Image description

গত ৩১ মে, ঢাকার মিরপুর-১১ নম্বরের সেকশন ৬, ব্লক সি, ১৩ নম্বর সড়কের একটি ভবনের চারতলার দৃশ্যটি যারা সংবাদপত্রের পাতায় দেখেছেন, তাদের শিউরে ওঠার কথা। ৭৫ বছর বয়সি এক বৃদ্ধ মায়ের গলিত, পোকায় ধরা লাশ উদ্ধার করেছে পুলিশ। ৯৯৯-এ আসা একটি ফোন এবং ফ্ল্যাট থেকে বের হওয়া তীব্র দুর্গন্ধই উন্মোচিত করেছে আমাদের তথাকথিত আধুনিক ও সভ্যসমাজের ভেতরের কুৎসিত পচনকে। মৃত মায়ের নাম নুরজাহান বেগম। তিনি কোনো নিঃস্ব, অনাথ নারী ছিলেন না; তিনি থাকতেন তার নিজের মেয়ের সঙ্গে। তার এক সন্তান রাষ্ট্রের উচ্চপদস্থ আমলা, দ্বিতীয় ছেলে বুয়েটের শিক্ষক, তৃতীয় ছেলে কানাডাপ্রবাসী। একমাত্র মেয়ে স্কুলশিক্ষিকা। সন্তানরা বড় দায়িত্বপূর্ণ পদে আসীন, শিক্ষা ও রাষ্ট্রের উন্নয়ন নিয়ে ভাবছেন, তাদের নিজের মায়ের লাশ মিরপুরের ফ্ল্যাটে পচে পোকায় ধরছে! এই বৈপরীত্য চরম বেদনাদায়ক। মানুষের বাহ্যিক চটক আর ভেতরের পচনকে এটি নগ্নভাবে উন্মোচিত করে।

এ ঘটনাটি শহরের ফ্ল্যাট কালচারের এক কুৎসিত রূপ। ইটপাথরের এই খাঁচাগুলোয় মানুষ এতটাই আত্মকেন্দ্রিক যে, পাশের ফ্ল্যাটে বা পাশের ঘরে কী হচ্ছে, তা নিয়ে কারো কোনো মাথাব্যথা থাকে না। প্রতিবেশীরা গন্ধ পাওয়ার পর বিষয়টি জানাজানি হয়। শহর আমাদের আধুনিকতা দিয়েছে ঠিকই, কিন্তু প্রতিবেশীর প্রতি বা সমাজবদ্ধ মানুষের প্রতি যে দায়বদ্ধতা ছিল, তা কেড়ে নিয়েছে। চারপাশের এই দেয়ালগুলো শুধু সিমেন্টের নয়, এগুলো আসলে আমাদের বিবেকের দেয়াল। সবচেয়ে বড় ধাক্কা লাগার মতো তথ্য হলো—নুরজাহান বেগম তার নিজের মেয়ের সঙ্গেই ওই বাসায় থাকতেন। অথচ বাসাটির বিবরণ বলছে তা ছিল ‘নোংরা, অপরিচ্ছন্ন ও এলোমেলো’। এর অর্থ হলো, একই বাসায় থেকেও মা এবং মেয়ের মধ্যে কোনো আত্মিক বা শারীরিক যোগাযোগ ছিল না। মেয়ে হয়তো তার নিজের জীবন, চাকরি বা অন্য কোনো ঘোরের মধ্যে এতটাই মগ্ন ছিলেন যে, পাশের ঘরে তার বৃদ্ধ মা কী অবস্থায় আছেন, খেয়েছেন কি না—এমনকি বেঁচে আছেন কি না—সেই খোঁজ নেওয়ার ন্যূনতম মানবিক বোধটুকুও তার লোপ পেয়েছিল। এটা অবশ্য সক্রিয় অবহেলা, যা এক ধরনের নীরব হত্যাকাণ্ড।

