দুয়ারে কড়া নাড়ছে জাতীয় সংসদ নির্বাচন। সরকার এবং নির্বাচন কমিশনে চলছে শেষ মুহূর্তের প্রস্তুতি। ঢেলে সাজানো হয়েছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে। ঝুঁকিপূর্ণ ভোটকেন্দ্র চিহ্নিত করতে পুলিশের অনুসন্ধান কাজ অব্যাহত
থাকলেও তালিকা প্রায় চূড়ান্ত করে আনা হয়েছে। মোট কেন্দ্রের ৬৫ ভাগের মতোই ঝুঁকিপূর্ণ বলে পুলিশের প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। তা ছাড়া দেশের বিভিন্ন স্থানে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি অবনতির আশঙ্কা নিয়েও পুলিশ আছে বিশাল দুশ্চিন্তায়। এ নিয়ে কর্মকর্তাদের মধ্যে চলছে চুলচেরা বিশ্লেষণ। ভোটের দিন দায়িত্ব পালন করবেন যেসব পুলিশ কর্মকর্তা ও সদস্য, তাদের নামের তালিকাও চূড়ান্ত করা হয়েছে। একই সঙ্গে তাদের আনা হচ্ছে নজরদারিতে। পেছনে লাগানো হয়েছে গোয়েন্দা।
সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো দেশ রূপান্তরকে জানায়, নির্বাচনের আগে ও পরে দায়িত্ব পালনের জন্য তালিকাভুক্ত পুলিশ কর্মকর্তা ও সদস্যরা কোথায় যাচ্ছেন, এখন সেই দৃশ্য এবং নানা তথ্যও সংগ্রহ করা হচ্ছে। পুলিশ সদর দপ্তর এ ব্যাপারে পুলিশের সব কটি ইউনিটকে বিশেষ চিঠি দিয়েছে। আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে অনুষ্ঠিত জাতীয় নির্বাচনে যেসব কর্মকর্তা দায়িত্ব পালন করেছিলেন, তাদের এবারের নির্বাচনে দায়িত্ব পালন করতে না দেওয়ার ঘোষণা থাকলেও অতিরিক্ত ডিআইজি, পুলিশ সুপার, সহকারী পুলিশ সুপার, ইন্সপেক্টর, সাব-ইন্সপেক্টর, সহকারী সাব-ইন্সপেক্টর ও কনস্টেবলদের মধ্যে সে রকম কেউ কেউ দায়িত্ব পালন করার কথা রয়েছে। ফলে এবার যারা দায়িত্ব পালন করবেন, তাদের বিস্তারিত আমলনামা তৈরি করে সরকারের হাইকমান্ডের কাছেও পাঠানো হয়েছে।
পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি) বাহারুল আলম দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘অবাধ ও সুষ্ঠুভাবে নির্বাচন সম্পন্ন করতে পুলিশ নিরলসভাবে কাজ করছে। যারা নির্বাচনে দায়িত্ব পালন করবেন, তাদের পুরো আমলনামা আছে আমাদের কাছে। কোনো রাজনৈতিক বিবেচনায় কাউকে দায়িত্বে রাখা হচ্ছে না। ইতিমধ্যে দেড় লাখের বেশি পুলিশ কর্মকর্তা ও অন্য সদস্যদের নির্বাচনী প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে।’
তিনি আরও বলেন, ভোটকেন্দ্র ও বাইরে নিরাপত্তায় যারা দায়িত্ব পালন করবেন, তাদের কড়া ভাষায় জানিয়ে দেওয়া হয়েছে, কোনো রাজনৈতিক দল বা প্রার্থীর পক্ষে কাজ করা যাবে না। কারও পক্ষে কাজ করার প্রমাণ মিললে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
অন্য এক প্রশ্নের জবাবে আইজিপি বলেন, ‘গত তিনটি জাতীয় নির্বাচনে যেসব কর্মকর্তা দায়িত্ব পালন করেছেন, তাদের এবারের নির্বাচনে রাখা হচ্ছে না। বর্তমানে একটি গুরুত্বপূর্ণ রূপান্তর পর্বের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে পুলিশ। বাহিনীর সদস্যদের মনোবল বাড়ানো এবং জনগণের আস্থা পুনরুদ্ধারে সর্বাত্মকভাবে কাজ করে যাচ্ছি আমরা। নির্বাচন একটি গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব। ছাত্র-জনতার নেতৃত্বে বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের বিজয়ের ফলে দীর্ঘদিনের বঞ্চনার অবসান ঘটেছে। কর্মক্ষেত্রের অভিজ্ঞতা ভবিষ্যতে পেশাগত দায়িত্ব পালনে সহায়ক হবে।’
