Image description
মোকাবিলা করতে হবে ৫ চ্যালেঞ্জ

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নিরঙ্কুশ বিজয় নিয়ে প্রায় দুই দশক পর সরকার গঠন করেছে বিএনপি। ক্ষমতা গ্রহণের পর জনগণকে দেওয়া নির্বাচনী নানান প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন এখন বিএনপি সরকারের মনোযোগের কেন্দ্রবিন্দুতে। অন্যদিকে, জাতীয় নির্বাচনের পর স্থানীয় সরকার নির্বাচনে মনোযোগী হয়েছে পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে বিএনপির প্রধান রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ ও সংসদের বিরোধী দল হিসেবে আবির্ভূত হওয়া জামায়াতে ইসলামী। নিজেদের সাংগঠনিক ইতিহাসে সংসদ নির্বাচনে সবচেয়ে ভালো ফলে উজ্জীবিত দলটি এবার স্থানীয় সরকার নির্বাচনে নিরঙ্কুশ জয়ের লক্ষ্যে আটঘাট বেঁধে মাঠে নামতে যাচ্ছে।

একই নির্বাচনের প্রস্তুতি নিচ্ছে তরুণদের নতুন রাজনৈতিক দল জাতীয় নাগরিক পার্টিও (এনসিপি)। তবে ক্ষমতাসীন বিএনপি এখনই স্থানীয় সরকার নির্বাচনে মনোযোগ দিচ্ছে না। তৃণমূল গুছিয়ে সুসংগঠিত ও শক্তিশালী সংগঠন নিয়েই স্থানীয় সরকারের নির্বাচনে অংশ নিতে চায় দলটি। কেননা, জাতীয় নির্বাচনে অর্ধশতাধিক আসনে দলের নেতারা ‘বিদ্রোহী প্রার্থী’ হওয়ায় তৃণমূলের বড় এলাকাজুড়ে সংগঠন কার্যত বিভক্ত অবস্থায় রয়েছে। এমন প্রেক্ষাপটে ঈদুল ফিতরের পরপরই তৃণমূল পুনর্গঠনের কাজে হাত দিতে পারে বিএনপি।

স্থানীয় সরকার নির্বাচনে বিএনপিকে মোটা দাগে পাঁচটি চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে হতে পারে বলে মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা। আর এজন্য এখন থেকেই দলটির নীতিনির্ধারকদের সতর্ক হওয়া উচিত বলেও মনে করেন তারা। অবশ্য সংগঠন পুনর্গঠনের মাধ্যমে তৃণমূলকে সুসংগঠিত এবং নির্বাচনী নানান প্রতিশ্রুতির বাস্তবায়ন শুরুর মধ্য দিয়ে সাধারণ মানুষের মন জয় করেই স্থানীয় নির্বাচনে ভালো ফল করতে চায় বিএনপি। সম্ভাব্য চ্যালেঞ্জ সম্পর্কেও সতর্ক থাকার কথা জানিয়েছেন দলটির নেতারা।

জানতে চাইলে বিএনপি চেয়ারম্যানের উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য অ্যাডভোকেট সৈয়দ মোয়াজ্জেম হোসেন আলাল কালবেলাকে বলেন, ‘বিএনপি সদ্য অনুষ্ঠিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে যেসব কার্যক্রমের মাধ্যমে মানুষের মন জয় করে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় এসেছে; এখন দেশ পরিচালনার দায়িত্ব পাওয়ার পর সেই কাজগুলোকে আরও গতিশীল এবং মানুষের আকাঙ্ক্ষার উপযোগী করে তুলতে হবে। আর এটা হলে তা বিএনপিকে স্থানীয় সরকার নির্বাচনে আরও ভালো ফল এনে দেবে।’

