যায়।
অস্বীকার করার উপায় নেই যে দেশের রাজনীতিতে, বিশেষ করে ভোটের মাঠে ইসলামি দলগুলোর খুব বেশি গুরুত্ব না থাকলেও জনমতের ওপর ইসলাম, মুসলমান, চেতনা, অনুভূতি ইত্যাদি শব্দ যেহেতু প্রভাব বিস্তার করে, ফলে সব বড় দলেরই টার্গেট থাকে ইসলাম নামধারী দল ও সংগঠনগুলোকে নিজেদের বলয়ে রাখা। যে কারণে হেফাজতে ইসলাম একটি অরাজনৈতিক সংগঠন হওয়া সত্ত্বেও সব সরকার এবং সব বড় দলই তাদের সঙ্গে সুসম্পর্ক বজায় রাখার চেষ্টা করে।
বলা হয়, নির্বাচনি মাঠ দখলের চেয়েও বেশি প্রয়োজন আন্দোলনের মাঠ দখল। অতীতে দেখা গেছে, ভোটের আগে যেসব দল ও জোট আন্দোলনের মাঠ দখল করতে পেরেছিল, তারাই আন্দোলন-পরবর্তী নির্বাচনে জয়ী হয়ে ক্ষমতায় গেছে। যেমন এরশাদবিরোধী আন্দোলনে বিএনপি-আওয়ামী লীগ-জামায়াতসহ ১৫ দল ছিল। ১৯৯১ সালের নির্বাচনে বিএনপি জয়ী হয়েছে। আওয়ামী লীগও অনেক আসন পেয়েছে।
১৯৯৬ সালের নির্বাচনের আগে আন্দোলনের মাঠ ছিল আওয়ামী লীগের দখলে। তারা ওই নির্বাচনে জিতেছে। ২০০১ সালের নির্বাচনের আগে রাজপথ বিএনপির দখলে এবং ওই নির্বাচনে তারা জয়ী হয়। ২০০৭ সালের নির্বাচনের আগে দেশের রাজনীতিতে টালমাটাল অবস্থা সৃষ্টি হয় এবং তখন আন্দোলনের মাঠ ছিল আওয়ামী লীগের দখলে। দুই বছর তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দায়িত্ব পালনের পর ২০০৮ সালের নির্বাচনে জয়ী হয় আওয়ামী লীগ। ২০১৪ সালের নির্বাচনের আগে বিএনপি আন্দোলনের মাঠে থাকলেও তারা সুবিধা করতে পারেনি। ব্যাপক প্রাণহানি হয়েছে ঠিকই—সরকার সেই আন্দোলন দমনও করেছে। ২০১৮ সালের নির্বাচনের পরেও বিএনপি কোনও ইস্যুতেই সরকারকে নড়াতে পারেনি। সবশেষ চব্বিশের আন্দোলনে পরাজিত হয়ে ক্ষমতাচ্যুত হয়েছে আওয়ামী লীগ। এমনকি তাদেরকে এর পরবর্তী নির্বাচনেই অংশ নিতে দেওয়া হয়নি। ফলে যেকোনও রাজনৈতিক জোট গঠনের পেছনে সব সময় সরাসরি ভোটের অঙ্ক না থাকলেও আন্দোলনে মাঠ দখলের হিসাব-নিকাশ থাকে। সুতরাং, হেফাজতে ইসলামের নেতৃত্বে সাতটি ইসলামি দলের ঐক্যবদ্ধ হওয়া আসন্ন স্থানীয় সরকার কিংবা অনেক পরে জাতীয় নির্বাচনে কী ভূমিকা পালন করবে বা করতে পারবে, তার চেয়ে বড় প্রশ্ন, এই জোট কি সম্ভাব্য কোনও রাজনৈতিক আন্দোলন মোকাবিলা তথা আন্দোলনের মাঠ দখলে রাখতে ভূমিকা রাখবে? সেক্ষেত্রে এই প্রশ্নও এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই, বৃহৎ কোনও দল বা কোনও শক্তি এই জোট গঠনের পেছনে ভূমিকা রেখেছে?
পরিশেষে, এই উপমহাদেশের রাজনীতিতে ধর্ম এতটাই প্রভাবক যে প্রগতিশীল বলে পরিচিত দলও ক্ষমতায় যাওয়া বা ক্ষমতায় থাকার অস্ত্র হিসেবে বারবারই ধর্মকে ব্যবহার করে। ভোটের আগে পীরের মাজারে যাওয়া, ধর্মীয় নেতাদের আশীর্বাদ নেওয়া, ধর্মভিত্তিক সংগঠনগুলোর দাবি-দাওয়া মেনে নিয়ে তাদের আস্থাভাজন থাকা বা নিষ্ক্রিয় রাখা, ধর্মবিষয়ক সম্মেলনে রাষ্ট্রের নীতিনির্ধারকদের যোগদান ইত্যাদি চলতে থাকে। যে কারণে ধর্ম আর মানুষের একান্ত ব্যক্তিগত বিশ্বাস বা আচারের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না। বরং সে রাষ্ট্রের রাজনীতি ও ক্ষমতার গতি-প্রকৃতিও নির্ধারণ করে। আর ধর্ম যখন রাজনীতিকে নিয়ন্ত্রণ বা প্রভাবিত করে, তখন সেই রাষ্ট্রে কট্টরপন্থি গোষ্ঠীগুলো শক্তিশালী হয়ে উঠবে, এটিই স্বাভাবিক। তখন তাদের দাবি-দাওয়া মেনে নিতেও সরকার বাধ্য হয়। এটি অব্যাহত থাকলে ধর্মীয় গোষ্ঠীগুলো একসময় কী করা যাবে এবং করা যাবে না—তাও নির্ধারণ করে দেওয়া শুরু করে। তারা একটি জাতির বহু বছর ধরে লালিত সংস্কৃতি বদলে দেওয়ার মতো নির্দেশনাও দিতে পারে। সে বিষয়ে সতর্ক থাকা দরকার।
আমীন আল রশীদ: সাংবাদিক ও লেখক