Image description

সহিদুল আলম স্বপন

বিশ্বের মানচিত্রে বাংলাদেশ আজ একটি উদীয়মান অর্থনীতির প্রতীক। গার্মেন্টস শিল্পে বৈশ্বিক অবস্থান, রেমিট্যান্সের সমৃদ্ধ প্রবাহ, ডিজিটাল বাংলাদেশের স্বপ্ন সবকিছু মিলিয়ে একটি আত্মবিশ্বাসী জাতির ছবি আঁকা হচ্ছে। কিন্তু যখন প্রশ্ন আসে উচ্চশিক্ষার মান এবং বিশ্ব র‍্যাংকিংয়ে বাংলাদেশের অবস্থানের, তখন সেই ছবিতে একটি বেদনাদায়ক ফাটল স্পষ্ট হয়ে ওঠে। ২০২৬ সালের QS ওয়ার্ল্ড ইউনিভার্সিটি র‍্যাংকিংয়ে দেশের সর্বোচ্চ বিদ্যাপীঠ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ৪০১-৫০০ এর ব্র্যাকেটে অবস্থান করছে, আর বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় বা বুয়েট ৫০১-৫৫০ এ। দেশের অন্য কোনো বিশ্ববিদ্যালয় শীর্ষ ছয়শোর মধ্যেও নেই। টাইমস হায়ার এডুকেশন র‍্যাংকিংয়ে ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয় ৮০০ থেকে ১০০০ এর মধ্যে, আর বাকিরা হাজারের উপরে। একটি দেশের মেধাবী প্রজন্মের জন্য এই চিত্র কেবল হতাশার নয়, এটি একটি সতর্কবার্তাও বটে।

 

প্রশ্ন হলো, কেন এই পরিস্থিতি? এর উত্তর খুঁজতে গেলে গভীরে যেতে হবে। প্রথমত, বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো মূলত শিক্ষাদানকেন্দ্রিক প্রতিষ্ঠান হিসেবে পরিচালিত হয়, গবেষণাকেন্দ্রিক নয়। বিশ্বমানের র‍্যাংকিং নির্ধারণে গবেষণা প্রকাশনা ও সাইটেশন সংখ্যা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মানদণ্ড। অথচ আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে আন্তর্জাতিক মানের পিয়ার-রিভিউড জার্নালে প্রকাশিত গবেষণাপত্রের সংখ্যা হতাশাজনকভাবে কম। দ্বিতীয়ত, শিক্ষা খাতে বাজেট বরাদ্দ দেশের মোট জিডিপির মাত্র দুই শতাংশেরও কম, যেখানে ইউনেস্কো সুপারিশ করে কমপক্ষে ছয় শতাংশ। এই অপর্যাপ্ত বিনিয়োগ গবেষণাগার, গ্রন্থাগার, ডিজিটাল পরিকাঠামো এবং দক্ষ শিক্ষক নিয়োগে সরাসরি বাধা তৈরি করে। তৃতীয়ত, বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে শিক্ষক-শিক্ষার্থীর অনুপাত আন্তর্জাতিক মানের চেয়ে অনেক বেশি, ফলে একজন শিক্ষকের পক্ষে ব্যক্তিগত মনোযোগ দেওয়া এবং একই সাথে গবেষণায় সময় দেওয়া প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ে। চতুর্থত, নিয়োগ প্রক্রিয়ায় রাজনৈতিক প্রভাব ও স্বজনপ্রীতি মেধাভিত্তিক শিক্ষক নিয়োগকে বাধাগ্রস্ত করে। পঞ্চমত, আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থী ও শিক্ষকের অনুপাতও র‍্যাংকিংয়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ মানদণ্ড, কিন্তু আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে বিদেশি শিক্ষার্থী ও গবেষকদের উপস্থিতি নগণ্য। ভর্তি জটিলতা, আবাসন সমস্যা এবং ইংরেজিতে পর্যাপ্ত কোর্সের অভাব এর প্রধান কারণ।

এখন তুলনামূলক দৃষ্টিভঙ্গিতে দেখা যাক পৃথিবীর অন্যান্য উন্নয়নশীল দেশ কীভাবে এই চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করেছে। চীন ১৯৯৫ সালে '২১১ প্রজেক্ট' এবং ১৯৯৮ সালে '৯৮৫ প্রজেক্ট' চালু করে শতাধিক বিশ্ববিদ্যালয়ে তিন বিলিয়ন ডলারেরও বেশি বিনিয়োগ করেছে। ফলে আজ পিকিং বিশ্ববিদ্যালয় ও সিংহুয়া বিশ্ববিদ্যালয় বিশ্বের শীর্ষ ত্রিশের মধ্যে স্থান করে নিয়েছে। দক্ষিণ কোরিয়া 'ব্রেইন কোরিয়া ২১' প্রকল্পে ৩.৫ ট্রিলিয়ন কোরিয়ান ওয়ান বিনিয়োগ করে তাদের গবেষণা বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে আন্তর্জাতিক মানে নিয়ে গেছে। সিঙ্গাপুরের ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি ইয়েল বিশ্ববিদ্যালয়সহ বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর সাথে যৌথ গবেষণা ও ডুয়েল ডিগ্রি প্রোগ্রাম চালু করে আজ বিশ্বের শীর্ষ দশে অবস্থান করছে। ব্রাজিল 'সায়েন্স উইদাউট বর্ডার্স' প্রকল্পের মাধ্যমে এক লক্ষেরও বেশি বিজ্ঞান শিক্ষার্থীকে বিদেশে পাঠিয়েছে এবং বিদেশি গবেষকদের দেশে আমন্ত্রণ জানিয়ে জ্ঞানের বিনিময়কে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিয়েছে। ভারত আইআইটি ও আইআইএম প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে বিশেষায়িত গবেষণা প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলেছে, যেগুলো আজ বৈশ্বিক মানদণ্ডে সম্মানজনক অবস্থানে রয়েছে।

