Image description
এনটিআরসিএর হাতে যাচ্ছে ক্ষমতা

ঘুষ দিতে মোটা অঙ্কের অর্থ কিংবা রাজনৈতিক প্রভাব—এ দুটির কোনো একটি ‘যোগ্যতা’ যার আছে, শুধু তারই বসার সৌভাগ্য হয় অধ্যক্ষ বা উপাধ্যক্ষের চেয়ারে। দেশের বেশিরভাগ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শীর্ষ এই দুই পদে নিয়োগে অনিয়মের দীর্ঘদিনের এমন অভিযোগ থেকে বেরিয়ে আসতে নতুন সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পরিচালনা পর্ষদের (ম্যানেজিং কমিটি) হাত থেকে অধ্যক্ষ, উপাধ্যক্ষ নিয়োগের ক্ষমতা যাচ্ছে বেসরকারি শিক্ষক নিবন্ধন ও প্রত্যয়ন কর্তৃপক্ষের (এনটিআরসিএ) হাতে। আর নিয়োগে স্বচ্ছতা আনতে প্রচলিত ৫০ নম্বরের পরিবর্তে হবে ১০০ নম্বরের পরীক্ষা। এরই মধ্যে এ-সংক্রান্ত ‘বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান প্রধান নিয়োগ নীতিমালা-২০২৬’-এর খসড়া চূড়ান্ত করা হয়েছে। মন্ত্রণালয়ের সবুজ সংকেত পেলেই আনুষ্ঠানিকভাবে এই কার্যক্রম শুরু করবে এনটিআরসিএ। যার ফলে দীর্ঘদিনের নিয়োগ-বাণিজ্য, স্বজনপ্রীতি ও দুর্নীতির পথ হবে বন্ধ।

শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের ভাষ্য, বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে অনিয়ম, দুর্নীতির বড় খাত শিক্ষক নিয়োগ। ২০১৫ সাল থেকে সাধারণ শিক্ষক নিয়োগ এনটিআরসিএর মাধ্যমে হওয়ায় এই নিয়োগ প্রক্রিয়ায় ‘বাণিজ্য’ কমেছে। তবে প্রতিষ্ঠান প্রধানের পদ অধ্যক্ষ, উপাধ্যক্ষ ও প্রধান শিক্ষক পদে নিয়োগের ক্ষমতা ম্যানেজিং কমিটির হাতে থাকায় এসব পদে এখনো দেদার নিয়োগ-বাণিজ্য ও স্বজনপ্রীতি হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে। লোভনীয় এসব পদের জন্য প্রতিষ্ঠানভেদে ৫০ লাখ থেকে কোটি টাকা পর্যন্ত লেনদেন হয়। কমিটির হাতে নিয়োগের ক্ষমতা থাকায় ঘুষ-বাণিজ্য, নম্বর জালিয়াতি, নিয়োগ বোর্ডে প্রভাব—সবমিলিয়ে শিক্ষা প্রশাসনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পদগুলো পরিণত হয়েছে যেন এক ধরনের বাণিজ্যিক পণ্যে। বর্তমানে প্রতিষ্ঠান প্রধান পদে নিয়োগে হয় ৫০ নম্বরের পরীক্ষা। এর মধ্যে লিখিত ৩০, মৌখিক ৮ এবং সনদে ১২। এই নিয়োগ প্রক্রিয়াটি এখন ম্যানেজিং কমিটির হাত থেকে এনে সাধারণ শিক্ষকদের মতো এনটিআরসিএর মাধ্যমে করা হবে। সে ক্ষেত্রে পরীক্ষার নম্বর কাঠামোও পুনর্বিন্যাসের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ৫০ নম্বরের পরিবর্তে ১০০ নম্বরের পরীক্ষা হবে। এর মধ্যে লিখিত বা বাছাইয়ে ৮০ নম্বর, সনদে ১২ এবং মৌখিকে থাকবে ৮ নম্বর। এ ছাড়া ৬টি পৃথক বিষয়ের ওপর ভিত্তি করে হবে এই পরীক্ষা। যেখানে প্রার্থীর প্রশাসনিক দক্ষতা, একাডেমিক যোগ্যতা ও নেতৃত্বগুণ আরও সুনির্দিষ্টভাবে যাচাই করা হবে।