স্থানীয় সরকার নির্বাচনকে গণতন্ত্রের প্রাথমিক ভিত্তি উল্লেখ করে এই বিএনপি নেতা বলেন, ‘নির্বাচনটাই তো একটা চ্যালেঞ্জ। স্থানীয় সরকার নির্বাচন তো আরও বড় চ্যালেঞ্জ। কারণ, গণতন্ত্রের প্রাথমিক ভিত্তিই এটা। তবে বিএনপি তো জনগণের রায়েই নির্বাচিত হয়ে বারবার ক্ষমতায় এসেছে। একটা সময় আওয়ামী লীগ দাপটের সঙ্গে ক্ষমতায় ছিল। তখনো কিন্তু বিএনপি বিভিন্ন সিটি করপোরেশন, উপজেলা, পৌরসভায় যে কোনো দলের চেয়ে বেশি জয়লাভ করেছে। এখন পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে বড় সংখ্যক তরুণ ও নারী ভোটার যুক্ত হয়েছে, যারা জয়-পরাজয়ে গুরুত্বপূর্ণ ফ্যাক্টর হিসেবে কাজ করে এবং একই সঙ্গে অমুসলিম সম্প্রদায়ের মানুষরা। সে দিকে আমাদের বিশেষ দৃষ্টি রয়েছে; জাতীয় নির্বাচনের আগেও রেখেছি, এখনো রাখছি এবং সেভাবে আমাদের ভেতরে ভেতরে কাজ চলছে।’

এক প্রশ্নের জবাবে আলাল বলেন, ‘দলের শৃঙ্খলার জন্য যেটা করা দরকার, অর্থাৎ যেখানে উদারতা দেখানো প্রয়োজন সেখানে দল উদারতা দেখাচ্ছে; আবার যেখানে কঠোর হওয়া দরকার সেখানে দল কঠোর হচ্ছে।’ অবশ্য তৃণমূল পুনর্গঠন তথা সাংগঠনিক কাঠামোর বিষয়ে দলের সংশ্লিষ্ট ফোরামে এখন পর্যন্ত কোনো আলাপ-আলোচনা হয়নি বলে জানান এই বিএনপি নেতা।

এদিকে ত্রয়োদশ জাতীয় নির্বাচন ও গণভোটের পর স্থানীয় সরকার নির্বাচনের উদ্যোগ নিতে যাচ্ছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। জানা গেছে, স্থানীয় সরকার নির্বাচনগুলো ধাপে ধাপে অনুষ্ঠিত হবে, যা সিটি করপোরেশন দিয়ে শুরু হতে পারে। স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয় সূত্র জানিয়েছে, স্থানীয় সরকারের যে নির্বাচনগুলো অনিবার্য হয়ে পড়েছে, সেগুলো আগে প্রাধান্য পাবে। তবে স্থানীয় সরকার নির্বাচন দলীয় প্রতীকে হবে কি না, সে বিষয়ে জাতীয় সংসদেই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হবে।

ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণসহ দেশের ছয় সিটি করপোরেশনে গত ২২ ফেব্রুয়ারি ছয়জন পূর্ণকালীন প্রশাসক নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। নতুন প্রশাসকদের সবাই সদ্য ক্ষমতায় আসা বিএনপি সম্পৃক্ত। মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে বলা হয়, সিটি করপোরেশনের প্রশাসক পদে রাজনীতিকরা থাকলে জনগণ ভালোভাবে সেবা পাবে এবং জনগণের সঙ্গে দূরত্বটাও কমবে। তবে নতুন করে প্রশাসক নিয়োগ দেওয়ায় শিগগির নির্বাচন অনুষ্ঠান নিয়ে এক ধরনের অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে বলে অনেকে মনে করছেন। এমন প্রেক্ষাপটে সিটি করপোরেশন নির্বাচনগুলো কবে হবে, কিংবা শিগগির অনুষ্ঠিত হবে কি না, সেই প্রশ্নও সামনে আসছে।

স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায়মন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর সম্প্রতি বলেছেন, যত দ্রুত সম্ভব নির্বাচনের মাধ্যমে সব স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানকে সচল করাই সরকারের প্রধান লক্ষ্য। সিটি করপোরেশনের মধ্যে যেটির মেয়াদ আগে শেষ হবে, সেখানে আগে নির্বাচন হবে। নির্বাচন আয়োজনের ক্ষেত্রে অগ্রাধিকার দেওয়া হবে ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ এবং চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনকে। পর্যায়ক্রমে বাকি সিটি করপোরেশন, পৌরসভাসহ অন্য স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানের নির্বাচন আয়োজন করবে সরকার।

