Image description

সরকারি চাকরি জীবনের ইতি টেনেও রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার ছায়া ছাড়তে পারেননি গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের সাবেক সচিব কাজী ওয়াছি উদ্দিন। বরাবরই নিজেকে সৎ কর্মকর্তা হিসেবে দাবি করতেন, চাকরি জীবনের প্রথমদিকে মোটামুটি রয়েসয়ে চলতেন। কিন্তু পরবর্তীতে ক্রমান্বয়ে অধঃপতন ঘটে তথাকথিত এই সৎ কর্মকর্তার। এক নাগাড়ে তিন বছরের বেশি সময় ছিলেন মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ে। এই মন্ত্রণালয়ে যুগ্মসচিব পদের পাশাপাশি পভাব খাটিয়ে একটি বড় প্রকল্পেরও প্রকল্প পরিচালকের দায়িত্ব নিজের হাতে রেখে দেন। এই সময় তলে তলে সিন্ডিকেট গড়ে তোলেন। গুরুতর অনিয়ম-অপকর্মে জড়িয়ে পড়েন। গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব হিসেবেও এই অনিয়মের ধারা অব্যাহত থাকে তার। এই সময় এক নারী ঠিকাদারের সঙ্গে পরকীয়া সম্পর্কে জড়িয়ে পড়েন। গণপূর্তের সচিব হওয়ার পরে এক পর্যায়ে ওই নারী ঠিকাদারকে বিয়েও করেন। তাকে নিয়ে উঠেন পূর্ত মন্ত্রণালয়ের অধীন বেইলী রোডের একটি বিশেষ বাংলোয়। নিয়ম অনুযায়ী বাড়ি ভাড়া ৫০ হাজার টাকা তার বেতন থেকে কেটে রাখার কথা। কিন্তু এর পরিবর্তে ক্ষমতার প্রভাব খাটিয়ে সম্পূর্ণ অবৈধভাবে মাত্র চার হাজার টাকা ভাড়া পরিশোধের ব্যবস্থা করেন তিনি পূর্ত সচিব পদে থেকে। শুধু তাই নয়, ওয়াছি উদ্দিনের পিআরএল শেষ হয়েছে ৯ মার্চ, ২০২৫। এখন পর্যন্ত তিনি সরকারি ওই বাংলোটি দখলে রেখেছেন সম্পূর্ণ অবৈধভাবে। গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ও এ ব্যাপারে কোনো ব্যবস্থা নিচ্ছে না তার বিরুদ্ধে। যদিও ইতিমধ্যে শেখ হাসিনা ও তার পরিবারের সদস্যদের অবৈধভাবে প্লট বরাদ্দের মামলায় কাজী ওয়াছি উদ্দিনকে ১৮ বছরের কারাদণ্ড দিয়েছেন আদালত।

সাবেক সচিব কাজী ওয়াছি উদ্দিনের গ্রামের বাড়ি গোপালগঞ্জের কাশিয়ানি উপজেলায়। আওয়ামী ফ্যাসিস্ট আমলে মূলতঃ এটিই ছিল ওয়াছি উদ্দিনের খুঁঁটির জোর। এই পরিচয়েই তিনি ২০২০ সালের আগস্টে গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ে অতিরিক্ত সচিব পদে পদায়ন পান। ১৫ সেপ্টেম্বর, ২০২২ তাকে গণপূর্ত সচিব করা হয়। চাকরির বয়স শেষে এক বছরের চুক্তিভিত্তিক নিয়োগও ভোগ করেন। গণপূর্তের সচিব পদে থাকাকালে শেখ সেলিম, ঢাকার পুলিশ কমিশনার হাবিবুর রহমানসহ গোপালগঞ্জের বেশ কয়েকজন প্রভাবশালীর সমন্বয়ে শক্তিশালী সিন্ডিকেট গড়ে তোলেন। সিন্ডিকেটের হয়ে সরকারি বাড়ি দখল, প্লট বাণিজ্য, টেন্ডার বাণিজ্য, নিয়োগ-বদলি, অনিয়ম, চাঁদাবাজিসহ এমন কোনো অপকর্ম নেই যা তিনি করেননি। তার সময়ে পূর্ত মন্ত্রণালয়কেন্দ্রীক নতুন একটি দালাল শ্রেণিও গড়ে উঠে। ২০২৩ সালের অক্টোবরে সচিবের দপ্তর থেকেই ভুয়া এক ডিজিএফআই কর্মকর্তাকে গ্রেফতার করে পুলিশ। ওই ব্যক্তি আদতে ছিল সচিব কাজী ওয়াছি উদ্দিনের দালাল। ওয়াছি উদ্দিনের নানাবিধ এসব অনিয়ম-অপকর্মের তথ্য বিস্তারিতভাবে পরবর্তীতে তুলে ধরা হবে। সরকারি বাংলোয় নামেমাত্র ভাড়া পরিশোধ এবং এখনও অবৈধ দখলে রেখে সরকারের যে বিপুল অংকের আর্থিক ক্ষতি করেছেন চলতি প্রতিবেদনে এ তথ্যগুলো তুলে ধরা হয়েছে।

