Image description
♦ পরিস্থিতি স্বাভাবিক হওয়ার অপেক্ষায় ব্যবসায়ী উদ্যোক্তা ♦ ব্যাংক বিমা শেয়ারবাজার সর্বত্র নির্বাচনি আলোচনা

চব্বিশের গণ আন্দোলনে রাজনৈতিক পট-পরিবর্তনের প্রায় দেড় বছর পর জাতীয় নির্বাচনের তারিখ চূড়ান্ত হওয়ায় দেশের অর্থনীতি-সংশ্লিষ্ট সব খাতে নির্বাচনি হাওয়া বইছে। সবকিছু ঠিকঠাক থাকলে আর মাত্র ২৯ দিন পরই অনুষ্ঠিত হবে বহুল প্রতীক্ষার সাধারণ নির্বাচন।

এজন্য ব্যবসায়ী, শিল্পমালিক ও উদ্যোক্তাসহ অর্থনীতি-সম্পর্কিত খাতগুলোর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সর্বত্র নির্বাচনি আমেজ বইতে শুরু করেছে। পরিস্থিতি স্বাভাবিক হওয়ায় অপেক্ষায় ব্যবসায়ী ও উদ্যোক্তারা। ব্যাংক, বিমা, সচিবালয়, শেয়ারবাজার সবখানে নির্বাচনি আলোচনা। এর অংশ হিসেবে দেশের প্রধান শেয়ারবাজার ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জে (ডিএসই) কিছুটা স্থিতিশীলতা ফিরতে শুরু করেছে। অবশ্য টানা দুই কার্যদিবস দরপতনের পর ৭ জানুয়ারি দেশের শেয়ারবাজারে ঊর্ধ্বমুখিতার দেখা মিলেছে। 

ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ (ডিএসই) এবং অন্য শেয়ারবাজার চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জে (সিএসই) বেশির ভাগ প্রতিষ্ঠানের শেয়ার ও ইউনিটের দাম বাড়ার পাশাপাশি বেড়েছে মূল্যসূচক। সেই সঙ্গে বেড়েছে লেনদেনের পরিমাণ। মূলত ব্যাংক কোম্পানিগুলোর দাপটের কারণে মূল্যসূচক ও লেনদেন উভয় বেড়েছে।

ঘটনা প্রবাহ-১ : গত ৭ জানুয়ারি দুপুর সাড়ে ১২টা। স্থান জনতা ব্যাংকের পল্টন শাখা। টাকা উত্তোলন ও জমার সারিতে অন্তত ১৫ জন গ্রাহক দাঁড়িয়ে আছেন। পেছন থেকে কেউ একজন হঠাৎ ফোনে কথা বলছেন : আরে ভাই রাখেন না নির্বাচনটা হইতে দেন। তার পর দোকান আবার নতুন করে সাজাব। আমি এখন ব্যাংকে আছি। টাকা তুলে রাখতেছি। ভোটটা হয়ে গেলেই নতুন করে নেমে পড়ব। জনৈক ব্যক্তির ফোনালাপের সূত্রে পাশে থাকা আরেকজন মন্তব্য ছুড়ে দিলেন : ভাই ভোটটা হয়ে গেলেই বাঁচি।

