Image description

১৮৩৬ সালে রাজকীয় চার্টারের মাধ্যমে আনুষ্ঠানিকভাবে ইউনিভার্সিটি অব লন্ডন প্রতিষ্ঠিত হয়। তবে এটি তখন কোনো শিক্ষাদানকারী বিশ্ববিদ্যালয় ছিল না; বরং মূল ভূমিকা ছিল পরীক্ষা গ্রহণ ও ডিগ্রি প্রদান। শিক্ষাদানের দায়িত্ব পালন করত মূলত দুটি প্রতিষ্ঠান—ইউনিভার্সিটি কলেজ লন্ডন (ইউসিএল) এবং কিংস কলেজ লন্ডন (কেসিএল)। শিক্ষাদান ও ডিগ্রি প্রদানের এই দ্বৈত কাঠামো উচ্চশিক্ষায় এক নতুন মডেল স্থাপন করে, যা পরবর্তীকালে বিশ্বজুড়ে অনুকরণীয় হয়ে ওঠে।

উনিশ শতকের শেষভাগে ইউনিভার্সিটি অব লন্ডনের কাঠামোতে এক মৌলিক রূপান্তর ঘটে। ১৯০০ সালে এটি পুনর্গঠিত হয় একটি ফেডারেল বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে। অর্থাৎ একাধিক স্বায়ত্তশাসিত কলেজ এক কেন্দ্রীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে যুক্ত হয়, তবে প্রত্যেকটি প্রতিষ্ঠান তার নিজস্ব পরিচয়, প্রশাসন ও একাডেমিক বিশেষায়ন বজায় রাখে। ধাপে ধাপে যুক্ত হয় গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানসমূহ—লন্ডন স্কুল অব ইকোনমিক্স (এলএসই), গোল্ডস্মিথস, কুইন মেরি, স্কুল অব ওরিয়েন্টাল অ্যান্ড আফ্রিকান স্টাডিজ (এসওএএস) এবং বার্কবেক কলেজ। 

এর ফলে ইউনিভার্সিটি অব লন্ডন একটি বহুমাত্রিক অ্যাকাডেমিক ফেডারেশনে পরিণত হয়। বর্তমান ইউনিভার্সিটি অব লন্ডন একটি বৈশ্বিক মানের অ্যাকাডেমিক ফেডারেশন। এর সদস্য প্রতিষ্ঠানসমূহের মধ্যে রয়েছে ইউসিএল, কেসিএল, এলএসই, কুইন মেরি, বার্কবেক, গোল্ডস্মিথস, রয়্যাল হলওয়ে, এসওএএস, লন্ডন বিজনেস স্কুল এবং লন্ডন স্কুল অব হাইজিন অ্যান্ড ট্রপিক্যাল মেডিসিন। এছাড়া আছে স্কুল অব অ্যাডভান্সড স্টাডিজ, যা প্রধানত মানববিদ্যা ও সমাজবিজ্ঞানের উচ্চতর গবেষণায় নিবেদিত।

সময়ের সঙ্গে সঙ্গে ফেডারেশনে কিছু পরিবর্তন এসেছে। ইম্পেরিয়াল কলেজ লন্ডন ২০০৭ সালে স্বাধীন বিশ্ববিদ্যালয়ে পরিণত হয়, কিন্তু এর নাম পরিবর্তন করে বিশ্ববিদ্যালয় যুক্ত করেনি। বেডফোর্ড কলেজ রয়্যাল হলওয়ের সঙ্গে একীভূত হয় এবং দর্শন ও ধর্মতত্ত্বভিত্তিক হেইথ্রপ কলেজ ২০১৮ সালে বন্ধ হয়। এসব পরিবর্তন প্রমাণ করে যে, ইউনিভার্সিটি অব লন্ডন কোনো স্থবির কাঠামো নয়; বরং এটি সময় ও বাস্তবতার সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেওয়া অভিযোজিত প্রতিষ্ঠান। 

