Image description
‘হেয়ারকাট’ নীতিতে পুঁজিবাজার কি ধীরে ধীরে বিনিয়োগশূন্য হয়ে পড়ছে?

ব্যাংক খাতে বিনিয়োগ হারানোর ধাক্কা সামলাতে না সামলাতেই এবার আর্থিক প্রতিষ্ঠান খাতেও সর্বস্ব হারানোর শঙ্কায় পড়েছেন পুঁজিবাজারের হাজার হাজার বিনিয়োগকারী। বাংলাদেশ ব্যাংকের সাম্প্রতিক এক প্রজ্ঞাপনে ব্যাংক রেজুলেশন কাঠামোর আওতায় ৯টি আর্থিক প্রতিষ্ঠান বন্ধের ঘোষণা আসার পর এই খাতে বিনিয়োগ করা ব্যক্তি ও প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের মধ্যে চরম উদ্বেগ ও ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়েছে।

 

এর আগে ইসলামী ধারার পাঁচটি ব্যাংককে একীভূত করে ‘সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক’ নামে নতুন একটি ব্যাংক গঠনের মাধ্যমে ওই পাঁচ ব্যাংকের শেয়ারহোল্ডিং কার্যত শূন্য ঘোষণা করা হয়। ফলে পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত ওই পাঁচ ব্যাংকে বিনিয়োগ করা ব্যক্তি ও প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের প্রায় সাড়ে চার হাজার কোটি টাকার শেয়ারমূল্য এক ধাক্কায় নিশ্চিহ্ন হয়ে যায়। বিনিয়োগকারীরা সেই ক্ষতির রেশ কাটিয়ে উঠতে না উঠতেই এবার ব্যাংক বহির্ভূত আর্থিক প্রতিষ্ঠান খাতেও একই পরিণতির আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের ঘোষণায় বন্ধ হতে যাওয়া ৯টি আর্থিক প্রতিষ্ঠান হলোÑ এফএএস ফিন্যান্স, বাংলাদেশ ইন্ডাস্ট্রিয়াল ফিন্যান্স কোম্পানি (বিআইএফসি), প্রিমিয়ার লিজিং, ফারইস্ট ফিন্যান্স, জিএসপি ফিন্যান্স, প্রাইম ফিন্যান্স অ্যান্ড ইনভেস্টমেন্ট, আভিভা ফিন্যান্স, পিপলস লিজিং অ্যান্ড ফিন্যান্সিয়াল সার্ভিসেস এবং ইন্টারন্যাশনাল লিজিং অ্যান্ড ফিন্যান্সিয়াল সার্ভিসেস।

এই ৯টি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে কেবল আভিভা ফিন্যান্স পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত নয়। বাকি আটটি প্রতিষ্ঠান ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জে তালিকাভুক্ত, যেখানে স্পন্সর শেয়ারহোল্ডারদের পাশাপাশি বিপুলসংখ্যক ব্যক্তি ও প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীর বিনিয়োগ রয়েছে। এসব কোম্পানির শেয়ারের অভিহিত মূল্য হিসেবে বিনিয়োগকারীদের ঝুঁকিতে থাকা মূলধনের পরিমাণ প্রায় দেড় হাজার কোটি টাকা। বাস্তবে বাজারদর বিবেচনায় ক্ষতির অঙ্ক আরো বড়।

বাংলাদেশ ব্যাংক ব্যক্তি আমানতকারীদের অর্থ ফেরত পাওয়ার বিষয়ে আশ্বস্ত করলেও এসব প্রতিষ্ঠানের শেয়ারহোল্ডারদের বিনিয়োগ এবং করপোরেট আমানতকারীদের অর্থ নিয়ে এখনো কোনো সুস্পষ্ট নীতিগত সিদ্ধান্ত জানায়নি। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের একটি দায়িত্বশীল সূত্র ৯টি প্রতিষ্ঠানকে একীভূত করে একটি প্রতিষ্ঠানে রূপ দেয়ার সম্ভাবনার কথা উল্লেখ করলেও সেটি এখনো চূড়ান্ত হয়নি।

বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, নন-ব্যাংক ফিন্যান্সিয়াল ইনস্টিটিউশন (এনবিএফআই) খাতের মোট খেলাপি ঋণের ৫২ শতাংশই এই ৯টি প্রতিষ্ঠানের দখলে। গত অর্থবছরের শেষে এসব প্রতিষ্ঠানের খেলাপি ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ২৫ হাজার ৮৯ কোটি টাকা, যা পুরো খাতের গভীর কাঠামোগত সঙ্কটের স্পষ্ট প্রতিফলন।

অন্য দিকে এসব প্রতিষ্ঠানে ব্যক্তি ও প্রাতিষ্ঠানিক মিলিয়ে মোট ১৫ হাজার ৩৭০ কোটি টাকার আমানত আটকে আছে। এর মধ্যে একক বা ব্যক্তি আমানতকারীদের জমা অর্থ ৩ হাজার ৫২৫ কোটি টাকা, আর ব্যাংক ও করপোরেট আমানতকারীদের অর্থ ১১ হাজার ৮৪৫ কোটি টাকা। ব্যক্তি আমানত সবচেয়ে বেশি আটকে আছে পিপলস লিজিংয়ে- ১ হাজার ৪০৫ কোটি টাকা। এরপর আভিভা ফিন্যান্সে ৮০৯ কোটি, ইন্টারন্যাশনাল লিজিংয়ে ৬৪৫ কোটি, প্রাইম ফিন্যান্সে ৩২৮ কোটি এবং এফএএস ফিন্যান্সে ১০৫ কোটি টাকা আটকে রয়েছে।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ঘোষণার পর পুঁজিবাজারে এসব প্রতিষ্ঠানের শেয়ারদর ধারাবাহিক দরপতনের শিকার হয়েছে। বর্তমানে বেশির ভাগ কোম্পানির ১০ টাকা অভিহিত মূল্যের শেয়ারদর নেমে এসেছে অর্ধেকেরও নিচে। কোনো কোনো কোম্পানির শেয়ার ১ টাকা বা তারও কম দরে লেনদেন হচ্ছে। এতে করে পুঁজিবাজারের হাজার হাজার বিনিয়োগকারী কার্যত তাদের বিনিয়োগের প্রায় শতভাগ হারিয়ে বসে আছেন।

তবে ব্যাংক খাতের ক্ষেত্রে সরকারের চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের পর যেভাবে সংশ্লিষ্ট ব্যাংকগুলোর শেয়ার লেনদেন বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছিল, আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর ক্ষেত্রে এখনো তেমন কোনো সিদ্ধান্ত নেয়া হয়নি। ফলে এসব কোম্পানির শেয়ার এখনো ট্রেডিংয়ে থাকায় প্রতিদিনই বিনিয়োগকারীদের পুঁজি ধীরে ধীরে ক্ষয়ে যাচ্ছেÑ যাকে বিনিয়োগকারীরা ‘ধীরগতির নিঃশেষকরণ’ বলে অভিহিত করছেন।

বিশ্লেষকদের মতে, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে মন্দা পুঁজিবাজারে টিকে থাকতে অনেক প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীই দৈনন্দিন ট্রেডিংয়ের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে। তুলনামূলক নিরাপদ মনে করে ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান খাতেই তারা বেশি বিনিয়োগ করে। কিন্তু একীভূত হওয়া পাঁচটি ব্যাংকে বিনিয়োগ করা পুঁজির বড় অংশ ইতোমধ্যে হারিয়ে গেছে। এখন ব্যাংক বহির্ভূত আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোতেও একই পরিণতি ঘটলে বহু প্রতিষ্ঠান ও ব্যক্তি বিনিয়োগকারী কার্যত নিঃস্ব হয়ে পড়বেন। এতে পুঁজিবাজারের ওপর আস্থার শেষ ভরসাটুকুও ভেঙে পড়বে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

