গণ-অভ্যুত্থান-পরবর্তী শ্রীলংকা ছিল রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা, অর্থনৈতিক ক্ষত ও আস্থাহীনতার এক কঠিন পর্বে দাঁড়িয়ে থাকা দেশ। ২০২২ সালের ‘আরাগালায়া’ আন্দোলনের পর ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরে জাতীয় নির্বাচন ছিল দেশটির জন্য অগ্নিপরীক্ষা। অর্থনৈতিক বিপর্যয়, সামাজিক ক্ষোভ ও পুরনো রাজনৈতিক অভিজাতদের প্রতি অনাস্থার মতো পরিস্থিতিতে দাঁড়িয়ে শ্রীলংকার নির্বাচন কমিশন গণ-অভ্যুত্থান-পরবর্তী গণতন্ত্রে ফেরার পরীক্ষায় দারুণভাবে সফল হয়েছে। নির্বাচনের তফসিলের পর ইলেকশন কমিশন অব শ্রীলংকা (ইসিএসএল) সরকারি প্রভাবমুক্ত নির্বাচন নিশ্চিতে প্রশাসন ও পুলিশকে সরকারের নিয়ন্ত্রণ থেকে নিউট্রালাইজ করে। সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের রাজনৈতিক কার্যক্রমে অংশগ্রহণ নিষিদ্ধ করা হয়। ক্ষমতাসীন প্রার্থীর প্রশাসনিক সুবিধা ব্যবহারের বিরুদ্ধে প্রকাশ্যে আপত্তি জানায়। এমনকি তৎকালীন ক্ষমতাসীন প্রেসিডেন্ট রণিল বিক্রমাসিংহের জমি বণ্টন কর্মসূচি স্থগিতের নির্দেশ দেয় এবং সরকারি কর্মচারীদের বেতন বাড়ানোর ঘোষণাকে নির্বাচনী আচরণবিধি লঙ্ঘন হিসেবে প্রকাশ্যে সমালোচনা করে। দেশটির প্রান্তিক পর্যায়ে ব্যাপক সচেতনতা কার্যক্রম পরিচালনা করা হয়। প্রায় ৭০ শতাংশ ভোটার উপস্থিতি নির্বাচনটির গ্রহণযোগ্যতা আরো জোরালো করে। পর্যবেক্ষক ও বিশ্লেষকদের মতে, শান্তিপূর্ণ, প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন আয়োজনের এ সক্ষমতা দক্ষিণ এশিয়ার রাজনৈতিক ইতিহাসে ব্যতিক্রমী দৃষ্টান্ত।
সংশ্লিষ্টদের মতে, শ্রীলংকার সফল নির্বাচন বাংলাদেশের জন্যও দৃষ্টান্ত হতে পারে। কিন্তু বাংলাদেশের আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোট ঘিরে তফসিল ঘোষণার পর যে প্রশাসনিক ও প্রচারণামূলক চিত্র সামনে এসেছে, তা অনেকের চোখে শ্রীলংকার পথের ঠিক উল্টো। শ্রীলংকায় যেখানে নির্বাচন কমিশন তফসিল ঘোষণার পর প্রশাসন ও নিরাপত্তা কাঠামোকে কার্যত সরকারের প্রভাব থেকে দূরে রেখে কমিশনের অধীনে নিয়ন্ত্রণে এনেছে, বাংলাদেশে সেখানে তফসিল ঘোষণার পরও বড় পদোন্নতি ও বদলির মতো সিদ্ধান্ত দেখা গেছে। নির্বাচনের আগে বিভিন্ন দেশের সঙ্গে চুক্তি করার কথাও রয়েছে অন্তর্বর্তী সরকারের। অর্থাৎ তফসিল ঘোষণার পর রুটিন কাজের পরিবর্তে সব ক্ষেত্রে নির্ধারণী ভূমিকা অব্যাহত রেখেছে অন্তর্বর্তী সরকার। পাশাপাশি গণভোটে ‘হ্যাঁ’ ভোটের পক্ষে বিভিন্ন স্তরে সরকারি সমন্বিত প্রচারণা উদ্যোগের তথ্যও সামনে আসে, যা পরে নির্বাচন কমিশনের প্রজ্ঞাপনের পর প্রকাশ্যে স্থগিত রাখা হয়।