জানা গেছে, গত বৃহস্পতিবার শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে এমপিওভুক্ত বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের প্রধান নিয়োগ নীতিমালা-২০২৬-এর খসড়া চূড়ান্ত করা হয়েছে। শিগগির নীতিমালাটি জারি করা হবে। বর্তমানে সারা দেশ থেকে শূন্য পদের তথ্য সংগ্রহের কাজ চলছে। সেই তালিকা পাওয়ার পর নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করা হবে। সেখানে মোট ১০০ নম্বরের মধ্যে লিখিত বা বাছাই পরীক্ষায় ৮০ নম্বর, শিক্ষাগত যোগ্যতার সনদে ১২ নম্বর এবং মৌখিক পরীক্ষায় ৮ নম্বর থাকবে। পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে হলে প্রার্থীদের ন্যূনতম ৫০ শতাংশ নম্বর পেতে হবে। এ ছাড়া মৌখিক পরীক্ষায় যাচাই করা হবে প্রার্থীর প্রশাসনিক অভিজ্ঞতা। আর একাডেমিক যোগ্যতা অনুযায়ী সনদে নম্বর পাবেন। এই তিনটি ক্যাটাগরিতে মেধা স্কোর করে জাতীয় একটি তালিকা প্রকাশ হবে। সেখান থেকে শূন্য পদে অধ্যক্ষ, উপাধ্যক্ষ বা প্রধান শিক্ষক পদে পদায়ন করা হবে।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বর্তমানে অধ্যক্ষ, উপাধ্যক্ষ বা প্রধান শিক্ষক নিয়োগে প্রথমে সংশ্লিষ্ট শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ম্যানেজিং কমিটি বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করে। পদাধিকার বলে নিয়োগ কমিটির সভাপতি হন ম্যানেজিং কমিটির সভাপতি এবং প্রতিষ্ঠান প্রধান সদস্য সচিব। ডিগ্রি কলেজের ক্ষেত্রে নিয়োগ বোর্ডে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিনিধি, একাদশ শ্রেণি পর্যন্ত শিক্ষা বোর্ডের প্রতিনিধি এবং উপজেলা বা জেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তাকে রাখা হয়। তবে এই নিয়োগ প্রক্রিয়ার সর্বেসর্বা হয়ে ওঠেন কমিটির সভাপতি। তার ইচ্ছাই মুখ্য হয়ে ওঠে—এমন অভিযোগ দীর্ঘদিনের। এই সুযোগকে কাজে লাগিয়ে অধ্যক্ষ পদের পদায়নে কলেজভেদে ৫০ লাখ থেকে ১ কোটি টাকা পর্যন্ত ঘুষ লেনদেন হয়েছে। আর এসব ঘুষ-বাণিজ্যের সঙ্গে স্থানীয় রাজনৈতিক ও প্রভাবশালী ব্যক্তি ছাড়াও শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের একাধিক প্রভাবশালী কর্মকর্তার নামও সামনে আসে। লিখিত ও মৌখিক পরীক্ষায় সর্বোচ্চ নম্বর না পেয়েও নিয়োগ পাওয়ার নজির রয়েছে। কোথাও কোথাও নিয়োগ বোর্ড বসার আগেই ফল নির্ধারণ হয়। এমনকি নানা অনিয়মের অভিযোগে কোনো কোনো নিয়োগ প্রক্রিয়া সাময়িকভাবে স্থগিত হলেও পরে প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে সেই নিয়োগ দেওয়া হয়। তবে নতুন নীতিমালায় এই প্রক্রিয়া পুরোপুরি এনটিআরসিএর হাতে চলে যাবে। সব পরীক্ষা, ফলাফল ও চূড়ান্ত সুপারিশ এনটিআরসিএ নির্ধারণ করবে, যা আর পরিবর্তনও করা যাবে না।

