সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে একটি ভিডিও ছড়িয়ে দিয়ে দাবি করা হচ্ছে, কুমিল্লা-৪ আসনের সংসদ সদস্য হাসনাত আবদুল্লাহর বাসায় সেনাবাহিনী অভিযান চালিয়ে বিপুল পরিমাণ অস্ত্র উদ্ধার এবং তিনজনকে গ্রেপ্তার করেছে। তবে যাচাই করে দেখা গেছে, দাবিটি সত্য নয়। সাভারে যৌথ বাহিনীর অভিযানে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক ছাত্রদল নেতা ও তার তিন সঙ্গীকে অস্ত্রসহ গ্রেফতারের ঘটনাকে উক্ত দাবিতে প্রচার করা হয়েছে।
গত ৬ মার্চ ফ্যাক্টচেকিং প্রতিষ্ঠান রিউমার স্ক্যানার দাবিটি যাচাই করে প্রতিবেদন প্রকাশ করলে একাধিক সংবাদমাধ্যমও রিউমর স্ক্যানারের সূত্রে প্রতিবেদনটি প্রকাশ করে। এরমধ্যে রয়েছে দৈনিক যুগান্তর, বাংলাভিশন, আমার দেশ, বিডি টুডে, বিডি২৪লাইভ এবং আমাদেরসময় ডট কম।
কিন্তু দেখা গেছে, রিউমর স্ক্যানারের প্রতিবেদনটি “হাসনাত আবদুল্লাহর বাসায় সেনা অভিযান ও অস্ত্র উদ্ধারের ভুয়া দাবি ভাইরাল” শিরোনামে করা হলেও উক্ত সংবাদমাধ্যমগুলো প্রতিবেদনটি বিভ্রান্তিকর নানা শিরোনামে প্রচার করেছে।
রিউমর স্ক্যানার প্রতিবেদনটি প্রকাশ করে ৬ মার্চ দুপুর ১২টা ৩৪ মিনিটে। এরপর দৈনিক যুগান্তর সর্বপ্রথম সেদিন সন্ধ্যা ৭টা ২০ মিনিটে প্রতিবেদনটি “‘হাসনাতের বাসায় অভিযান’ নিয়ে যা জানা গেল” শিরোনামে প্রকাশ করে। এরপর ৭টা ৫১ মিনিটে বাংলাভিশন সেটি “হাসনাত আবদুল্লাহর বাড়িতে সেনা অভিযান, যা জানা গেলো” শিরোনামে প্রকাশ করে। রাত ৮টা ২ মিনিটে “হাসনাতের বাসায় অভিযানের বিষয়ে যা জানা গেল” শিরোনামে প্রকাশ করে আমার দেশ। রাত ৮টা ১৩ মিনিটে প্রকাশ করে বিডি টুডে “হাসনাতের বাসায় অভিযানের বিষয়ে যা জানা গেল” শিরোনামে এবং রাত ৮ টা ১৬ মিনিটে “”হাসনাতের বাসায় অভিযান’ নিয়ে যা জানা গেল” শিরোনামে প্রকাশ করে আমাদেরসময় ডট কম। পরের দিন অর্থাৎ ৭ মার্চ দুপুর ১টা ২০ মিনিটে প্রকাশ করে বিডি২৪লাইভ “‘হাসনাতের বাসায় অভিযান’ নিয়ে যা জানা গেল” শিরোনামে।
বিভ্রান্ত হচ্ছেন পাঠকরা
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিস্তারিত সংবাদ না পড়ে কেবল শিরোনাম দেখেই তা শেয়ার করার এক ধরনের প্রবণতা রয়েছে পাঠকদের মধ্যে। যুক্তরাষ্ট্রের কলাম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয় এবং ফ্রেঞ্চ ন্যাশনাল ইনস্টিটিউটের একদল গবেষকের করা একটি গবেষণার বরাতে দ্য ওয়াশিংটন পোস্ট এক প্রতিবেদনে জানায়, সামাজিক মাধ্যমে শেয়ার করা লিংকের প্রায় ৫৯ শতাংশই কখনো ক্লিক করা হয় না। অর্থাৎ, বেশিরভাগ মানুষ পুরো খবরটি না পড়েই সেটি শেয়ার করেন।ফলে শিরোনাম বিভ্রান্তিকর হলে পাঠকরাও বিভ্রান্ত হন।
ঠিক এখানেও উল্লিখিত সংবাদমাধ্যমগুলোর এধরনের শিরোনামে বিভ্রান্ত হতে দেখা গেছে পাঠকদের। অনেক পাঠক সম্পূর্ণ প্রতিবেদনটি না পড়ে শুধু শিরোনামটি দেখে মনে করেছেন, হাসনাত আব্দুল্লাহর বাসায় সেনাবাহিনী অভিযান চালিয়েছে।