শ্রীলংকায় আগের নির্বাচনগুলোর সঙ্গে তুলনা করলে ২০২৪ সালের নির্বাচনের পার্থক্য স্পষ্ট। দেশটিতে ২০১০ ও ২০১৫ সালের নির্বাচনে ভোট জালিয়াতি, ক্ষমতাসীনদের প্রশাসনিক প্রভাব, রাষ্ট্রীয় সম্পদ ব্যবহারের অভিযোগ এবং সহিংসতার ঘটনা নিয়মিত আলোচনায় ছিল। ২০১৯ সালের সাধারণ নির্বাচনেও প্রচারণায় কালো টাকা ব্যবহারের অভিযোগ, রাষ্ট্রীয় পক্ষপাত, ভোট জালিয়াতি এবং বিরোধীদের ওপর দমন-পীড়নের ব্যাপক অভিযোগ ছিল। সে তুলনায় ২০২৪ সালের নির্বাচনে বড় ধরনের ব্যালট কারচুপি বা জালিয়াতির অভিযোগ ওঠেনি। ২০২৪ সালের নির্বাচনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক ছিল—সরকার কেবল রুটিন ভূমিকা পালন করেছে। নির্বাচন আয়োজনের সিদ্ধান্ত, ভোটের ব্যবস্থাপনা, ফল ঘোষণা—সবই নির্বাচন কমিশনের মাধ্যমে নির্ধারিত হয়েছে। পুলিশ, জেলা প্রশাসন ও স্থানীয় সরকার কাঠামো নির্বাচনের সময়ে কমিশনের নির্দেশনা অনুযায়ী কাজ করে। প্রার্থীদের ডিজিটাল প্রচারণা ও দলের ওপরও আচরণবিধি মানার নির্দেশ দেয়।
শ্রীলংকার কমিশনের প্রধান লক্ষ্য ছিল ‘লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড’ নিশ্চিত করা। ক্ষমতাসীন প্রার্থীর প্রশাসনিক সুবিধা ব্যবহারের আশঙ্কা থাকায় সরকারি সম্পদ ব্যবহারে কড়াকড়ি আরোপ করা হয়। নির্বাচনকালে প্রকাশ্যে ক্ষমতাসীন প্রেসিডেন্ট রণিল বিক্রমাসিংহের কার্যালয়ের জমি বণ্টন কর্মসূচি স্থগিতের নির্দেশ দেয় কমিশন। সরকারি কর্মচারীদের বেতন বাড়ানোর ঘোষণাকে নির্বাচনকালীন আচরণবিধি লঙ্ঘন হিসেবে সমালোচনা করে, যা দেশটিতে আলোড়ন তৈরি করে। কালো টাকা ব্যবহার বন্ধে প্রার্থীদের ব্যয় তহবিল ব্যবহারের ওপর নজরদারি চালানো হয়। অতীতের নির্বাচনে পুলিশ ও নিরাপত্তা সংস্থাগুলোকে ক্ষমতাসীনদের পক্ষে কাজ করার অভিযোগ উঠত। কিন্তু ২০২৪ সালের নির্বাচনকালে নিরাপত্তা বাহিনী ‘ভোটের পাহারাদার’ হিসেবে কাজ করেছে, ‘ভোট প্রভাবক’ হিসেবে নয়; যা আগের নির্বাচনগুলোর তুলনায় একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন। জেলা প্রশাসন, পুলিশ ও স্থানীয় সরকার কাঠামোর জন্য পৃথক সমন্বয় ইউনিট গঠন করা হয়, যারা শুধু কমিশনের নির্দেশনা বাস্তবায়ন করেছে। মাঠপর্যায়ে রিটার্নিং কর্মকর্তা ও সহকারী কর্মকর্তাদের দায়িত্ব বণ্টন ছিল স্পষ্ট এবং কেন্দ্রীয় পর্যায়ে মনিটরিং সেল থেকে প্রতিদিন প্রতিবেদন সংগ্রহ করা হতো। এ কাঠামো সিদ্ধান্তগ্রহণে দ্রুততা, শৃঙ্খলা ও নিরপেক্ষতা নিশ্চিত করেছে।
