ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ছেলে সজীব ওয়াজেদ জয় এবং সাবেক তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি প্রতিমন্ত্রী জুনায়েদ আহমেদ পলকের বিরুদ্ধে জুলাই হত্যা মামলায় আনুষ্ঠানিক অভিযোগ গঠনের আবেদন করা হয়েছে। বিচারপতি মো. গোলাম মর্তূজা মজুমদারের নেতৃত্বে তিন সদস্যের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১-এ রোববার এই আবেদন করেন চিফ প্রসিকিউটর মোহাম্মদ তাজুল ইসলাম। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ এর চেয়ারম্যান বিচারপতি মো. গোলাম মর্তূজা মজুমদারের নেতৃত্বাধীন তিন সদস্যের বিচারিক প্যানেলে এ আর্জি জানান চিফ প্রসিকিউটর। প্যানেলের বাকি দুই সদস্য হলেন-বিচারপতি মো. শফিউল আলম মাহমুদ ও বিচারপতি মো. মোহিতুল হক এনাম চৌধুরী।
এ মামলার আসামি জয় পলাতক। অপর আসামি পলক গ্রেফতার আছেন। তাকে রোববার কারাগার থেকে ট্রাইব্যুনালে হাজির করা হয়। আনুষ্ঠানিক অভিযোগ গঠনের আবেদনে চিফ প্রসিকিউটর তাজুল ইসলাম বলেন, জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের সময় ইন্টারনেট বন্ধের নির্দেশ আসত জয়ের কাছ থেকে। সেই নির্দেশ বাস্তবায়ন করতেন পলক। আসামিপক্ষের বক্তব্য উপস্থাপনের জন্য বৃহস্পতিবার দিন ধার্য করেছেন ট্রাইব্যুনাল।
জয় পলাতক থাকায় তার পক্ষে ডিসেম্বরে রাষ্ট্রনিযুক্ত আইনজীবী হিসাবে মো. মুনজুর আলমকে নিয়োগ দেওয়া হয়। তিনি প্রথমবারের মতো ট্রাইব্যুনালে উপস্থিত হন। তিনি এ মামলা থেকে জয়ের অব্যাহতির আবেদন উপস্থাপনের জন্য সময় প্রার্থনা করেন।
এদিকে, জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের সময় সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় জামিন পেয়েছেন কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের লক্ষ্মীপুরের নেতা হুমায়ুন কবির পাটোয়ারী। এটি আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল থেকে জামিনের প্রথম আদেশ। বিচারপতি নজরুল ইসলাম চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন তিন সদস্যের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২ রোববার এক আসামির জামিন আবেদন মঞ্জুর করেন। ট্রাইব্যুনালের অপর দুই সদস্য হলেন বিচারক মো. মঞ্জুরুল বাছিদ ও বিচারক নূর মোহাম্মদ শাহরিয়ার কবীর। হুমায়ুন কবির পাটোয়ারী লক্ষ্মীপুর সদর উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি, সদর উপজেলার চররুহিতা ইউনিয়ন পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান। জুলাই অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পরপরই ২০২৪ সালের আগস্টে তাকে ঢাকা থেকে গ্রেফতার করা হয়েছিল। হুমায়ুন কবিরের গুরুতর অসুস্থতার কথা তুলে ধরে তার আইনজীবীরা জামিন আবেদন করলে ট্রাইব্যুনাল তা মঞ্জুর করেন।
জামিন আবেদনে আসামির আইনজীবী বলেন, তার মক্কেল লিভার সিরোসিসে আক্রান্ত। এই রোগে আক্রান্ত হয়ে ইতোমধ্যে তার দুই ভাই মারা গেছেন। এ সময় প্রসিকিউশনের (রাষ্ট্রপক্ষ) বক্তব্য জানতে চান ট্রাইব্যুনাল। তখন প্রসিকিউটর মো. মিজানুল ইসলাম বলেন, গুরুতর অসুখের মেডিকেল রিপোর্ট জমা দেওয়া হয়েছে। তাতে এ ধরনের জামিন আবেদনে বিরোধিতা করা খুব কঠিন। তবে মানবতাবিরোধী অপরাধের কোনো আসামির সঙ্গে যেন এই আসামি যোগাযোগ না করতে পারেন।
