শুধু মুখে আল্লাহর ওপর বিশ্বাসের কথা বললেই কি একজন মানুষ প্রকৃত মুমিন হয়ে যায়? ইসলামি চিন্তাবিদদের মতে, এই ধারণা আমাদের সময়ের অন্যতম বড় বিভ্রান্তি। কোরআন ও হাদিসে রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর শিক্ষায় স্পষ্ট করে বলা হয়েছে, ঈমান ও আমল আলাদা কোনো বিষয় নয়; বরং অবিচ্ছেদ্য দুই বস্তু।
ইসলামী চিন্তাবিদ আমিন আহসান ইসলাহির লেখা এক প্রবন্ধে বলা হয়েছে, শুরুতে এই ভুল ধারণা কিছু নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল। সময়ের ব্যবধানে তা ধীরে ধীরে সাধারণ মুসলমানদের মাঝেও ছড়িয়ে পড়েছে। ফলে অনেকেই মনে করছেন, আল্লাহর ওপর বিশ্বাস থাকলেই দায়িত্ব শেষ। নেক আমল, চরিত্র গঠন ও ইবাদত অতটা জরুরি নয়।
কিন্তু কোরআনের ভাষ্য ঠিক এর বিপরীত। কোরআনে যেখানে ঈমানের কথা এসেছে, প্রায় সব জায়গাতেই তার সঙ্গে সৎকাজের নির্দেশ রয়েছে। অর্থাৎ আল্লাহর ওপর বিশ্বাস ও নেক আমল আলাদা নয়, তারা পাশাপাশি পথ চলে।
কোরআনে বলা হয়েছে, প্রকৃত মুমিন তারা, যাদের অন্তর আল্লাহর নাম শুনলে কেঁপে ওঠে, যাদের ঈমান আয়াত শুনে আরও দৃঢ় হয়, যারা নামাজ কায়েম করে এবং আল্লাহ প্রদত্ত রিজিক থেকে ব্যয় করে। তারাই সত্যিকার অর্থে বিশ্বাসী।
কোরআনে ঈমানকে তুলনা করা হয়েছে একটি ফলবান গাছের সঙ্গে, যার শিকড় মাটির গভীরে গেঁথে আছে, ডালপালা আকাশের দিকে বিস্তৃত এবং যা সব ঋতুতেই ফল দেয়। এই উপমার অর্থ হলো, প্রকৃত বিশ্বাস মানুষের ভেতরে গভীরভাবে প্রোথিত থাকে, যা ঝড়ঝাপটায় উপড়ে যায় না। আর অবিশ্বাসের ভিত্তি দুর্বল, সহজেই ভেঙে পড়ে।
একজন মুমিনের জীবনও সমাজের জন্য কল্যাণের উৎস। যেমন একটি বড় গাছ তার ছায়া ও ফল দিয়ে পথচারীদের উপকার করে, তেমনি একজন বিশ্বাসীর সততা, ন্যায়পরায়ণতা ও দায়িত্বশীল আচরণ আশপাশের মানুষকেও উপকৃত করে।
কোরআনে বলা হয়েছে, উত্তম কথা আল্লাহর কাছে পৌঁছে যায়, কিন্তু সেই কথাকে মর্যাদা ও শক্তি দেয় সৎকর্ম। অর্থাৎ আমল ছাড়া ঈমান শুধু একটি দাবি হয়ে থেকে যায়।
লেখক বিশ্বাসকে একটি লতার সঙ্গে তুলনা করেছেন, যা অবলম্বন না পেলে বেড়ে উঠতে পারে না। তেমনি নেক আমল ছাড়া ঈমানও শক্তিশালী হয় না, ফলপ্রসূ হয় না।
তার মতে, প্রকৃত ঈমানের সবচেয়ে বড় প্রমাণ হলো রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর পূর্ণ অনুসরণ। মানুষের আচরণ, সিদ্ধান্ত ও জীবনযাত্রায় যদি নবীজির আদর্শের প্রতিফলন না থাকে, তবে তার ঈমানের দাবি প্রশ্নের মুখে পড়ে।
কোরআনে কঠোর ভাষায় বলা হয়েছে, মানুষ ততক্ষণ প্রকৃত মুমিন হতে পারে না, যতক্ষণ না সে সব বিরোধ ও মতবিরোধের মীমাংসায় রাসুলকে চূড়ান্ত বিচারক হিসেবে মেনে নেয় এবং তার সিদ্ধান্তের প্রতি অন্তরে কোনো আপত্তি না রেখে সম্পূর্ণভাবে আত্মসমর্পণ করে।
এই আয়াতের পটভূমিতে মদিনার মুনাফিকদের আচরণের কথা তুলে ধরা হয়েছে। তারা প্রকাশ্যে ইসলাম গ্রহণ করলেও নিজেদের স্বার্থে ইহুদিদের আদালতে মামলা নিয়ে যেত, যাতে ঘুষ বা কৌশলের মাধ্যমে নিজের পক্ষে রায় আদায় করা যায়। কোরআন এই দ্বিমুখী আচরণকে তাদের ঈমানের দাবির সম্পূর্ণ পরিপন্থী বলে ঘোষণা করেছে।
আরেক আয়াতে বলা হয়েছে, প্রকৃত বিশ্বাসী তারা, যারা আল্লাহ ও তার রাসুলের ওপর ঈমান আনার পর আর সন্দেহ পোষণ করে না এবং নিজেদের সম্পদ ও জীবন দিয়ে আল্লাহর পথে সংগ্রাম করে।
সব মিলিয়ে ইসলাহির পরিষ্কার বক্তব্য হলো, ঈমান শুধু অন্তরের বিষয় নয়, এটি কাজের মাধ্যমে প্রমাণ করতে হয়। নামাজ, নৈতিকতা, দায়িত্ববোধ, ত্যাগ ও সৎকর্ম—এসবের মাধ্যমেই আল্লাহর ওপর বিশ্বাস বাস্তব রূপ পায়। আমল ছাড়া ঈমান যেমন অপূর্ণ, তেমনি ঈমান ছাড়া আমলও প্রাণহীন। এই দুইয়ের সমন্বয়েই একজন মানুষ প্রকৃত অর্থে মুমিন হয়ে ওঠে।