বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাতের মানচিত্রে গত এক যুগে আমূল পরিবর্তন এসেছে। যে ব্যাংকের কার্যক্রম একসময় শুধু শহরের শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত ভবনে সীমাবদ্ধ ছিল, ‘এজেন্ট ব্যাংকিং’য়ের হাত ধরে সেই সেবা এখন পৌঁছে গেছে দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলেও। পরিসংখ্যান বলছে, আর্থিক অন্তর্ভুক্তির এই লড়াইয়ে ‘এজেন্ট ব্যাংকিং’ এখন আর কোনো সাধারণ ধারণা নয়, বরং এটি দেশের প্রান্তিক অর্থনীতিতে এক ‘নীরব বিপ্লব’ ঘটিয়ে দিয়েছে। ১২ বছর আগে শুরু হওয়া এই যাত্রা এখন কোটি মানুষের আস্থার নাম। ব্যাংক শাখা খুলতে যে বিশাল ব্যয় ও জনবলের প্রয়োজন হয়, সেই সীমাবদ্ধতাকে জয় করে এই এজেন্ট ব্যবস্থায় আজ ২ কোটি ৫৬ লাখ ১৬ হাজার ৬৭২টি অ্যাকাউন্ট খোলা হয়েছে। এর মধ্যে ২ কোটি ১৭ লাখ ৬০ হাজার ৮৮৪টি হিসাবই গ্রামীণ এলাকার। অর্থাৎ, এজেন্ট ব্যাংকিংয়ের এই বিপ্লব মূলত গ্রামকে কেন্দ্র করেই আবর্তিত হচ্ছে। সবচেয়ে বড় অর্জনের জায়গাটি হলো লিঙ্গবৈষম্য নিরসন; মোট অ্যাকাউন্টের ৫২ শতাংশের বেশি এখন নারীর।
ইউএনডিপির সহায়তায় বাংলাদেশে এজেন্ট ব্যাংকিং চালুর উদ্যোগ শুরু হয় ২০১৩ সালে। ওই বছর পরীক্ষামূলকভাবে বিশেষায়িত ব্যাংকিং সেবা হিসেবে এজেন্ট ব্যাংকিং চালুর অনুমোদন পায় বেসরকারি খাতের ব্যাংক এশিয়া। এর পর ২০১৩ সালের ৯ ডিসেম্বর একটি নীতিমালা জারি করে বাংলাদেশ ব্যাংক। নীতিমালা জারির কিছুদিনের মধ্যে ২০১৪ সালের ১৭ জানুয়ারি আনুষ্ঠানিকভাবে এজেন্ট ব্যাংকিং সেবা চালু করে ব্যাংক এশিয়া। যে কারণে দিনটি এখন এজেন্ট ব্যাংকিং দিবস হিসেবে পরিচিতি পেয়েছে। ঢাকার পার্শ্ববর্তী মুন্সীগঞ্জ জেলার জৈনসার ইউনিয়নে প্রথম এজেন্ট আউটলেট খোলা হয়।
এক যুগ আগে বাংলাদেশে এজেন্ট ব্যাংকিং শুরু হলেও ১৯৯৯ সালে বিশ্বে প্রথম এজেন্ট ব্যাংকিং চালু করে ব্রাজিল। এ ছাড়া কলম্বিয়া, পেরু, মালয়েশিয়া, কেনিয়া, মেক্সিকো, ভেনেজুয়েলা, ইকুয়েডর, আর্জেন্টিনাসহ কয়েকটি দেশে এজেন্ট ব্যাংকিং চালু আছে। এসব দেশেও কম খরচের এ সেবার প্রধান লক্ষ্য হচ্ছে আর্থিক অন্তর্ভুক্তি বাড়ানো।
