জুলাই গণঅভ্যুত্থানে জনপ্রিয় ‘ইনকিলাব জিন্দাবাদ’ স্লোগানটি হঠাৎ করেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে। রাজনৈতিক নেতা বিশেষ করে বিরোধী দলগুলোর নেতা, বিভিন্ন ছাত্রসংগঠনের প্রতিনিধিসহ অনেকেই স্লোগানটি লিখে পোস্ট দিচ্ছেন ফেসবুকে।
জানা যায়, হঠাৎ করে এই স্লোগানের পেছনে রয়েছে ভাষা ও পরিচয়বিষয়ক বিতর্ক। যা নতুন করে আলোচনায় আনেন বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু।
শনিবার (২১ ফেব্রুয়ারি) সকাল ১১টায় সিরাজগঞ্জ জেলা প্রশাসনের আয়োজনে জেলা শিল্পকলা একাডেমি অডিটোরিয়ামে শহীদ দিবস ও আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস উপলক্ষে আয়োজিত আলোচনা সভা, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ও পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠানে এ বিষয়ে বক্তব্য দেন মন্ত্রী। সেখানে তিনি বলেন, বাংলাকে যদি ধারণ করতে হয়, বাংলা ভাষাকে যদি মায়ের ভাষা বলতে হয়, তাহলে ‘ইনকিলাব জিন্দাবাদ’ চলবে না। ‘ইনকিলাব জিন্দাবাদ’, ‘ইনকিলাব মঞ্চ’ এগুলোর সঙ্গে বাংলার কোনো সম্পর্ক নেই। যারা আমাদের ভাষা কেড়ে নিতে চেয়েছিল, এগুলো তাদের ভাষা।
মন্ত্রীর ওই বক্তব্যের পর তীব্র সমালোচনা করেন বিরোধীদলসহ বিভিন্ন দলের নেতৃবৃন্দ। শনিবার এ নিয়ে ২৪ এর অভ্যুত্থানের নেতৃত্ব দেওয়া প্লাটফর্ম বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের ফেসবুক পেজে লেখা হয়, ‘মোদের গরব, মোদের আশা, আ-মরি বাংলা ভাষা’—ইনকিলাব জিন্দাবাদ।’
সংগঠনটির আহ্বায়ক রশিদুল ইসলাম রিফাত তার ব্যক্তিগত ফেসবুক স্ট্যাটাসে লেখেন, ‘ভাষাকে কেউই চেতনার বেড়াজালে আটকে রাখতে পারে নাই। ৫২-তে উর্দুইজম দিয়ে বাংলাকে আটকে রাখতে পারে নাই, আজকের দিনে এসে ইনসাফ, ইনকিলাবকেও পারবে না।
ঢাকা-৮ আসনের সংসদ সদস্য প্রার্থী ও এনসিপি নেতা নাসির উদ্দিন পাটোয়ারী লেখেন, ‘ইনকিলাব জিন্দাবাদ! চাঁদাবাজ মুর্দাবাদ!’ সাইমুম শিল্পীগোষ্ঠী তাদের পোস্টে লেখে, ‘ইনকিলাব জিন্দাবাদ। শোষকের বুকে কাঁপন ধরানো। প্রতিটি শব্দ আমাদের।’ জাতীয় যুবশক্তির আহ্বায়ক মো. তরিকুল ইসলাম লেখেন, ‘ইনকিলাব, জিন্দাবাদ।’ সাধারণ আলেম সমাজের ফেসবুক পেজে লেখা হয়, ‘৪৭ থেকে ৫২, ৭১ থেকে ২৪—আমাদের আজাদির সিলসিলা।’
সাবেক অর্ন্তবর্তীকালীন সরকারের উপদেষ্টা ও এনসিপির মুখপাত্র আসিফ মাহমুদ লেখেন, ‘ইনকিলাব জিন্দাবাদ শুনলে ব্লিডিং হয়, বাংলাদেশ জিন্দাবাদ শুনলে ব্লিডিং হয় না মাননীয় মন্ত্রী?’