এনটিআরসিএ সংশ্লিষ্টরা বলছেন, নতুন এই নিয়োগ প্রক্রিয়া বাস্তবায়ন হলে দেশে শিক্ষক নিয়োগে দুর্নীতি, অনিয়ম, স্বজনপ্রীতির ঘটনা প্রায় শূন্যের কোঠায় নেমে আসবে। এরপর কর্মচারী নিয়োগও এনটিআরসিএর মাধ্যমে করার প্রস্তুতি চলছে। যদিও এসব কার্যক্রমে রাজনৈতিক দল বা নেতাদের সহযোগিতার পরিবর্তে অসহযোগিতা মিলছে।

জানতে চাইলে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা বিভাগের অতিরিক্ত সচিব মিজানুর রহমান কালবেলাকে বলেন, ‘প্রতিষ্ঠান প্রধান পদে নিয়োগের ক্ষেত্রে নতুন যেসব শর্ত যুক্ত হয়েছে সেগুলোর বাস্তবায়ন হলে নিয়োগের স্বচ্ছতা বাড়ার পাশাপাশি মেধাবীদের পাওয়া যাবে। গত বৃহস্পতিবার নীতিমালাটি মোটামুটি চূড়ান্ত হয়েছে। শিগগির এটি জারি হবে।’

এ প্রসঙ্গে এনটিআরসিএর চেয়ারম্যান মো. আমিনুল ইসলাম বলেন, ‘নতুন নীতিমালার অনুমোদন দিয়েছে মন্ত্রণালয়। শিগগির প্রতিষ্ঠান প্রধান নিয়োগ নীতিমালা জারি করা হবে। এরই মধ্যে দুটি দপ্তরের শূন্য পদের তালিকা পেয়েছি। এখন চূড়ান্ত করে নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করা হবে।’

নতুন নীতিমালা অনুযায়ী, শূন্য পদের তালিকা পাওয়ার পর তা যাচাই শেষে প্রতিষ্ঠান প্রধান ও সহকারী প্রতিষ্ঠান প্রধান পদে নিয়োগের জন্য বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করা হবে। এরপর যোগ্য প্রার্থীদের লিখিত বা বাছাই এবং মৌখিক পরীক্ষা গ্রহণ করা হবে। লিখিত বা বাছাই পরীক্ষা ও মৌখিক পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে হলে প্রার্থীদের ন্যূনতম ৫০ নম্বর পেতে হবে। পদভিত্তিক শূন্য পদের তিন গুণ প্রার্থী মৌখিক পরীক্ষার জন্য নির্বাচিত হবেন। মৌখিক পরীক্ষায় উত্তীর্ণ প্রার্থীদের মধ্য থেকে লিখিত, বাছাই, শিক্ষাগত যোগ্যতা ও মৌখিক পরীক্ষায় প্রাপ্ত নম্বরের ভিত্তিতে মেধাক্রম অনুযায়ী শূন্য পদের বিপরীতে ১.১০ অনুপাতে পদভিত্তিক একটি তালিকা তৈরি করা হবে। পাশাপাশি শূন্য পদের সমসংখ্যক প্রার্থীর একটি প্যানেলও প্রস্তুত করা হবে। সব পরীক্ষার ফল ও কৃতকার্যতা নির্ধারণে এনটিআরসিএর সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত। একজন প্রার্থী সর্বোচ্চ পাঁচটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের নাম পছন্দ হিসেবে দিতে পারবেন। এরপর কোনো প্রার্থী যদি পছন্দের বাইরে অন্য কোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে চাকরি করতে আগ্রহী হন, তাহলে অনলাইনে ই-আবেদনপত্রে প্রদর্শিত বিকল্পে সম্মতি দিতে হবে। নিয়োগের জন্য সুপারিশপ্রাপ্ত প্রার্থীকে সংশ্লিষ্ট ম্যানেজিং কমিটি বা গভর্নিং বডি এক মাসের মধ্যে নিয়োগপত্র দেবে। কোনো প্রার্থীর বিরুদ্ধে কোনো ফৌজদারি মামলা থাকলে তিনি নিয়োগে অযোগ্য বলে গণ্য হবেন।

