Image description
ঝুঁকিতে গ্রামীণ স্বাস্থ্যসেবা

ডিপ্লোমা ইন মেডিকেল ফ্যাকাল্টি (ডিএমএফ) সনদধারীদের কর্মপরিধি ও ভুয়া চিকিৎসকদের প্রতিরোধ করতে বাংলাদেশ মেডিকেল অ্যান্ড ডেন্টাল কাউন্সিলসহ (বিএমডিসি) সংশ্লিষ্টরা যখন হিমশিম খাচ্ছে। তখন ‘বাংলাদেশ টেকনোলজি ফাউন্ডেশন’ (বিটিএফ) নামে একটি প্রতিষ্ঠান রীতিমতো ভুয়া মেডিকেল টেকনোলজিস্ট তৈরির কারখানা খুলে বসেছে। প্রতিষ্ঠানসংশ্লিষ্টরা চিকিৎসা বিশেষজ্ঞ না হয়েও গ্রামীণ স্বাস্থ্যসেবা উন্নয়নের নামে চিকিৎসা বিজ্ঞান বিষয়ে অন্তত ২০ ধরনের কোর্স করাচ্ছেন। নিয়মের তোয়াক্কা না করে প্রশিক্ষণ কোর্সগুলোর নামের আগে রীতিমতো ‘ডিপ্লোমা’ শব্দ বসিয়ে দিয়েছে। এসএসসি বা সমমান পাশ সনদের ফটোকপি ও জাতীয় পরিচয়পত্র থাকলেই যে কোনো বয়সি নারী-পুরুষ মেডিকেলবিষয়ক এসব কোর্স করতে পারছেন। নামকাওয়াস্ত প্রশিক্ষণ নিয়ে অনেকে রীতিমতো চিকিৎসক, মেডিকেল টেকনোলজিস্ট বা নার্স বনে যাচ্ছেন। জটিল-কঠিন রোগের সেবা দিচ্ছেন। এতে করে ঝুঁকিতে পড়ছে গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর স্বাস্থ্যসেবা।

চিকিৎসা বিশেষজ্ঞরা বলছেন-প্রথমত, কোনো ফাউন্ডেশন নন-মেডিকেল পার্সনদের মেডিকেল পারসন হিসাবে তৈরি করতে পারে না। দ্বিতীয়ত, চিকিৎসা বিষয়ে কোর্স পরিচালনা বা ডিপ্লোমা ডিগ্রি প্রদানের শিক্ষাদান করতে হলে ‘স্টেট মেডিকেল ফ্যাকাল্টি তথা রাষ্ট্রীয় চিকিৎসা অনুষদের’ অনুমোদন নিতে হয়। প্রয়োজনীয়সংখ্যক শিক্ষার্থী ও প্রতিষ্ঠান পরিচালনায় নিয়ম না মানায় সম্প্রতি রাষ্ট্রীয় চিকিৎসা অনুষদের সুপারিশে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয় ১৮৬টি মেডিকেল অ্যাসিস্ট্যান্ট ট্রেইনিং স্কুল (ম্যাটস) বন্ধ করে দিয়েছে। এতকিছুর পরও ফাউন্ডেশন গড়ে দীর্ঘ বছর ধরে মেডিকেল শিক্ষাদান পরিচালনা নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন বিশেষজ্ঞরা।

তবে বাংলাদেশ টেকনোলজি ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান এমএ হান্নানের দাবি, বিটিএফ ব্যাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের জয়েন্ট স্টক কোম্পানির অধীনে পরিচালিত হয়। প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয়ের অধীনে ‘জাতীয় দক্ষতা উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (এনএসডিএ) অনুমোদিত। বিটিএফ চিকিৎসক বা ডিপ্লোমা ডিগ্রিধারী তৈরি করেন না, মানুষকে দক্ষ করে গড়ে তুলতে প্রশিক্ষণ ও সার্টিফিকেট দেয়। প্রশিক্ষণ গ্রহীতারা রোগীকে স্যালাইন ও ইনজেকশন পুশ করা, আহতদের কাটাছেঁড়া ড্রেসিং করাতে পারেন। এ ছাড়া ব্লাড গ্রুপ নির্ণয়, রক্তচাপ মাপা, ডায়াবেটিস পরীক্ষা করা, গজ-ব্যান্ডেজ ব্যবহার শিক্ষা ও ওষুধের কার্যকারিতা সম্পর্কে আলোচনা করেত পারেন। প্রশিক্ষণ নিয়ে অনেকে বিভিন্ন বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে কাজ করছেন। নার্সিংয়ে ভর্তি হচ্ছেন। পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তর চাকরি পাচ্ছেন।

তবে প্রশিক্ষণ কোর্সের নামে ২ বছর মেয়াদি ‘ডিপ্লোমা ইন মেডিকেল ল্যাবরেটরি টেকনোলজি, ডিপ্লোমা ইন ডেন্টাল টেকনোলজি’ ও ‘ডিপ্লোমা ইন নার্সিং ট্রেইনিং প্রোগ্রাম’ কেন? ২ বছর, ১ বছর, ৬ মাস ও ৪ মাসের প্রশিক্ষণ কোর্সের নামের আগে ‘ডিপ্লোমা’ কেন? সে বিষয়ে কোনো সদুত্তর দিতে পারেননি তিনি।

