জিনিসপত্রের মূল্য বৃদ্ধির প্রতিবাদে চলতি বছরের শুরুতে ইরানে হওয়া বিক্ষোভের সময় গ্রেপ্তার আরাশ তোলো শেখজাদেহ নামের এক যুবকের মৃত্যু হয়েছে। ইরানের বিপ্লবী গার্ডের (আইআরজিসি) গোয়েন্দা হেফাজতে থাকা অবস্থায় অসুস্থ হয়ে পড়েন তিনি। পরে তাকে চিকিৎসার জন্য হাসপাতালে নেওয়া হয়। সেখানে কয়েক সপ্তাহ ধরে কোমায় থাকার পর মৃত্যু হয়েছে ওই যুবকের।
সোমবার (২৩ ফেব্রুয়ারি) এক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানিয়েছে ইরান ইন্টারন্যাশনাল।
এতে বলা হয়, গত ৮ ও ৯ জানুয়ারি মাশহাদে অনুষ্ঠিত বিক্ষোভের ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শেয়ার করার প্রায় এক সপ্তাহ পর তার বাড়িতে অভিযান চালায় আইআরজিসির গোয়েন্দা কর্মকর্তারা। আরাশ তোলো শেখজাদেহকে আটক করা হয়। তিনি মাশহাদে একা থাকতেন এবং একটি ক্যাফেতে বারিস্তা হিসেবে কর্মরত ছিলেন। সোশ্যাল মিডিয়ায় বিভিন্ন বিষয় নিয়ে সক্রিয় ছিলেন।
পরিবারের দাবি, শেখজাদেহের ফোন বন্ধ থাকায় বেশ কয়েক দিন ধরে যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি। তিনি যে অ্যাপার্টমেন্টে থাকতেন, সেখানে গিয়ে তার মা সব জিনিসপত্র তছনছ ও জানালা ভাঙা দেখতে পান। অ্যাপার্টমেন্টে শেখজাদেহ ছিল না। যদিও পরে গোয়েন্দারা নিশ্চিত করেছেন, তাদের হেফাজতেই রয়েছেন শেখজাদেহ। তবে তার সঙ্গে দেখা বা ফোনালাপ করার অনুমতি দেননি তারা।
যোগাযোগ না থাকায় বা তার বিষয়ে বিস্তারিত কোনো তথ্য না পাওয়ায় উদ্বিগ্ন হয়ে পড়ে পরিবার। মুখ খুললে আরেক ছেলের পরিণতিও শেখজাদেহের মতো হতে পারে বলে আইআরজিসি গোয়েন্দা বিভাগ থেকে সতর্ক করা হয়। তার ব্যবহৃত মোবাইল ফোনটি আইআরজিসির গোয়েন্দা কর্মকর্তাদের কাছে রয়েছে। মিউচুয়াল ফ্রেন্ডরা জানিয়েছেন, শেখজাদেহের ইনস্টাগ্রাম অ্যাকাউন্টটি এখনও সক্রিয় রয়েছে।
গত ১২ ফেব্রুয়ারি হাসপাতালের একজনের মাধ্যমে পরিবার জানতে পারে, আরাশকে মাশহাদের ভেলাইয়াত হাসপাতালে নেওয়া হয়েছে। হাত-পা ভাঙা এবং মাথার খুলিসহ শরীরের বিভিন্ন স্থানে গুরুতর আঘাতের চিহ্ন রয়েছে। তাকে নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে ভর্তি করা হয়েছিল এবং ভেন্টিলেটরে রাখা হয়েছিল।
সূত্রটি আরও জানিয়েছে, বারবার অনুরোধ করার পর প্রথমবারের মতো তার মাকে হাসপাতালে প্রবেশের অনুমতি দেওয়া হয়। তিনি কেবল কাচের দেওয়ালের ওপর পাশ থেকে ছেলেকে এক পলক দেখতে পান। জানান, শেখজাদেহের মাথা, হাত-পা ব্যান্ডেজ করা ছিল। অজ্ঞান ছিল।
ছেলের এই পরিণতির কারণ জানতে চাইলে কর্মকর্তারা বলেন, ‘আমরা কিছু করিনি। তিনি স্ট্রোক করেছিলেন।’ কিন্তু পরিবারের দাবি, বিক্ষোভের সময় শেখজাদেহ আহত হয়নি। গ্রেপ্তার হওয়ার আগের দিন পর্যন্ত কর্মস্থলে উপস্থিত হয়েছিলেন। নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে শেখজাদেহের শারীরিক অবস্থার বেশ উন্নতি হয়েছিল। কিন্তু অজানা কারণে ১৫ ফেব্রুয়ারি ভেন্টিলেটর বন্ধ করে দেওয়া হয়। যে কারণে তার মৃত্যু হয়েছে। একে ‘হত্যা’ বলে দাবি করছে শেখজাদেহের পরিবার।
তবে এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য করেনি আইআরজিসি।
কড়া নিরাপত্তায় দাফন
হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ শেখজাদেহের মাকে জানিয়েছিল পরদিন ছেলের মরদেহ হস্তান্তর করা হবে। কিন্তু শর্ত আছে। তা হলো মরদেহের ময়নাতদন্ত করা হবে না, গোপনে দাফন করতে হবে, জানায় কেবল নিকটাত্মীয় ছাড়া বাইরের কেউ উপস্থিত থাকতে পারবে না। অন্যথায় মরদেহ দেওয়া হবে না।
গত শনিবার (২১ ফেব্রুয়ারি) মাশহাদের বেহেশত রেজা কবরস্থানে মরদেহ দাফন করা হয়। সেখানে সাদা পোশাকে ও ইউনিফর্ম পরিহিত বিপুল সংখ্যক সেনা মোতায়েন করা হয়েছিল। এমনকি কাফন না খোলার জন্যও সতর্ক করা হয়েছিল। কিন্তু শেখজাদেহের মা ও পরিবারের সদস্যরা জোর করেই শেষবারের মতো তার মুখ দেখেন।
পরিবারের সদস্যরা জানান, শেখজাদেহের মরদেহ যখন আনা হয়, আমরা জোর করেই তার চেহারা দেখি। তার মুখমণ্ডলে আঘাতের চিহ্ন, ফোলাভাব এবং ভাঙা মাথার খুলিতে স্পষ্ট লাঠির আঘাতের চিহ্ন আমরা দেখেছি। তারা তাকে নির্মমভাবে নির্যাতন করে হত্যা করেছে।