ব্যারিস্টার আহমেদ এ. খান
বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সাতক্ষীরা-৪ আসনের সংসদ সদস্য গাজী নজরুল ইসলামকে বহিষ্কারের সিদ্ধান্তটিকে সংবাদমাধ্যমে প্রধানত একটি কেলেঙ্কারির ঘটনা হিসেবেই দেখা হয়েছে। কিন্তু এর অন্তরালে রয়েছে সত্যিকার অর্থেই একটি কঠিন সাংবিধানিক প্রশ্ন।
আর এই বিষয়ে আইনটি মোটেও ততটা মীমাংসিত নয়, যতটা এই সপ্তাহে ঢাকাজুড়ে উচ্চারিত আত্মবিশ্বাসী মন্তব্যগুলো থেকে মনে হচ্ছে।
সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদ আসলে কী বলে
সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদই সেই বিধান, যার দিকে সবাই প্রথমে হাত বাড়ায়। এর ভাষাটি ধীরে ও মনোযোগ দিয়ে পড়া প্রয়োজন। কোনো রাজনৈতিক দলের মনোনয়নে নির্বাচিত ব্যক্তি “যদি (ক) উক্ত দল হইতে পদত্যাগ করেন, অথবা (খ) সংসদে উক্ত দলের বিপক্ষে ভোটদান করেন, তাহা হইলে সংসদে তাঁহার আসন শূন্য হইবে।” তালিকাটি এখানেই শেষ: দল থেকে পদত্যাগ অথবা দলের বিরুদ্ধে ভোট দেওয়া (একটি ব্যাখ্যার মাধ্যমে দ্বিতীয় বিষয়টির আওতা বাড়িয়ে দলীয় হুইপযুক্ত ভোটে বিরত থাকা অথবা অনুমোদন ছাড়া অনুপস্থিত থাকাকেও অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে)। এই বাক্যের কোথাও বহিষ্কারের কথা নেই। আর এটি এমন কোনো শূন্যতা নয়, যা উদারভাবে ব্যাখ্যা দিয়ে নীরবে পূরণ করা যায়।
১৯৯১ সালের দ্বাদশ সংশোধনীর মাধ্যমে প্রতিস্থাপিত হওয়ার পরও ৭০ অনুচ্ছেদটি নির্মিত হয়েছে সংসদ সদস্য নিজে কী করেন, তার ভিত্তিতে—যদি তিনি পদত্যাগ করেন অথবা দলীয় হুইপ অমান্য করেন। দল তাঁর সঙ্গে কী করে, সে বিষয়ে এখানে কিছুই বলা হয়নি। কোনো দল একজন সদস্যকে বহিষ্কার করলে পরিস্থিতিটি প্রায় তার বিপরীত প্রতিচ্ছবি হয়ে দাঁড়ায়। আর শুধু সম্পর্কিত বলে মনে হওয়ার কারণে বিপরীত প্রতিচ্ছবিগুলো স্বয়ংক্রিয়ভাবে একই নিয়মের আওতায় পড়ে না। সহজভাবে বললে, বহিষ্কার সম্পর্কে সংবিধান বা সংসদের কার্যপ্রণালী বিধির কোথাও কোনো বিধান নেই। ৭০ অনুচ্ছেদটি এই পরিস্থিতির কথা মাথায় রেখে লেখা হয়নি। এই শূন্যতাই বাংলাদেশে এর আগে এ প্রশ্নকে ঘিরে বিতর্কগুলোর জন্ম দিয়েছিল। অষ্টম সংসদে বিএনপি থেকে বহিষ্কৃত আবু হেনা স্পিকারের অনুমোদনে তাঁর আসন ধরে রেখেছিলেন। ২০১৪ সালে আওয়ামী লীগ থেকে বহিষ্কৃত আবদুল লতিফ সিদ্দিকী যুক্তি দিয়েছিলেন যে, তাঁর ক্ষেত্রে ৬৬ বা ৭০—কোনো অনুচ্ছেদই প্রযোজ্য নয়। তবে যুক্তিটি কখনো পরীক্ষিত হয়নি, কারণ নির্বাচন কমিশন কোনো সিদ্ধান্ত দেওয়ার আগেই তিনি পদত্যাগ করেছিলেন। এই নির্দিষ্ট বিষয়ে বাংলাদেশে এখনো কোনো কর্তৃত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত হয়নি। এ পর্যন্ত যা কিছু হয়েছে, সেগুলো হয় বিচারিক মন্তব্য, রাজনৈতিক সমঝোতা অথবা একাডেমিক যুক্তি।