তবে পুলিশ সদর দপ্তরে কর্মরত ডিআইজি পদমর্যাদার এক কর্মকর্তা গতকাল সোমবার দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে অনুষ্ঠিত জাতীয় নির্বাচনে যারা নিরাপত্তার দায়িত্বে ছিলেন, তাদের কাউকে কাউকে এবারের নির্বাচনেও রাখা হচ্ছে। কারণ পুলিশের সংখ্যা তুলনামূলক কম। রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর সহস্রাধিক পুলিশ সদস্য আত্মগোপনে আছেন। অনেকে আবার আটক হয়েছেন। ফলে বাধ্য হয়েই বিতর্কিত অনেককে নিরাপত্তার দায়িত্ব পালন করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। তবে যারা দায়িত্বে থাকবেন, তাদের নজরদারির মধ্যেই রাখা হবে। ইতিমধ্যে পুলিশের সব কটি ইউনিটপ্রধানদের কাছে বেশ কিছু নির্দেশনা পাঠানো হয়েছে।’
ওই কর্মকর্তা আরও বলেন, পুলিশের কোনো সদস্য প্রার্থীদের সঙ্গে আঁতাত করলেই সাসপেন্ড করা হবে। পুলিশ সদর দপ্তর এ বিষয়ে কঠোর মনোভাব দেখাবে। নির্বাচনে দায়িত্ব পাওয়া পুলিশ কর্মকর্তা ও সদস্যদের বিষয়ে তথ্য সংগ্রহের পাশাপাশি গোপন ক্যামেরার মাধ্যমে নজরদারি শুরু করেছে গোয়েন্দা সংস্থাগুলো।
পুলিশ সদর দপ্তর সূত্র জানায়, নির্বাচনে পুলিশ সদস্যরা যাতে কোনো দলের পক্ষে অবস্থান না নিয়ে পেশাদারিত্বের সঙ্গে কাজ করেন, তা নিশ্চিত করতে দেড় লাখ পুলিশ সদস্যের প্রশিক্ষণ শেষ হয়েছে গত মাসের শেষ সপ্তাহে। পুলিশের কনস্টেবল থেকে উপমহাপরিদর্শক (ডিআইজি) পদমর্যাদার কর্মকর্তাদের নির্বাচনের আচরণবিধি, ভোটারের অধিকার, নির্বাচন কমিশনের নির্দেশনা, আইন অনুযায়ী পুলিশের দায়িত্ব, নির্বাচনের আগে গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহ ও বিশ্লেষণ, নির্বাচনসামগ্রী, ভোটকেন্দ্র ও বুথের নিরাপত্তা, মক ইলেকশন, নির্বাচনী সহিংসতা দমন ও নির্বাচন-পরবর্তী ব্যবস্থাপনা নিয়ে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি তাদের মনোবল চাঙা রাখতে নানা ধরনের ‘মোটিভেশন’ দেওয়া হয়েছে।
নির্বাচন সুষ্ঠু করতে এরই মধ্যে খুলনা, গাজীপুর, রাজশাহী ও বরিশাল মহানগর পুলিশ কমিশনার পরিবর্তন করা হয়েছে। পুলিশ সদর দপ্তরের ডিআইজি প্রশাসনসহ আরও কয়েকটি পদেও পরিবর্তন আনা হয়েছে। বদলি করা হয়েছে ৬৪ জেলার পুলিশ সুপার ও ৫২৭ থানার ওসিকে। ডিএমপির সব ওসি পদেও আনা হয়েছে রদবদল। এবার সংসদ নির্বাচনের সঙ্গে গণভোটও হচ্ছে। পৌনে ১৩ কোটি ভোটার দুটি করে ভোট দেবেন। প্রায় ৪৩ হাজার ভোটকেন্দ্রে পৌনে ৩ লাখের মতো ভোটকক্ষ রেখেছে নির্বাচন কমিশন। সংসদ নির্বাচন ঘিরে সার্বিক বিষয় নিয়ে বৈঠক করেছে কমিশন। প্রতিটি ভোটকেন্দ্রে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ১৩ থেকে ১৮ জন সদস্য দায়িত্ব পালন করবেন। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সাত লাখের বেশি সদস্য ভোটের নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকবেন। ভোটকেন্দ্রের দায়িত্বে আনসার-ভিডিপি সদস্যদের সংখ্যাই হবে সাড়ে ৫ লাখের মতো। সশস্ত্র বাহিনীর সদস্য থাকবেন ৯০ হাজারের মতো। তা ছাড়া পুলিশ, র্যাব, বিজিবি, কোস্টগার্ডও নির্বাচনী দায়িত্ব পালনের জন্য প্রস্তুতি শেষ করেছে।
