গণমাধ্যমের সম্পাদকদের সঙ্গে মতবিনিময় বৈঠকে বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমানকে পরিণত ও মনোযোগী রাজনৈতিক নেতা হিসেবে দেখা গেছে। তিনি পানি, স্বাস্থ্য, কৃষি, নারী অধিকার, ভোকেশনাল শিক্ষা, দক্ষ জনশক্তি রপ্তানি ও আইটি খাতে উন্নয়ন নিয়ে তাঁর পরিকল্পনা জানিয়েছেন।
তবে তাঁর প্রস্তাবিত কৃষি কার্ড ও ফ্যামিলি কার্ড পরিকল্পনা অস্পষ্ট রয়ে গেছে। কার্ডের উদ্দেশ্য, অর্থের উৎস, রাজনৈতিক অপব্যবহার রোধ, বিশেষজ্ঞ মতামত ও পাইলট প্রকল্পের অনুপস্থিতি নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। বিশেষ করে সর্বজনীন ফ্যামিলি কার্ডের যৌক্তিকতা ও বিপুল অর্থায়নের বাস্তবতা নিয়ে গুরুতর সংশয় রয়ে গেছে।
তারেক রহমান গত দেড় দশকেরও বেশি সময় যুক্তরাজ্যে অবস্থান করে ওয়েস্টমিনস্টার–ব্যবস্থার পরিকল্পনা ও দেশ পরিচালনার প্রক্রিয়া কাছ থেকে দেখেছেন। তিনি লেবার ও কনজারভেটিভ—দুই প্রধান রাজনৈতিক দলের নীতিনির্ধারণ ও বাস্তবায়নের ধারা প্রত্যক্ষ করেছেন। একটি উন্নত অর্থনীতির বাস্তব চিত্রও তাঁর সামনে উন্মুক্ত হয়েছে, যেখানে উন্নত যোগাযোগব্যবস্থা, স্বাস্থ্য ও চিকিৎসাসেবা, মানসম্মত শিক্ষা, শক্তিশালী সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি এবং প্রাতিষ্ঠানিক সামাজিক মূল্যবোধ একে অন্যকে পরিপূরক করে কাজ করে।
কিন্তু এই অবস্থানে পৌঁছাতে ব্রিটিশ রাষ্ট্রব্যবস্থার চার শ বছরেরও বেশি সময় লেগেছে। এই দীর্ঘ সময়ে তাদের রাজনীতি ও অর্থনীতিতে একটি দৃঢ় ভিত্তি গড়ে উঠেছে। আজ ওয়েস্টমিনস্টারে যে পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়, তা সেই ঐতিহাসিক ও প্রাতিষ্ঠানিক ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়েই করা হয় বলেই সেগুলো কার্যকর হয়।
বাংলাদেশের বাস্তবতা ভিন্ন। তাই এখানে পরিকল্পনা হতে হবে বাংলাদেশ-উপযোগী। কোনো প্রকল্প গ্রহণের আগে প্রথমেই দেখতে হবে, এর শেষ ফলাফল কী হতে পারে। এরপর প্রয়োজন অভিজ্ঞ ব্যক্তি, গবেষক ও সংশ্লিষ্ট পেশাজীবীদের সঙ্গে আলোচনা এবং একাডেমিক বিতর্ক।
ওয়েস্টমিনস্টার স্টাইলে রাষ্ট্র পরিচালনার কথা যদি বলা হয়, তাহলে মনে রাখতে হবে, সেখানে কোনো বড় পরিকল্পনা এমন আলোচনার বাইরে গৃহীত হয় না। ইংল্যান্ডে আমার দীর্ঘদিন বসবাস, পড়াশোনা, শিক্ষকতা ও গবেষণা প্রকল্পে যুক্ত থাকার অভিজ্ঞতা থেকে এ কথাই প্রতীয়মান হয়। বড় কোনো কর্মসূচি বাস্তবায়নের আগে পাইলট প্রকল্পের মাধ্যমে তার কার্যকারিতা যাচাই করা একটি স্বীকৃত পদ্ধতি। সংশ্লিষ্ট প্রস্তাবগুলোর ক্ষেত্রে সে ধরনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে কি না, তা স্পষ্ট নয়।
আমাদের মনে রাখতে হবে, একটি দল নির্বাচিত হয়ে সরকার গঠন করার পর আর শুধু দলের সরকার থাকে না; সে দেশের ও জনগণের সরকারে পরিণত হয়। তাই সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচির সুবিধা দেশের স্বার্থেই সঠিক মানুষের হাতে পৌঁছানো উচিত।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন রাজনৈতিক বাস্তবতার সঙ্গে যুক্ত। ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর বাংলাদেশের মানুষ বা রাজনৈতিক দলগুলোর নেতা-কর্মীদের চরিত্র, মেধা ও প্রজ্ঞা রাতারাতি বদলে যায়নি। সে ক্ষেত্রে নতুন কোনো কার্ড বা সুবিধা দলীয়ভাবে বণ্টন করা হবে না—এই নিশ্চয়তা কোথায়?