পর্যবেক্ষকদের মতে, শ্রীলংকার সফল নির্বাচনের নেপথ্যে ছিল নির্বাচন কমিশনের স্বাধীন অবস্থান, প্রশাসনের ওপর কার্যকর নিয়ন্ত্রণ এবং সরকারি প্রভাবমুক্ত নির্বাচন আয়োজনের সচেষ্ট প্রয়াস। দেশটিতে যেখানে নির্বাচন কমিশন তফসিল ঘোষণার পর সরকারি প্রশাসনকে নিউট্রালাইজ করা হয়েছে সেখানে বাংলাদেশে তফসিল ঘোষণার পর বড় প্রশাসনিক পদোন্নতি, বদলি ও গণভোটকেন্দ্রিক সরকারি প্রচারণা উদ্যোগ নির্বাচনকালীন রাষ্ট্রীয় আচরণ নিয়ে নতুন বিতর্ক তৈরি করেছে।
গত ১১ ডিসেম্বর ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোটের তফসিল ঘোষণা করে নির্বাচন কমিশন। পরদিন ১২ ডিসেম্বর বিসিএস সাধারণ শিক্ষা ক্যাডারে বড় পদোন্নতি দেয় অন্তর্বর্তী সরকার। অধ্যাপক ও সহযোগী অধ্যাপক পদে একসঙ্গে ২ হাজার ৭০৬ কর্মকর্তাকে পদোন্নতি দেয়া হয়। একই দিন বাংলাদেশ পুলিশের উপমহাপরিদর্শক (ডিআইজি) পদমর্যাদার ৩০ জন এবং অতিরিক্ত ডিআইজি পদমর্যাদার নয় কর্মকর্তার কর্মস্থল পরিবর্তন করা হয়। চলতি বছরের ২৭ জানুয়ারি জনপ্রশাসনে ১১৮ জন যুগ্ম সচিবকে পদোন্নতি দিয়ে অতিরিক্ত সচিব করা হয়।

২০২৪ সালের ২১ সেপ্টেম্বর শ্রীলংকায় অনুষ্ঠিত হয় সাধারণ নির্বাচন ছবি: রয়টার্স
গণভোটেও ‘হ্যাঁ’ ভোটের পক্ষে সরকার পরিকল্পিত ও সমন্বিত প্রচারণা চালানোর উদ্যোগ নিয়েছিল। প্রচারণার অংশ হিসেবে স্থানীয় প্রশাসনের সঙ্গে সমন্বয় করে এনজিওগুলোকে যুক্ত করা, সব ব্যাংকের শাখায় ব্যানার টানানোর নির্দেশ, পোশাক কারখানার সামনে ব্যানার এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষক, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের মাধ্যমে ‘হ্যাঁ’ ভোটের পক্ষে জনসচেতনতা তৈরির উদ্যোগ নেয়া হয়। তবে ২৯ জানুয়ারি নির্বাচন কমিশন প্রজ্ঞাপন জারি করে প্রজাতন্ত্রের কর্মচারীদের পক্ষে-বিপক্ষে প্রচার দণ্ডনীয় ঘোষণা করলে সরকারিভাবে এ প্রকাশ্য প্রচারণা বন্ধ রাখা হয়। ১২ জানুয়ারিতে ‘হ্যাঁ’ ভোটের পক্ষে প্রচারণা শুরু করে সরকার। সরকারি কর্মচারীদের প্রচারণা বন্ধে এতদিন পর কেন নির্বাচন কমিশন নির্দেশনা দিল সে বিষয়েও প্রশ্ন তুলছেন অনেকে। এমনকি শেষ সময়ে এসে নির্বাচনের আগে বিভিন্ন দেশের সঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ চুক্তিও স্বাক্ষর করার পথে রয়েছে অন্তর্বর্তী সরকার। এছাড়া সরকারি চাকরিজীবীদের বেতন বাড়ানোর উদ্যোগও নিয়েছিল সরকার, যদিও শেষ পর্যন্ত ওই সিদ্ধান্ত থেকে তারা সরে আসে।