স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা লে. জেনারেল (অব.) মো. জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী বলেছেন, জাতীয় নির্বাচন একটি রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব, যেখানে পুলিশের ভূমিকা অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। তারা নির্বাচনে নিরপেক্ষ ভূমিকা পালন করবে। এ ব্যাপারে মাঠপর্যায়ের পুলিশ সদস্যদের গুরুত্বপূর্ণ দিকনির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
পুলিশ সূত্র আরও জানায়, জুলাই অভ্যুত্থানের জেরে বিপর্যস্ত পুলিশ বাহিনীকে ধীরে ধীরে গুছিয়ে এনে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি উন্নতির চেষ্টা চালানো হচ্ছে। তবে জনমনে এখনো ফেরেনি স্বস্তি। নির্বাচনে জনগণের আস্থা অর্জন ও নিরপেক্ষতা বজায় রাখা পুলিশের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। তা ছাড়া নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীদের নেতিবাচক তৎপরতা, জামিনে বের হওয়া শীর্ষ সন্ত্রাসীদের আবার সক্রিয় হওয়া নিয়েও রয়েছে দুশ্চিন্তা। পাশাপাশি লুট হওয়া আগ্নেয়াস্ত্র উদ্ধার না হওয়ায় বেশি উদ্বেগ দেখা দিয়েছে পুলিশে।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, নির্বাচন নিয়ে গত মাসের শেষ সপ্তাহে স্ব^রাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে বৈঠক হয়েছে। ওই বৈঠকে স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা, স্বরাষ্ট্র সচিব, আইজিপি, ডিএমপি কমিশনারসহ ঊর্ধ্বতনরা উপস্থিত ছিলেন। বৈঠকে এ ব্যাপারে বিস্তারিত আলোচনা হয়েছে। পুলিশের কোন কোন ব্যাচের বড় কর্তাদের নির্বাচনে দায়িত্ব দেওয়া হবে, বৈঠকে সেটা নিয়েও পর্যালোচনা করা হয়। এ ক্ষেত্রে বিসিএস ক্যাডারের ১৮, ২০, ২১, ২২, ২৪, ২৫, ২৭ ও ২৮, ২৯, ৩০ ও ৩১ ব্যাচের ডিআইজি, অতিরিক্ত ডিআইজি, পুলিশ সুপার ও অতিরিক্ত পুলিশ সুপারদের বেশি প্রাধান্য দেওয়া হচ্ছে। বর্তমানে পুলিশে ৩ হাজার ১২৪ জন প্রথম শ্রেণির বিসিএস ক্যাডার কর্মকর্তা রয়েছেন। তাদের মধ্যে ১,২২২ জন এএসপি, ১,০০১ অতিরিক্ত এসপি, ৫৯৩ এসপি, ২০০ জন অতিরিক্ত ডিআইজি, ৮৫ জন ডিআইজি, ২০ অতিরিক্ত মহাপরিদর্শক, গ্রেড ১-এর ৪ জন অতিরিক্ত মহাপরিদর্শক ও একজন মহাপরিদর্শক রয়েছেন। নির্বাচনে পুলিশ সদর দপ্তর, সিআইডি, পুলিশ টেলিকম, রেলওয়ে, হাইওয়ে পুলিশ, পিবিআই, শিল্প পুলিশ, সন্ত্রাসবিরোধী ইউনিট এটিইউ, সারদা পুলিশ একাডেমি, পুলিশ স্টাফ কলেজ ও আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়ন থেকে পুলিশ সদস্যদের দায়িত্ব পালন করার কথা রয়েছে।
পুলিশ সদর দপ্তরের ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে বলেন, আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর উচ্চাভিলাষী ও অপেশাদার পুলিশ সদস্যদের একটি তালিকা তৈরি করা হয়। ওই তালিকায় যাদের নাম রয়েছে, তাদের মধ্যে বিসিএসের ১২, ১৫, ১৭, ১৮, ২০, ২১, ২২, ২৪ ও ২৫ ব্যাচের কর্মকর্তাই সবচেয়ে বেশি। অতিরিক্ত আইজিপি থেকে শুরু করে কনস্টেবল পর্যন্ত অনেকে আছেন, যারা এখনো কর্মস্থলে যোগ দেননি।
বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে সারা দেশে নিহতের ঘটনায় হত্যা মামলায় অন্তত দেড়শ ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাকে আসামি করা হয়েছে। তাদের মধ্যে পুলিশের সাবেক মহাপরিদর্শক (আইজিপি) থেকে শুরু করে ডিএমপির কমিশনার, অতিরিক্ত কমিশনার, উপকমিশনার, সহকারী কমিশনার, থানার ওসি রয়েছেন। পাশাপাশি ইন্সপেক্টর, সাব-ইন্সপেক্টর, সহকারী সাব-ইন্সপেক্টর ও কনস্টেবলদেরও আসামি করা হয়েছে।