বাংলাদেশে বৃহস্পতিবার হতে যাওয়া নির্বাচন স্বাভাবিকের চেয়ে অনেক বেশি তাৎপর্যপূর্ণ। আশা করা যায়, এটি ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের ‘বর্ষা বিপ্লব’-এর পর থেকে যে অন্তর্বর্তী বা অন্তর্বিরতি পরিস্থিতি চলছে, তার অবসান ঘটাবে। এতদিন যে একধরনের ‘হাইব্রিড’ শাসনব্যবস্থা বাংলাদেশ পরিচালনা করছিল, তা সংবিধানসম্মতভাবে নির্বাচিত সরকারের মাধ্যমে প্রতিস্থাপিত হবে।
গত দেড় বছর যে একটি মৌলিক রূপান্তরের সময় ছিল, তার ইঙ্গিত পাওয়া যায় এ কারণেও যে নির্বাচনের পাশাপাশি একটি গণভোটও হচ্ছে। এই গণভোটে সংবিধানের গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনের প্রস্তাব রাখা হয়েছে, যার উদ্দেশ্য আগের আওয়ামী লীগ সরকারের সময়কার ‘অতিরিক্ত ক্ষমতা প্রয়োগ’ ঠেকানো। নির্বাচনী লড়াই ও সম্ভাব্য ফলাফল অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ। তবে নির্বাচনপরবর্তী বাংলাদেশে গণভোট-সংশ্লিষ্ট প্রশ্নগুলোই বেশি প্রভাব ফেলবে।
এটি গত তিন দশকের মধ্যে প্রথম নির্বাচন, যেখানে বাংলাদেশের দুই প্রভাবশালী নারী নেতা- বেগম খালেদা জিয়া ও শেখ হাসিনা- কেউই উপস্থিত নেই। খালেদা জিয়া প্রয়াত, আর শেখ হাসিনা নির্বাসনে; মানবতাবিরোধী অপরাধে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত হয়ে নির্বাচনে অযোগ্য ঘোষিত, তার দল আওয়ামী লীগও(কার্যক্রম) নিষিদ্ধ। ফলে এবারের প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বিতা দুটি জোটের মধ্যে। একদিকে তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন বিএনপি, অন্যদিকে জামায়াতে ইসলামী। জামায়াত এবার আরও শক্তিশালী হয়েছে ন্যাশনাল সিটিজেন পার্টির (এনসিপি) সঙ্গে জোট করে। ২০২৪ সালের অভ্যুত্থানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখা ছাত্রনেতাদের নিয়ে গঠিত দল এনসিপি।
২০০৮ সালের পর থেকে যখন আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় ছিল, বিএনপি ও জামায়াত হয় নির্বাচনে অংশ নেয়নি, নয়তো আইনগতভাবে বাধাপ্রাপ্ত হয়েছে। ফলে বর্তমান প্রতিদ্বন্দ্বিতা নতুন, বিশেষত তারা অতীতে জোটসঙ্গী ছিল। তবে ইতিহাস সবসময় নির্ভরযোগ্য পথনির্দেশক নয়। ২০২৪ সালে আওয়ামী লীগের পতনের পর জামায়াতের প্রভাব বেড়েছে এবং এবারের নির্বাচনে তারা একটি বড় শক্তি হয়ে উঠেছে। যদিও তাদের শক্তিশালী ক্যাডারভিত্তিক সংগঠন রয়েছে, অতীতে তারা কখনোই বড় নির্বাচনী ফ্যাক্টর হিসেবে বিবেচিত হয়নি। পাকিস্তানেও ঐতিহাসিকভাবে ইসলামপন্থি দলগুলো নির্দিষ্ট ইস্যুতে জনমত সংগঠিত করতে পারলেও বহু-ইস্যুভিত্তিক নির্বাচনে ভালো ফল করে না। তবে এবার প্রত্যাশা করা হচ্ছে জামায়াতের ফল উল্লেখযোগ্যভাবে উন্নত হবে; আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে গভীর ক্ষোভ থেকে তারা লাভবান হবে।
১৯৭১ সালে জামায়াতের ভূমিকা, বিশেষ করে সংখ্যালঘুদের টার্গেট করার ইতিহাস, ভারতের স্মৃতিতে গভীরভাবে গাঁথা। এসব প্রশ্ন এখনো প্রাসঙ্গিক। সামগ্রিকভাবে বাংলাদেশে ইসলামপন্থি শক্তির উত্থান ভারতকে উদ্বিগ্ন করে। এটি একটি কাঠামোগত পরিবর্তনের ইঙ্গিত দেয়- যেমন ভারতবিরোধী মনোভাবের তীব্র প্রকাশ, ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের জন্মে যে ভাষাভিত্তিক ও সাংস্কৃতিক জাতীয়তাবাদ কাজ করেছিল তার শিথিলতা এবং পাকিস্তানের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা বৃদ্ধি।