বিএনপি নেতারা বলছেন, দীর্ঘ সময় আওয়ামী লীগ সরকারের নির্যাতন-নিপীড়নের মধ্য দিয়ে গেছেন তাদের দলের নেতাকর্মী ও সমর্থকরা। আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর জাতীয় নির্বাচনে অংশগ্রহণ করে বিএনপি। চেয়ারম্যান তারেক রহমান দেশে ফিরে অল্প সময়ের মধ্যে দেশজুড়ে বিস্তর জনসংযোগ ও নির্বাচনী প্রচারের মাধ্যমে জনগণের ভালোবাসায় দলকে ক্ষমতাসীন করেছেন। এখন বিএনপি সরকারি দল। অনেক নেতাই এমপি-মন্ত্রী হয়েছেন। তারা সংসদ, সংসদে আইন প্রণয়ন এবং সরকার পরিচালনা নিয়ে ব্যস্ত থাকবেন। সুতরাং সংগঠন পুনর্গঠন অপরিহার্য। তবে জাতীয় নির্বাচনে ধানের শীষ ও জোট প্রার্থীর বিরুদ্ধে ‘বিদ্রোহী প্রার্থী’ হয়ে বহিষ্কৃত হওয়া নেতাদের ব্যাপারে এখনই ভাবছে না বিএনপি।

বিএনপির নীতিগত সিদ্ধান্ত রয়েছে, দলের যারা এমপি-মন্ত্রী হবেন, অর্থাৎ যারা সরকার পরিচালনায় ব্যস্ত থাকবেন, তাদের পরিবর্তে দলের অন্য নেতাদের সংগঠনে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হবে। যেহেতু দলীয় সরকার ক্ষমতায় রয়েছে, পার্লামেন্টের বাইরে যারা থাকবেন, তারা দলকে শক্তিশালী করবেন, করার দায়িত্বে থাকবেন।

বিএনপির সাংগঠনিক কর্মকাণ্ড প্রসঙ্গে দলটির ঢাকা বিভাগীয় সাংগঠনিক সম্পাদক কাজী সায়েদুল আলম বাবুল কালবেলাকে বলেন, ‘কমিটি গঠন-পুনর্গঠন একটা স্বাভাবিক সাংগঠনিক প্রক্রিয়া। কিছু কমিটির মেয়াদ এরই মধ্যে শেষ হয়ে গেছে; আবার কিছু জায়গায় আহ্বায়ক কমিটি আছে, পূর্ণাঙ্গ কমিটি হয়নি, আমরা কিছুদিন পরে এগুলোতে হাত দেব। সরকারে বিএনপি থাকলেও বিএনপি যেহেতু একটা বৃহৎ সংগঠন, সাংগঠনিক কর্মকাণ্ড ধারাবাহিকভাবে চলতে থাকবে—এতে কোনো ব্যত্যয় হবে না। তা ছাড়া সামনে স্থানীয় সরকার নির্বাচনগুলো পর্যায়ক্রমে হতে থাকবে। সুতরাং দলকে গুছিয়ে সুসংগঠিত রাখতে হবে, দলই আগে।’

স্থানীয় সরকার নির্বাচন নিয়ে বিএনপির প্রস্তুতি প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘সরকার যখন স্থানীয় সরকার নির্বাচনের একটা রূপরেখার দিকে যাবে, তখন আমরাও সাংগঠনিকভাবে মাঠপর্যায়ে সংগঠনকে আরও চাঙ্গা করে ঐক্যবদ্ধভাবে নির্বাচনে যাওয়ার বিষয়ে মনোযোগ দেব।’

