Image description

রাজধানীর প্রধান পাইকারি বাজার কারওয়ান বাজার ও তার আশেপাশের অলিগলির ফুটপাতে ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের কষ্ট আর দীর্ঘশ্বাস যেন থামছেই না। রাজনৈতিক পটপরিবর্তন হলেও পাল্টায়নি চাঁদাবাজির সংস্কৃতি; কেবল বদলেছে চাঁদা তোলার কৌশল আর নিয়ন্ত্রকদের পরিচয়। আওয়ামী লীগ আমলের প্রকাশ্য জুলুমের পর এখন ‘উত্তরাধিকার’ সূত্রে দখলদারিত্ব এবং ছদ্মবেশী সিন্ডিকেটের কবলে জিম্মি হয়ে পড়েছেন ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা। ব্যবসায়ীরা জানান, বিগত সরকারের আমলে স্থানীয় সন্ত্রাসীরা প্রতিটি দোকান থেকে দিনে দুই-তিনবার চাঁদা আদায় করত।

অতীতে টাকা না দিলে ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের উপর প্রকাশ্যে চলত অমানুষিক নির্যাতন, মারধর ও দোকান ভাঙচুর। তবে বর্তমান সময়ে বিশেষ কৌশলে চাঁদাবাজি ঠিকই অব্যাহত আছে। অতীতে আওয়ামী লীগের লোকজন চাঁদাবাজির জন্য টোকেন, রশিদ এবং স্টিকার ব্যবহার করতো। কিন্তু ৫ আগস্টের পর নতুন চাঁদাবাজরা ধরা পড়ার ঝুঁকি এড়াতে অভিনব পদ্ধতি বেছে নিয়েছ।

কৌশলে সরাসরি নগদ টাকা আদায়ের পাশাপাশি এখন বিকাশের মাধ্যমে প্রতিনিয়ত লেনদেন হচ্ছে বলেও অভিযোগ উঠেছে। প্রতিবাদ করলে ব্যবসা বন্ধ করে দেওয়া এমনকি সপরিবারে প্রাণনাশের হুমকি দেওয়া হচ্ছে বলে জানান ব্যবসায়ীগণ। ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের নিরাপত্তা, জীবনের ঝুঁকি ও চাঁদাবাজদের হুমকির ভয়ে অনেকেই এখন মুখ খুলতে সাহস পাচ্ছেন না। 

অনুসন্ধানে জানা যায়, রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় থাকা স্থানীয় প্রভাবশালী ব্যক্তিরা সরাসরি ব্যবসায়ীদের আয়ের একটি বড় অংশ লুটে নিয়ে থাকে। নৈশপ্রহরী, পরিচ্ছন্নতাকর্মী ও লাইনম্যানদের বেতন পরিশোধের অজুহাতেও এখন চাঁদাবাজি হচ্ছে প্রতিনিয়ত। 

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কারওয়ান বাজারে এক ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীর সাথে কথোপকথনকালে তিনি আরটিএনএনকে চাঁদাবাজির এই নতুন কৌশল সম্পর্কে অবহিত করেন। তিনি বলেন, ফুটপাত ভাড়া ছাড়া কারওয়ান বাজার চলে না। অসহায় ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে প্রতিদিন ২০০ থেকে ১০০০ টাকা পর্যন্ত ‘ভাড়া’ বা ‘নাস্তা খরচ’ হিসেবে আদায় করা হচ্ছে। এখনকার পরিস্থিতি এমন যে, বাজারের খরিদ্দার না থাকলেও চাঁদাবাজদের পাওনা ঠিকই বুঝিয়ে দিতে হয়।

প্রবীণ ব্যবসায়ীদের মতে, চাঁদাবাজিকে এখন ‘অফিসিয়াল’ রূপ দেওয়ার চক্রান্ত চলছে। কখনো ক্রেতা-বিক্রেতা সাজিয়ে কৃত্রিম দ্বন্দ্ব তৈরি করা হয়, আবার কখনো ‘বড় ভাইদের’ মাধ্যমে তা মীমাংসার নামে টাকা হাতিয়ে নেওয়া হয়।

সিন্ডিকেট ও দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির বিষয়ে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক ব্যবসায়ী আরটিএনএনকে জানান, ফসলের উৎপাদন কম হওয়ার পাশাপাশি উচ্চ হারের চাঁদাবাজিই দ্রব্যমূল্য বাড়ার প্রধান কারণ। পাইকারি ও খুচরা বিক্রেতারা বাড়তি খরচ সমন্বয় করতে গিয়ে ক্রেতাদের পকেট কাটছেন। এর ফলে বাজারে বেচাকেনা আশঙ্কাজনকভাবে কমে গেছে। আমরা কোনো দলের লেজুড়বৃত্তি চাই না। শান্তি মতো ব্যবসা করতে চাই।

সাধারণ ব্যবসায়ীদের দাবি, ক্ষমতার পরিবর্তন যদি কেবল ‘নামের’ হয় এবং ফুটপাত ও সড়ক যদি সিন্ডিকেটের দখলেই থাকে, তবে সাধারণ ক্রেতা ও ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের মুক্তি মিলবে কিভাবে? ফুটপাত দখলমুক্ত করে চাঁদাবাজদের দৌরাত্ম্য বন্ধ না করলে কারওয়ান বাজারের বিশৃঙ্খলা কখনোই থামবে না বলেও মন্তব্য করেন ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা।

শহরের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ মার্কেট ও পয়েন্টে চাঁদাবাজি ইস্যুতে পুলিশের ভূমিকা কী, জানতে চাইলে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) অতিরিক্ত কমিশনার (ক্রাইম অ্যান্ড অপারেশনস্) এস এন মো. নজরুল ইসলাম আরটিএনএনকে বলেন, চাঁদাবাজি নির্মূলে নতুন সরকার জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণ করেছে। এর সাথে যারাই জড়িত থাকুক না কেন বিন্দুমাত্র ছাড় দেওয়া হবে না। পুলিশ ইতোমধ্যে গুরুত্বপূর্ণ প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিয়েছে হলেও দাবি করেছেন ডিএমপির এই অতিরিক্ত কমিশনার।