Image description

গোটা বিশ্বের অভিজাত ও বিলাসবহুল এলাকাগুলোর একটি সংযুক্ত আরব আমিরাতের পাম জুমেইরাহ এলাকা। দুবাইয়ের পারস্য উপসাগরে অবস্থিত এ কৃত্রিম দ্বীপে তিন বছর আগে অ্যাপার্টমেন্ট কিনেছেন এক বাংলাদেশী।

২০২৪ সালের ৫ আগস্টের গণ-অভ্যুত্থান পরবর্তী সময়ে সপরিবারে দেশ থেকে পালিয়ে গিয়ে ওই বিলাসবহুল অ্যাপার্টমেন্টেই বসবাস করছেন তিনি। গত শনিবার রাতে পাম জুমেইরাহ এলাকায় আঘাত হানে ইরান থেকে ছোড়া ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র। বিস্ফোরণের বিকট শব্দ আর আগুনের শিখায় আতঙ্ক ছড়ায় অভিজাত এলাকাটিতে।

পরিবার নিয়ে আতঙ্কে সময় কাটানো ওই বাংলাদেশীর সঙ্গে কথা হয় এ প্রতিবেদকের। নাম অপ্রকাশিত রাখার শর্তে বণিক বার্তাকে তিনি বলেন, ‘ইফতারের পরপরই পাম জুমেইরাহ এলাকায় বিস্ফোরণের বিকট শব্দ হয়। দূর থেকে আগুনের শিখা ও ধোঁয়াও দেখেছি। এ দৃশ্য দেখার পর থেকেই পরিবারের সবাই আতঙ্কিত। শনিবার দুপুরের পর থেকেই বাসার বাইরে যেতে পারছি না। আরো অনেক বাংলাদেশীর সঙ্গে কথা হয়েছে। তারাও আতঙ্কে আছে। বিমান চলাচল বন্ধ থাকায় অন্য কোনো দেশেও যেতে পারছি না।’

ইরানের ওপর গত শনিবার সকালে যৌথ হামলা শুরু করে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলি বাহিনী। এ হামলায় ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনিসহ দেশটির বহু মন্ত্রী ও উচ্চপদস্থ সামরিক কর্মকর্তা নিহত হয়েছেন। জবাবে উপসাগরীয় অঞ্চলের দেশগুলোয় থাকা যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ঘাঁটি ও অন্যান্য স্থাপনায় পাল্টা হামলা চালায় ইরান। প্রতিশোধমূলক এ হামলায় এখন পর্যন্ত সংযুক্ত আরব আমিরাতে অন্তত তিনজন নিহত এবং ৫৮ জন আহত হয়েছেন। নিহতদের মধ্যে একজন বাংলাদেশীও রয়েছেন। তার নাম সালেহ আহমদ, যিনি আজমান প্রদেশে ডেলিভারি ম্যান হিসেবে কর্মরত ছিলেন। তার বাড়ি মৌলভীবাজারের বড়লেখা উপজেলায়।

ইরানি হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত স্থানগুলোর মধ্যে দুবাই আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরও রয়েছে। গতকাল সংযুক্ত আরব আমিরাতের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, তারা ১৬৫টি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র শনাক্ত করেছে, যার মধ্যে ১৫২টি ধ্বংস এবং দুটি ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহত করা হয়েছে। পাশাপাশি শনাক্ত করা হয়েছে ৫৪১টি ইরানি ড্রোনও। এর মধ্যে ৫০৬টি প্রতিহত ও ধ্বংস করা হয়েছে বলে আমিরাতের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় দাবি করেছে।

দুবাইসহ আমিরাতের বিভিন্ন শহরে বসবাসকারী এক ডজনের বেশি বাংলাদেশীর সঙ্গে কথা বলেছে বণিক বার্তা। এর মধ্যে বেশ কয়েকজন ধনকুবেরও রয়েছেন, যারা দেশটির বিভিন্ন শহরে বাড়ি-গাড়ি, অ্যাপার্টমেন্টসহ বিপুল স্থাবর সম্পদ কিনেছেন। এ রকমই একজন বাংলাদেশী ইকবাল মাহমুদ (ছদ্মনাম), যিনি এক দশক ধরে দুবাইয়ে স্থায়ীভাবে বসবাস করছেন। দেশটির রাজধানী আবু দুবাইসহ একাধিক রাজ্যে তার রয়েছে বেশ কয়েকটি অ্যাপার্টমেন্ট, অফিস ও শো-রুম।