যে কারণে এজেন্ট ব্যাংকিং: ব্যাংকিং খাত কেন প্রথাগত শাখা ব্যবস্থা ছেড়ে এজেন্টের দিকে ঝুঁকল, তার পেছনে রয়েছে গভীর অর্থনৈতিক ও কৌশলগত কারণ। সাধারণত একটি পূর্ণাঙ্গ ব্যাংকের শাখা খুলে সেবা দিতে যে পরিমাণ খরচ হয়, তা সব জায়গায় লাভজনক হয় না। লোকবল নিয়োগ, জায়গার উচ্চ ভাড়া, নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং অভ্যন্তরীণ সাজসজ্জা মিলিয়ে একটি শাখার পরিচালন ব্যয় অনেক বেশি। ফলে ব্যাংকগুলোর মধ্যে গ্রামমুখী হওয়ার প্রবণতা কম ছিল এবং প্রত্যন্ত অঞ্চলের বিপুল সংখ্যক মানুষ ব্যাংকিং সেবার বাইরেই থেকে যাচ্ছিল। এই বাস্তবতা মাথায় রেখেই আর্থিক অন্তর্ভুক্তি বাড়াতে এজেন্ট বা প্রতিনিধি ব্যাংকিংয়ের ধারণা নিয়ে আসা হয়।
এজেন্ট ব্যাংকিং ব্যবস্থায় ব্যাংকের পক্ষে একজন উদ্যোক্তা এজেন্ট হিসেবে নির্ধারিত কমিশনের বিনিময়ে সেবা প্রদান করেন। এটি মূলত একটি ‘লো কস্ট’ বা স্বল্প ব্যয়ের মডেল। ব্যাংকের একটি নির্ধারিত শাখার তত্ত্বাবধানে প্রতিটি এজেন্ট আউটলেট পরিচালিত হয়। কেন্দ্রীয় ব্যাংক সাধারণত যে এলাকায় ব্যাংকের শাখা নেই, সেখানেই এজেন্ট আউটলেট খোলার অনুমোদন দিয়ে থাকে। এর ফলে প্রত্যন্ত অঞ্চলের মানুষ ঘরের কাছেই প্রায় সব ধরনের ব্যাংকিং সুবিধা পাচ্ছেন। এটি যেমন ব্যাংকের পরিচালন ব্যয় কমিয়ে মুনাফার পথ সুগম করেছে, তেমনি প্রান্তিক মানুষকে আধুনিক অর্থ ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত করে এক নীরব অর্থনৈতিক বিপ্লবের পথ তৈরি করেছে।
দ্রুত বাড়ছে সেবা: বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ পরিসংখ্যান পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, গত এক যুগে এজেন্ট ব্যাংকিং সেবার বিস্তার ঘটেছে অভাবনীয় গতিতে। তথ্য অনুযায়ী, গত নভেম্বর পর্যন্ত দেশের ৩০টি ব্যাংক এজেন্ট ব্যাংকিংয়ের অনুমোদন নিয়েছে। সারা দেশে বর্তমানে ১৫ হাজার ৩৪০ জন এজেন্টের মাধ্যমে ২০ হাজার ৫১৩টি এজেন্ট আউটলেট পরিচালিত হচ্ছে। এই আউটলেটগুলোর ৯২ শতাংশ বা ১৭ হাজার ৫৫৩টিই গ্রামে অবস্থিত। দেশের বর্তমান প্রেক্ষাপটে যেখানে ব্যাংকের মোট শাখার সংখ্যা ১১ হাজার ৪০১টি, সেখানে এজেন্ট আউটলেটের সংখ্যা প্রায় ২০ হাজার ৫০০। অর্থাৎ, গত এক যুগে ব্যাংক শাখার দ্বিগুণের কাছাকাছি সংখ্যক এজেন্ট আউটলেট প্রতিষ্ঠিত হয়ে গেছে।
এজেন্ট ব্যাংকিং সেবায় ব্যাংকগুলোর মধ্যে প্রতিযোগিতাও স্পষ্ট। প্রথম শুরু করা ব্যাংক এশিয়ার বর্তমান আউটলেট সংখ্যা ৫ হাজার ৩৫টি হলেও এখন আউটলেট সংখ্যার দিক থেকে শীর্ষে রয়েছে ডাচ্-বাংলা ব্যাংক, যাদের মোট আউটলেট ৫ হাজার ৬২৮টি। তৃতীয় অবস্থানে থাকা ইসলামী ব্যাংকের রয়েছে ২ হাজার ৭৮৮টি আউটলেট এবং ব্র্যাক ব্যাংকের আউটলেট