নৈতিক স্খলনের পথটি কেন বন্ধ
অন্য যে সুস্পষ্ট বিধানটির কথা মনে আসে, সেটি হলো ৬৬ অনুচ্ছেদ। এতে নৈতিক স্খলনসম্পর্কিত কোনো অপরাধে দোষী সাব্যস্ত এবং কমপক্ষে দুই বছরের কারাদণ্ডপ্রাপ্ত একজন সংসদ সদস্যকে অযোগ্য ঘোষণা করা হয়। তাঁর মুক্তির পর আরও পাঁচ বছর পর্যন্ত এই অযোগ্যতা বহাল থাকে। জামায়াতের অভ্যন্তরীণভাবে দেওয়া “নৈতিক অসদাচরণের” সিদ্ধান্ত কোনো দণ্ডাদেশ নয় এবং এতে কোনো সাজাও দেওয়া হয়নি। অন্তর্নিহিত অভিযোগগুলো যা-ই হোক না কেন, আইনের দৃষ্টিতে একটি দলের নিজস্ব শৃঙ্খলামূলক সিদ্ধান্ত এবং আদালতের রায় দুটি ভিন্ন বিষয়। আর ৬৬ অনুচ্ছেদে এ দুটির মধ্যে শুধু একটিরই উল্লেখ রয়েছে। প্রাসঙ্গিক কোনো অভিযোগে কোনো আদালত যদি কখনো গাজী নজরুল ইসলামকে দোষী সাব্যস্ত করে সাজা দেন, তবে নির্বাচন কমিশনে কোনো বিষয় প্রেরণের প্রয়োজন ছাড়াই ৬৭(১)(ঘ) অনুচ্ছেদ স্বয়ংক্রিয়ভাবে কার্যকর হবে। সেটি হবে অবিতর্কিত ও আদালত-প্রত্যয়িত অযোগ্যতার ঘটনা। এখন পর্যন্ত এর কাছাকাছি কিছুই ঘটেনি।
গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশের যুক্তি এবং এতে কেন টানাপোড়েন রয়েছে
এখানেই বিশ্লেষণটিকে প্রকাশ্যে এ পর্যন্ত যা বলা হয়েছে, তার অধিকাংশের চেয়ে আরও এগিয়ে নিতে হবে। কারণ জামায়াতের নিজস্ব সংসদীয় দলের ভেতর থেকে যেসব যুক্তি আসছে, সেগুলোতে গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ, ১৯৭২ বাস্তব ভূমিকা পালন করছে। গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশের ১২(১) অনুচ্ছেদে “সদস্য হিসেবে নির্বাচিত হওয়ার অথবা সদস্য থাকার” ক্ষেত্রে অযোগ্যতাগুলোর তালিকা দেওয়া হয়েছে। এর (খ) উপধারায় এমন ব্যক্তিকে অযোগ্য বলা হয়েছে, যিনি “কোনো নিবন্ধিত রাজনৈতিক দল কর্তৃক মনোনীত নন অথবা স্বতন্ত্র প্রার্থী নন।” জামায়াতের সংসদীয় মুখপাত্র এই বিধানটির দিকেই ইঙ্গিত করেছেন। তাঁর বক্তব্য হলো, বহিষ্কারের ফলে একজন ব্যক্তি কোনো দলের “মনোনীত” ব্যক্তি হিসেবে তাঁর মর্যাদা হারান এবং এর মাধ্যমে ১২(১)(খ) কার্যকর হয়। কিন্তু ভালোভাবে