এই প্রেক্ষাপটে সরলভাবে বিএনপির বিজয় ভারতীয় দৃষ্টিকোণ থেকে সর্বোত্তম ফল হতে পারে। তবে বাংলাদেশকে বোঝার ক্ষেত্রে সরল দ্বিমাত্রিক বিশ্লেষণে নির্ভর না করে বৃহত্তর বিবর্তনকে দেখা জরুরি। ১৯৭১-এর ইতিবাচক আবেগ ভারতে এখনো শক্তিশালী। কিন্তু কেবল সেই বয়ানেই নির্ভর করলে এবং সেখানকার বিভাজনরেখাকেই চিরস্থায়ী ধরে নিলে দৃষ্টিভঙ্গি বিকৃত হতে পারে। অর্ধশতাব্দী পুরোনো চশমা দিয়ে বর্তমান বাংলাদেশকে দেখা, কিংবা পাকিস্তানের সঙ্গে শূন্য-সম খেলা হিসেবে বিবেচনা করা, সিদ্ধান্ত গ্রহণকে ঘোলা করতে পারে।
বাস্তবতা হলো, পাকিস্তান ধারণা বা মুসলিম পৃথকতাবাদের উত্থানের আগেও ইসলাম ছিল বাংলার পরিচয়ের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। কিছু মানদণ্ডে পূর্ব ও পশ্চিমবঙ্গ মিলিয়ে বাঙালি মুসলমানরা আরবদের পর ইসলামের দ্বিতীয় বৃহত্তম ভাষাভিত্তিক জাতিগোষ্ঠী। আমাদের ইতিহাসপাঠে এই মৌলিক বাস্তবতা প্রায়ই আড়ালে পড়ে যায়। আধুনিক বাংলার গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক- যেমন ইয়ং বেঙ্গল আন্দোলন, উনিশ শতকের শেষভাগের বঙ্গীয় নবজাগরণ, কিংবা বিংশ শতকের প্রথমভাগের স্বদেশি আন্দোলন- এসব আলোচনায় বাংলার শক্তিশালী ইসলামী পরিচয় প্রায়ই উপেক্ষিত হয়।
ইসলামী পরিচয়ের প্রকাশকে সরাসরি পাকিস্তানপন্থার সমার্থক হিসেবে দেখা ভুল হবে। তবে এটাও অস্বীকার করা যায় না যে পাকিস্তানের প্রভাব যদি বাংলাদেশের শাসনকাঠামোয় প্রবেশ করে, তা ভারতের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ।
বাংলাদেশের ভূ-রাজনৈতিক অবস্থান ও ভারতের সঙ্গে দীর্ঘ সীমান্ত এই সম্পর্ককে ভারতের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রতিবেশী সম্পর্কগুলোর একটি করে তুলেছে। ভারতের পূর্ব সীমান্ত পশ্চিম সীমান্তের তুলনায় অনেক বেশি জটিল। বাংলাদেশের সঙ্গে বৈরী সম্পর্কের স্থায়ী রূপ নেয়া সবচেয়ে খারাপ সম্ভাব্য পরিণতি হবে।
এই পরিণতি এড়াতে হলে ইসলামপন্থি ও ভারতবিরোধী শক্তিকে ঘিরে ভবিষ্যদ্বাণীর ফাঁদ এড়াতে হবে। যদি আমরা কেবল সবচেয়ে খারাপটাই কল্পনা করি, সেটাই বাস্তবে রূপ নিতে পারে। একইভাবে এমন পদক্ষেপ এড়ানো উচিত যা বাংলাদেশ ও পাকিস্তানকে একটি যৌথ প্ল্যাটফর্মে নিয়ে আসে- উদাহরণ হিসেবে আইসিসি মেনস টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের প্রসঙ্গ উল্লেখ করা যায়।
এই গুরুত্বপূর্ণ প্রতিবেশীকে বুঝতে হলে প্রথমত আসন্ন নির্বাচনের ফলাফলের প্রতি উন্মুক্ত থাকতে হবে এবং পরে যে জোটই ক্ষমতায় আসুক না কেন, তার সঙ্গে পেশাদার ও শীতল মাথায় সম্পর্ক পরিচালনা করতে হবে। ভবিষ্যৎ সরকারকে মূল্যায়নের ক্ষেত্রে আওয়ামী লীগের দীর্ঘ শাসনকালকে ‘লিটমাস টেস্ট’ হিসেবে ব্যবহার না করাই ভালো।
প্রতিবেশী কূটনীতির একটি সুপ্রতিষ্ঠিত নীতি মনে রাখা জরুরি: ভবিষ্যতের জন্য ভালো বিকল্প তৈরি করতে হলে শুরুতে হয়তো খারাপ বিকল্পের তালিকা থেকেই একটি বেছে নিতে প্রস্তুত থাকতে হয়।
মিয়ানমার ও আফগানিস্তানের ক্ষেত্রে ভারত এমন সিদ্ধান্ত নিয়েছে এবং হয়তো সে কারণেই সেসব জটিলতা তুলনামূলকভাবে দক্ষতার সঙ্গে সামাল দিতে পারছে। যদিও সেসব পরিস্থিতি বাংলাদেশের সঙ্গে পুরোপুরি তুলনীয় নয়, তবু নীতিগত শিক্ষা একই। রাজনীতি ও ভূ-রাজনীতি স্থির নয়; প্রতিবেশে পরিবর্তন অনিবার্য। অনুকূল নয় এমন ফলাফলকেও বাস্তবতার অংশ হিসেবে মেনে নিয়ে কৌশলীভাবে মোকাবিলা করাই কূটনীতির অংশ।
শেষ পর্যন্ত ভারতের সাফল্য নির্ভর করবে এ বিষয়েও যে, তারা কতটা তাদের বৈদেশিক নীতিকে অভ্যন্তরীণ রাজনীতির প্রভাব থেকে পৃথক রাখতে পারে।
(লেখক পাকিস্তান ও সিঙ্গাপুরে ভারতের সাবেক হাইকমিশনার। তার এ লেখাটি অনলাইন টেলিগ্রাফ থেকে অনূদিত)