সংখ্যা ১ হাজার ১১৮টি। বিভাগ ভিত্তিতে ঢাকা বিভাগে সর্বোচ্চ ৫ হাজার ১৮৭টি আউটলেট রয়েছে। এক্ষেত্রে দ্বিতীয় অবস্থানে থাকা চট্টগ্রাম বিভাগে আউটলেটের সংখ্যা ৪ হাজার ১৭১টি। অন্যান্য বিভাগের মধ্যে খুলনায় ২ হাজার ৪৯৫টি, রাজশাহীতে ২ হাজার ৪৬১টি, রংপুরে ২ হাজার ২১টি, বরিশালে ১ হাজার ৩৫৮টি, সিলেটে ১ হাজার ১৫৪টি ও ময়মনসিংহ বিভাগে ১ হাজার ১৬৬টি আউটলেট পরিচালিত হচ্ছে।
গ্রাহক সংখ্যার দিক থেকেও এই সেবার বিস্তার চোখ-ধাঁধানো। মোট ২ কোটি ৫৬ লাখ ১৬ হাজার ৬৭২ জন গ্রাহকের মধ্যে ২ কোটি ১৭ লাখ ৬০ হাজার ৮৮৪ জনই গ্রামীণ এলাকার। এর মধ্যে নারী গ্রাহকের সংখ্যা ১ কোটি ২৬ লাখ ৯০ হাজার ৯৩৫ জন, ও পুরুষ গ্রাহকের সংখ্যা ১ কোটি ২৫ লাখ ২৯ হাজার ৬৬১ জন। আমানতের ক্ষেত্রেও গ্রামের মানুষের অবদান অনন্য; মোট ৪৭ হাজার ৭৬০ কোটি টাকার আমানত স্থিতির মধ্যে ৩৯ হাজার ৫৬৭ কোটি টাকাই এসেছে গ্রাম থেকে, যা মোট আমানতের ৮৩ শতাংশ। শুধু আমানত নয়, ঋণ বিতরণের ক্ষেত্রেও এজেন্ট ব্যাংকিং কার্যকর ভূমিকা রাখছে। গত নভেম্বর পর্যন্ত ১ হাজার ৪০ কোটি টাকার ঋণের মধ্যে ৬৬৯ কোটি টাকাই পেয়েছে গ্রামের মানুষ। এ ছাড়া গত নভেম্বর মাসেই এ ব্যবস্থার মাধ্যমে ২ হাজার ৭৪১ কোটি টাকার রেমিট্যান্স বা প্রবাসী আয় বিতরণ করা হয়েছে এবং ৯২ কোটি টাকার ইউটিলিটি বিল পরিশোধ করা হয়েছে।
এই বিপ্লব সম্পর্কে বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান বলেন, ‘এজেন্ট ব্যাংকিংয়ের রেকর্ড ভঙ্গ শুধু একটি পরিসংখ্যান নয়, দেশের প্রান্তিক অঞ্চলে আর্থিক সেবা পৌঁছে দিতে বিপ্লব বয়ে এনেছে। এজেন্ট ব্যাংকিং এখন প্রবাসী আয় বিতরণের অন্যতম চ্যানেলে পরিণত হয়েছে। এটি প্রত্যন্ত এলাকার পরিবারগুলোকে অন্তর্ভুক্তিমূলক অর্থায়নে যুক্ত করেছে।’
এজেন্ট ব্যাংকিং নিয়ে সাধারণ জিজ্ঞাসা: এজেন্ট ব্যাংকিং এক যুগ পার করলেও সাধারণ মানুষের মধ্যে এখনো এই সেবা নিয়ে নানা কৌতূহল ও প্রশ্ন রয়েছে। অনেকেই ভাবেন, এজেন্টের কাছে টাকা জমা দেওয়া নিরাপদ কি না, কিংবা সুদের হার কম হবে কি না বা বাড়তি চার্জ লাগবে কি না। প্রকৃতপক্ষে, ব্যাংকের সাধারণ শাখা এবং এজেন্ট আউটলেটের মধ্যে নিরাপত্তা বা সেবার মানে কোনো পার্থক্য নেই। একজন গ্রাহক ব্যাংকের শাখায় যে ধরনের নিরাপত্তা ও সুবিধা পান, এজেন্ট আউটলেটেও ঠিক একই সেবা নিশ্চিত করা হয়। সবচেয়ে বড় নিরাপত্তার বিষয়টি হলো, কোনো কারণে এজেন্ট পালিয়ে গেলেও সংশ্লিষ্ট ব্যাংক গ্রাহকের জমানো টাকা পরিশোধ করতে বাধ্য।