যাচাই করলে এই ব্যাখ্যাটি টেকে না। ১২(১)(খ) অনুচ্ছেদটি এমন একটি প্রার্থিতার যোগ্যতাসংক্রান্ত তালিকার কথা বলে, যেখানে দেউলিয়াত্ব, মানসিক ভারসাম্যহীনতা, লাভজনক পদে থাকা এবং ঋণখেলাপি হওয়ার মতো বিষয় রয়েছে। এসব বিষয় নির্বাচনের সময় যাচাই করা হয়। কোনো দলের মনোনয়ন একটি ঐতিহাসিক সত্য, যা প্রার্থিতা দাখিলের দিনেই স্থির হয়ে যায়। নির্বাচনের পর দল মত পরিবর্তন করলে সেই মনোনয়ন পূর্বাবস্থায় ফিরে যায় না। ইতোমধ্যে সম্পন্ন হওয়া একটি মনোনয়নকে পূর্বপ্রযোজ্যভাবে বাতিল করার জন্য (খ) উপধারাটি পড়তে হলে এমন একটি আইনি কল্পধারণা প্রয়োজন হবে, যা ওই বিধানের ভাষায় একেবারেই নেই। ভারতের আদালতগুলো বহিষ্কারকে অযোগ্যতার সমতুল্য হিসেবে গণ্য করার আগে ভারতকে ঠিক এ ধরনের আইনি কল্পধারণা স্পষ্ট ভাষায় নিজেদের সংবিধানে লিখতে হয়েছিল। বাংলাদেশের গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশে এমন কোনো বিধান নেই। অধস্তন আইনের একটি প্রার্থিতার যোগ্যতাসংক্রান্ত বিধানকে পাশ কাটিয়ে এমন ফল অর্জন করতে দেওয়া, যা ৭০ অনুচ্ছেদ সরাসরি অর্জন করে না, হবে অদ্ভুত ধরনের বিধিবদ্ধ ইঞ্জিনিয়ারিং। এখানে আরও একটি জটিলতা স্পষ্ট করা প্রয়োজন, কারণ জামায়াতের পক্ষ থেকে উপস্থাপনযোগ্য যুক্তিগুলোর মধ্যে এটিই সবচেয়ে শক্তিশালী। গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশের ১২(৮) অনুচ্ছেদটি ২০২৫ সালের ৩ নভেম্বর থেকে কার্যকর হওয়ার জন্য সংযোজিত হয়েছিল এবং ১২(১)(খ)-এর সঙ্গে মিলিয়ে এটি বাস্তব ভূমিকা পালন করে। দুটি উপধারা একসঙ্গে পড়লে এই যুক্তি দেওয়া যেতে পারে যে, যে দল তাঁকে মনোনয়ন দিয়েছিল সেই দল এখন তাঁকে বহিষ্কার করায় তিনি ১২(১)(খ)-এর মনোনয়নসংক্রান্ত যোগ্যতা আর পূরণ করেন না। ফলে নির্বাচনের “পর” তাঁর ক্ষেত্রে ১২(১) অনুচ্ছেদের অধীনে একটি অযোগ্যতার সৃষ্টি হয়েছে। এরপর ১২(৮) অনুযায়ী নির্বাচন কমিশন নিজ উদ্যোগে অথবা জামায়াতের নোটিশের ভিত্তিতে বিষয়টি নির্ধারণ করবে এবং কমিশনের সিদ্ধান্ত হবে চূড়ান্ত ও বাধ্যতামূলক। এই সম্মিলিত ব্যাখ্যা অনুযায়ী, ৭০ অনুচ্ছেদের কাছাকাছি না গিয়েও গাজী নজরুল ইসলামের আসন শূন্য ঘোষণা করা যেতে পারে। এটি একটি পরিপাটি যুক্তি। সম্ভবত এ কারণেই জামায়াত স্পিকারের অপেক্ষা না করে সরাসরি কমিশনে গেছে। তবে এই যুক্তিটিও নির্ভর করছে ১২(১)(খ)-কে মনোনয়নের সময় একবার পূরণ করা শর্তের পরিবর্তে সদস্য থাকার একটি