শুনানির পর বেশকিছু শর্ত দিয়ে জামিন আবেদন মঞ্জুর করেন ট্রাইব্যুনাল। শর্তের মধ্যে রয়েছে-আসামিকে বাসার ঠিকানা দিতে হবে, আসামি গণমাধ্যম কিংবা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কোনো বক্তব্য দিতে পারবেন না, তদন্ত কর্মকর্তা ও ট্রাইব্যুনালের রেজিস্ট্রারকে অবহিত করা ছাড়া বাসা পরিবর্তন করতে পারবেন না, সাক্ষ্য-প্রমাণকে প্রভাবিত করতে পারবেন না। শর্ত ভঙ্গ করলে তদন্ত কর্মকর্তা সঙ্গে সঙ্গে আসামিকে গ্রেফতার করতে পারবেন। আদেশ দেওয়ার সময় ট্রাইব্যুনাল বলেন, একটু এদিক-সেদিক করলে জামিন আর কোনো দিনও দেওয়া হবে না।
জুলাই সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় এই প্রথম কোনো আসামি জামিন পেলেন বলে প্রসিকিউটর মিজানুল ইসলাম জানান। ২০২৪ সালের জুলাইয়ে লক্ষ্মীপুরে সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় মোট চারজন গ্রেফতার আছেন। তাদের মধ্যে হুমায়ুন কবির জামিন পেলেন।
পলকের পক্ষে শুনানি : প্রসিকিউশনের শুনানি শেষে আসামি পলকের পক্ষে দাঁড়ান আইনজীবী লিটন আহমেদ। তিনি বলেন, আদালতের আদেশ অনুযায়ী ৯ জানুয়ারি আমরা আসামির সঙ্গে প্রিভিলেজ কমিউনিকেশনের জন্য কারাগারে যাই। কিন্তু ল্যাপটপ ও পেনড্রাইভ নিয়ে আমাদের ঢুকতে দেয়নি কারা কর্তৃপক্ষ। তাই আমরা শুক্রবার এ কাজটি সারতে চাই। একই সঙ্গে, ১৮ জানুয়ারি অভিযোগ গঠন নিয়ে প্রশ্নে শুনানি করতে চাই। এ সময় চিফ প্রসিকিউটর বলেন, আসামিপক্ষের শুনানির জন্য ১৪ তারিখ নির্ধারিত রয়েছে। তারা চাইলে আজই আসামির সঙ্গে এখানে (ট্রাইব্যুনালের হাজতখানায়) প্রিভিলেজ কমিউনিকেশন করতে পারেন। তখন চেয়ারম্যান বলেন, শুক্রবার কেন, আপনারা চাইলে আজই এসব কাজ সারতে পারেন। কিন্তু নিজেদের আবেদন নিয়ে অটল থাকেন আসামিপক্ষের আইনজীবীরা। এ সময় চিফ প্রসিকিউটর বলেন, উনারা বিচারকাজ বিলম্ব করতে চাইছেন। এজন্যই এতকিছু। এ পর্যায়ে ট্রাইব্যুনালের উদ্দেশে লিটন আহমেদ বলেন, এ মামলায় জব্দকৃত ১০টি ভিডিও আমাদের দিয়েছে প্রসিকিউশন। কিন্তু কয়েকটি ওপেন করতে পারিনি।
তখন ট্রাইব্যুনালের প্রথম সদস্য বিচারপতি শফিউল আলম বলেন, আপনারা বুঝে নেননি কেন? প্রসিকিউশনের সামনে সবকিছু দেখে নিতে পারতেন। পরে চিফ প্রসিকিউটর বলেন, আমাদের এখানে সব ওপেন হচ্ছে। উনাদের ডিভাইসে সমস্যা থাকতে পারে।
জবাবে ট্রাইব্যুনাল বলেন, ডিভাইসের সমস্যা থাকলে আজও ২ ঘণ্টা সময় নিয়ে করেন। আর নির্ধারিত তারিখ অনুযায়ী শুনানি করেন।
পলকের পক্ষের আইনজীবীরা বলেন, ফরমাল চার্জ অনেক বড়। পুরোটা পড়তে সময় লাগবে আমাদের। আদালত সবার প্রতি দয়াবান। তখন ট্রাইব্যুনালের চেয়ারম্যানসহ অন্য বিচারকরাও বলেন, আগামী ৪ দিন অর্থাৎ বৃহস্পতিবারের কথা।
চিফ প্রসিকিউটর বলেন, উনারা আশায় আছে ইলেকশন (নির্বাচন) হলে বিচার হবে না। এজন্য বিচারকার্য বিলম্বিত করতে চাইছেন।
চিফ প্রসিকিউটরের এমন কথায় বিচারপতি শফিউল বলেন, ইলেকশন হলে কি আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসবে? ‘এমন বইলেন না, এমন বইলেন না।’
তখন চিফ প্রসিকিউটর বলেন, উনারা কী বলে সব কথা আমাদের কানে আসে। একপর্যায়ে ট্রাইব্যুনাল বলেন, এসব কথা আর বলবেন না। পরে ট্রাইব্যুনালের চেয়ারম্যান বলেন, বৃহস্পতিবার পর্যন্ত সময় পাবেন। বৃহস্পতিবার শুনানি করবেন।