Image description

সাংবাদিক দম্পতি সাগর সরওয়ার ও মেহেরুন রুনি হত্যাকাণ্ডের ১৪ বছর পূর্ণ হলো। ২০১২ সালের ১১ ফেব্রুয়ারি ঢাকার পশ্চিম রাজাবাজারের নিজ বাসভবনে তাদের হত্যা করা হয়। দীর্ঘদিন পেরিয়ে গেলেও এই আলোচিত জোড়া খুনের মোটিভ কিংবা প্রকৃত খুনিদের শনাক্ত করা সম্ভব হয়নি। মামলার তদন্ত প্রতিবেদন দাখিলের তারিখ এ পর্যন্ত ১২৪ বার পেছানো হয়েছে। বর্তমানে মামলাটি তদন্ত করছে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)।

আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে সংঘটিত এই হত্যাকাণ্ডের বিচার অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে হবে—এমন আশায় বুক বেঁধেছিলেন নিহতদের স্বজনরা। তবে অন্তর্বর্তী সরকারের আমলেও বিচার বা তদন্তে দৃশ্যমান কোনও অগ্রগতি হয়নি। এই সরকারের সময়েও তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেওয়ার তারিখ ১১ বার পেছানো হয়েছে।

দীর্ঘদিনেও ছেলে ও পুত্রবধূর হত্যার রহস্য উদ্‌ঘাটিত না হওয়ায় ক্ষোভ ও হতাশা প্রকাশ করেছেন সাগরের মা সালেহা মনির। কান্নাজড়িত কণ্ঠে তিনি বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে ন্যায়বিচারের কোনও আশা ছিল না। অন্তর্বর্তী সময়ে ড. ইউনূসের কাছে আশাবাদী ছিলাম। শুধু আমি নয়, সারাদেশই সে আশা করেছিল। কিন্তু ড. ইউনূস একদিনও সাগর–রুনি হত্যার বিচারের কথা মুখে আনেননি। অনেক বক্তব্য দিলেও এই হত্যাকাণ্ডের বিচার নিয়ে তাকে কখনও কথা বলতে শুনিনি।

সালেহা মনির বলেন, পূর্বাচলে একটি প্লট সাগর–রুনির ছেলে মেঘের নামে হস্তান্তর করা হয়েছে। তবে সেটি বিচার নয়। তিনি বলেন, মৃত্যুর আগ পর্যন্ত ছেলে ও পুত্রবধূ হত্যার বিচারের আশা করে যাবেন। প্রতি শুক্রবার নামাজে বসলে তাদের মুখ ভেসে ওঠে। কারণ যেদিন তাদের হত্যা করা হয়েছিল, সেটিও ছিল শুক্রবার দিবাগত রাত।

তিনি আরও বলেন, সাংবাদিকরা পাশে থাকলে হয়তো একদিন সাগর–রুনি হত্যার সুষ্ঠু তদন্ত ও বিচার নিশ্চিত হবে। অসুস্থ শরীর নিয়েও এখনও সেই দিনের অপেক্ষায় আছেন বলে জানান তিনি।

মামলার বাদী ও রুনির ভাই নওশের আলম রোমান বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, সাগর–রুনি হত্যার সঙ্গে আগের সরকারের গোপন সংস্থাগুলো জড়িত—এটা অনেকেই জানেন। তবে কেন তাদের হত্যা করা হয়েছে, সেই রহস্য এখনও উন্মোচন হয়নি। আওয়ামী লীগ সরকারের সময় তারা বিচারের আশা ছেড়ে দিয়েছিলেন। অন্তর্বর্তী সরকারের সময়েও খুব বেশি আশা করেননি। তবে অন্তত হত্যার রহস্য উদ্‌ঘাটনের প্রত্যাশা ছিল। সেটিও হয়নি। এখন আর কারও কাছেই তিনি আশাবাদী নন বলে জানান।

ঢাকা মহানগর পাবলিক প্রসিকিউটর ওমর ফারুক ফারুকী বলেন, এই সরকারের সময়ে সাগর–রুনি হত্যার রহস্য উন্মোচনের আশা করেছিলেন তারা। তদন্ত কর্মকর্তাকে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়া হয়েছে—এ বিষয়ে কী ব্যবস্থা নেওয়া হয়, সেটিই এখন দেখার বিষয়।

মামলার তদন্ত কর্মকর্তা ও পিবিআইয়ের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মো. আজিজুল হক বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, টাস্কফোর্স গঠনের পর মামলার তদন্তভার তার কাছে আসে। তিনি শতভাগ সুষ্ঠু ও নির্ভুলভাবে তদন্তের চেষ্টা করছেন। নির্ধারিত সময়ে প্রতিবেদন দিতে না পারায় আদালত শোকজ দিতে পারে বলে জানান তিনি। সময় লাগলেও নির্ধারিত তারিখের মধ্যে সঠিক তদন্ত প্রতিবেদন আদালতে উপস্থাপন করার আশাবাদ ব্যক্ত করেন তিনি।

উল্লেখ্য, সর্বশেষ মামলার তদন্ত প্রতিবেদন দাখিলের তারিখ পিছিয়ে আগামী ১ এপ্রিল নির্ধারণ করা হয়েছে। ফলে তদন্ত কর্মকর্তারা আরও দুই মাস সময় পেয়েছেন। এ নিয়ে মোট ১২৪ বার প্রতিবেদন দাখিলের তারিখ পেছানো হলো।

গত সোমবার (৮ ফেব্রুয়ারি) শুনানি শেষে ঢাকা মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আরিফুর রহমানের আদালত তদন্ত প্রতিবেদন দাখিল করতে না পারায় তদন্ত কর্মকর্তাকে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেন। একই সঙ্গে তাকে স্বশরীরে হাজির হয়ে ব্যাখ্যা দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়।

২০১২ সালের ১১ ফেব্রুয়ারি মাছরাঙা টেলিভিশনের বার্তা সম্পাদক সাগর সরওয়ার ও এটিএন বাংলার জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক মেহেরুন রুনিকে হত্যা করা হয়। পরে রুনির ভাই নওশের আলম রোমান শেরেবাংলা নগর থানায় মামলা করেন।

মামলার আসামিরা হলেন—রফিকুল ইসলাম, বকুল মিয়া, মাসুম মিন্টু, কামরুল ইসলাম ওরফে অরুণ, আবু সাঈদ, সাগর–রুনির বাসার দুই নিরাপত্তারক্ষী পলাশ রুদ্র পাল ও এনায়েত আহমেদ এবং তাদের পরিচিত তানভীর রহমান খান। এদের মধ্যে তানভীর ও পলাশ জামিনে রয়েছেন। অন্যরা কারাগারে আটক।

হাইকোর্টের নির্দেশে গত ২৩ অক্টোবর চার সদস্যের একটি উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন টাস্কফোর্স গঠন করা হয়। টাস্কফোর্সের আহ্বায়ক পিবিআই প্রধান।