ঘটনা প্রবাহ-২ : শাহজালাল ইসলামী ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়। মঙ্গলবার বেলা ৩টা। রিসিপশনে বসে থাকা দুজন ব্যক্তির আলাপচারিতায় মনোযোগ রাখলাম। একে অপরকে বলছেন, এখানে আমার কিছু টাকা আছে। গ্রামে দুটি নতুন ফ্যাক্টরি আর একটা খামারের কথা ভাবছি অনেক দিন থেকেই। একটা লোনের আবেদনও করেছি। কিন্তু রাজনৈতিক পরিস্থিতি স্বাভাবিক না হওয়ায় সিদ্ধান্ত নিতে পারছিলাম না। এবার হয়তো সেটার একটা সিদ্ধান্ত নিতে পারব। অপর ব্যক্তি তার এ মন্তব্যে সমর্থন জানালেন মাথা নেড়ে। এমন নির্বাচনি আলোচনা এখন সবখানেই। তবে শেয়ারবাজার, ব্যাংক, বিমাসহ আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর অভ্যন্তরেও এরূপ আলোচনা জমে উঠছে হরহামেশাই। বিশ্লেষকরা বলছেন, অনেক বছর পর মানুষ স্বতঃস্ফূর্তভাবে ভোট দিতে পারবে এমন ভাবনায় বিভোর রয়েছেন। এ ছাড়া নির্বাচনের মধ্য দিয়ে যারা দেশ পরিচালনার দায়িত্বে আসবেন তারা আগের সরকারগুলোর মতো হবেন না। বরং জনস্বার্থের বিষয়ে ভাববেন। একই সঙ্গে জনগণের সত্যিকার কল্যাণে কাজ করবে নতুন সরকার- এমনটাই প্রত্যাশা সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা ড. হোসেন জিল্লুর রহমানের।

তিনি বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, নির্বাচনটা সঠিক সময়ে অনুষ্ঠিত হবে বলে প্রত্যাশা করাই যায়। এর পরিপ্রেক্ষিতে দেশের মানুষও নতুন করে স্বপ্ন দেখছে বলে তিনি মনে করেন। এই অর্থনীতিবিদ আরও বলেন, নির্বাচনের পর নতুন সরকারের উচিত হবে আইনশৃঙ্খলার সঙ্গে বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান খাতকে সর্বাধিক গুরুত্ব দেওয়া। এদিকে এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের (এডিবি) পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০২৫-২০২৬ অর্থবছরে জিডিপি প্রায় ৫ শতাংশ বাড়তে পারে। সেখানেও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার মূল ভিত্তি হিসেবে রেমিট্যান্স ও রপ্তানির কথা বলা হয়েছে। বিশেষ করে পোশাক রপ্তানি ও দেশের বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের বিষয়ে গুরুত্বারোপ করা হয়েছে।

এ ছাড়া পরিকল্পনা কমিশনের সাধারণ অর্থনীতি বিভাগ (জিইডি) প্রকাশিত নতুন ইকোনমিক আপডেট অ্যান্ড আউটলুকের নভেম্বর ২০২৫ সংখ্যায় অর্থনীতির আশাবাদী চিত্র তুলে ধরা হলেও গভীর কাঠামোগত দুর্বলতা ও রাজনৈতিক পালাবদল অর্থনীতির গতিকে বাধাগ্রস্ত করতে পারে বলে সতর্ক করা হয়েছে। নির্বাচন-পরবর্তী রাজনৈতিক দিকনির্দেশনা স্পষ্ট হলে এবং নতুন সরকার ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ উন্নয়ন, ব্যাংকিং খাত স্থিতিশীলতা, আর্থিক শৃঙ্খলা ও জ্বালানি নিরাপত্তায় দীর্ঘদিনের স্থগিত থাকা সংস্কারগুলো বাস্তবায়নে কার্যকর সিদ্ধান্ত নিলে অর্থনীতি ফের গতিশীলতা পাবে। এ ধরনের সংস্কার ছাড়া বর্তমানের পুনরুদ্ধার অবস্থা স্বল্পস্থায়ী হতে পারে।

অর্থনীতিবিদ মাশরুর রিয়াজ বলেন, সংসদ নির্বাচনের মধ্য দিয়ে দেশের রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা কেটে যাবে বলে আশা করা যায়। এর ফলে দেশের রাজনীতিতে ভোটের হাওয়া বইতে শুরু করার পাশাপাশি ভঙ্গুর অর্থনীতিও ঘুরে দাঁড়াবে বলে তিনি মনে করেন। দেশের অর্থনীতি এবং রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ফেরানো একমাত্র পথ নির্বাচন।