চলমান শর্ত হিসেবে গণ্য করার ওপর। অথচ ১২(১)(খ)-এর ভাষায় এমন পরিবর্তনকে সমর্থন করার মতো কিছুই নেই। উপধারাটি নিজে ২০২৫ সালে সংশোধিত হয়নি; কেবল ১২(৮) যোগ করা হয়েছে। নতুনভাবে সংযোজিত একটি প্রক্রিয়াগত প্রবেশপথ নিজে থেকেই পুরোনো কোনো মূল বিধানের অর্থ পরিবর্তন করে না। যুক্তিটি এতটাই বাস্তব যে কমিশন তা গ্রহণ করতে পারে। তবে তা গ্রহণ করার অর্থ হবে ১২(১)(খ)-কে এমন একটি অর্থ দেওয়া, যা এর আগে কখনো ছিল না; শুধু বিধানটির প্রয়োগ করা নয়।
সাংবিধানিক পথ: ৬৬(৪) অনুচ্ছেদ, ১৯৮০ সালের আইন এবং বিধি ১৭৮
মতবাদগতভাবে অধিক গ্রহণযোগ্য পথটি ৬৬(৪) অনুচ্ছেদের মধ্য দিয়ে যায়। এতে অযোগ্যতাসংক্রান্ত যেকোনো বিরোধ অথবা ৭০ অনুচ্ছেদের অধীনে কোনো আসন শূন্য হবে কি না, সে বিষয়ে বিরোধ নির্বাচন কমিশনে পাঠানো হয়েছে এবং কমিশনের সিদ্ধান্তকে চূড়ান্ত বলা হয়েছে। ৬৬(৪) অনুচ্ছেদে নিজে থেকে বলা হয়নি কে প্রক্রিয়াটি শুরু করবেন অথবা কীভাবে তা শুরু হবে। আরও দুটি আইনি ব্যবস্থা এই শূন্যতা পূরণ করে। সংবাদমাধ্যমের আলোচনায় এখন পর্যন্ত এর কোনোটিই খুব বেশি গুরুত্ব পায়নি। সংসদ সদস্য (বিরোধ নির্ধারণ) আইন, ১৯৮০—টেকনিক্যালি ১৯৮১ সালের ১ নম্বর আইন—৬৬(৫) অনুচ্ছেদের প্রদত্ত ক্ষমতাবলে বিশেষভাবে ৬৬(৪) অনুচ্ছেদ কার্যকর করার জন্য প্রণীত হয়েছিল। এর ৩ ধারায় স্পিকারের ওপর একটি সুস্পষ্ট দায়িত্ব আরোপ করা হয়েছে। সংশ্লিষ্ট তথ্য প্রকাশ্যে আসার ত্রিশ দিনের মধ্যে তাঁকে সংশ্লিষ্ট সদস্য এবং বিরোধ উত্থাপনকারী ব্যক্তির নাম উল্লেখ করে নির্বাচন কমিশনে একটি বিবৃতি পাঠাতে হবে। The Secretary, Parliament Secretariat v. Khandker Delwar Hossain (1999) মামলায় আপিল বিভাগ সতর্কতার সঙ্গে এটিকে সাংবিধানিক দায়িত্বের পরিবর্তে বিধিবদ্ধ দায়িত্ব হিসেবে বর্ণনা করেছিলেন। এর অর্থ হলো, স্পিকার যখন এই দায়িত্ব পালন করেন, তখন তাঁর কাজ আদালতের রিট এখতিয়ারের আওতাভুক্ত থাকে। এটি সংসদের প্রকৃত কার্যক্রম পরিচালনার মতো নয়, যাকে ৭৮ অনুচ্ছেদ সুরক্ষা দেয়। অনিচ্ছুক কোনো স্পিকারকে বিষয়টি কমিশনে পাঠাতে বাধ্য করা যেতে পারে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, “পদত্যাগ” (বা বহিষ্কার) ঘটেছে কি না, সে বিষয়ে স্পিকারের নিজস্ব মতামতের কোনো আইনি মূল্য নেই। প্রশ্নটির সিদ্ধান্ত নেওয়ার অধিকার একমাত্র কমিশনের। সংসদের কার্যপ্রণালী বিধির ১৭৮ বিধির শিরোনাম হলো “নির্বাচন কমিশনে