বাংলাদেশের জন্য এই অভিজ্ঞতাগুলো অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক। একটি উন্নয়নশীল দেশ হিসেবে আমাদের সীমাবদ্ধতা আছে, কিন্তু অসম্ভব কিছু নেই। প্রথমেই প্রয়োজন একটি সুনির্দিষ্ট জাতীয় উচ্চশিক্ষা উন্নয়ন নীতিমালা প্রণয়ন, যেখানে গবেষণাকে কেন্দ্রে রাখতে হবে। শিক্ষা খাতে জিডিপির কমপক্ষে চার থেকে পাঁচ শতাংশ বরাদ্দ নিশ্চিত করতে হবে এবং সেই অর্থের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ গবেষণা ও উদ্ভাবনে ব্যয় করতে হবে। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে 'রিসার্চ ইনসেনটিভ' বা গবেষণা প্রণোদনা ব্যবস্থা চালু করতে হবে, যাতে শিক্ষকরা আন্তর্জাতিক জার্নালে গবেষণা প্রকাশে উৎসাহিত হন। শিক্ষক নিয়োগে রাজনৈতিক প্রভাব সম্পূর্ণ বন্ধ করে মেধা ও গবেষণা অভিজ্ঞতাকে একমাত্র মানদণ্ড হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে হবে।

এর পাশাপাশি, বিশ্বের শীর্ষ বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর সাথে যৌথ গবেষণা চুক্তি, শিক্ষার্থী ও শিক্ষক বিনিময় কর্মসূচি এবং ডুয়েল ডিগ্রি প্রোগ্রাম চালু করতে হবে। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর ওয়েবসাইট আন্তর্জাতিক মানে হালনাগাদ রাখা, ইংরেজি মাধ্যমে কোর্স অফার করা এবং বিদেশি শিক্ষার্থীদের জন্য ভর্তি প্রক্রিয়া সহজ করা এখন সময়ের দাবি। শিল্প ও বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে সেতুবন্ধন তৈরি করে প্রায়োগিক গবেষণাকে উৎসাহিত করতে হবে। বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকেও কেবল মুনাফামুখী না হয়ে গবেষণায় বিনিয়োগ বাড়াতে নিয়ন্ত্রক সংস্থার মাধ্যমে বাধ্য করতে হবে।

তরুণ প্রজন্মের কথা আলাদাভাবে বলতে হয়। বাংলাদেশের মোট জনসংখ্যার বিশাল একটি অংশ তরুণ। এই জনমিতিক সুবিধা, যাকে অর্থনীতিবিদরা 'ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড' বলেন, তা কাজে লাগাতে না পারলে এটি বোঝায় পরিণত হবে। একজন তরুণ শিক্ষার্থী যখন দেখেন তার দেশের বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিগ্রি আন্তর্জাতিক বাজারে যথেষ্ট স্বীকৃতি পাচ্ছে না, তখন মেধা পাচার বা 'ব্রেইন ড্রেইন' অনিবার্য হয়ে ওঠে। সেরা মেধাবীরা বিদেশে পাড়ি জমান এবং সেখানেই থেকে যান। এই চক্র ভাঙতে হলে দেশেই বিশ্বমানের গবেষণার সুযোগ তৈরি করতে হবে।

গ্লোবাল ভিলেজের অংশীদার হতে হলে কেবল পণ্য রপ্তানি যথেষ্ট নয়, জ্ঞান ও উদ্ভাবন রপ্তানিতেও সক্ষম হতে হবে। সেই লক্ষ্যে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে কেবল ডিগ্রি বিতরণের কেন্দ্র না রেখে জ্ঞান উৎপাদনের কেন্দ্রে পরিণত করাই এখন সবচেয়ে জরুরি জাতীয় কাজ। র‍্যাংকিং কোনো লক্ষ্য নয়, এটি একটি পরিমাপ। লক্ষ্য হওয়া উচিত মানসম্পন্ন শিক্ষা, গভীর গবেষণা এবং উদ্ভাবনী মানবসম্পদ। সেই পথে হাঁটলে র‍্যাংকিং আপনাআপনিই উঠে আসবে। মশাল জ্বালানোর দায়িত্ব নীতিনির্ধারকদের, কিন্তু সেই আলোয় এগিয়ে যাওয়ার শক্তি এই দেশের তরুণদেরই আছে এটা বিশ্বাস করতে হবে এবং সেই বিশ্বাসকে কর্মে রূপ দিতে হবে।

লেখক: সুইজারল্যান্ডভিত্তিক বেসরকারি ব্যাংকিং আর্থিক অপরাধ বিশেষজ্ঞ কলামিস্ট ও কবি