এ ঘটনার পর সরকার দ্রুত প্রশাসনিক ব্যবস্থা নিয়েছে। গত ৩ জুন, বুধবার জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় থেকে প্রজ্ঞাপন জারি করে মোংলা বন্দর কর্তৃপক্ষের সদস্য (প্রকৌশল ও উন্নয়ন) পদ থেকে সরিয়ে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে সংযুক্ত করা হয়েছে। জনপ্রশাসন প্রতিমন্ত্রী স্পষ্ট জানিয়েছেন, ‘বাবা-মায়ের ভরণপোষণ আইন’ অনুযায়ী তার বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে এবং তার বক্তব্যও খতিয়ে দেখা হবে। এই প্রশাসনিক ব্যবস্থা প্রমাণ করে, সমাজ বা রাষ্ট্র এখন আর মা-বাবার প্রতি এ ধরনের নিষ্ঠুরতাকে শুধু ‘পারিবারিক বিষয়’ বলে এড়িয়ে যেতে রাজি নয়। সন্তান যত প্রভাবশালীই হোক না কেন, জন্মদাত্রীর প্রতি অবহেলার দায় তাকে চড়া মূল্যে চুকাতেই হবে।

আইনি চাকা ঘুরছে, প্রশাসনিক খড়গও নেমে এসেছে। কিন্তু এই দৃশ্যমান আইনি প্রক্রিয়ার বাইরে যে বড় প্রশ্নটি আমাদের মগজে তীব্র চপেটাঘাত করে, তা হলো—আমাদের শিক্ষার ফলিত রূপটি আসলে কোথায়? যে যুগ্ম সচিবের স্বাক্ষরে বা কলমে রাষ্ট্রের বড় বড় উন্নয়ন প্রকল্প অনুমোদিত হয়, মোংলা বন্দরের মতো গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় কেপিআই প্রতিষ্ঠানের উন্নয়ন যার হাত দিয়ে পরিচালিত হচ্ছিল, তার নিজের জন্মদাত্রী মায়ের জীবন কেন এমন পরিত্যক্ত, নোংরা, অপরিচ্ছন্ন ও এলোমেলো ঘরে ধুঁকে ধুঁকে শেষ হলো? কেন মৃত্যুর পরও তার শরীর পোকায় কাটার আগে সন্তানরা তার খোঁজ পেল না?

পারিবারিক মনস্তত্ত্ব অবশ্য এই অন্ধকারের অন্য একটি দিকও আমাদের সামনে আনে। অপরাধবিজ্ঞান ও সম্পর্কের সমীকরণ বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, কোনো সন্তানই হুট করে একদিনে জন্মদাত্রীর প্রতি এমন চরম নিষ্ঠুর হয়ে ওঠে না। সমাজ আজ এই সন্তানদের ঢালাওভাবে ‘কুলাঙ্গার’ বলছে এবং সেটাই স্বাভাবিক। কিন্তু লোকচক্ষুর আড়ালে থাকা কোনো পারিবারিক গোপন ইতিহাস কি এখানে কাজ করেছিল? এমন কি হতে পারে না যে, শৈশবের কোনো গভীর ট্রমা মায়ের কোনো অতীত আচরণ, কোনো অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে মায়ের সম্পৃক্ততা, তীব্র রূঢ় সিদ্ধান্ত বা এমন কোনো ঘটনা সন্তানদের মনকে বিষিয়ে তুলেছিল, যা সামাজিক সম্মানহানির ভয়ে আজ সন্তানরা জনসমক্ষে প্রকাশ করতে পারছে না? আমাদের সমাজে উচ্চপদস্থ ব্যক্তিরা অনেক সময় নিজেদের নির্দোষ প্রমাণ করার চেয়ে সমাজ ও প্রতিবেশীর গালি নীরবে সয়ে যাওয়াকে শ্রেয় মনে করেন, যদি সত্য প্রকাশ পেলে নিজেদের সামাজিক স্ট্যাটাস বা ক্যারিয়ার ধূলিসাৎ হওয়ার শঙ্কা থাকে। মনস্তত্ত্বের ভাষায় একে ‘অ্যাভয়েডেন্ট ডিফেন্স মেকানিজম’ বলা যায়, যেখানে তীব্র ক্ষোভ বা মানসিক ক্ষত থেকে মানুষ সেই উৎসের সঙ্গে সব যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করে ফেলে। এটি আত্মরক্ষা কৌশল, যেখানে মানুষ তীব্র কষ্টের বা ক্ষোভের উৎস থেকে নিজেকে সম্পূর্ণ দূরে সরিয়ে নেয়। মিরপুরের ওই নোংরা ফ্ল্যাটের ঘটনাটি যদি এই প্রেক্ষাপটে দেখা হয়—হয়তো মা মানসিকভাবে এতটাই রূঢ় বা উগ্র আচরণ করতেন, যেমন তীব্র মানসিক ব্যাধি বা সিজোফ্রেনিয়া বা ডিমেনশিয়ার কারণে, যার সঙ্গে মানিয়ে নেওয়া সন্তানদের পক্ষে অসম্ভব হয়ে পড়েছিল। দিনের পর দিন চেষ্টা করে ব্যর্থ হয়ে, সন্তানরা এক ধরনের মানসিক ক্লান্তি থেকে হাল ছেড়ে দেয় এবং দূরে সরে যায়। অনেক সময় সন্তানদের এই নীরবতা ও সমালোচনা সহ্য করার পেছনে লোকচক্ষুর আড়ালে থাকা কোনো ‘পারিবারিক ট্র্যাজেডি’ বা মায়ের কোনো অগ্রহণযোগ্য অতীত লুকিয়ে থাকে, যা তারা কবরে যাওয়া পর্যন্ত গোপন রাখতে চায়। সব মা-ই স্নেহময়ী হন—এটি আমাদের সামাজিক মিথ বা চিরন্তন ধারণা। কিন্তু কিছু মানুষ গুরুতর ব্যক্তিত্বের বিকার নিয়ে মা হতে পারেন। মায়ের কারণে সন্তানের মনে তৈরি হওয়া স্থায়ী ক্ষত অবচেতনেই মায়ের থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন করে ফেলে।