প্রেরণ এবং আসন শূন্য হওয়া।” এটিই সেই প্রক্রিয়া, যার মাধ্যমে সংসদের অধিবেশন থেকে একটি বিরোধ প্রথমে স্পিকারের কাছে পৌঁছায়। সাধারণত অন্য কোনো সদস্যের উত্থাপিত পয়েন্ট অব অর্ডারের মাধ্যমে এটি ঘটে। লতিফ সিদ্দিকীর ঘটনায় এবং নিচে আলোচিত তামিলনাড়ুর মামলায় প্রায় এমনটাই ঘটেছিল। স্বেচ্ছায় পদত্যাগসংক্রান্ত বিধির ঠিক পরেই ১৭৮ বিধির অবস্থান। এটি ছোট হলেও তাৎপর্যপূর্ণ একটি বিষয়। বিধানপ্রণেতারা স্পষ্টতই এমন একজন সদস্যের কথা কল্পনা করেছিলেন, যিনি নিজে সরে যাচ্ছেন; এমন পরিস্থিতির কথা নয়, যেখানে দল তাঁকে বের করে দিচ্ছে। ৬৬(৪) অনুচ্ছেদ, ১৯৮০ সালের আইন এবং ১৭৮ বিধি একসঙ্গে পড়লে মোটামুটি পরিষ্কার একটি ধারাবাহিকতা পাওয়া যায়। প্রথমে একটি বিরোধ প্রকৃতপক্ষে উত্থাপিত হতে হবে। স্পিকারের একমাত্র কাজ হলো, একটি প্রকৃত বিরোধ রয়েছে কি না, সে বিষয়ে সন্তুষ্ট হওয়া এবং ত্রিশ দিনের মধ্যে তা কমিশনে পাঠানো। মূল প্রশ্নের সিদ্ধান্ত দেওয়ার কোনো ক্ষমতা তাঁর নেই। বহিষ্কারকে পদত্যাগ হিসেবে গণ্য করা হবে কি না, সে সিদ্ধান্ত তাঁর নয়। আর কমিশন শেষ পর্যন্ত যে সিদ্ধান্তই দিক না কেন, সেটি চূড়ান্ত এবং এরপর আর বিতর্কের সুযোগ নেই। “পদত্যাগ” বলতে আসলে কী বোঝায়, সে বিষয়ে আপিল বিভাগ ইচ্ছাকৃতভাবেই কোনো সিদ্ধান্ত দেওয়া থেকে বিরত ছিলেন। কারণ তারা কমিশনের জন্য সংরক্ষিত ক্ষেত্রে হস্তক্ষেপ করতে চাননি। এখানেও সেই একই সংযম অনুসরণ করা উচিত। এটি আইন কী বিধান দেয় তার একটি বিশ্লেষণ, কেবল কমিশনই যে রায় দেওয়ার অধিকারী, তার বিকল্প নয়।
ভারতের আইন কী প্রমাণ করে এবং কী প্রমাণ করে না
এই প্রশ্নের সমাধানে ভারতের দলত্যাগবিরোধী বিচারিক সিদ্ধান্তগুলোর দিকে দৃষ্টি না দিয়ে থাকা যায় না। লতিফ সিদ্দিকীর নিজের দাখিল করা বক্তব্যে প্রায় বিপরীতভাবে ভারতীয় নজির উদ্ধৃত করে বলা হয়েছিল, বহিষ্কৃত একজন আইনপ্রণেতা তাঁর আসন ধরে রাখেন এবং যে দল তাঁকে বহিষ্কার করেছে, আইনি কল্পধারণায় তিনি সেই দলেরই সদস্য হিসেবে বিবেচিত হতে থাকেন। এই উল্লেখটি বিশ্লেষণ করা প্রয়োজন, কারণ ভারতের আইন সরাসরি ও নির্বিঘ্নে সীমান্ত অতিক্রম করে বাংলাদেশে প্রয়োগ করা যায় না। ভারতের সংবিধানের দশম তফসিলে একটি সুস্পষ্ট আইনি কল্পধারণার বিধান রয়েছে। এর ২(১) অনুচ্ছেদের ব্যাখ্যায় নির্বাচিত কোনো সদস্যকে বহিষ্কারের পরও যে দল তাঁকে প্রার্থী করেছিল, সেই দলের সদস্য হিসেবে তাকে অব্যাহতভাবে গণ্য