এই পরিস্থিতিতে বিনিয়োগকারীদের একটি বড় ভরসার জায়গা ছিল পুঁজিবাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি)। কিন্তু এত বড় ক্ষতির মুখেও সংস্থাটি বিনিয়োগকারীদের সুরক্ষায় কার্যকর ভূমিকা রাখতে ব্যর্থ হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। রাষ্ট্রের বিদ্যমান আইন ও বিধি মেনেই সাধারণ মানুষ ও প্রতিষ্ঠানগুলো শেয়ারবাজারে বিনিয়োগ করলেও সংকটের মুহূর্তে তারা কার্যত অসহায় হয়ে পড়েছেন।

বিএসইসি ব্যাংক খাতে বিনিয়োগকারীদের সুরক্ষার বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংককে একটি চিঠি দিলেও ব্যাংক বহির্ভূত আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর ক্ষেত্রে বিনিয়োগকারীদের সুরক্ষায় কোনো দৃশ্যমান উদ্যোগ নেয়নি। এ বিষয়ে জানতে চাইলে বিএসইসির মুখপাত্র ও পরিচালক মোহাম্মদ আবুল কালাম নয়া দিগন্তকে বলেন, ‘ব্যাংকের ক্ষেত্রে বিএসইসি একটি চিঠি দিয়েছিল। তবে ব্যাংক রেজুলেশনের আওতায় বিষয়টি চলে যাওয়ায় আমরা আর বেশি কিছু করতে পারিনি। আর ব্যাংক বহির্ভূত আর্থিক প্রতিষ্ঠানের বিষয়ে আমার জানা মতে বিএসইসির পক্ষ থেকে এখনো কোনো উদ্যোগ নেয়া হয়নি।’

ঢাকা ব্রোকার্স অ্যাসোসিয়েশনের (ডিবিএ) সভাপতি সাইফুল ইসলাম নয়া দিগন্তকে বলেন, ‘বিনিয়োগকারীদের সুরক্ষায় আমরা সর্বোচ্চ চেষ্টা করব। ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান- কোনো ক্ষেত্রেই আমরা ছাড় দেবো না। জাতীয় নির্বাচনের পর নতুন সরকার এলে বিনিয়োগকারীদের সুরক্ষার বিষয়টি নিয়ে আরো জোরালোভাবে এগোনো হবে। কারণ এই দুই সঙ্কট পুঁজিবাজারকে অনেক পেছনে ঠেলে দিয়েছে। বিনিয়োগকারীরা সুরক্ষা না পেলে পুঁজিবাজার টিকে থাকবে কিভাবে?’

ডিবিএ সভাপতির বক্তব্যের সাথে একমত পোষণ করেন ডিবিএর নির্বাহী কমিটির সাবেক সদস্য ও পুবালী ব্যাংক সিকিউরিটিজের প্রধান নির্বাহী আহসান উল্যা। তিনি বলেন, ‘নির্বাচনের পর নতুন সরকার দায়িত্ব নিলে ডিএসইর পক্ষ থেকে বিষয়টি নতুনভাবে উপস্থাপন করা হবে। তখন ডিএসই ও ডিবিএ একযোগে বিনিয়োগকারীদের স্বার্থ রক্ষায় সমাধানের চেষ্টা করবে।’

বিশেষজ্ঞদের মতে, ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান খাতে সংস্কারের নামে যদি বারবার শেয়ারহোল্ডারদের সম্পূর্ণ ক্ষতির বোঝা বইতে হয়, তাহলে তা দীর্ঘমেয়াদে দেশের পুঁজিবাজারের অস্তিত্বকেই প্রশ্নের মুখে ফেলবে। বিনিয়োগকারীদের সুরক্ষা নিশ্চিত না করে আর্থিক খাতের টেকসই সংস্কার সম্ভব নয়Ñ এই বাস্তবতা নীতিনির্ধারকদের দ্রুত অনুধাবন করা জরুরি বলে মনে করছেন তারা।