Image description

দেড় বছর অন্তর্বর্তী সরকারের অর্থ উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ। তার সময়ে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ ছিল সরকারি চাকরিজীবীদের জন্য পে স্কেল বাস্তবায়ন করা। তবে সেটা বাস্তবায়ন করে যেতে পারেননি তিনি। তবে তিনি করে যেতে না পারলেও নতুন অর্থমন্ত্রীর কাছে সেটা বাস্তবায়নের জন্য সুপারিশ করেছেন।

 

বিদায়বেলায় অর্থ উপদেষ্টা সালেহউদ্দিন আহমেদ ২৯ পৃষ্ঠার ‘উত্তরাধিকারী নোট’ রেখে গেছেন। তাতে তিনি বলেছেন, সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সবশেষ ২০১৫ সালে পে স্কেল ঘোষণা করা হয়। এরপর প্রায় ১১ বছর অতিবাহিত হয়েছে। এই জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি পাওয়ায় ও ক্রমপুঞ্জীভূত মুল্যস্ফীতির ফলে প্রকৃত আয় কমেছে। সরকারের আর্থিক ব্যয় কিছু বৃদ্ধি পেলেও ১১ বছরে ক্রমপুঞ্জীভূত মূল্যস্ফীতি ১১১ শতাংশ বৃদ্ধি ও প্রকৃত আয় বিবেচনায় প্রজাতন্ত্রের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জীবনযাত্রার মান রক্ষার্থে পে স্কেল বাস্তবায়ন করা প্রয়োজন।

 

বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক এই গভর্নর অর্থ মন্ত্রণালয়ের জন্য উত্তরাধিকারী (সাকসেসর) নোটে দেশের অর্থনীতি, ব্যাংক ও রাজস্ব খাতের সংস্কারসহ অর্থনীতির নানা বিষয়েও পরামর্শ দিয়ে গেছেন।

 

নোটে তিনি বলেছেন, বাংলাদেশ ব্যাংক মুদ্রানীতি প্রণয়ন করছে, আবার বাণিজ্যিক ব্যাংক ও ফাইন্যান্স কোম্পানিগুলোর নিয়ন্ত্রণ-তদারকিও করছে। এ কারণে স্বার্থের সংঘাত সৃষ্টির পাশাপাশি প্রাতিষ্ঠানিক স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি কমছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের কার্যক্রম থেকে তাই ‘কেন্দ্রীয় ব্যাংকিং কার্যক্রম’ ছাড়া অন্য কার্যক্রম আলাদা করা দরকার। বাণিজ্যিক ব্যাংক ও ফাইন্যান্স কোম্পানিগুলোর নিয়ন্ত্রণ-তদারকি করতে গঠন করা দরকার আলাদা তদারক সংস্থা।

 
 

 

এ ছাড়া আর্থিক খাত সংস্কারের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা সম্পর্কেও পরামর্শ দিয়েছেন তিনি। নোটে বলেছেন, সরকার নীতিগত সম্মতি দিলে এ জন্য একটি ধারণাপত্র তৈরি করতে পারে আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ।

 

সালেহউদ্দিন আহমেদ একসময় বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ছিলেন। অন্তর্বর্তী সরকারের দেড় বছরে তিনি অর্থ উপদেষ্টার দায়িত্ব পালন করেছেন।

 

২৯ পৃষ্ঠার এ নোটে অর্থ বিভাগ, আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ (এফআইডি), অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগ (ইআরডি) এবং অভ্যন্তরীণ সম্পদ বিভাগের (আইআরডি) ভবিষ্যৎ করণীয় সম্পর্কে বলে গেছেন সালেহউদ্দিন আহমেদ। এ ছাড়া আলাদা ব্যাংক রেজ্যুলেশন কর্তৃপক্ষ, আমানত সুরক্ষা করপোরেশন, ইসলামি ব্যাংকিংয়ের জন্য আলাদা আইন প্রণয়ন ইত্যাদি পরামর্শও দেওয়া হয়েছে।

 

উত্তরাধীকারী নোটে বলা হয়েছে, সামষ্টিক স্থিতিশীলতা, রাজস্ব জোরদার, ব্যাংক খাত সংস্কার ও উন্নয়ন সহায়তা কার্যকর ব্যবহারে সমন্বিত কৌশল নতুন সরকারের অগ্রাধিকার বিষয়। সামস্টিক অর্থনীতির চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় তাৎক্ষণিক অগ্রাধিকার হিসেবে রাজস্ব সংগ্রহ বৃদ্ধি, বাজারভিত্তিক বিনিময় হার অব্যাহত রাখা, উচ্চ অগ্রাধিকার উন্নয়ন প্রকল্পে মনোযোগ দেওয়া এবং বেশি সুদের ঋণ নেওয়া থেকে বিরত থাকার কথা বলা হয়েছে।