ইতিমধ্যে এই কার্ড নির্বাচনমুখী রাজনীতিতে একটি বিভ্রান্তির উপকরণ হয়ে উঠেছে। কোথাও বলা হচ্ছে, ভোট না দিলে কার্ড দেওয়া হবে না। কোথাও আবার ভোটারদের হাতে কার্ডের ডামি কপি তুলে দেওয়া হচ্ছে। একটি রাষ্ট্রীয় সামাজিক সুরক্ষা উদ্যোগ যদি এমনভাবে রাজনৈতিক হাতিয়ারে পরিণত হয়, তাহলে তার গ্রহণযোগ্যতা প্রশ্নের মুখে পড়ে।
এ প্রসঙ্গে ভিজিএফ কার্ডের ভবিষ্যৎ নিয়েও স্পষ্টতা প্রয়োজন। বিএনপি ক্ষমতায় এলে চাইলে এই কার্ডের পরিধি বাড়াতে পারে। পরিবারের পুরুষ সদস্যের পরিবর্তে সংসারের মায়ের হাতে কার্ড তুলে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিতে পারে। অতীতে যদি রাজনৈতিক বিবেচনায় কার্ড বণ্টিত হয়ে থাকে, তবে তা সংশোধন করে প্রকৃত প্রাপ্য পরিবারগুলোর হাতে কার্ড পৌঁছানো ও বণ্টনে নিরপেক্ষতা নিশ্চিত করাই হবে সঠিক পথ।
আমাদের মনে রাখতে হবে, একটি দল নির্বাচিত হয়ে সরকার গঠন করার পর আর শুধু দলের সরকার থাকে না; সে দেশের ও জনগণের সরকারে পরিণত হয়। তাই সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচির সুবিধা দেশের স্বার্থেই সঠিক মানুষের হাতে পৌঁছানো উচিত।
তারেক রহমান ভোকেশনাল ইনস্টিটিউটগুলো আধুনিক কোর্স ও কনটেন্টের মাধ্যমে পুনর্গঠনের কথা বলেছেন। এটি নিঃসন্দেহে একটি ইতিবাচক পরিকল্পনা। এর ফলে যুবসমাজের একটি অংশ কর্মসংস্থানের জন্য প্রয়োজনীয় দক্ষতা অর্জন করতে পারে। বিদেশে জনশক্তি পাঠানোর আগে প্রশিক্ষণ দেওয়ার প্রস্তাবও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, যা প্রবাসী কর্মীদের দক্ষতা ও আয়—দুটিই বাড়াতে পারে। আইটি খাতে বিদ্যমান অবকাঠামো আরও কার্যকরভাবে ব্যবহারের কথাও তিনি বলেছেন, যা অনলাইন ও প্রযুক্তিনির্ভর খাতে কিছু অগ্রগতির সম্ভাবনা তৈরি করতে পারে।
তবে বড় রাজনৈতিক দলগুলোর কাছ থেকে দেশের মানুষ মূলত তিনটি বিষয়ে সুস্পষ্ট পরিকল্পনা জানতে চায়—কীভাবে বেকারত্ব কমানো হবে, কীভাবে দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণ করা হবে এবং কীভাবে দ্রব্যমূল্য সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে রাখা হবে।
বিশেষ করে দুর্নীতির প্রশ্নে বাংলাদেশের অবস্থান অত্যন্ত উদ্বেগজনক। ১৮০টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান ১৫১তম। ২০২৪ সালের দুর্নীতি ধারণা সূচক অনুযায়ী, দেশে সরকারি কাজে প্রায় ৭৭ শতাংশ ক্ষেত্রে দুর্নীতি ঘটে। ক্ষমতায় গেলে এই দুর্নীতি কীভাবে মোকাবিলা করা হবে, সে বিষয়ে এখনো স্পষ্ট রূপরেখা সামনে আসেনি।
সময়ের সীমাবদ্ধতার কারণে আলোচনায় হয়তো বিষয়টি বিস্তারিতভাবে আসেনি, কিন্তু জাতির প্রত্যাশা—তারেক রহমান তাঁর অন্যান্য পরিকল্পনার পাশাপাশি দুর্নীতি, বেকারত্ব ও দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণের বিষয়ে সুস্পষ্ট ও বাস্তবসম্মত পরিকল্পনা জাতির সামনে উপস্থাপন করবেন।
একটি রাজনৈতিক কর্মসূচির শক্তি শেষ পর্যন্ত তার বাস্তবায়নযোগ্যতা ও নৈতিক গ্রহণযোগ্যতার ওপরই নির্ভর করে। সেই জায়গায় স্পষ্টতা ও বিশ্বাসযোগ্যতাই হবে সবচেয়ে বড় পুঁজি।
-
নুসরাতে আজীজ গবেষক ও একাডেমিক
*মতামত লেখকের নিজস্ব