Image description

বাংলাদেশের ইতিহাসের দুই গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণ ১৯৭০ সালের সাধারণ নির্বাচন এবং ১৯৭৫ সালের রাজনৈতিক বাঁকবদল। এ দুই পর্বেই নীরব কিন্তু প্রভাবশালী ভূমিকা পালন করেন বিচারপতি আবু সাদাত মোহাম্মদ সায়েম। বিচার বিভাগে তার দীর্ঘ অভিজ্ঞতা ও প্রশাসনিক দক্ষতা তাকে ওই দুই সময়ের আলোচিত রাষ্ট্রীয় চরিত্রগুলোর একটিতে পরিণত করে।

১৯৬৯ সালে আইয়ুব খানের পতনের পর জেনারেল ইয়াহিয়া খান ক্ষমতা গ্রহণের পরপরই পূর্ব পাকিস্তানের সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠানের সিদ্ধান্ত নেন। জাতির উদ্দেশে প্রথম ভাষণে তিনি অন্যান্য বিষয়ের সঙ্গে নির্বাচন কীভাবে এবং কখন হবে, সে সম্পর্কেও একটি ধারণা দেন। সে অনুযায়ী প্রাথমিকভাবে ১৯৭০ সালের ৫ অক্টোবর দেশে জাতীয় পরিষদের এবং ২২ অক্টোবর প্রাদেশিক পরিষদের নির্বাচন অনুষ্ঠানের তারিখ নির্ধারণ করা হয়। কিন্তু সেপ্টেম্বরে পূর্ব পাকিস্তানের কিছু এলাকায় প্রবল বন্যা হয়। বন্যার জন্য ভোটারদের ভোটদানে অসুবিধার কথা উল্লেখ করে কিছু রাজনৈতিক দল নির্বাচন পেছানোর দাবি জানায়। ইয়াহিয়া খান প্রথম দিকে এতে সাড়া না দিলেও পরবর্তী সময়ে জনগণের ভোটদানের কথা বিবেচনা করেন। তিনি ১৯৭০ সালের ৭ ডিসেম্বর জাতীয় পরিষদের এবং ১৭ ডিসেম্বর প্রাদেশিক পরিষদের নির্বাচনের তারিখ নির্দিষ্ট করেন। ১২ নভেম্বর পূর্ব বাংলার উপকূল অঞ্চল প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় সেসব এলাকায় ১৯৭১ সালের ১৭ জানুয়ারি তারিখ নির্দিষ্ট করা হয়।

প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান তার প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী নির্বাচন অনুষ্ঠানের জন্য প্রথমেই একটি নির্বাচন কমিশন গঠন করেন। ১৯৬৯ সালের ২ জুলাই পাকিস্তানের সুপ্রিম কোর্টের একজন বাঙালি বিচারপতি আব্দুস সাত্তারের নেতৃত্বে নির্বাচন কমিশন গঠন করা হয়। ওই কমিশনের সদস্য হিসেবে নিয়োগ পান বিচারপতি আবু সাদাত মোহাম্মদ সায়েম।

সত্তরের নির্বাচনকে কেন্দ্র করে গঠিত নির্বাচন কমিশনের প্রাথমিক কাজ ছিল একটি সর্বজনীন ভোটার তালিকা প্রস্তুত করা। পাশাপাশি তার দায়িত্ব ছিল নির্বাচনী এলাকার সীমানা নির্ধারণ। সে জন্য সীমানা চিহ্নিতকরণে কমিশন গঠন করা হয়। এ কমিটিতেও সদস্য হিসেবে কাজ করেন বিচারপতি সায়েম।

