Image description

ন্তর্বর্তীকালীন সরকারের হাফ ডজন উপদেষ্টার মেয়াদ শেষ হওয়ার আগেই কূটনৈতিক বা ‘লাল পাসপোর্ট’ জমা দেওয়ার খবর প্রকাশের পর প্রশ্নটা আর শুধু প্রশাসনিক নয়—এটি এখন রাজনৈতিক, প্রাতিষ্ঠানিক ও বিশ্বাসযোগ্যতার আলোচনায় পরিণত হয়েছে। কারণ, একদিকে একাধিক নির্ভরযোগ্য সূত্র বলছে পাসপোর্ট জমা দিয়ে সাধারণ পাসপোর্টের আবেদন করা হয়েছে, অন্যদিকে সরকারের গুরুত্বপূর্ণ একজন সদস্য বর্তমান পররাষ্ট্র উপদেষ্টা স্পষ্ট ভাষায় এই দাবি নাকচ করছেন। ফলে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠে যায়: আসলেই কি তারা পাসপোর্ট জমা দিয়েছেন, নাকি ঘটনাটি গুঞ্জন?

প্রথমে তথ্যের জায়গাটি পরিষ্কার করা প্রয়োজন। সংবাদ অনুযায়ী, অর্থ, স্বরাষ্ট্র, তথ্য, জ্বালানি, গৃহায়ন ও প্রাথমিক শিক্ষা—এই ছয়টি গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টাসহ প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী, আইজিপি, কয়েকজন সচিব ও হাইকোর্টের বিচারক কূটনৈতিক পাসপোর্ট জমা দিয়ে সাধারণ পাসপোর্টের জন্য আবেদন করেছেন। সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো শুধু নামই উল্লেখ করেনি, বরং এর পেছনের প্রশাসনিক যুক্তিও ব্যাখ্যা করেছে—দায়িত্ব শেষ হওয়ার পর পাসপোর্ট পেতে বিলম্ব, ইমিগ্রেশনে এনওসি জটিলতা এবং হঠাৎ বিদেশ ভ্রমণের সম্ভাবনা।

এই যুক্তিগুলো বাস্তবতার সঙ্গে সাংঘর্ষিক নয়। বরং এগুলো রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থার এক পরিচিত দুর্বলতাকেই সামনে আনে। দায়িত্বে থাকলে প্রশাসনিক কাজ দ্রুত হয়, কিন্তু দায়িত্ব শেষ হলেই সেই গতি আর থাকে না—এ অভিজ্ঞতা শুধু সাধারণ নাগরিকের নয়, সাবেক মন্ত্রী-উপদেষ্টারাও অতীতে বারবার এর মুখোমুখি হয়েছেন। সে হিসেবে আগাম আবেদন একটি ‘দূরদর্শী’ সিদ্ধান্ত বলেই মনে হতে পারে।

কিন্তু সমস্যাটা শুরু হয় তখনই, যখন পররাষ্ট্র উপদেষ্টা মো. তৌহিদ হোসেন প্রকাশ্যে বলেন, তিনি বা তার স্ত্রী কেউই কূটনৈতিক পাসপোর্ট জমা দেননি। আর দায়িত্বে থাকা অবস্থায় এমন কাজকে তিনি ‘অস্বাভাবিক’ বলেও মন্তব্য করেন। তার বক্তব্যে দুটি গুরুত্বপূর্ণ ইঙ্গিত আছে। এক, সবাই এই পথে হাঁটছেন না। দুই, কূটনৈতিকভাবে এটি আদর্শ আচরণ কি না—সে প্রশ্নও উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।

তাহলে এই সংবাদের সত্যতা কোথায় দাঁড়ায়? বাস্তবতা সম্ভবত মাঝামাঝি কোথাও। অর্থাৎ, “সবাই জমা দিয়েছেন”—এই দাবি যেমন অতিরঞ্জিত হতে পারে, তেমনি “এমন কিছুই হয়নি”—এই দাবিও পুরো সত্য চিত্র তুলে ধরে না। কেউ কেউ সত্যিই হয়তো জমা দিয়েছেন, কেউ হয়তোবা আসলেই দেননি—এমন সম্ভাবনাই সবচেয়ে যুক্তিসংগত।

তবে এর চেয়েও বড় প্রশ্ন হলো—এই খবর কেন এতো দ্রুত বিশ্বাসযোগ্যতা পেল? কারণ, এটি আমাদের দেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতির সঙ্গে মানানসই। ক্ষমতা ছাড়ার আগেই ব্যক্তিগত নিরাপত্তা, চলাচল ও ভবিষ্যৎ প্রস্তুতি নেওয়ার প্রবণতা নতুন কিছু নয়। বিশেষ করে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের মতো অস্থায়ী কাঠামোয় দায়িত্ব পালনকারীদের ক্ষেত্রে ভবিষ্যৎ অনিশ্চয়তা আরও প্রকট।

এখানে আরেকটি অস্বস্তিকর প্রশ্নও উঁকি দেয়—দায়িত্ব ছাড়ার পরপরই বিদেশ যাওয়ার প্রয়োজন কেন এতটা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে? এটি কি নিছক ব্যক্তিগত ও পেশাগত কারণে, নাকি এর পেছনে রাজনৈতিক বাজে পরিবেশ তৈরির আশঙ্কাও কাজ করছে? যদিও এ প্রশ্নের সরাসরি উত্তর পাওয়া কঠিন, তবে এই নীরব প্রস্তুতিগুলো জনমনে স্বাভাবিকভাবেই সন্দেহ তৈরি করে।

সবশেষে বলা যায়, কূটনৈতিক পাসপোর্ট জমা দেওয়ার ঘটনা যতটা না পাসপোর্টকেন্দ্রিক, তার চেয়ে বেশি এটি আস্থাকেন্দ্রিক। রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থার ওপর আস্থা, ক্ষমতা-পরবর্তী নিরাপত্তা এবং স্বচ্ছতার ওপর আস্থা। যদি সত্যিই একাধিক উপদেষ্টা দায়িত্বে থাকাকালেই ভবিষ্যৎ জটিলতা এড়াতে এমন প্রস্তুতি নেন, তাহলে সেটি ব্যক্তিগত বিচক্ষণতার পাশাপাশি প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতার দিকেই আঙুল তোলে।

সুতরাং প্রশ্নটা শুধু—‌‘তারা পাসপোর্ট জমা দিয়েছেন কি না’—এতে সীমাবদ্ধ নয়। আসল প্রশ্ন হলো, এমন খবর বিশ্বাসযোগ্য মনে হওয়ার মতো বাস্তবতা আমরা কেন তৈরি করেছি? এবং সেই বাস্তবতা বদলাতে রাষ্ট্র কতটা প্রস্তুত?