বাংলাদেশ টেকনোলজি ফাউন্ডেশন ২০১৫ সালের ১৭ আগস্ট প্রতিষ্ঠিত হয়। প্রতিষ্ঠানটি সারা দেশে ২৯টি কেন্দ্র খুলে চিকিৎসাবিষয়ক কোর্স পরিচালনা করছে। বিটিএফ পরিচালিত অন্য কোর্সগুলো হলো-এক বছর মেয়াদি ডিপ্লোমা ইন মেডিকেল অ্যাসিসট্যান্ট (ডিএমএ), ডিপ্লোমা ইন হোমিওপ্যাথিক প্যারামেডিকেল (ডিএইচপিএম), ডিপ্লোমা ইন নার্সিং অ্যাসিস্ট্যান্ট (ডিএনএ), ডিপ্লোমা ইন মাদার অ্যান্ড চাইল্ড হেলথ কেয়ার (ডিএমসিএইচ), ডিপ্লোমা ইন ফিজিওথেরাপি (ডিপিটি) ও প্যারামেডিক বিষয়ে পড়ানো হচ্ছে।

এছাড়া ৬ মাস মেয়াদি ডিপ্লোমা ইন ইউনানি মেডিসিন অ্যান্ড সার্জারি অ্যাসিস্ট্যান্ট (ডিইউএমএসএ), হোমিওপ্যাথিক প্যারামেডিকেল (এইচপিএম) এবং ৪ মাসের ডিপ্লোমা ইন ভেটেনারি প্র্যাক্টিশনার (ডিভিপি) করানো হচ্ছে। কোর্স করার পর কেউ ইন্টার্নশিপ করতে চাইলে তাদের বিভিন্ন হাসপাতালে পাঠানো হয়।

এছাড়া ডিপ্লোমা ইন মেডিকেল ফ্যাসিলিটি (ডিএমএফ), ডিপ্লোমা ইন মেডিকেল ফ্যাকাল্টি (ডিএমএফ), বাংলাদেশ ডেন্টাল অ্যাসিস্ট্যান্ট (বিডিএ), রেডিওলোজি, লোকাল মেডিকেল অ্যাসিস্ট্যান্ট অ্যান্ড ফ্যামিলি প্ল্যানিং (এলএমএএফপি), বেসিক ইউনানি মেডিসিন অ্যান্ড সার্জারি (বিইউএমএস), বাংলাদেশ রেজিস্টার্ড মেডিকেল প্র্যাক্টিশনার (বিআরএমপি), লোকাল ভেটেনারি প্র্যাক্টিশনার (এলভিপি), ফার্মাসিস্ট ট্রেইনিং প্রোগ্রাম ও ল্যান্ড সার্ভার (আমিনশিপ) কোর্সগুলো আগে করানো হলেও নানা কারণে বর্তমানে বন্ধ রাখা হয়েছে। চিকিৎসা বিশেষজ্ঞরা যুগান্তরকে বলছেন, ২০১৯ সালে প্রতিষ্ঠিত এনএসডিএ-এর মূল লক্ষ্য জাতীয় ও আন্তর্জাতিক শ্রমবাজারের চাহিদার ভিত্তিতে দক্ষতা উন্নয়ন সম্পর্কিত পরিকল্পনা ও সমন্বয় সাধনের মাধ্যমে দক্ষ মানবসম্পদ তৈরি করা। চিকিৎসা বিষয়ে শিক্ষা দিতে চাইলে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়, স্টেট মেডিকেল ফ্যাকাল্টি (রাষ্ট্রীয় চিকিৎসা অনুষদ) বা নার্সিং কাউন্সিলের অনুমোদন লাগে। ইতোপূর্বে কারিগরি শিক্ষা বোর্ডের অধীনে চালু হওয়া মেডিকেল কোর্স পরিচালনার অনুমোদন বাতিল করা হয়ছে। এরপরও নামে-বেনামে অনেকে চিকিৎসা বিজ্ঞানের বিভিন্ন বিষয়ে প্রশিক্ষণ বা কোর্স পরিচালনা করছে। বিশেষ করে অনেক প্রতিষ্ঠান পল্লি চিকিৎসকদের প্রশিক্ষণ দিচ্ছে, যা চিকিৎসা বিজ্ঞানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক। নামমাত্র প্রশিক্ষণ নিয়ে সংশ্লিষ্টরা চিকিৎসা পেশার সঙ্গে যুক্ত হচ্ছেন। নামের আগে ডাক্তার, মেডিকেল টেকনোলজিস্ট পদবি লিখছেন। মেডিকেলবিষয়ক ডিগ্রি ছাড়াই চিকিৎসা দান, রোগ নির্ণয় বা ওষুধ প্রদান করছেন। রোগীদের জীবন ঝুঁকিতে ফেলছেন। এমন পরিস্থিতিতে ফাউন্ডেশনের ঘোষণা দিয়ে প্রশিক্ষণের আয়োজন করা হলে তাদের দৌরাত্ম্য আরও বেড়ে যাবে। সাধারণ মানুষ প্রতারিত হবে।

বাংলাদেশ মেডিকেল অ্যান্ড ডেন্টাল কাউন্সিল (বিএমডিসি) সভাপতি অধ্যাপক ডা. সাইফুল ইসলাম যুগান্তরকে বলেন, ডিপ্লোমা ডিগ্রি দিতে হলে সরকারের স্বীকৃত কোনো বোর্ড হতে হবে। কোনো ফাউন্ডেশনের অধীনে পরিচালিত পাঠ্যক্রমকে ডিপ্লোমা সনদ দেওয়ার এখতিয়ার নেই। মেডিকেল বিষয়ে পাঠ শেষে কেউ দেশে প্র্যাকটিস করতে চাইলে বোর্ড থেকে লাইসেন্স নিতে হয়। চিকিৎসক, নার্স ও মেডিকেল অ্যাসিস্ট্যান্ট ছাড়া অন্য চিকিৎসা পেশাজীবীদের যা নেওয়ার সুযোগ নেই। কেউ প্র্যাকটিস করলে অবৈধ হবে।