১৯৭০ সালের ৩০ মার্চ রাওয়ালপিণ্ডি থেকে নির্বাচনসংক্রান্ত ‘আইনগত কাঠামো আদেশ’ বা এলএফও ঘোষণা করা হয়। এর গুরুত্বপূর্ণ উদ্দেশ্য ছিল পাকিস্তানের জন্য একটি শাসনতন্ত্র প্রণয়নের পথরেখা নির্ধারণ করা। এলএফওর মূল বিষয়গুলোর মধ্যে ছিল জনসংখ্যা ও প্রাপ্তবয়স্কদের ভোটাধিকারের ভিত্তিতে নির্দিষ্ট মেয়াদ পরপর ফেডারেল ও প্রাদেশিক পরিষদগুলোর নির্বাচনের ব্যবস্থার মাধ্যমে গণতন্ত্রের মূলনীতিগুলোর অনুসরণ নিশ্চিত করা হবে। পাশাপাশি জনগণের মৌলিক অধিকার নিশ্চিত এবং নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে অর্থনৈতিক ও অন্যান্য বৈষম্য দূর করা হবে। বিচার বিভাগের স্বাধীনতা দেয়া হবে। নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে ‘এক ব্যক্তি এক ভোট’—এ নীতির ভিত্তিতে এবং জাতীয় ও প্রাদেশিক পরিষদের নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে জনগণের প্রত্যক্ষ ভোটে। নির্বাচন কমিশনের সদস্য হিসেবে বিচারপতি সায়েম তৎকালীন পাকিস্তান সরকারের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের ব্যক্তিবর্গের সঙ্গে আলোচনার ভিত্তিতে এলএফওর মৌলিক নীতিকে বাস্তব ও কার্যকর করতে ভূমিকা রাখেন।

ডিলিমিটেশন প্রক্রিয়া বা জনসংখ্যার অনুপাতে আসন পুনর্বিন্যাসে বিচারপতি সায়েম সরাসরি জড়িত ছিলেন। নির্বাচন কমিশন গঠনের পর ভোটার তালিকা তৈরি করা ছাড়াও নির্বাচনী এলাকার সীমানা নির্ধারণের সিদ্ধান্ত হয়। এ লক্ষ্যে প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান ১৯৭০ সালের নির্বাচনী এলাকার সীমানা নির্ধারণ আদেশ জারি করেন। সীমানা নির্দেশকরণের জন্য গঠিত কমিশনে সদস্য হিসেবে যোগ দেন বিচারপতি সায়েম।

কমিশনটির কার্যক্রম শুরুর পর পূর্ব পাকিস্তানের নির্বাচনী এলাকার ব্যাপারে আপত্তি ও পরামর্শ গ্রহণ করা হয় ১৯৭০ সালের ১১ মে থেকে ২২ মে পর্যন্ত। কমিশন পূর্ব পাকিস্তানে জাতীয় পরিষদের ৫৮টি নির্বাচনী এলাকা এবং প্রাদেশিক পরিষদের ৯৬টি নির্বাচনী এলাকায় ভাগ করে। পশ্চিম পাকিস্তানে জাতীয় পরিষদের ৩৯টি এবং চারটি প্রদেশকে ৮৯টি প্রাদেশিক পরিষদের নির্বাচনী এলাকায় বিভক্ত করে। নির্বাচনী এলাকার সীমানা নির্ধারণ শেষে পূর্ব পাকিস্তানের নির্বাচনী এলাকার চূড়ান্ত তালিকা ১৯৭০ সালের ৫ জুন এবং পশ্চিম পাকিস্তানের নির্বাচনী এলাকার তালিকা ১৯৭০ সালের ২৫ জুন প্রকাশ করা হয়। সরকার ১৯৬১ সালের আদমশুমারির ভিত্তিতে ‘এক ব্যক্তি এক ভোট’ নীতি অনুযায়ী জাতীয় পরিষদের আসন সংখ্যা নির্ধারণের জন্য বিশেষজ্ঞ কমিটি গঠন করে। প্রায় চার লাখ লোকের সমন্বয়ে একেকটি নির্বাচনী এলাকা গঠিত হয়।

পাকিস্তানের ইতিহাসে প্রথম সর্বজনীন প্রাপ্তবয়স্কদের ভোটাধিকারের ভিত্তিতে একটি সুষ্ঠু অবাধ নিরপেক্ষ নির্বাচন অনুষ্ঠানের সব ব্যবস্থা গ্রহণ করে তৎকালীন ওই নির্বাচন কমিশন। দেশের প্রথম সাধারণ নির্বাচন আয়োজন নিয়ে সে সময় কোনো পক্ষেরই অসন্তুষ্টি প্রকাশ পায়নি।

বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর ১৯৭২ সালের ১২ জানুয়ারি দেশের প্রথম প্রধান বিচারপতির দায়িত্ব নেন আবু সাদাত মোহাম্মদ সায়েম। এরপর ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট দেশের রাজনৈতিক পটপরিবর্তন হয়। এদিন তৎকালীন রাষ্ট্রপতি শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবারে হত্যা করা হয়। এরপর রাষ্ট্রপতি হিসেবে দায়িত্ব নেন খন্দকার মোশতাক আহমেদ। এর কিছুদিন পরই ঘটে অভ্যুত্থান-পাল্টা অভ্যুত্থান। ১৯৭৫ সালের ৩ নভেম্বর সামরিক অভ্যুত্থান ঘটান সেনাবাহিনীর তৎকালীন চিফ অব জেনারেল স্টাফ ব্রিগেডিয়ার খালেদ মোশাররফ ও তার অনুগতরা। ওই অভ্যুত্থানের পর কার্যত ক্ষমতাহীন হয়ে পড়েন রাষ্ট্রপতি খন্দকার মোশতাক আহমেদ। ৬ নভেম্বর পদত্যাগ করে বঙ্গভবন থেকে বের হয়ে আসেন তিনি। একই দিন অভ্যুত্থানকারীদের অনুরোধে দেশের ষষ্ঠ রাষ্ট্রপতি হিসেবে শপথ নেন বিচারপতি আবু সাদাত মোহাম্মদ সায়েম।

৭ নভেম্বরের এক সিপাহি-জনতার বিপ্লবের মধ্য দিয়ে খালেদ মোশাররফের মৃত্যু হয়। সেদিনই খন্দকার মোশতাককে রাষ্ট্রপতি ও প্রধান সামরিক আইন প্রশাসক হওয়ার প্রস্তাব দেয়া হয়। তবে তিনি সে প্রস্তাবে রাজি না হওয়ায় রাষ্ট্রপতি পদে থেকে যান বিচারপতি সায়েম। এ সময় সংসদ ও মন্ত্রিপরিষদ ভেঙে দিয়ে সারা দেশে সামরিক আইন জারি করেন তিনি। পাশাপাশি প্রধান সামরিক আইন প্রশাসক (সিএমএলএ) হিসেবেও দায়িত্ব নেন তিনি। উপপ্রধান সামরিক আইন প্রশাসক (ডিসিএমএলএ) ও রাষ্ট্রপতির উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য হন তৎকালীন সেনাপ্রধান মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমান। ডিসিএমএলএ এবং রাষ্ট্রপতির উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য করা হয় তৎকালীন বিমানবাহিনী প্রধান এয়ার ভাইস মার্শাল এমজি তাওয়াব ও নৌবাহিনী প্রধান রিয়ার অ্যাডমিরাল এমএইচ খানকেও।

আবু সাদাত মোহাম্মদ সায়েমের মূল প্রতিশ্রুতি ছিল নির্বাচনের মাধ্যমে নতুন সরকার গঠন করা। কিন্তু তিনি সেটা করতে পারেননি। ১৯৭৬ সালের ২৯ নভেম্বর প্রধান সামরিক আইন প্রশাসকের দায়িত্ব তৎকালীন উপপ্রধান সামরিক আইন প্রশাসক মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমানের হাতে ছেড়ে দেন। ১৯৭৭ সালের ২১ এপ্রিল তিনি রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব থেকে পদত্যাগ করেন।

পদত্যাগের পর ওই বছরেরই শেষ ও ১৯৭৮ সালের শুরুতে আবু সাদাত মোহাম্মদ সায়েম ইংরেজিতে একটি স্মৃতিকথা লিখেছিলেন। তিনি চেয়েছিলেন, তার মৃত্যুর পর এটি প্রকাশিত হোক। ১৯৯৭ সালের ৮ জুলাই তিনি মারা যান। তার মৃত্যুর পর একটি জাতীয় দৈনিকে ‘অ্যাট বঙ্গভবন: লাস্ট ফেজ’ নামে ওই স্মৃতিকথার অনুবাদ ধারাবাহিকভাবে প্রকাশ করা হয়। অনুবাদ করেছিলেন মশিউল আলম। সেটি পরে ‘বঙ্গভবনে শেষ দিনগুলি’ নামে বই আকারে প্রকাশিত হয়।