বাংলাদেশের বস্ত্র, তৈরি পোশাক, অবকাঠামো নির্মাণসহ বিভিন্ন খাতে এক ডজনের বেশি কোম্পানির মালিক এ ব্যবসায়ী বণিক বার্তাকে বলেন, ‘দুবাইয়ে আমার অ্যাপার্টমেন্ট থেকে ৩০০ মিটারের মধ্যে ইরানি ড্রোন পড়েছে। শনিবার রাত ১১টার দিকের ওই হামলায় একটি বাড়িতে আগুন ধরে যায়। রাতে আরো বেশ কয়েকটি বিস্ফোরণের শব্দ শুনেছি। রোববারের পরিস্থিতি ছিল আরো খারাপ। মিসাইলের শব্দে ঘুমাতে পারছি না।’

গণ-অভ্যুত্থানের মুখে ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার টানা দেড় দশকের শাসনামলে দেশের ব্যাংক খাত থেকে কয়েক লাখ কোটি টাকা লোপাট হওয়ার অভিযোগ রয়েছে। নামী-বেনামী বিভিন্ন কোম্পানির নামে বের করে নেয়া এসব ঋণ খেলাপি হয়ে যাওয়ায় ব্যাংক খাতে এর পরিমাণ দাঁড়িয়েছে প্রায় সাড়ে ৬ লাখ কোটি টাকায়। খেলাপি এ ঋণের বড় একটি অংশ দেশ থেকে পাচার হয়েছে বলে অন্তর্বর্তী সরকার গঠিত শ্বেতপত্র কমিটির প্রতিবেদনে তুলে ধরা হয়। শ্বেতপত্রে বলা হয়, ২০০৯ সাল-পরবর্তী ১৫ বছরে বাংলাদেশ থেকে ২৮ উপায়ে দুর্নীতির মাধ্যমে ২৩৪ বিলিয়ন ডলার বিদেশে পাচার হয়েছে। বাংলাদেশী মুদ্রায় এ অর্থের পরিমাণ প্রায় ২৮ লাখ কোটি টাকা (প্রতি ডলার ১২০ টাকা হিসাবে)। সে হিসাবে প্রতি বছর গড়ে ১ লাখ ৮৬ হাজার কোটি টাকা পাচার হয়েছে।

দেশ থেকে পাচারকৃত বিপুল এ অর্থের বড় একটি অংশের গন্তব্য সংযুক্ত আরব আমিরাতে ছিল বলে বিভিন্ন সূত্রে জানা যায়। কেননা মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর মধ্যে কেবল এ দেশটিতেই বিনিয়োগ, সম্পত্তি কেনা ও নগরিকত্ব পাওয়া সহজ ছিল। যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক অলাভজনক সংস্থা সেন্টার ফর অ্যাডভান্সড ডিফেন্স স্টাডিজের (সিফোরএডিএস) সংকলিত তথ্য অনুযায়ী, দুবাইয়ে ৪৬১ বাংলাদেশীর নামে ৯২৯টি নিবন্ধিত সম্পত্তি রয়েছে, যেগুলোর বাজারমূল্য প্রায় ৫ হাজার কোটি টাকা। প্রকৃতপক্ষে দাম আরো বেশি হতে পারে। এসব সম্পদের মালিকানায় দেশের রাজনীতিবিদ, বড় ব্যবসায়ী ও ব্যাংকার, আমলাদের নাম উঠে এসেছে। মূলত বাংলাদেশ থেকে অর্থ পাচারের মাধ্যমেই এসব সম্পদ গড়ে তোলা হয় বলে অভিযোগ রয়েছে।

বিত্তবান বিদেশীদের আকৃষ্ট করতে ২০১৯ সালে এ ভিসা চালু করে সংযুক্ত আরব আমিরাত। ২ মিলিয়ন ডলারের সমপরিমাণ অর্থসম্পত্তির মালিকানা থাকলেই এ ভিসার জন্য আবেদন করা যেত। শর্ত সহজীকরণের পাশাপাশি ভিসা প্রক্রিয়ার জটিলতাগুলোও সে সময় দূর করা হয়েছিল। বাংলাদেশী ধনকুবেরদের অনেকেই ওই সময় ইউএইর দেয়া এ সুযোগ লুফে নেন। ব্যাংক চেয়ারম্যান, পরিচালক কিংবা প্রভাবশালী এমডি; রাজনীতিবিদ, পোশাক ব্যবসায়ী, রেল ও সড়কের সামনের সারির ঠিকাদারসহ দেশের বড় ও মাঝারি অনেক পুঁজিপতিও এখন আমিরাতের গোল্ডেন ভিসাধারী। তবে ২০২৪ সালের শুরুর দিকে গোল্ডেন ভিসাসহ বাংলাদেশীদের জন্য ভিসা প্রক্রিয়ায় নানা শর্ত ও বিধিনিষেধ আরোপ করে আমিরাত কর্তৃপক্ষ।

ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর আওয়ামী লীগ নেতাদের অনেকে সংযুক্ত আরব আমিরাতে পালিয়ে যান। কেউ কেউ ওই সময় অন্য দেশে পালালেও বর্তমানে আমিরাতের বিভিন্ন শহরে বসবাস করছেন। নারায়ণগঞ্জের প্রভাবশালী আওয়ামী লীগ নেতা শামীম ওসমানকেও সম্প্রতি দুবাইয়ের শপিং মলে দেখা গেছে। নাম অপ্রকাশিত রাখার শর্তে শেখ হাসিনার মন্ত্রিসভার সাবেক এক মন্ত্রী বণিক বার্তাকে বলেন, ‘দুবাইসহ আমিরাতের বিভিন্ন শহরে আওয়ামী লীগের গুরুত্বপূর্ণ অর্ধশতাধিক নেতা বর্তমানে অবস্থান করছেন। তাদের অনেকেরই আগে থেকে গোল্ডেন ভিসা ছিল। এখানে অনেকের বাড়ি-গাড়ি রয়েছে। ইরানের হামলার পর সবাই উদ্বিগ্ন।’

বণিক বার্তার সংযুক্ত আরব আমিরাত প্রতিনিধি গোলাম সরওয়ার জানান, শনিবার সকাল থেকে রোববার দুপুর পর্যন্ত আবুধাবি রেসিডেন্সি এলাকা ও পাম জুমেইরাহ ফেয়ার মন্ট হোটেলে মিসাইল হামলা হয়েছে। আর জাবেল আলী পোর্ট এলাকা, দুবাই আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের টার্মিনাল-৩, বুরুজ আল আরব হোটেল ও বুরুজ খলিফা এলাকার দুবাই মলের পাশে ড্রোন হামলা হয়েছে। আমিরাত সরকারের পক্ষ থেকে সবার মোবাইলে হামলার বিষয়ে সতর্কবার্তা যাচ্ছে। সবাইকে দরজা-জানালা বন্ধ করে ঘরে থাকতে বলা হয়েছে। কোথাও একত্র হওয়ার বিষয়ে জারি করা হয়েছে নিষেধাজ্ঞা।

এদিকে প্রবাসী বাংলাদেশীদের সহযোগিতায় হটলাইন নম্বর ও ই-মেইল সেবা চালু করেছে আবুধাবির বাংলাদেশ দূতাবাস। এ বিষয়ে গতকাল রাতে বাংলাদেশী রাষ্ট্রদূত তারেক আহমেদ এক জরুরি ভিডিও বার্তায় বলেন, ‘শনিবার দূতাবাস থেকে দেয়া বিজ্ঞপ্তির বিষয়গুলো আপনাদের স্মরণ করিয়ে দিচ্ছি। সোমবার (আজ) বাংলাদেশী দূতাবাস খোলা থাকবে। কেবল অতি জরুরি কাজ হলে তবেই আপনারা দূতাবাসে আসবেন। অন্যথায় বাসায় অবস্থান করুন।’

এ মুহূর্তে বাংলাদেশের তৃতীয় বৃহত্তম রেমিট্যান্স আহরণের দেশ আরব আমিরাত। অভিবাসী শ্রমিকসহ দেশটির বিভিন্ন শহরে প্রায় ১২ লাখ বাংলাদেশী বসবাস করছেন বলে দূতাবাস সূত্রে জানা গেছে। চলতি অর্থবছরের প্রথম ছয় মাসে আমিরাতে থাকা প্রবাসী বাংলাদেশীরা ২০৬ কোটি ডলার দেশে পাঠিয়েছেন। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে দেশটি থেকে আসা রেমিট্যান্সের পরিমাণ ছিল ৪১৭ কোটি ডলার।