করা হয়। ফলে তিনি পরে অন্য কোনো দলে যোগ দিলে, সেই কাজকে স্বেচ্ছায় দলের সদস্যপদ ত্যাগ হিসেবে গণ্য করা হয় এবং এতে অযোগ্যতা কার্যকর হয়। G. Viswanathan v. The Hon’ble Speaker, Tamil Nadu Legislative Assembly (1996) মামলায় এই নিয়ম প্রতিষ্ঠিত হয়। সেখানে “দলনিরপেক্ষ” বা “unattached” পরিচয়টির কোনো আইনি অর্থই নেই বলে ঘোষণা করা হয়েছিল। কিন্তু পুরো কাঠামোটিই নির্ভর করে এই আইনি কল্পধারণাটি সংবিধানে স্পষ্ট ভাষায় লেখা থাকার ওপর। ৭০ অনুচ্ছেদে এর সঙ্গে তুলনীয় কিছুই নেই। এমন বিধান না থাকায় আইনগত কল্পনার মাধ্যমে এমন ভান করার কোনো লিখিত ভিত্তি নেই যে, বাংলাদেশের একজন সংসদ সদস্য এখনো এমন একটি দলের সদস্য, যে দল তাঁকে আর চায় না। একইভাবে সংসদ সদস্য হিসেবে তাঁর আসনে বহাল থাকাকে কোনো ধরনের ছদ্মবেশী পদত্যাগ হিসেবে গণ্য করারও কোনো ভিত্তি নেই। এমনকি ভারতের নিজস্ব আইনি কল্পধারণাটিও প্রশ্নের ঊর্ধ্বে নয়। Amar Singh v. Union of India (2010) মামলায় দুই বিচারপতির একটি বেঞ্চ Viswanathan মামলার পুরো সিদ্ধান্তধারাকে বৃহত্তর বেঞ্চে পাঠিয়েছিলেন। তাঁদের যুক্তি ছিল, যেসব দল বহিষ্কৃত সদস্যদের প্রত্যাখ্যান করেছে, তাঁদের সেই দলের সঙ্গে বাধ্যতামূলকভাবে আবদ্ধ রাখলে সদস্যরা দলীয় নেতাদের খেয়ালখুশির কাছে অসহায় হয়ে পড়েন। তাৎপর্যপূর্ণভাবে ঐতিহাসিক কারণও উল্লেখ করা হয়েছিল। ১৯৮৫ সালে বাহান্নতম সংশোধনী নিয়ে বিতর্কের সময় সংসদ এমন একটি খসড়া বিধান ইচ্ছাকৃতভাবে বাদ দিয়েছিল, যেখানে বহিষ্কারকেই অযোগ্যতার কারণ ধরা হতো। সে সময় দেওয়া যুক্তিটি ছিল সরল: একটি দলের অভ্যন্তরীণ বহিষ্কারপ্রক্রিয়ার সঙ্গে অযোগ্যতাকে যুক্ত করলে দলীয় নেতৃত্বের হাতে সংসদ সদস্যদের নিয়ন্ত্রণের এমন একটি হাতিয়ার তুলে দেওয়া হয়, যার সঙ্গে সংসদের ভেতরে ওই সদস্য কী করেছেন, তার কোনো সম্পর্ক নেই। একই উদ্বেগ এখানেও প্রযোজ্য। যে দেশে ঠিক এই পরিস্থিতির জন্য সুস্পষ্ট সাংবিধানিক আইনি কল্পধারণা রয়েছে, সেই দেশই যদি এর ন্যায্যতা নিয়ে দ্বিতীয়বার ভাবতে শুরু করে, তবে যে দেশ কখনো এমন কোনো বিধানই লেখেনি, সেখানে আরও কঠোর ফলাফলে পৌঁছানোর খুব কম কারণ রয়েছে।
পরিস্থিতি কোথায় দাঁড়ায়