এখানেই আমাদের সাথে তাদের পার্থক্য। উন্নত হওয়ার প্রাথমিক শর্ত হলো অভিযোজিত হওয়া। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ও লন্ডন বিশ্ববিদ্যালয়ের আদলে গঠিত হয়েছিল। এখানেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় আর কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে পার্থক্য ছিল। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে লন্ডন বিশ্ববিদ্যালয়ের আদলে না তৈরি করে এটিকে অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের আদলে তৈরী করা হয়েছিল। আর এ জন্যই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে প্রাচ্যের অক্সফোর্ড বলে। কিন্তু সমস্যা হলো আমরা অভিযোজিত হয়ে উন্নত হওয়ার বদলে অধঃপতিত হয়েছি।

আমাদের জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের মডেল হওয়া উচিত ছিল লন্ডন বিশবিদ্যালয়ের আদলে। ঢাকা শহরের ৭টি কলেজ নিয়েও লন্ডন বিশ্ববিদ্যালয়ের আদলে গঠন হতে পারতো। আমি একবার ঢাকার সাত কলেজ নিয়ে লন্ডন বা কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের আদলে বিশ্ববিদ্যালয়ে রূপান্তরের প্রস্তাব করেছিলাম। বলেছিলাম সাতটি কলেজকে ইউসিএল, কেসিএল, এলএসই, কুইন মেরি ইত্যাদি কলেজের মত গড়ে তোলা। আর একটা কেন্দ্রীয় ব্যবস্থা থাকবে, যার অধীনে প্রশাসন ও পরীক্ষা ব্যবস্থা চলবে।

ইউসিএল বা ইউনিভার্সিটি কলেজ লন্ডন এই নামে কিন্তু কলেজ আছে। কিন্তু এটি বিশ্ব সেরা ১০টি বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে একটি। নামে কিছু আসে যায় না। আসে যায় শিক্ষকদের মানে। আমি বলেছিলাম, এটিকে উন্নত করতে হলে বিসিএস শিক্ষা ক্যাডারের পরিবর্তে আধুনিক বিশ্বমানের বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক নিয়োগ পদ্ধতি অনুসরণ করে বিশ্বমানের বেতন সমৃদ্ধ প্রতিষ্ঠান করুন। 

ইরিকম ফেডারেল বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে গড়ে তুলে পাশাপাশি এসব ঐতিহ্যবাহী কলেজের নাম ব্যবহার করে ফিডার (feeder) প্রতিষ্ঠান অর্থাৎ উন্নত মানের উচ্চ মাধ্যমিক পর্যন্ত স্কুল অ্যান্ড কলেজ তৈরি করুন, যাতে বিসিএস শিক্ষা ক্যাডাররা সেখানে পড়াতে পারেন। এটিই হবে সাত কলেজ সমস্যা সমাধানের উৎকৃষ্ট পথ।

কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে অধীনে কলেজগুলো ভালো করছে, কারণ ওখানে শুধু তিন বছরের অনার্স পড়ানো হতো। অতি সম্প্রতি তারা ৪ বছরের অনার্স চালু করেছে। মোদ্দা কথা হলো, ওখানে উচ্চ মাধ্যমিক ছিল না। যেখানে অনার্স থাকবে, সেখানে একই প্রশাসন ও শিক্ষকদের অধীনে উচ্চ মাধ্যমিক থাকতে পারে না। আমরা এই জগাখিচুড়ি বানিয়েছি। কিন্তু এইটা আর টানা উচিত না। 

কলেজে অনার্স পড়াতে হলে সব শিক্ষকের ন্যূনতম পিএইচডি থাকতে হবে। এটি করলেই নাম কি ডাকলাম কিচ্ছু আসে যায় না। সমস্যা হচ্ছে, যারা আন্দোলনে যুক্ত, তাদের অনেকগুলো পক্ষ- যাদের সবাই নিজ নিজ স্বার্থকে বড় করে দেখছে। একটা প্রতিষ্ঠান গড়ার কথা ভাবলে দেশকে বড় পর্দায় রেখে ম্যাক্রোসকোপিকাললি ভাবতে হবে।

লেখক: অধ্যাপক, পদার্থবিজ্ঞান বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।