বাংলাভিশনের ফেসবুক পেজে এরকম শিরোনামে একটি ফটোকার্ড পোস্ট করা হয়েছে। পোস্টটিতে এখন পর্যন্ত প্রায় ৪৪ হাজার রিয়েক্ট পড়েছে। পোস্টে কমেন্ট করেছেন প্রায় সাড়ে ৩ হাজার মানুষ এবং শেয়ার করেছেন প্রায় ১ হাজার জন। পোস্টটির কমেন্ট সেকশনে গেলে দেখা যায়, অনেকেই মনে করেছেন হাসনাত আবদুল্লাহর বাসায় সেনাবাহিনী অভিযান চালিয়ে বিপুল পরিমাণ অস্ত্র উদ্ধার এবং তিনজনকে গ্রেপ্তার করেছে।
Taj Udden Mentou নামে একজন সেখানে কমেন্ট করেছেন, “লুটপাত কারীদের আস্তানায় অভিযান চালানো জরুরী।” এছাড়াও Biplob Shikder নামে একজন কমেন্ট করেছেন, “সন্ত্রাসীর বাড়িতে সেনা অভিযান হতেই পারে।” Avoy Sujit নামে একজন পাঠক মন্তব্য করেছেন, “তাদের কর্মকাণ্ডের কারণে আর মনে হয় না আগামী ১০০ বছরের মধ্যে ছাত্ররা রাজপথে লড়াই করে কোন দলকে পদত্যাগ করাতে পারবে।এই এনসিপি প্রথমে যে উদ্দেশ্যে রাজ পথে নেমে ছিলো পরবর্তীতে তারা এই উদ্দেশ্য থেকে সড়ে দাঁড়ায়। তারা ক্ষমতার লোভে হিংস্রের মত গর্জন করে এটা কোন গনতন্ত্র নয়। আরো কিছু দেখার বাকী রইলো অপেক্ষায় রইলাম?”
Aklack Uzzaman Shamim নামে একজন মন্তব্য করেছেন, “যদি সত্যি হয়ে থাকে তবে ধিক্কার সেনাবাহিনীর ঐ কর্মকর্তা কে যিনি হাসনাত আবদুল্লাহর বাড়িতে সেনা অভিযানের অনুমতি দিয়েছেন। কি পেয়েছেন জনগণের সন্তোষ্টির জন্য তা প্রকাশ করা হউক।” Faruque Ahmed নামে একজন মন্তব্য করেছেন, “If true, it's dangerous alarming, must be questioned and should have lawful measures.”
অনেকেই ফটোকার্ডটি শেয়ার করে মন্তব্য করেছেন। Md Tanvir Ahmad লিখেছেন ,”আসিফ মাহমুদ এমনে এমনে বলে নাই যে তাদের সশস্ত্র হামলার প্রস্তুতি ছিলো।” Md Nurnobi Matabbor নামে একজন শেয়ার করে দাবি করেছেন, “জুলাই জঙ্গিদের গ্রেফতার করা হোক।”
এছাড়াও দৈনিক আমার দেশের ফেসবুক পেইজেও ঠিক একইধরনের শিরোনামে একটি ফটোকার্ড পোস্ট করা হয় । শিরোনাম দেখে আসলেই হাসনাতের বাসায় অভিযান চালানো হয়েছে মনে করে Zahar Islam Sarkar নামে একজন কমেন্ট করেছেন, “মববাজ সন্ত্রাসীর বাড়ির থেকে অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার অভিযান চলছে।”
বিভ্রান্তিকর শিরোনামের সমালোচনা করছেন পাঠকরা
অনেক পাঠক বুঝতে পেরেছেন, এটি একটি বিভ্রান্তিকর শিরোনাম। এরকম বিভ্রান্তিকর শিরোনামের সমালোচনা করে কমেন্ট করতে দেখা গেছে অনেক পাঠককে। মোঃ রহিছ সিকদার নামে একজন পাঠক বাংলাভিশনের ওই ফটোকার্ডের পোস্টে কমেন্ট করেছেন, “বাংলাভিশন একটি অন্যতম গণমাধ্যম আপনাদের কি দর্শকের অভাব পড়ছে যে এভাবে শিরোনাম করতে হবে?”
এছাড়াও Mst Jannatul Ferdous নামে একজন কমেন্ট করেছেন, “এমন শিরোনাম দেন কেন? বললেই হতো হাসনাতকে নিয়ে প্রচারিত খবরটি মিথ্যা এটা অন্য অভিযানের।”
আমার দেশের ফটোকার্ডের পোস্টে Md Al amin Akon নামে একজন পাঠক সম্পূর্ন প্রতিবেদনটি পড়ে যাতে অন্যরা বিভ্রান্ত না হয় সেজন্য কমেন্ট করেছেন, “তার বাসায় এমন কোনো অভিযানও হয়নি। প্রকৃতপক্ষে সাভারে যৌথ বাহিনীর অভিযানে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক ছাত্রদল নেতা ও তার তিন সঙ্গীকে অস্ত্রসহ গ্রেপ্তারের ঘটনাকে উক্ত দাবি হিসেবে প্রচার করা হয়েছে।” Md. Siddikur Rahman Chowdary নামে আরেকজন কমেন্ট করেছেন, “"যা জানা গেলো" টাইপের হলুদ সাংবাদিকতা বাদ দেন এবার!”