স্থানীয় সরকার নির্বাচনের আগে সরকার কতটা সফলতা অর্জন করল, সেটাই বিএনপির জন্য মূল চ্যালেঞ্জ বলে মনে করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক কাজী মোহাম্মাদ মাহবুবুর রহমান। তিনি কালবেলাকে বলেন, ‘বিএনপি সবেমাত্র সরকার গঠন করেছে। এ অবস্থায় আগামী ছয় মাসের মধ্যে যদি স্থানীয় সরকার নির্বাচন হয়, এই অল্প সময়ের মধ্যে সরকারকে সেভাবে মূল্যায়ন করা যাবে না। তবে বিরোধী দলগুলো বা যারা সরকারবিরোধী অবস্থানে থাকবে, তারা সেটা তো উপস্থাপন করবেই। তাই সরকারকে সতর্কভাবে সরকার পরিচালনা করতে হবে। এটাই বিএনপির জন্য মূল চ্যালেঞ্জ।’

স্থানীয় সরকার নির্বাচনে দলের কেউ যাতে বিদ্রোহী প্রার্থী না হতে পারেন, সেদিকটা বিএনপিকে গুরুত্ব দিয়ে ভাবার তাগিদ দেন এই রাষ্ট্রবিজ্ঞানী। তিনি বলেন, ‘ত্রয়োদশ জাতীয় নির্বাচনে দলের বিদ্রোহী প্রার্থীদের মোকাবিলা করে ক্ষমতায় এসেছে বিএনপি। বিদ্রোহীদের কারণে তাদের শক্তি প্রতিদ্বন্দ্বিতায় পড়তে হয়েছিল। স্থানীয় সরকার নির্বাচনে যাতে এর পুনরাবৃত্তি না হয়, সেটা বিএনপিকে গুরুত্বসহকারে ভাবতে হবে। স্থানীয় সরকারের এই নির্বাচনেও যদি বিএনপির একাধিক নেতা প্রার্থী হন, পাশাপাশি জামায়াত থেকে প্রার্থী হয়, সেক্ষেত্রে তা বিএনপির জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াবে। হয়তো এই নির্বাচনটা দলীয় প্রতীকে হবে না, কিন্তু দলীয়ভাবেই তো হয়। তাই যাতে বিদ্রোহী প্রার্থী না থাকে, সে বিষয়ে গুরুত্ব দিতে হবে।’

বিএনপির জন্য তৃতীয় চ্যালেঞ্জ তুলে ধরে বলেন, ‘বিএনপিকে এখন তার দলের দিকে নজর দিতে হবে। দলটা যাতে সরকারে হারিয়ে না যায়—এজন্য দলটাকে সংগঠিত, শক্তিশালী করা প্রয়োজন। সরকারে থাকার সুবিধা কাজে লাগিয়ে বিএনপি তার দলকে আরও বেশি সুসংগঠিত করতে পারে। বিরোধীদের তো এখন আর তেমন কোনো কাজ নেই। সুতরাং তারা তাদের দলকে শক্তিশালী করবে—এটাই স্বাভাবিক।’

স্থানীয় সরকার নির্বাচনে বিএনপির চতুর্থ চ্যালেঞ্জ তুলে ধরে অধ্যাপক কাজী মোহাম্মাদ মাহবুবুর রহমান বলেন, ‘ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে জামায়াত নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় ঐক্যজোট যে ৭৭টি আসনে বিজয়ী হয়েছে, নিজেদের এমপি থাকার কারণে এসব এলাকায় তারা বেশ সুবিধাজনক অবস্থায় থাকবে। সেখানে বিএনপি কীভাবে তাদের মোকাবিলা করবে, সেটা একটা বড় চ্যালেঞ্জ।’

পঞ্চম আরেকটি চ্যালেঞ্জের কথা তুলে ধরে এই রাজনৈতিক বিশ্লেষক বলেন, ‘হাইব্রিড তথা নতুন লোকজন যাতে নির্বাচন করতে না পারে, সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে। দলীয় মনোনয়ন বা সমর্থন দেওয়ার ক্ষেত্রে বিগত ১৫-১৬ বছরে দলের চরম দুঃসময়ে যারা পাশে ছিলেন, সেসব ত্যাগী নেতাকে অবশ্যই মূল্যায়ন করতে হবে। অন্যথায় দলের মধ্যে আস্থা, ঐক্য ধরে রাখা কঠিন হবে।’