এছাড়াও ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে কুমিল্লা-৪ (দেবীদ্বার) আসন থেকে নবনির্বাচিত সংসদ সদস্য ও এনসিপির মুখ্য সংগঠক হাসনাত আব্দুল্লাহও ফেসবুকে ‘ইনকিলাব জিন্দাবাদ’ লিখে স্ট্যাটাস দেন।
ডাকসুর মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক সম্পাদক এবং ইনকিলাব মঞ্চ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সদস্য সচিব ফাতেমা তাসনিম জুমা এক পোস্টে লেখেন, ‘বিপ্লবও আমার, ইনকিলাবও আমার। স্বাধীনতাও আমার, আজাদিও আমার। আমি যেটাতে সাবলীল, তার সবটাই আমার।’
তিনি আরো লেখেন, ‘বাংলায় ব্যবহৃত সকল শব্দকে দেশি-বিদেশি, তদ্ভব-তৎসম বলে বিভাজিত করে পর করে দেওয়া অপরাজনীতির অংশ। বাংলাকে নিজস্ব বলতে কিছু নেই—এই অনুভব করানোর পায়তারা। এই বিভাজন ইংরেজিতে কখনো দেখতে পাবেন না। তারা বিভিন্ন দেশের শব্দ নিজস্ব করে নেয়। বহু ঘাঁটাঘাঁটির পর বড়জোর দেখা যাবে তার উৎপত্তি অন্য কোথাও। কিন্তু শব্দটা ‘বিদেশি’ হিসেবে ফ্রেমিং করা হয় না। ইংরেজিই থাকে। শব্দের রাজনীতি ও শব্দ নিয়ে রাজনীতি শুরু হয় ইংরেজদের হাত ধরে। সিলসিলা জারি রাখছে সমাজে বিভাজনপ্রিয় জনগোষ্ঠী। অপচেষ্টা রুখে দিতে বেশি বেশি ‘ইনকিলাব জিন্দাবাদ’ বলুন প্রিয় স্বাধীনতাকামী জনগণ।’
এনসিপির উত্তরাঞ্চলের মুখ্য সংগঠক সারজিস আলম লেখেন, ‘যে স্লোগান স্বৈরাচারের পতন ঘটিয়েছে, সেই স্লোগান তাদের উত্তরসূরিদের ভয়ের কারণ তো হবেই!’
সদ্যবিদায়ী প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সচিব সফিকুল আলম লেখেন, ‘ইনসাফ একটি সুন্দর বাংলা শব্দ। ইনকিলাবও তাই। ফয়সালা, আজাদি, জিন্দাবাদ, এমনকি আওয়ামী ও লীগ এসবও বাংলা শব্দ। যেমন চুদ... লিং পং-ও।’
সুপ্রিম কোর্টের আলোচিত আইনজীবী ব্যারিস্টার শাহরিয়ার কবির তার পোস্টে লিখেছেন, ‘ইনকিলাব-জিন্দাবাদ। দিল্লী না, ঢাকা? ঢাকা-ঢাকা। গোলামী না, আজাদী? আজাদী-আজাদী।’
ছাত্রশিবিরের কেন্দ্রীয় সভাপতি নুরুল ইসলাম সাদ্দাম লিখেছেন, ‘ইনকিলাব জিন্দাবাদ’।
রাকসুর জিএস সালাউদ্দিন আম্মার লিখেছেন, ‘শোষকের বুকে কম্পন ধরানো প্রতিটি শব্দই আমাদের ভাষা। নারায়ে তাকবির, আল্লাহু আকবার; ইনকিলাব জিন্দাবাদ; আজাদী, ইনসাফ; তোমার দেশ আমার দেশ, বাংলাদেশ বাংলাদেশ। প্রতিটি স্লোগান, প্রতিটি শব্দই শোষককে পরাজিত করে আমাদের দিয়েছে নয়া ইতিহাস।’
মূলত, মন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকুর বক্তব্যের পর ‘ইনকিলাব জিন্দাবাদ’ শব্দবন্ধটি ভাষা, জাতীয়তাবাদ ও রাজনৈতিক পরিচয়ের বিতর্কে নতুন মাত্রা যোগ করেছে। এক পক্ষ এটিকে বাংলা ভাষার পরিপন্থী বলে দাবি করছে, অন্য পক্ষ বলছে শব্দের উৎপত্তি যেখানেই হোক, ব্যবহারের মধ্য দিয়েই তা ভাষার অংশ হয়ে ওঠে।