 

ড. সালেহউদ্দিন বলেছেন, ১০ বছর আগের তুলনায় পুঞ্জীভূত মূল্যস্ফীতি বেড়েছে ১১১ শতাংশ। সরকারি কর্মচারীদের জীবনযাত্রার মান রক্ষার্থে তাই নতুন বেতন কাঠামোর বাস্তবায়ন দরকার। মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে সমন্বিত রাজস্ব-মুদ্রানীতি অব্যাহত রাখা দরকার।

 

নোটে আরও বলা হয়েছে, অর্থ বিভাগকে ব্যয় ব্যবস্থাপনায় তথা সরকারি ঋণ ব্যবস্থাপনায় শৃঙ্খলা আনতে হবে। আর ভর্তুকি ব্যবস্থা যৌক্তিকীকরণ, অপচয় রোধ এবং ব্যয় ব্যবস্থাপনায় শৃঙ্খলা আনতে হবে। উচ্চ সুদ ব্যয় ও সীমিত রাজস্ব প্রবাহের বাস্তবতায় বাজেট বাস্তবায়নে অগ্রাধিকারভিত্তিক ব্যয় নির্ধারণের পরামর্শও দেওয়া হয় নোটে।

 

বলা হয়, ভর্তুকি যৌক্তিকীকরণ, অপচয় রোধ এবং সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচিতে দক্ষতা বৃদ্ধি হবে এ বিভাগের তাৎক্ষণিক কর্মসূচি।

 

এনবিআর অংশ নিয়ে দেড় বছরে কী করা হয়েছে, নোটে তার বিবরণ তুলে ধরেছেন বিদায়ী উপদেষ্টা। বলা হয়েছে, করব্যবস্থার সংস্কারে বিদায়ী প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয়ে একটি প্রতিবেদন দাখিল করা হয়েছে। এ প্রতিবেদন পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে বাস্তবায়নের উদ্যোগ নিতে হবে। চ্যালেঞ্জ হিসেবে বলা হয়েছে, দেশে ব্যাপক কর ফাঁকি হচ্ছে। কর অব্যাহতির সংস্কৃতিও ব্যাপক। আয়কর ও ভ্যাট ব্যবস্থার মধ্যে ডিজিটাইজড অপর্যাপ্ত এবং কর আদায় কার্যক্রমে ন্যায্যতা, জবাবদিহি ও স্বচ্ছতার ঘাটতি রয়েছে।

 

ইআরডির অংশে উল্লেখ করা হয়েছে, ২০১৫ সালে নিম্ন মধ্যম আয়ের কাতারে উন্নীত হওয়ায় বাংলাদেশের ঋণের সুদের হার বাড়ছে এবং ঋণ পরিশোধের সময় কমছে। উচ্চ হারে নেওয়া ঋণ ব্যবহারের ক্ষেত্রে প্রকল্প বাছাইয়ে বেশি সতর্কতা দরকার। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল, বিশ্বব্যাংক ও এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের (এডিবি) সঙ্গে চলমান কর্মসূচিতে নীতিগত সংস্কার বাস্তবায়ন করা হচ্ছে।

 

প্রকল্প মূল্যায়ন ও পর্যবেক্ষণে ডিজিটাল ট্র্যাকিং ব্যবস্থা চালু হয়েছে উল্লেখ করে বলা হয়েছে, বৈদেশিক সহায়তার কার্যকারিতা বাড়াতে উন্নয়ন সহযোগীদের নিয়মিত সমন্বয় সভা হচ্ছে। এ ছাড়া দক্ষিণ-দক্ষিণ সহযোগিতা, আঞ্চলিক উন্নয়ন ব্যাংক ও জলবায়ু তহবিল থেকে অর্থ সংগ্রহও অগ্রাধিকার বলে উল্লেখ করা হয়েছে নোটে।

 

নোটে আরও হয়, জলবায়ু অভিযোজন, নবায়নযোগ্য জ্বালানি ও অবকাঠামো উন্নয়ন খাতে বিনিয়োগ বাড়াতে নতুন অংশীদার খোঁজা হচ্ছে।