ওপরে আলোচিত কোনো পথই জামায়াত অথবা নির্বাচন কমিশনকে পরিষ্কারভাবে অযোগ্যতা ঘোষণার জায়গায় পৌঁছে দেয় না। প্রতিটি পথেই বিধানের স্বাভাবিক অর্থের বাইরে গিয়ে ভাষাটিকে প্রসারিত করতে হয়। ৭০ অনুচ্ছেদ পদত্যাগ এবং দলের বিরুদ্ধে ভোট দেওয়ার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য। এটি বহিষ্কারের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য নয় এবং কার্যপ্রণালী বিধিও এই ব্যাখ্যাকে সমর্থন করে। ৬৬ অনুচ্ছেদের নৈতিক স্খলনসংক্রান্ত ভিত্তি প্রয়োগের জন্য প্রকৃত দণ্ডাদেশ এবং বাস্তব সাজা প্রয়োজন। এখানে এর কোনোটিই নেই। গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশের ১২(১)(খ) অনুচ্ছেদ মনোনয়নের মুহূর্তে অযোগ্যতা নির্ধারণ করে; এটি কোনো চলমান শর্ত নয়। নতুন ১২(৮) অনুচ্ছেদ যুক্তিটিকে যত শক্তিশালীই করুক না কেন, এর অন্য কোনো ব্যাখ্যা দেওয়ার অর্থ হবে এমন একটি আইনি কল্পধারণা উদ্ভাবন করা, যা বাংলাদেশ কখনো প্রণয়ন করেনি। বাংলাদেশে ভারতের দশম তফসিলের আইনি কল্পধারণার সঙ্গে সাদৃশ্যপূর্ণ কিছুই নেই। আর ভারত নিজেই যেহেতু সম্প্রতি ওই কল্পধারণা নিয়ে অস্বস্তি প্রকাশ করেছে, তাই বাংলাদেশের এমন একটি বিধান চাওয়ারও বিশেষ কারণ নেই। আইন বর্তমানে যে অবস্থায় রয়েছে, সে অনুযায়ী অধিক শক্তিশালী আইনি অবস্থান হলো, জামায়াতে ইসলামী থেকে গাজী নজরুল ইসলামের বহিষ্কার নিজে থেকেই তাঁর সংসদীয় আসন শূন্য করে না। সংসদ শেষ পর্যন্ত তাঁর জন্য যে পরিচয়ই নির্ধারণ করুক না কেন, কার্যত দলনিরপেক্ষ অবস্থায় তিনি সংসদ সদস্য হিসেবে বহাল থাকবেন। এ অবস্থার পরিবর্তন হতে পারে, যদি কোনো আদালত তাঁকে এমন কোনো অপরাধে দোষী সাব্যস্ত করেন, যা ৬৬ অনুচ্ছেদের নির্ধারিত সীমা পূরণ করে। অথবা যদি যথাযথভাবে একটি বিরোধ উত্থাপিত হয়, ১৯৮০ সালের আইন এবং ১৭৮ বিধির মাধ্যমে তা কমিশনে পাঠানো হয় এবং নির্বাচন কমিশন নিজেই বহিষ্কারকে ৭০ অনুচ্ছেদের আওতায় অন্তর্ভুক্ত করার সিদ্ধান্ত নেয়। একইভাবে কমিশন ওপরে বর্ণিত ১২(১)(খ) ও ১২(৮) অনুচ্ছেদের সম্মিলিত যুক্তিটিও গ্রহণ করতে পারে। দুটি সম্ভাবনার কোনোটিই পুরোপুরি উড়িয়ে দেওয়া যায় না। এ ধরনের বিষয়ে কমিশনের সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত এবং আদালতগুলোও সেই সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনার বিষয়ে কোনো আগ্রহ দেখায়নি। তবে যেকোনো সিদ্ধান্তই বর্তমানে লেখা আইনের সরল প্রয়োগ না হয়ে আইনের প্রকৃত সম্প্রসারণ হিসেবে গণ্য হবে।
লেখক: বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের একজন আইনজীবী এবং ঢাকার সিকে লিগ্যাল ল ফার্মের একজন অংশীদার