এ বিষয়ে সাবেক সচিব ও বাংলাদেশ লোকপ্রশাসন প্রশিক্ষণ কেন্দ্রের (বিপিএটিসি) সাবেক রেক্টর একেএম আবদুল আউয়াল মজুমদার বণিক বার্তাকে বলেন, ‘এখন সরকারের মেয়াদ রয়েছে হাতেগোনা আর কয়েক দিন। ভোটের পর ক্ষমতা হস্তান্তর করতে লাগবে কয়েক দিন। এখন সরকারের কোনো বড় কাজে হাত দেয়া একেবারেই উচিত না। যে চুক্তি স্বাক্ষর করতে যাচ্ছে এটা ঠিক হবে না। এটা গণতান্ত্রিক বিশ্বের নর্মসের সঙ্গে মেলে না। এছাড়া সরকারের হ্যাঁ ভোটের পক্ষ নেয়ার বিষয়েও শুরু থেকেই আপত্তি করে আসছি। এখানে সরকারের পক্ষ নেয়া উচিত না। হ্যাঁ-নার প্রস্তাব সরকার তৈরি করে দিয়েছে, বাকিটা জনগণের বিষয়। ভোটার আর রাজনীতিবিদরা মিলে সিদ্ধান্ত নিক কোনটা হওয়া উচিত আর কোনটা হওয়া উচিত না।’
নির্বাচনকেন্দ্রিক সহিংসতা নিয়েও উদ্বেগ বাড়ছে। তফসিল ঘোষণার পর বিভিন্ন এলাকায় নির্বাচনী সহিংসতার ঘটনা ও সংঘর্ষ বেড়ে চলেছে, যা ভোটের মাঠকে ক্রমেই উত্তপ্ত করে তুলছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে পুরনো অনিশ্চয়তা। ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের অস্থির সময়ে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর যে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ অস্ত্র খোয়া যায়, সেগুলোর বড় অংশ এখনো উদ্ধার হয়নি। এ বাস্তবতায় সাধারণ ভোটারদের মধ্যে নিরাপত্তা নিয়ে শঙ্কা ও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। আরেকটি উদ্বেগ ভোটের টার্নআউট ঘিরে। ভোটের সময় টানা ছুটি থাকায় অনেক ভোটার নিজ নিজ এলাকার বাইরে চলে যেতে পারেন; ফলে ভোটার উপস্থিতি কমে যাওয়ার আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা। অন্তর্বর্তী সরকারের পররাষ্ট্র উপদেষ্টা মো. তৌহিদ হোসেন ৫৫ শতাংশের বেশি ভোট পড়ার প্রত্যাশা ব্যক্ত করেছেন। তবে দেড় দশকের বেশি সময় ধরে মানুষের ভোটাধিকার কার্যত ছিলই না; সে বাস্তবতায় এবারের নির্বাচনে জন-উৎসাহ ও ভোটার উপস্থিতি আরো বেশি হওয়ার কথা বলেই মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। তারা বলছেন, নির্বাচনকে ঘিরে সহিংসতা নিয়ন্ত্রণ, অস্ত্র উদ্ধার ও ভোট কেন্দ্রভিত্তিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা না গেলে কম ভোট টার্নআউটের আশঙ্কা ঘনীভূত হতে পারে।
এদিকে গত ২৮ জানুয়ারি রাজধানীর একটি হোটেলে গোলটেবিল আলোচনায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের বিশেষ সহকারী অধ্যাপক আলী রীয়াজ বলেন, ‘সংসদ প্রথম দিন থেকেই নির্বাচিত হওয়ার পর তার স্বাভাবিক কার্যাবলি যেমন—সরকার গঠন, দেশ পরিচালনা ও বাজেট তৈরির কাজ করবে। তবে বিদ্যমান সংবিধানকে ফ্যাসিবাদের পথ থেকে সরিয়ে আনতে মৌলিক পরিবর্তনের প্রয়োজন। এজন্য নির্বাচিত সদস্যরা আলাদা শপথ নিয়ে ১৮০ দিনের মধ্যে সংস্কারের কাজ শেষ করবেন।’ তার বক্তব্য নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম থেকে শুরু করে রাজনৈতিক অঙ্গনে তীব্র বিতর্ক তৈরি হয়। ব্যাপক সমালোচনার পর প্রধান উপদেষ্টার প্রেস উইং ফ্যাক্টসের ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে দেয়া এক বিবৃতিতে বলা হয়, ‘অধ্যাপক আলী রীয়াজ কোথাও বলেননি যে অন্তর্বর্তী সরকার ১৮০ দিন গণপরিষদ হিসেবে কাজ করবে; বরং তিনি বলেছেন, এ দায়িত্ব পালন করবেন নির্বাচিত সংসদ সদস্যরা।’
সরকারের সাবেক এক শীর্ষ কর্মকর্তা বণিক বার্তাকে বলেন, ‘গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো তফসিল ঘোষণার পর সরকার বড় নীতিগত সিদ্ধান্ত নেবে না, প্রশাসনিক পদায়ন বা এমন কোনো পদক্ষেপ নেবে না যা নির্বাচনকে প্রভাবিত করতে পারে। এ ধারণা মূলত একটি গণতান্ত্রিক রীতি বা কনভেনশন। এটি আইনে স্পষ্টভাবে লেখা না থাকলেও সংসদীয় গণতন্ত্রে প্রতিষ্ঠিত একটি চর্চা। যুক্তরাজ্য, ভারতসহ বহু স্থিতিশীল সংসদীয় গণতন্ত্রে নির্বাচনকালে সরকার “রুটিন কাজ” চালালেও বড় নীতিগত সিদ্ধান্ত থেকে বিরত থাকে। এটি আইনগত বাধ্যবাধকতার চেয়ে রাজনৈতিক ও নৈতিক দায়বদ্ধতার বিষয় বেশি। অর্থাৎ তফসিলের পর সরকারের সংযত আচরণ মূলত একটি প্রচলিত গণতান্ত্রিক প্রথা।’
তবে তফসিল ঘোষণার পর সরকারের কার্যক্রম নির্বাচনী প্রক্রিয়াকে প্রভাবিত করছে না বলে দাবি করেছেন নির্বাচন কমিশনার মো. আনোয়ারুল ইসলাম সরকার। তিনি বণিক বার্তাকে বলেন, ‘আন্তর্জাতিক চুক্তি বা সমঝোতা স্মারকের বিষয়টি দীর্ঘমেয়াদি রাষ্ট্রীয় প্রক্রিয়ার অংশ। সরকার তাদের রুলস অব বিজনেস ও সাংবিধানিক দায়িত্বের আওতায় কাজ করছে। এসব ক্ষেত্রে নির্বাচন কমিশনের হস্তক্ষেপ করার সুযোগ সীমিত। আমাদের মূল দায়িত্ব হলো নির্বাচনী প্রক্রিয়ায় নিরপেক্ষতা বজায় রাখা। সেজন্য প্রয়োজনীয় আইন ও বিধি আমরা প্রয়োগ করছি। সরকার যে কাজগুলো করছে, সেগুলো সংবিধান ও প্রচলিত নিয়মের মধ্যেই করছে বলে আমাদের কাছে প্রতীয়মান হয়েছে। এসব কার্যক্রম নির্বাচনের সঙ্গে সরাসরি সংশ্লিষ্ট নয় এবং নির্বাচনে প্রভাব ফেলছে—এমন প্রমাণও আমাদের কাছে নেই।’
