Image description

সদ্য ত্রয়োদশ জাতীয় নির্বাচন শেষে দেশের বিভিন্ন জেলায় একে একে খুলতে শুরু করেছে কার্যক্রম নিষিদ্ধ থাকা আওয়ামী লীগের দলীয় কার্যালয়। পতাকা উত্তোলন, দোয়া-মোনাজাত, স্লোগান ও প্রতীকী কর্মসূচির মাধ্যমে স্থানীয় নেতাকর্মীরা পুনরায় উপস্থিতি জানান দিচ্ছেন। তবে এসব কার্যক্রমকে ঘিরে রাজনৈতিক উত্তেজনা, পাল্টা প্রতিক্রিয়া এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। পর্যবেক্ষকদের মতে, কিছু এলাকায় অঘোষিত বা নীরব সমঝোতার ভিত্তিতেই কার্যালয় খোলার ঘটনা ঘটছে।

২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তী আত্মগোপন ও নিষেধাজ্ঞার পর প্রায় ১৮ মাস নিষ্ক্রিয় ছিল আওয়ামী লীগ ও দলটির অঙ্গ-সহযোগী সংগঠনগুলো। তবে নির্বাচনের পর গত সপ্তাহে স্থানীয় কার্যালয়গুলো ধীরে ধীরে খোলার বিষয়টি একদিকে যেমন সংগঠন পুনরুজ্জীবনের ইঙ্গিত দিচ্ছে, অন্যদিকে দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে উত্তেজনা, ক্ষমতার ভারসাম্য এবং সম্ভাব্য অঘোষিত সমঝোতা নিয়ে নতুন প্রশ্নও তুলছে।

গত শুক্রবার (২০ ফেব্রুয়ারি) সকালে ফরিদপুরে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের জেলা কার্যালয়ে প্রকাশ্যে যুবলীগের পক্ষ থেকে জাতীয় ও দলীয় পতাকা উত্তোলনের ঘটনা ঘটে। একই দিন ফরিদপুর কোতোয়ালী থানার পাশে আওয়ামী লীগ কার্যালয়ে জাতীয় ও দলীয় পতাকা উত্তোলন করতে দেখা যায়। এতে যুবলীগ ও নিষিদ্ধ ছাত্রলীগের সাবেক নেতারা অংশ নেন এবং ‘জয় বাংলা’ স্লোগান দেন।

এ ছাড়া জামালপুরের বকশীগঞ্জ ইউনিয়ন কার্যালয়ে পতাকা উত্তোলন ও ভাষা শহীদদের স্মরণে মোনাজাত অনুষ্ঠিত হয়। ঘটনাটির ভিডিও সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। পটুয়াখালীর দশমিনায় ১৮ মাস পর কার্যালয় খুলে মিলাদ অনুষ্ঠিত হয়। পরে ছাত্রদল-যুবদলের নেতাকর্মীরা ভাঙচুর চালিয়ে পুনরায় তালা ঝুলিয়ে দেয়।

এর আগে গত ১৮ ফেব্রুয়ারি ভোরে নোয়াখালী পৌর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক হাছিনা চৌধুরীর তত্ত্বাবধানে পৌর মহিলা আওয়ামী লীগ ও অঙ্গ-সহযোগী সংগঠনের নেতৃবৃন্দের পক্ষ থেকে মূল ফটকে একটি ব্যানারে লাগানো হয়। ব্যানারে লেখা রয়েছে, দীর্ঘ আঠারো মাস পর নোয়াখালী জেলা আওয়ামী লীগের কার্যালয় আজ থেকে অবমুক্ত করা হলো।

স্থানীয় লোকজন জানান, সেদিন ভোরে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা একটি মিছিল নিয়ে মাইজদী টাউনহল মোড় সংলগ্ন জেলা কার্যালয়ের সামনে আসেন। প্রথমে তারা কার্যালয়ের তালা খুলে সেখানে অবস্থান নেন এবং আওয়ামী লীগের পক্ষে বিভিন্ন স্লোগান দিতে থাকেন। বেশ কিছুক্ষণ অবস্থানের পর তারা কার্যালয়ের মূল ফটকে একটি ব্যানার লাগিয়ে চলে যান।

অপরদিকে দিনাজপুরে স্লোগান দেওয়ার ভিডিও ছড়িয়ে পড়ার পর বিক্ষোভ ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটে। খুলনায় শেখ মুজিবুর রহমান ও শেখ হাসিনার ছবিতে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানানো হয়। চট্টগ্রামে ম্যুরাল পরিষ্কার ও অফিস খোলার ভিডিও ভাইরাল হয়। এ ছাড়া নোয়াখালী, শরীয়তপুর, নারায়ণগঞ্জ, বরগুনা, কুড়িগ্রাম ও পঞ্চগড়সহ অন্তত ২০ থেকে ২৬ জেলায় একই ধরনের কার্যক্রমের খবর পাওয়া গেছে।

অনেকের মতে, রাজনৈতিক পরিবেশের পরিবর্তন ও নির্বাচন-পরবর্তী পরিস্থিতিতে আত্মগোপনে থাকা নেতাকর্মীদের মধ্যে সক্রিয় হওয়ার প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। এই সুযোগে সংগঠন পুনর্গঠনের প্রচেষ্টা ও স্থানীয় পর্যায়ে উপস্থিতি জানান দিয়ে সাংগঠনিক কাঠামো পুনরুজ্জীবিত করার চেষ্টা চলছে।

কিছু এলাকায় উত্তেজনা এড়াতে স্থানীয় পর্যায়ে নীরব অজ্ঞাত সমঝোতা বা অনানুষ্ঠানিক অনুমতির মাধ্যমে কার্যালয় খোলার সুযোগ দেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এটি রাজনৈতিক পুনর্বিন্যাসের সূচক হতে পারে। তবে আইনগত প্রক্রিয়া ছাড়া পুনরায় সক্রিয়তা অস্থিরতা বাড়াতে পারে। তারা বলছেন, দোষারোপের রাজনীতি থেকে বেরিয়ে সহনশীল রাজনৈতিক পরিবেশ জরুরি।

এ বিষয়ে পুলিশের মুখপাত্র এআইজি (মিডিয়া অ্যান্ড পিআর) এ এইচ এম শাহাদাত হোসাইন দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসকে বলেন, কার্যক্রম নিষিদ্ধ থাকায় আওয়ামী লীগের দলীয় কার্যালয় খুলে জমায়েত হওয়ার কোনো আইনি সুযোগ নেই। পুলিশ প্রশাসনের পক্ষ থেকে বিষয়টি কঠোরভাবে পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। যাদের বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট আইনি অভিযোগ রয়েছে, পুলিশ তাদের বিরুদ্ধে যথাযথ ব্যবস্থা নেবে।