কিন্তু পেছনের মনস্তাত্ত্বিক কারণ বা ক্ষত যতই জটিল হোক না কেন, জীবনের শেষ প্রান্তে এসে একজন ৭৫ বছরের সম্পূর্ণ অক্ষম, বৃদ্ধা মানুষকে এভাবে একটি ঘরের ভেতর পচনের দিকে ঠেলে দেওয়া—কোনো আইনি বা মানবিক মানদণ্ডেই বৈধতা পেতে পারে না। ক্ষোভ যদি থাকত, তবে এই সামর্থ্যবান সন্তানরা মাকে কোনো বৃদ্ধাশ্রমে বা কোনো কেয়ার-টেকারের তত্ত্বাবধানে সম্মানের সঙ্গে রাখতে পারতেন। তা না করে একই ছাদের নিচে বা একই শহরে থেকে মায়ের এই দশা করা চরমতম অপরাধ।

এ ঘটনাটি ২০১৩ সালের ‘পিতা-মাতার ভরণ-পোষণ আইন’ এবং পরে প্রণীত ২০২৩ সালের বিধিমালার কার্যকারিতাকে আবার আলোচনার টেবিলে এনেছে। এই আইনের ৩ ও ৪ ধারা অনুযায়ী, প্রত্যেক সন্তান মা-বাবার এবং তাদের অনুপস্থিতিতে নাতি-নাতনিরা দাদা-দাদি বা নানা-নানির ভরণ-পোষণ ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে আইনিভাবে বাধ্য। আইন লঙ্ঘন করলে অনূর্ধ্ব ১ লাখ টাকা জরিমানা এবং তিন মাসের সশ্রম কারাদণ্ডের বিধান রয়েছে। কিন্তু মিরপুরের এ ঘটনা আমাদের মনে করিয়ে দেয়, শুধু রাষ্ট্রীয় আইন বা জরিমানার ভয় দিয়ে পারিবারিক মূল্যবোধ ফিরিয়ে আনা সম্ভব নয়। আমরা এখন এক জিপিএ ৫ আর বড় বড় ডিগ্রির পেছনে চূড়ান্ত ‘ভোগবাদী’ সমাজ তৈরি করছি। আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা তাত্ত্বিক জ্ঞানসম্পন্ন কর্মকর্তা বা কেরানি তৈরিতে সফল হলেও, শিক্ষার ব্যবহারিক বা ফলিত (Applied) রূপ, যা মানুষকে বিনয়ী, সংবেদনশীল এবং মা-বাবার প্রতি দায়বদ্ধ করতে শেখায়—তা অর্জনে চরমভাবে ব্যর্থ হচ্ছে।