সরকার সব জনমত কিংবা প্রতিবাদ অগ্রাহ্য করে যেভাবে চুক্তি করছে তা খুব সন্দেহজনক বলে মনে করেন অর্থনীতিবিদ ও গণতান্ত্রিক অধিকার কমিটির সদস্য অধ্যাপক আনু মুহাম্মদ। তিনি বলেন, ‘সরকার নিয়ম-নীতি এবং আইনবিরুদ্ধ কাজ করছে। তারা সংস্কারের যেসব কথাবার্তা বলে ঠিক তার বিপরীত কাজ করছে। প্রধান উপদেষ্টা সরকারের মধ্যে কিছু লোকজন নিয়ে এসেছেন, যারা আপাতদৃষ্টিতে তার বিশেষ সহকারী। যদিও তাদের মূল কাজটা হয়ে দাঁড়িয়েছে কোম্পানির লবিস্ট হিসেবে কাজ করা। তারা সারাক্ষণ বিদেশী কোম্পানির সঙ্গে চুক্তি করার বিষয়ে এত আগ্রহী যে তা সন্দেহের উদ্রেক করে।’
অধ্যাপক আনু মুহাম্মদ প্রশ্নে রেখে বলেন, ‘তাদের কি কাউকে কোনো কথা দেয়া আছে? নাকি বিদেশী কোম্পানি বা অন্যান্য রাষ্ট্রের স্বার্থ রক্ষায় তারা দায়বদ্ধ? চুক্তি, অর্থ বরাদ্দ, কেনাকাটা কোনো কিছুই তারা এখন করতে পারে না। এগুলো বন্ধ করতে হবে। রাজনৈতিক দলগুলো কেন চুপ করে আছে বুঝতে পারছি না।’
এ বিষয়ে মন্ত্রিপরিষদ সচিব ড. শেখ আব্দুর রশীদ বণিক বার্তাকে বলেন, ‘এটা তত্ত্বাবধায়ক সরকার নয়। তাই তফসিল ঘোষণার পর নীতিনির্ধারণী সিদ্ধান্ত নিতে পারবে কিনা—এ প্রশ্ন যৌক্তিক নয়। সরকার রাষ্ট্রীয় প্রয়োজনে যেকোনো সময়ই সিদ্ধান্ত নিতে পারে। পদোন্নতি নিয়ম অনুযায়ী হচ্ছে।’ পদ খালি আছে, কর্মকর্তারা যোগ্য হয়েছেন, এ কারণে পদোন্নতি হচ্ছে বলেও দাবি করেন তিনি।
তবে এ বিষয়ে ভিন্নমত প্রকাশ করেছেন সাবেক নির্বাচন ব্যবস্থা সংস্কার কমিশনের সদস্য ও গত তিনটি নির্বাচনে অনিয়মের অভিযোগে গঠিত তদন্ত কমিশনের সাবেক সদস্য এবং নির্বাচন বিশেষজ্ঞ ড. মো. আব্দুল আলীম। তিনি বণিক বার্তাকে বলেন, ‘নির্বাচনের আগে সরকারের মূল দায়িত্ব হওয়া উচিত নির্বাচন কমিশনকে প্রয়োজনীয় সহায়তা করা এবং নিয়মিত প্রশাসনিক কাজ চালু রাখা। কিন্তু এ সময়ে যদি বড় নীতিগত সিদ্ধান্ত, বড় চুক্তি বা ব্যাপক পদোন্নতি-নিয়োগ দেয়া হয় তাহলে তা নিয়ে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন ওঠে। প্রশাসনের গুরুত্বপূর্ণ পদে বদলি বা পদোন্নতি নির্বাচনকালে মাঠ প্রশাসনের আচরণ ও নিরপেক্ষতা নিয়ে জনমনে প্রশ্ন উঠতে পারে। এ কারণেই অনেক দেশে নির্বাচন-পূর্ব সময়ে সরকারগুলো রুটিন দায়িত্ব পালন করে। বড় নীতিগত সিদ্ধান্ত নেয়ার ক্ষেত্রে সংযত থাকে। এমনকি যেখানে আনুষ্ঠানিক তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা নেই, সেখানেও নির্বাচন সামনে থাকলে বিদায়ী সরকার বড় নীতিগত সিদ্ধান্ত নেয়া থেকে বিরত থাকে।’
ড. মো. আব্দুল আলীমের মতে, ‘একান্ত প্রয়োজন না হলে নির্বাচন-পূর্ব সময়ে বড় চুক্তি, গুরুত্বপূর্ণ নিয়োগ বা পদোন্নতির মতো সিদ্ধান্ত না নেয়াই উত্তম। আর নিতে হলে নির্বাচন কমিশনের সঙ্গে আলোচনা ও স্বচ্ছতা বজায় রাখা উচিত—এটাই আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত ভালো চর্চা।’