নিরাপত্তা ও স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে এজেন্ট ব্যাংকিংয়ে বায়োমেট্রিক বা আঙুলের ছাপ পদ্ধতি অনুসরণ করা হয়। এখান থেকে সঞ্চয়ী, চলতি বা মেয়াদি আমানত হিসাব খোলা যায়। যদিও এখান থেকে বড় ঋণ দেওয়া যায় না বা সরাসরি বৈদেশিক বাণিজ্যিক লেনদেন করা যায় না, তবে বিদেশ থেকে আসা রেমিট্যান্স বা প্রবাসী আয় গ্রহণ করা যায় অনায়াসেই। এ ছাড়া দেশের যে কোনো প্রান্তে টাকা পাঠানো, বিল পরিশোধ, বেতন-ভাতা প্রদান এবং অন্য অ্যাকাউন্টে টাকা স্থানান্তরের সুবিধা রয়েছে। নিরাপত্তার স্বার্থে এখানে লেনদেনের একটি সীমা রয়েছে। একজন এজেন্টও দৈনিক সর্বোচ্চ কত টাকা লেনদেন করতে পারবেন, তা ব্যাংক থেকে নির্ধারিত থাকে। সাধারণত একটি আউটলেটে দিনে দুইবারে সর্বোচ্চ ৪ লাখ টাকা জমা এবং ৩ লাখ টাকা উত্তোলন করা যায়।
এজেন্ট আউটলেটে অ্যাকাউন্ট খোলার প্রক্রিয়াটিও অত্যন্ত সহজ। গ্রাহককে শুধু জাতীয় পরিচয়পত্র বা কোনো গ্রহণযোগ্য পরিচয়পত্রের কপি এবং নিজের ও নমিনির ছবি নিয়ে যেতে হয়। এরপর এজেন্টের প্রতিনিধি বায়োমেট্রিক মেশিনের মাধ্যমে আঙুলের ছাপ নিয়ে হিসাব খোলার প্রক্রিয়া সম্পন্ন করেন। প্রক্রিয়া শেষ হলে গ্রাহক ব্যাংক থেকে একটি নিশ্চিতকরণ এসএমএস পাবেন। এমনকি এজেন্ট আউটলেটের মাধ্যমেই এটিএম কার্ডের জন্য আবেদন করার সুযোগও রয়েছে।
কারা এজেন্ট হতে পারেন: এজেন্ট ব্যাংকিং হলো সমঝোতা স্মারক চুক্তির ভিত্তিতে নিয়োগকৃত এজেন্টের মাধ্যমে ব্যাংকের গ্রাহকদের ব্যাংকিং সেবা দেওয়া। নিজস্ব বিক্রয় প্রতিষ্ঠান রয়েছে—এমন ব্যক্তি ব্যাংকের এজেন্ট হিসেবে কাজ করতে পারেন। এজেন্ট হওয়ার জন্য ট্রেড লাইসেন্সসহ যে কোনো ব্যবসা প্রতিষ্ঠান থাকতে হবে। মাইক্রোক্রেডিট রেগুলেটরি বা এমআরএতে নিবন্ধিত ক্ষুদ্রঋণ প্রতিষ্ঠান, সমাজসেবা অধিদপ্তরে নিবন্ধিত এনজিও বা সমবায় সমিতি আইন অনুযায়ী নিবন্ধিত সমিতি এজেন্ট হতে পারে। এ ছাড়া কোম্পানি, কুরিয়ার বা মেইলিং সেবা প্রদানকারী প্রতিষ্ঠান, এমএফএস এজেন্ট বা বীমা কোম্পানির এজেন্ট ব্যাংকিংয়ের এজেন্ট হতে পারে। অবশ্য আবেদনকারীর ন্যূনতম শিক্ষাগত যোগ্যতা থাকতে হবে এসএসসি বা সমমান। ঋণখেলাপি ব্যক্তি এজেন্ট হতে পারেন না। কোনো ফৌজদারি অপরাধে অভিযুক্ত ব্যক্তিকেও এজেন্ট নিয়োগ দিতে পারে না ব্যাংক। ব্যাংকগুলো নিয়ম মেনে কার্যক্রম করছে কি না, কেন্দ্রীয় ব্যাংক তা তদারক করে।