মিরপুরের ঘটনাটি শুধু তার বীভৎসতা এবং সন্তানের উচ্চ সামাজিক পদমর্যাদার কারণে ‘ভাইরাল’ হয়েছে, তাই চারদিকে এত হইচই। নইলে এই ইটপাথরের শহরে প্রতিদিন কত শত মা-বাবা নিজের সন্তানের ঘরেই জীবন্ত লাশ হয়ে আছেন, কতজন নিঃশব্দে কাঁদছেন, তার খবর কজন রাখে? উচ্চশিক্ষিত ও সমাজে প্রতিষ্ঠিত সন্তানদের দ্বারা মা-বাবার এভাবে বৃদ্ধাশ্রমে অবহেলায় দিন কাটানো—আমাদের সমাজের গভীর ও ক্যানসারসদৃশ কিছু লক্ষণকে নির্দেশ করে। সমাজবিজ্ঞানের ভাষায় একে বলা যায় ‘একটি ক্ষয়িষ্ণু ও পচনশীল সভ্যতার লক্ষণ’।

মানবসভ্যতার সূচনালগ্ন থেকে ‘পরিবার’ ছিল সমাজের সবচেয়ে নিরাপদ, প্রাচীন এবং মৌলিক প্রতিষ্ঠান। সুখ-দুঃখের ভাগাভাগি, একে অন্যের প্রতি নিঃশর্ত দায়বদ্ধতা এবং যৌথভাবে টিকে থাকার লড়াই থেকেই জন্ম নিয়েছিল যৌথ পরিবার। একটি সুস্থ সমাজের লক্ষণ হলো তার শক্তিশালী পারিবারিক ও সামাজিক বন্ধন। আমাদের সমাজে ঐতিহ্যগতভাবে মা-বাবা ও প্রবীণরা ছিলেন পরিবারের বটবৃক্ষ, বরকত এবং সামাজিক নিরাপত্তার মূল ভিত্তি।

কিন্তু আধুনিক যুগে এসে সেই সুদৃঢ় বন্ধনে ধরেছে মারাত্মক ফাটল। পুঁজিবাদ, শিল্পায়ন এবং এর হাত ধরে আসা ‘ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যবাদ’ মানুষের হাজার বছরের চেনা পারিবারিক কাঠামোকে ভেঙে চুরমার করে দিচ্ছে। কিন্তু এখন প্রতিষ্ঠিত সন্তানরা যখন মা-বাবাকে বৃদ্ধাশ্রমে পাঠায়, তখন তা প্রমাণ করে যে আমাদের হাজার বছরের পারিবারিক ঐতিহ্য ও সামাজিক পুঁজি ধ্বংস হয়ে গেছে। সমাজ এখন পুরোপুরি ব্যক্তিকেন্দ্রিক ও বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে।

আজকের ইউরোপে ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যবাদ তার চূড়ান্ত সীমানায় পৌঁছেছে। এর ফলে সেখানে পরিবার প্রথার অবসান ঘটেছে এবং তৈরি হয়েছে এক চরম মানবিক সংকট। একাকিত্বের মহামারি ইউরোপের প্রধান শহরগুলোর প্রায় অর্ধেক মানুষ এখন সম্পূর্ণ একা বাস করেন। যুক্তরাজ্য বা জার্মানির মতো দেশে লাখ লাখ প্রবীণ নাগরিক একা মরে পড়ে থাকেন, খোঁজ নেওয়ার কেউ থাকে না। পরিস্থিতি এতটাই ভয়াবহ যে, রাষ্ট্রকে এখন একাকিত্ব মন্ত্রণালয় (Ministry of Loneliness) গঠন করতে হচ্ছে। ইউরোপীয় মনস্তত্ত্বে বৃদ্ধ মা-বাবার দেখভালের দায়িত্ব সন্তানের নয়, রাষ্ট্রের। ফলে শেষ জীবনে মা-বাবারা নিঃসঙ্গ বৃদ্ধাশ্রমে কাটান। অনেক সময় নিজের ফ্ল্যাটে মারা যাওয়ার কয়েক সপ্তাহ পর প্রতিবেশীরা দুর্গন্ধ পেলে পুলিশ এসে কঙ্কাল বা গলিত লাশ উদ্ধার করে।