এর আগে গত ৬ অক্টোবর শিক্ষা মন্ত্রণালয় অধ্যক্ষ, উপাধ্যক্ষ ও সুপার পদে নিয়োগ কার্যক্রম বন্ধ করে দেয়। তবে যেসব প্রতিষ্ঠানে আগে থেকেই নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি দেওয়া ছিল সেগুলোর প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে উচ্চ আদালত দুই সপ্তাহের জন্য মন্ত্রণালয়ের আদেশ স্থগিত করে। সেই সময়সীমা শেষ হওয়ার পর এখন নতুন পদ্ধতিতে প্রতিষ্ঠান প্রধান নিয়োগের কার্যক্রম শুরু করেছে শিক্ষা প্রশাসন। দেশের মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদপ্তর (মাউশি), মাদ্রাসা শিক্ষা অধিদপ্তর এবং কারিগরি শিক্ষা অধিদপ্তরকে শূন্য পদের তালিকা পাঠাতে বলেছিল এনটিআরসিএ। প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী স্কুল ও কলেজ পর্যায়ে সারা দেশে মোট ১ হাজার ৯৭৯টি প্রতিষ্ঠানে অধ্যক্ষ ও উপাধ্যক্ষের পদ শূন্য রয়েছে। আর মাদ্রাসার ৪৪৩টি শূন্য পদের তালিকা জমা পড়েছে। তবে কারিগরি শিক্ষা অধিদপ্তরের তালিকা তৈরির কাজ এখনো প্রক্রিয়াধীন।

মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তরের (মাউশি) এডুকেশন ম্যানেজমেন্ট ইনফরমেশন সিস্টেম (ইএমআইএস) সেলের তথ্য অনুযায়ী, সারা দেশে বেসরকারি স্কুল-কলেজ, মাদ্রাসা ও কারিগরি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ১০ হাজারের বেশি অধ্যক্ষ, উপাধ্যক্ষ, প্রধান, সহকারী প্রধানের পদ শূন্য রয়েছে। এর মধ্যে মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে শূন্য রয়েছে প্রধান শিক্ষকের ৩ হাজার ৯২০টি এবং সহকারী প্রধান শিক্ষকের ৩ হাজার ৮৭০টি পদ। নিম্নমাধ্যমিক বিদ্যালয়ে ৫০৪টি প্রধান শিক্ষকের পদ শূন্য রয়েছে। এ ছাড়া স্নাতক (পাস) কলেজে ৫৮২টি অধ্যক্ষের পদ শূন্য রয়েছে এবং ও ৬২৭টি উপাধ্যক্ষ পদ শূন্য রয়েছে। উচ্চ মাধ্যমিক কলেজে শূন্য রয়েছে ৭৬৭টি অধ্যক্ষ পদ।

ইএমআইএস সেলের তথ্য অনুযায়ী, দেশে মোট শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান রয়েছে ৩৪ হাজার ১১০টি। এর মধ্যে এমপিওভুক্ত প্রতিষ্ঠান ২৭ হাজার ২৮টি এবং নন-এমপিও প্রতিষ্ঠান ৭ হাজার ৮২টি। তার মধ্যে স্কুল ১৯ হাজার ৫৯টি, কলেজ ৩ হাজার ৪৬, স্কুল অ্যান্ড কলেজ ১ হাজার ১৮৯ এবং মাদ্রাসা রয়েছে ৯ হাজার ১৭৬টি। এসব প্রতিষ্ঠানে মোট শিক্ষক রয়েছেন ৪ লাখ ৩ হাজার ৯৪৬ জন।