সচিব কাজী ওয়াছি উদ্দিনের পিআরএল শুরু হয়েছে ২০২৪ এর ১০ মার্চ। ফলে নিয়ম অনুযায়ী ২০২৫ এর ৯ মার্চ পর্যন্ত তিনি সরকারি বাসায় থাকতে পারবেন। এরপরেও অতিরিক্ত দুই মাস এবং বিশেষ বিবেচনায় সর্বোচ্চ আরও চার মাস পর্যন্ত থাকা যায়। কিন্তু এখন পর্যন্ত তিনি কোন ক্ষমতার বলে সরকারি এ বাংলোটি দখল করে রেখেছেন, পূর্ত মন্ত্রণালয়ও তাকে কোন বিবেচনায় এ অবৈধ সুযোগ দিচ্ছে- সংশ্লিষ্টরা জবাব দিতে পারছেন না।

উল্লেখ্য, গত ১৭ জানুয়ারি শনিবার সরেজমিনে দেখা গেছে, কাজী ওয়াছি উদ্দিন রাজধানীর বেইলী রোডের মিনিস্টার্স এপার্টমেন্ট-৩ সংলগ্ন গণপূর্ত অধিদপ্তরের বৈদ্যুতিক সাব-স্টেশনের দ্বিতীয় তলায় অবস্থিত সরকারি ভবনটি ছাড়েননি। সরকারি নথিতে এটি একটি সাব-স্টেশন ভবন হিসেবে উল্লেখ থাকলেও বাস্তবে সেটিকে সম্পূর্ণভাবে ডুপ্লেক্স বাংলোতে রূপান্তর করা হয়েছে। কাজী ওয়াছি উদ্দিন এই বাংলোটিতে সরকারের বিপুল অংকের অর্থ খরচ করেছেন শুধু নিজে থাকার সুবিধার জন্যই। বর্তমানে ভবনটি ‘বেইলী রোড মন্ত্রীপাড়া ৪০ নম্বর বাড়ি’ হিসেবেই পরিচিত।

সবচেয়ে বিস্ময়কর ব্যাপার হলো, প্রায় ৫০ হাজার টাকা মাসিক ভাড়ার একটি ডুপ্লেক্স বাংলোর জন্য তিনি মাত্র ৪ হাজার টাকা ভাড়া পরিশোধ করছেন। বরাদ্দ নেওয়ার সময় নিজের প্রভাব খাটিয়ে বাসাটিকে ‘সাব-স্টেশন ভবন’ হিসেবে দেখিয়ে মূল বেতনের মাত্র ৭.৫ শতাংশ হারে ভাড়া নির্ধারণ করান তিনি।
বরাদ্দের আগে একই বাসায় বসবাস করতেন নির্বাহী প্রকৌশলী (ই/এম) তরিকুল ইসলাম। তিনি সরকারি বিধি অনুযায়ী তার বেতন থেকে প্রতি মাসে প্রায় ২৬ হাজার টাকা বাসা ভাড়া পরিশোধ করতেন। অথচ কাজী ওয়াছি উদ্দিন সেই একই বাসায় বসবাস করা সত্ত্বেও এমনকি ইতিমধ্যে বিপুল অংকের অর্থ ব্যয় করে বাসাটির উন্নয়ন সত্ত্বেও মাত্র চার হাজার টাকা ভাড়া পরিশোধ করছেন।

অভিযোগ রয়েছে, কাজী ওয়াছি উদ্দিন অত্যন্ত কৌশলে সাব-স্টেশন উল্লেখপূর্বক ভবনটি বরাদ্দ নেন এবং পরবর্তীতে সাব-স্টেশন কার্যক্রম পাশ কাটিয়ে পুরো ভবনটিকে বিলাসবহুল ডুপ্লেক্স বাংলোতে রূপান্তর করেন। নিচতলা ও দোতলা মিলিয়ে প্রায় ৮টি কক্ষবিশিষ্ট এই বাংলোটি আধুনিক রিনোভেশন ও দামী ফার্নিচারে সাজানো হয়।

সূত্র বলছে, ভবনটির সংস্কার ও আসবাবপত্র কেনায় প্রায় ৩ কোটি টাকা ব্যয় করা হয়েছে। সরকারি অর্থের এমন অপ্রয়োজনীয় বিপুল ব্যয় কীভাবে এবং কোন বিধিবলে করা হয়েছে, তা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।