Image description

২০১৩ সালের ৫ মে রাজধানীর মতিঝিলের শাপলা চত্বরে হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশ-এর সমাবেশে সংঘটিত সহিংস ঘটনার তদন্ত সম্পন্ন করেছে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের তদন্ত সংস্থা। আলোচিত এই ঘটনায় তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে ‘নির্দেশদাতা’ হিসেবে উল্লেখ করে তাকে প্রধান আসামি করা হয়েছে বলে তদন্ত সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে। মামলায় তারসহ অন্তত ৩০ জনকে আসামি করা হয়েছে।

তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, শাপলা চত্বরে সংঘটিত ‘গণহত্যা’র অভিযোগে ৩০ জনের বেশি ব্যক্তিকে অভিযুক্ত করা হয়েছে। প্রতিবেদনে দাবি করা হয়, সরাসরি গণভবন থেকে অভিযান পরিচালনার নির্দেশ আসে এবং সেই সূত্রে শেখ হাসিনাকে প্রধান আসামি করা হয়েছে। তার পরেই তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মহিউদ্দিন খান আলমগীর, স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামসুল হক টুকু এবং আওয়ামী লীগের তৎকালীন সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম-এর নাম উল্লেখ করা হয়েছে।

এছাড়া আসামিদের তালিকায় সাবেক তথ্যমন্ত্রী হাসানুল হক ইনু, সাবেক মন্ত্রী মোফাজ্জল হোসেন চৌধুরী মায়া, যুবলীগের তৎকালীন সভাপতি ওমর ফারুক চৌধুরী, গণজাগরণ মঞ্চের ইমরান এইচ সরকার ও শাহরিয়ার কবীরের নাম রয়েছে বলে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তৎকালীন একাধিক শীর্ষ কর্মকর্তাকেও আসামি করা হয়েছে। তাদের মধ্যে রয়েছেন পুলিশের সাবেক আইজিপি হাসান মাহমুদ খোন্দকার ও এ কে এম শহিদুল হক, সাবেক ডিএমপি কমিশনার বেনজীর আহমেদ, র‍্যাবের সাবেক ডিজি মোখলেসুর রহমান ও জিয়াউল আহসান এবং পুলিশের আরও কয়েকজন কর্মকর্তা।

তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়, পূর্বপরিকল্পিতভাবে সারাদেশ থেকে হেফাজতের নেতাকর্মীদের ঢাকায় সমবেত হতে দেয়া হয়। অভিযোগ রয়েছে, দিনভর তাদের বিভিন্নভাবে বাধা ও চাপ প্রয়োগ করা হয় এবং গণমাধ্যমে ভাঙচুরের খবর প্রচার করে তাদের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্নের চেষ্টা করা হয়। পরবর্তীতে রাত ১০টার পর শাপলা চত্বরে অভিযান পরিচালনার নির্দেশ দেওয়া হয় বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। তদন্ত সংস্থার দাবি, রাত ১টা ৪৫ মিনিটের দিকে বিদ্যুৎ সংযোগ বন্ধ করে একদিক খোলা রেখে সমন্বিত অভিযানে যায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনী।

তবে ঘটনায় মোট নিহতের সংখ্যা নির্ধারণে তদন্ত সংস্থা চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে পারেনি। ঢাকা ও নারায়ণগঞ্জে নিহতদের বিষয়ে মানবাধিকার সংগঠন ‘অধিকার’-এর প্রতিবেদনের ভিত্তিতে প্রাথমিক হিসাব অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে বলে জানা গেছে। নিহতের প্রকৃত সংখ্যা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই বিতর্ক রয়েছে।

উল্লেখ্য, কুরআন-সুন্নাহবিরোধী আইন বাতিল, ধর্ম অবমাননার সর্বোচ্চ শাস্তির বিধানসহ ১৩ দফা দাবিতে ২০১৩ সালের ৫ মে শাপলা চত্বরে সমাবেশ ডাকে হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশ। সমাবেশকে কেন্দ্র করে দিনভর উত্তেজনা ও সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। রাতের অভিযানের পর হতাহতের অভিযোগ ওঠে। সে সময়কার সরকার বরাবরই ‘গণহত্যা’র অভিযোগ অস্বীকার করে আসছিল।

গত বছরের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর এই ঘটনার বিচার দাবিতে ট্রাইব্যুনালে আবেদন করে হেফাজতে ইসলাম। জাতীয় নির্বাচনের আগে তদন্ত সম্পন্ন করেছে ট্রাইব্যুনালের তদন্ত সংস্থা। এখন অভিযোগপত্র আনুষ্ঠানিকভাবে দাখিল ও বিচার কার্যক্রম শুরুর অপেক্ষা।

আলোচিত এই মামলায় ইতোমধ্যে চারজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তারা হলেন—সাবেক আইজিপি এ কে এম শহিদুল হক, সাবেক স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামসুল হক টুকু, অবসরপ্রাপ্ত মেজর জেনারেল জিয়াউল আহসান এবং পুলিশের সাবেক উপমহাপরিদর্শক (ডিআইজি) মোল্লা নজরুল ইসলাম। মামলার পরবর্তী অগ্রগতি ও আনুষ্ঠানিক অভিযোগ গঠন এখন রাজনৈতিক অঙ্গন ও জনমনে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে।