জুলাই গণঅভ্যুত্থানে রাজধানীর রামপুরায় ভবনের কার্নিশে ঝুলে থাকা তরুণ আমির হোসেনকে গুলি এবং দুজনকে হত্যা মামলার রায় কবে জানা যাবে আজ।
রোববার (১৫ ফেব্রুয়ারি) আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ এর চেয়ারম্যান বিচারপতি মো. গোলাম মর্তূজা মজুমদারের নেতৃত্বাধীন ট্রাইব্যুনালের বিচারক প্যানেলে এ মামলায় আদেশের দিন ঠিক করা হবে।
মামলায় ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) সাবেক কমিশনার হাবিবুর রহমানসহ পাঁচজন আসামি রয়েছেন। অন্য আসামিরা হলেন খিলগাঁও জোনের সাবেক অতিরিক্ত উপ-কমিশনার (এডিসি) মো. রাশেদুল ইসলাম, রামপুরা থানার সাবেক ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. মশিউর রহমান, সাবেক উপ-পরিদর্শক (এসআই) তরিকুল ইসলাম ভূঁইয়া এবং রামপুরা পুলিশ ফাঁড়ির তৎকালীন এএসআই চঞ্চল চন্দ্র সরকার। তাদের মধ্যে চঞ্চল চন্দ্র সরকারকে গ্রেফতার করা হয়েছে।
এর আগে, এ মামলায় ডিএমপির সাবেক কমিশনার হাবিবুর রহমানসহ পাঁচ আসামির বিষয়ে রাষ্ট্র ও আসামিপক্ষের যুক্তিতর্ক উপস্থাপন শেষ হয়েছে। পরে রায়ের দিন নির্ধারণ করতে আজ রোববার দিন ঠিক করেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল। গত ৩ ফেব্রুয়ারি আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ এর বিচারক প্যানেল যুক্তিতর্ক উপস্থাপন শেষে এ দিন ঠিক করেন।
এদিন ট্রাইব্যুনালে আসামিপক্ষের আইনজীবীরা যুক্তি উপস্থাপন করেন। এর মধ্যে আসামি চঞ্চলকে নির্দোষ দাবি করে খালাস প্রার্থনা করেন আইনজীবী সারওয়ার জাহান নিপ্পন। তিনি বলেন, প্রসিকিউশনের আনা অভিযোগের সঙ্গে আসামির কোনো সংশ্লিষ্টতা নেই। এছাড়া পলাতক চার আসামির পক্ষে শুনানি করেন স্টেট ডিফেন্স আইনজীবী মো. আমির হোসেন। তিনিও আসামিদের নিরপরাধ দাবি করেন। এ সময় তাৎক্ষণিকভাবে এসব যুক্তির খণ্ডন করে প্রসিকিউশন। উভয়পক্ষের শুনানি শেষে রায় ঘোষণার চূড়ান্ত দিন ঠিক করার জন্য ১৫ ফেব্রুয়ারি দিন করেন ট্রাইব্যুনাল।
তারও আগে, গত ২৯ জানুয়ারি রাষ্ট্রপক্ষের প্রসিকিউটর মোহাম্মদ মিজানুল ইসলাম ও গাজী এমএইচ তামিম শুনানি করেন। রাষ্ট্রপক্ষ ওইদিন মামলায় ডিএমপির সাবেক কমিশনার হাবিবুর রহমানসহ পাঁচ জনের সর্বোচ্চ সাজা দাবি করেন। এরপর আসামিপক্ষের যুক্তি উপস্থাপনের জন্য আজ দিন ঠিক করেন ট্রাইব্যুনাল। তারই ধারাবাহিকতায় আসামিপক্ষের যুক্তিতর্ক উপস্থাপন করা হয়।
যুক্তিতর্কে প্রসিকিউশনের পক্ষে বলা হয়, জুলাই-আগস্ট আন্দোলন ঘিরে সারাদেশের মতো রামপুরায়ও ব্যাপক হত্যাকাণ্ড চালিয়েছে তৎকালীন সরকারের পুলিশ বাহিনী। ২০২৪ সালের ১৯ জুলাই নিরস্ত্র আমির হোসেনকে লক্ষ্য করে গুলি চালানো হয়, যা স্পষ্টতই মানবতাবিরোধী অপরাধ।
এছাড়া আরও দুজনকে শহীদ করা হয়। পুলিশের ঊর্ধ্বতনদের প্রত্যক্ষ নির্দেশে এসব হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয়েছে। সাক্ষ্য-প্রমাণ, ভিডিও ফুটেজ, প্রত্যক্ষদর্শীর জবানবন্দিসহ নথিপত্রে এ মামলার পাঁচ আসামির সম্পৃক্ততা স্পষ্টভাবে প্রমাণিত হয়েছে।
মামলায় ২০২৫ সালের ১৮ সেপ্টেম্বর আনুষ্ঠানিক অভিযোগ গঠন করেন আদালত। এর মধ্য দিয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে মামলার বিচার শুরু হয়। এর আগে একই বছরের ৭ আগস্ট রাষ্ট্রপক্ষে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ দাখিল করেন প্রসিকিউটর ফারুক আহাম্মদ। গত ৩১ জুলাই চিফ প্রসিকিউটরের কার্যালয়ে এ মামলার তদন্ত প্রতিবেদন দাখিল করেন তদন্ত সংস্থা।
২০২৪ সালের ১৯ জুলাই আমির হোসেন জুমার নামাজ পড়ে বাসায় ফিরছিলেন। বাসার কাছে তখন সংঘর্ষের মধ্যে পড়ে যান তিনি। এ সময় পুলিশ গুলি শুরু করে। আমির হোসেন দৌড়ে নির্মাণাধীন একটি ভবনের চারতলায় গিয়ে আশ্রয় নেন। একপর্যায়ে বিক্ষোভকারীদের ধাওয়া করে পুলিশ ভবনটির চারতলায় ওঠে। সেখানে আমির হোসেনকে পেয়ে পুলিশ সদস্যরা তার দিকে আগ্নেয়াস্ত্র তাক করে বারবার নিচে লাফ দিতে বলেন। একজন পুলিশ সদস্য তাকে ভয় দেখাতে কয়েকটি গুলিও করেন। ভয়ে আমির হোসেন লাফ দিয়ে নির্মাণাধীন ভবনটির রড ধরে ঝুলে থাকেন। তখন তৃতীয় তলা থেকে একজন পুলিশ সদস্য আমির হোসেনকে লক্ষ্য করে ছয়টি গুলি করেন। গুলিগুলো আমিরের দুই পায়ে লাগে।
পরে পুলিশ চলে গেলে আমির হোসেন ঝাঁপ দিয়ে কোনোরকমে তৃতীয় তলায় পড়েন। তখন তার দুই পা দিয়ে রক্ত ঝরছিল। পরে আমির হোসেনকে উদ্ধার করে স্থানীয় একটি হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। এ ঘটনায় ভাগ্যক্রমে বেঁচে যান তিনি।
এছাড়া একই দিন রামপুরার বনশ্রী এলাকায় পুলিশের গুলিতে নাদিম ও মায়া ইসলাম নিহত হন। মামলায় ২০২৫ সালের ১৮ সেপ্টেম্বর পাঁচ আসামির বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করে বিচার শুরুর আদেশ দেন ট্রাইব্যুনাল-১। একই বছরের ৭ আগস্ট ফর্মাল চার্জ দাখিল করে প্রসিকিউশন।