সপ্তদশ ও অষ্টাদশ শতাব্দীতে ইউরোপে যখন রেনেসাঁ এবং আলোকায়ন যুগের সূচনা হয়, তখন জন লক, ভলতেয়ার বা রুশোর মতো দার্শনিকরা মানুষের ‘ব্যক্তিগত স্বাধীনতা’ ও ‘অধিকার’ নিয়ে কথা বলতে শুরু করেন। চার্চ এবং সামন্ততান্ত্রিক সমাজ কাঠামোর পাশাপাশি ঐতিহ্যগত পারিবারিক কর্তৃত্বের বিরুদ্ধেও এক ধরনের নীরব বিদ্রোহ শুরু হয়। মানুষ বুঝতে শেখে, পরিবারের ইচ্ছার বাইরেও তার একটি নিজস্ব জীবন আছে। এটি ধীরে ধীরে যৌথ পরিবার প্রথাকে ভেঙে দেয়।

আমরা ইউরোপের এই ধ্বংসের ইতিহাস থেকে শিক্ষা না নিয়ে, অন্ধভাবে তাদের সেই লাইফস্টাইলকেই ‘আধুনিকতা’ বা ‘স্মার্টনেস’ মনে করে আপন করে নিচ্ছি। আমাদের দেশেও এখন দ্রুত যৌথ পরিবার ভেঙে একক পরিবার হচ্ছে। ইউরোপে পরিবার ভাঙলেও সেখানে রাষ্ট্রের একটি শক্তিশালী ‘সোশ্যাল সেফটি নেট’ বা সামাজিক নিরাপত্তা বলয় আছে (যেমন : ওল্ড-এজ হোম বা রাষ্ট্রীয় ভাতা)। কিন্তু আমাদের দেশে রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা নেই। ফলে এ দেশের সন্তানরা যখন ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যবাদে উদ্বুদ্ধ হয়ে মা-বাবাকে ত্যাগ করে, তখন সেই মা-বাবাদের পরিণতি ইউরোপের চেয়েও শতগুণ বেশি অমানবিক ও করুণ হয়। ইউরোপের পরিবার প্রথার মৃত্যু আমাদের জন্য এক জীবন্ত সতর্কবার্তা।

আজকের যে তরুণ সমাজ বা যেসব ছেলের বউরা ভাবছেন শাশুড়ি বা বৃদ্ধ মা-বাবা সংসারের ‘বোঝা’, কিংবা যে সন্তানরা ক্ষমতার দাপটে মায়ের ঋণ ভুলে যাচ্ছেন, প্রকৃতির নিখুঁত বিচার কিন্তু তাদের দিকেই ধেয়ে আসছে। এই পচন যদি আমরা এখনই না রুখতে পারি, তবে আগামী দিনে প্রতিটি উচ্চশিক্ষিত সন্তানের ফ্ল্যাটই একেকটি অন্ধকূপে পরিণত হবে। যে মা নিজের জীবনের সমস্ত আলো বিলিয়ে দিয়ে সন্তানকে বড় করেন, শেষ বয়সে এসে সেই সন্তানের ঘরেই তাকে কেন এমন অন্ধকার, নোংরা আর পরিত্যক্ত অবস্থায় মরতে হবে? এই আত্মকেন্দ্রিকতার অভিশাপ কিন্তু ঘুরেফিরে সেই সন্তানের ওপরই পড়বে। মিরপুরের এ ঘটনা কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়; এটি আমাদের সমাজের সেই তথাকথিত ‘উচ্চশিক্ষিত ও আধুনিক’ সন্তানদের ভেতরের কুৎসিত ও পচে যাওয়া মনস্তত্ত্বেরই বহিঃপ্রকাশ। নুরজাহান বেগমের লাশ উদ্ধার হয়নি, উদ্ধার হয়েছে আমাদের মানবিকতার এক গলিত শবদেহ।

 

লেখক : সাবেক উপদেষ্টা, ধর্মবিষয়ক মন্ত্রণালয়, অন্তর্বর্তী সরকার