রাষ্ট্রপতি নির্বাচন ঘিরে রাজনৈতিক আলোচনা শুরু হলে একটি প্রশ্ন সামনে আসে—সংসদের বিরোধী দল কি রাষ্ট্রপতি পদে প্রার্থী দিতে পারে? বাংলাদেশের সংবিধান বলছে পারে। সংবিধানে বিরোধী দলের প্রার্থী দেওয়ার ক্ষেত্রে কোনও নিষেধাজ্ঞা নেই। তবে রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন সংসদ সদস্যদের ভোটে। ফলে সংসদে যে দল বা জোটের সংখ্যাগরিষ্ঠতা থাকে, তাদের প্রার্থীর জয়ের সম্ভাবনাই সাধারণত বেশি থাকে।
সংবিধানের ৪৮(১) অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, বাংলাদেশের একজন রাষ্ট্রপতি থাকবেন এবং তিনি আইন অনুযায়ী সংসদ সদস্যদের ভোটে নির্বাচিত হবেন। আর ৪৮(৪) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, রাষ্ট্রপতি পদে নির্বাচিত হওয়ার জন্য কোনও ব্যক্তির কমপক্ষে ৩৫ বছর বয়স হতে হবে এবং তিনি সংসদ সদস্য নির্বাচিত হওয়ার যোগ্য হতে হবে। অর্থাৎ রাষ্ট্রপতি হওয়ার জন্য আগে সংসদ সদস্য হওয়া বাধ্যতামূলক নয়; সংসদ সদস্য হওয়ার যোগ্যতা থাকলেই তিনি রাষ্ট্রপতি পদে নির্বাচিত হতে পারেন।
সংবিধানের কোথাও বলা নেই যে রাষ্ট্রপতি পদে শুধু সরকারি দলই প্রার্থী দিতে পারবে। সংসদে প্রতিনিধিত্বকারী বিরোধী দল বা অন্য কোনও সদস্যও আইন অনুযায়ী একজন যোগ্য ব্যক্তিকে রাষ্ট্রপতি পদে প্রার্থী হিসেবে মনোনয়ন দিতে পারেন। তবে ভোটাভুটিতে জয়-পরাজয় নির্ধারিত হয় সংসদে সংখ্যাগরিষ্ঠতার ভিত্তিতে।
বাংলাদেশের সংসদীয় শাসনব্যবস্থা পুনঃপ্রবর্তনের পর রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে বিরোধী দলের প্রার্থী দেওয়ার উল্লেখযোগ্য নজির রয়েছে ১৯৯১ সালে। ওই বছর ক্ষমতাসীন বিএনপি রাষ্ট্রপতি পদে আবদুর রহমান বিশ্বাসকে মনোনয়ন দেয়। অন্যদিকে প্রধান বিরোধী দল আওয়ামী লীগ সাবেক প্রধান বিচারপতি বদরুল হায়দার চৌধুরীকে প্রার্থী করে। সংসদে বিএনপির সংখ্যাগরিষ্ঠতা থাকায় আবদুর রহমান বিশ্বাস রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন।
এরপরের রাষ্ট্রপতি নির্বাচনগুলোর বেশিরভাগই বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় সম্পন্ন হয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে বিরোধী দল প্রার্থী দেয়নি অথবা মনোনয়ন পর্যায়েই প্রতিদ্বন্দ্বিতা শেষ হয়ে গেছে। ফলে ১৯৯১ সালের নির্বাচনকে সংসদীয় আমলে রাষ্ট্রপতি পদে বিরোধী দলের অংশগ্রহণের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দৃষ্টান্ত হিসেবে দেখা হয়।
রাষ্ট্রপতি পদে নির্বাচিত হতে সংসদ সদস্য হওয়া বাধ্যতামূলক নয়, এরও একটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ সাবেক রাষ্ট্রপতি অধ্যাপক ইয়াজউদ্দিন আহমেদ। তিনি কখনও জাতীয় সংসদের সদস্য ছিলেন না। ২০০২ সালে তৎকালীন রাষ্ট্রপতি একিউএম বদরুদ্দোজা চৌধুরী পদত্যাগ করার পর বিএনপি ইয়াজউদ্দিন আহমেদকে রাষ্ট্রপতি পদে মনোনয়ন দেয়। তিনি সংসদ সদস্য না হয়েও সংবিধানের ৪৮(৪) অনুচ্ছেদে নির্ধারিত যোগ্যতা পূরণ করায় রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন।
সংবিধান বিশেষজ্ঞদের মতে, রাষ্ট্রপতি নির্বাচন মূলত সংসদের সংখ্যার অঙ্কের ওপর নির্ভরশীল হলেও বিরোধী দলের প্রার্থী দেওয়ার সাংবিধানিক অধিকার পুরোপুরি বহাল রয়েছে। ফলে সংসদে বিরোধী দল চাইলে রাষ্ট্রপতি পদে নিজস্ব প্রার্থী মনোনয়ন দিয়ে নির্বাচনে অংশ নিতে পারে।